অষ্টপ্রহর আনাগোনা ১৫

অষ্টপ্রহর আনাগোনা ১৫

ক্যামেলিয়া ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে রনিতাকে কাছে ডাকলেন। বললেন,
-কাল তোমার জন্মদিন ছিল, ছোট্ট একটা গিফট।
বলে রঙিন মোড়কে বাঁধা একটা প্যাকেট রনিতার হাতে তুলে দিলেন। বিস্মিত রনিতা বলল,
-অনেক ধন্যবাদ। আমি কী বলব ভেবেই পাচ্ছি না।
স্মিতমুখে ক্যামেলিয়া বলেন,
-কিচ্ছু বলতে হবে না। চলো গল্প করি খাবার আসতে আসতে। আমার ছেলেকে দেখে কাল একটু অবাক হয়েছ, তাই না?
-হ্যাঁ, কিছুটা। আগে কখনো আপনার মুখে ছেলের কথা শুনিনি৷
-হুঁ প্রসঙ্গ আসেনি, বলা হয়নি। তাছাড়া আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে আমি কথা বলিও না।
-সেটা বুঝতে পেরেছি এ কিছুদিনেই।
-কাল তোমাকে দেখে মনে হয়েছে তোমার মন খারাপ ছিল।
হতভম্ব রনিতা তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ ক্যামেলিয়ার দিকে। তারপর মাথা নেড়ে বলল,
-আপনি বুঝলেন কী করে?
-তোমাকে বুঝতে পারি।

গল্পের মতোই জীবন ক্যামেলিয়ার। আনোয়ার আর ক্যামেলিয়া দুজনে এক সঙ্গে কর্পোরেট অফিসে কাজ করতেন। খুব স্বল্প সময় আর পরিচয়ে, প্রেমে পড়ে ক্যামেলিয়া ব্যানার্জি থেকে বিয়ে করে ক্যামেলিয়া আনোয়ার হয়ে গেলেন। দুই পরিবারই মেনে নিতে পারেনি এই বিয়েকে। মন খারাপ হলেও দুজনে তখন প্রেমের প্রাপ্তিতে বিভোর। কিন্তু এই বিভোরতা কাটতেও খুব একটা সময় লাগেনি। শুরু থেকেই কোথায় যেন একটা শূন্যতা ছিল দুজনের মাঝে। বিয়ের পর আনোয়ারকে বড়ো নির্লিপ্ত মনে হত ক্যামেলিয়ার। যৌথ পরিবারের মেয়ে ক্যামেলিয়া৷ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুহীন জীবনে নিজেকে অনেকটা একঘরে লাগত। একেবারেই অভ্যস্ত নন তিনি এভাবে থাকতে। কয়েকবার চেষ্টা করেছেন বাবা-মা, ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কিন্তু তাঁরা একেবারেই সাড়া দেননি। ক্যামেলিয়া মন খারাপ করে আনোয়ারকেও প্রায় বলতেন, চলো তোমাদের গ্রামে যাই, তোমার বাবা-মার কাছে গিয়ে দাঁড়ালে,তাঁরা আমাদের ঠিকই মেনে নেবেন।
আনোয়ার বলতেন,
-তোমার বাবা-মাও তো মেনে নিতে পারেননি।
ক্যামেলিয়া বলেন,
-সে তো অনেকটা ধর্মীয় কারণে। বাবার আসল রাগের কারণ, আমি ধর্ম ত্যাগ করেছি। একজন ব্রাহ্মণ হয়ে বাবা এটা কোনোদিনও মেনে নিতে পারবেন না। তোমার বেলায় তো সেটা ঘটেনি।
-আমার বাবা-মা হয়তো অন্য একটা কারণ দেখাবেন। জানি ওঁরাও মেনে নেবেন না।
-তবু চলো চেষ্টা করেই দেখি।
আনোয়ার কোনো উত্তর করতেন না। ক্যামেলিয়া ঠিক বুঝতে পারতেন না এই বিষয়টা আনোয়ার সবসময় কেন যেন এড়িয়ে যেতেন।
একাকীত্ব কিছুটা কেটে গিয়েছিল এক বছরের মাথায় ছেলে অর্ক এলো ওঁদের জীবনে আনন্দ হয়ে। তখনও বুঝতে পারেননি তাঁদের এই আনন্দ বড়ো ক্ষণস্থায়ী। ছেলেকে পেয়ে বাবা-মার দুঃখ কিছুটা ভুলে গিয়েছিলেন ক্যামেলিয়া। ছেলের ছয় মাস হতেই রাতদিনের কাজের লোকের কাছে রেখে ক্যামেলিয়া আবার চাকরিতে ফিরে গেলেন। অফিসের কাজ, বাড়ি ফিরে ছেলের দেখা-শোনা, সংসার নিয়ে বেশ মেতে ছিলেন। অর্কের তিন বছর হতেই স্কুলেও ভর্তি করে দিলেন।
ঘটনা যেদিন ঘটল, অর্কর সাত বছর হতে দুদিন বাকি ছিল। ক্যামেলিয়া অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন। ভাবলেন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে জন্মদিনের জন্য কেনাকাটা করবেন। কিন্তু ব্যাগ খুলে দেখেন টাকার পার্স বাড়ি ফেলে এসেছেন।
বাড়ি এসে বাইরের তালা খুলে তাড়াহুড়ায় সোজা শোবার ঘরে ঢুকে পড়লেন। পরমুহূর্তেই ছিটকে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। দৌড়ে বাড়ি থেকে বের হতে গিয়ে চেয়ারের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মাথা ঘুরে পড়ে জ্ঞান হারালেন।
জ্ঞান ফেরার পর চোখ মেলে ক্যামেলিয়া প্রথম কথা বলেছিলেন,
-অর্ক কোথায়?
আনোয়ার ক্যামেলিয়ার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে মুখের ওপর ঝুঁকে বললেন,
-অর্ককে স্কুল থেকে আনা হয়েছে, ভেব না তুমি। সব ঠিক আছে। তুমি সুস্থ হও আগে।
সুস্থ হওয়া ক্যামেলিয়ার জন্য সহজ ছিল না।
কঠিন বাস্তব সত্যকে মেনে নেয়া কি এতটা সহজ, বলা যতটা সহজ?
কয়েকদিন পর ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠে ক্যামেলিয়া আনোয়ারকে বলেছিলেন,
-তাহলে আমাকে কেন বিয়ে করেছিলে?
-তুমি আমাকে আকর্ষণ করেছিলে। তোমাকে ভালোবাসি বলেই বিয়ে করেছি।
-এ কেমন ভালোবাসা? আমি যা দেখলাম সেটা তাহলে কী?
-নারী, পুরুষ দুটাই আমাকে আকর্ষণ করে।
আমি জানি তোমাকে এখন সব কিছু বোঝানো সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে তোমার বুঝতে পারারও কথা নয়। তবে তুমি যা চাইবে, সেটাই হবে।
কী চান ক্যামেলিয়া নিজেও জানেন না। তাঁর ছেলের কী হবে? কেমন করে ছেলেকে মানুষ করবেন? ছেলের কাছে কতদিন অমোঘ সত্যকে লুকিয়ে রেখে সারাজীবন কাটিয়ে দেবেন!
ক্যামেলিয়া ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটিয়ে বাস্তবের শক্ত মাটিতে অনভ্যস্ত হাতে নিজেকে
গুছাতে চান। বন্ধু-বান্ধব কার কাছে গিয়ে এই সমস্যা বলতে পারবেন সেটাও বুঝতে পারছিলেন না। আনোয়ার নিজে থেকেই সমস্যার সমাধান নিয়ে এলেন।
ক্যামেলিয়ার সামনে অপরাধী, অসহায় কাতর কণ্ঠে বললেন,
-তুমি চাইলে আমার সঙ্গে থাকতে পারো, যেতে চাইলে আমি বাধা দেব না। আজীবন তোমার আর অর্কের সব দায়িত্ব আমি নেব যেমন করে পারি। শুধু আমার এই বিষয়টা তোমাকে গোপন রাখতে হবে। আমরা যে সমাজে বাস করি, সে সমাজ, পরিবেশ এটাকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেবে না। সবাই ভাববে আমার রুচি বিকৃতি ঘটেছে। আমার এই ভালোবাসা নিয়ে লোকে হাসবে। আমি সবার কাছে হাসির পাত্র হয়ে বেঁচে থাকতে পারব না। আমার সামাজিক অবস্থানে বিব্রত হতে হবে, অপমানিত হতে হবে নানা ভাবে। তুমি বুঝতে পারছ ক্যামেলিয়া আমি কতখানি অসহায়!
ক্যামেলিয়া করুণ কণ্ঠে বলেন,
-আমাকে কেন এর মধ্যে জড়ালে তুমি ?
-আমি ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে জীবন মানিয়ে নিতে পারব। নিজেকে অবদমন করে আমি চেষ্টা করছিলাম তোমার সঙ্গে সংসার করতে। আমরা দুজনেই বিয়ের সিদ্ধান্ত খুব তাড়াতাড়ি নিয়েছিলাম। তোমাকে দেখার পর মনে হয়েছিল আমি হয়তো এই দোটানা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারব। আপ্রাণ চেষ্টাও করছিলাম। কিন্তু শাহাদাতের সঙ্গে পরিচয়ের পর সব কিছু কেমন বদলে যেতে থাকল। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। শাহাদাত আমার কাছে বিষয়টা সহজ করে দিল। নিজেও স্বাভাবিক ভাবে নিল। এতদিন যে দ্বিধা নিয়ে আমি বেঁচেছিলাম, শাহাদাত অনায়াসে তার সমাধান করে দিল। তোমাকে আমি কীভাবে এসব কথা জানাব বুঝতে পারছিলাম না। আমি অপরাধবোধে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি।
মাঝে মাঝে আনোয়ার ক্যামেলিয়াকে বলতেন,
-তুমি আবার বিয়ে করো, সংসার করো, আমার স্বস্তি লাগবে।
দিনে দিনে আনোয়ারের প্রতি রাগ, ঘৃণা করুণায় পরিণত হতে থাকে ক্যামেলিয়ার। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না। কী করবেন বুঝতে পারেন না। নিজের শরীর ভালো থাকে না। লো প্রেশার। ডিপ্রেশনে থাকেন। একদিন অফিসেও পড়ে যান মাথা ঘুরে। কাজে মন দিতে পারেন না। কতদিন আর এভাবে চলে! এক পর্যায়ে চাকরি ছেড়ে দিতে চান।
ক্যামেলিয়া আনোয়ারকে বলেন,
-আমি আর এভাবে থাকতে পারছি না। আমি অর্ককে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে চাই।
-পাগলামি করো না ক্যামেলিয়া। মাথা ঠাণ্ডা করে ডিসিশন নাও।
দুজনে সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেকে একটা ভালো বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে দেবার আগ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকবেন। ক্যামেলিয়ার জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া এই মুহূর্তে সত্যি খুব কঠিন। বিয়ের সময় ক্যামেলিয়ার যে দৃঢ়তা, সাহস আর উদ্যম ছিল এখন জীবনের এই সংকটকালে তার কোনোটাই নাই। আনোয়ার সত্যি বলেছে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ডিভোর্সের কথাও মাথায় এসেছে। কিন্তু মনস্থির করতে পারেননি।
অর্ককে চট্টগ্রামে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে ক্যামেলিয়া আলাদা থাকতে শুরু করেন।
শুনতে শুনতে নিজের অজান্তে রনিতার চোখ ভিজে উঠছিল। খাবার এসে যায়। ক্যামেলিয়া বলেন,
-চলো আগে খেয়ে নি। খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
খাবার শেষে রনিতা জিজ্ঞেস করে,
-এখানে এলেন কী করে?
-আতিয়া সিদ্দিকীর স্বামীর কোম্পানিতে কাজ করতাম। এক কলিগের মুখে এই আশ্রমের কথা জানতে পেরে এখানে ইয়োগা করতে আসতাম। তখন মগবাজার এলাকায় ফ্ল্যাটে একা থাকতাম। খরচ অবশ্য আনোয়ার দিত। কিন্তু বুঝতেই পারো এই দেশে আমার মতো একটি মেয়ের একা থাকার বিড়ম্বনা! তাই ডিভোর্সের চিন্তাটা মাথা থেকে বের করে দিলাম। এখানে ম্যামের সঙ্গে পরিচয় হয়, ঘনিষ্ঠতা হল। সব জেনে ম্যাম একদিন বললেন, চলে আসো আমার আশ্রমে। আমার সঙ্গে থাকবে। ছুটিতে অর্ক ঢাকায় আসলে আমি দেখা করতে যাই, সময় কাটাই ওর সঙ্গে। এইতো এভাবেই সময় কেটে যায়।
রনিতা জিজ্ঞেস করে,
-ছেলে জানে?
-জানে। গতবছর অর্ক জানতে চেয়েছিল আমাদের আলাদা হবার কারণ। বড়ো হয়েছে এখন। সবটা খুলে বললাম ওকে। মিথ্যে বলতে পারলাম না। মনে হল সত্যিটা কোনো একদিন অর্ক জানবেই। তখন আমাকে প্রশ্ন করতে পারে সত্যিটা কেন লুকালাম। এখানে আমার তো কোনো ভূমিকা নাই। সত্যি কথা বলতে পেরে নিজেও অনেক স্বস্তি পেয়েছি।
-ছেলের সঙ্গে দেখা হয় আনোয়ার সাহেবের?
-হুঁ, বিষয়টা জানার পরও ছেলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক আছে। এ যুগের ছেলে তো! আমার মতো মানসিক ধাক্কা লাগেনি। বরং আমাকে বলল, ভেব না, এ কারণে বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হবে না।
আমিও নিশ্চিত হলাম। ছেলের সব দায়িত্ব পালনে আনোয়ারেরও কোনো ত্রুটি নেই৷
তবে আমি এখানে আসার পর আনোয়ারের কাছ থেকে আর কোনো হেল্প নেই না৷
+
+
+
+

ছবিসূত্র: Image by Jean-Pierre Pellissier from Pixabay

Leave a Reply