কাঠামো পরিকাঠামো চালচিত্র হয়ত আছে, মূর্তিটি নেই

কাঠামো পরিকাঠামো চালচিত্র হয়ত আছে, মূর্তিটি নেই

কিছুদিন আগে একটা গদ্য লিখেছিলাম, নাম ছিল ‘সাম্প্রতিক কবিতার গতি প্রকৃতি’। গদ্যটি আমার ‘রিলেদৌড়ের অনিঃশেষ’ গদ্যগ্রন্থে সংযোজিত হয়েছে। নামেই কিছুটা আঁচ আছে যে সাম্প্রতিক কালের কবিতার গতিধারাটি কী রকম। আর এর প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্যগুলি কী ধরণের। এখানেও প্রায় অনেকটা সেইসব আলোচনা চলে আসছে। স্বাভাবিক কারণেই একই কথা বারবার বলার চেয়ে পাঠককে অনুরোধ করতেই পারি, ওই লেখাটা একটু পড়ে নিতে। এখানে আলোচনায় আনতে চাই সেইসব যা রিপিটেশন হবে না।

যেমন কাঠামোর কথা বলা হচ্ছে। কবিতার কাঠামো। তা অনেক-পুরোনো, পুরোনো, অধুনা, সাম্প্রতিক, বা অতি-সাম্প্রতিক বা এই-সময়ের যাই হোক না কেন তার একটি তথাকথিত কাঠামো আছে। এখন কবিতার কাঠামো নিয়ে আমার ভাবনা ও বিশ্বাসের কথাটা আগে বলা প্রয়োজন। প্রথমত কাঠামোটি আপাত। কবিতার কোনো অবয়ব নেই। যা আমরা দেখি সেটি তার লিপিত রূপ মাত্র। এখন এই লিপিত রূপটি কেমন হবে তা পূর্ব-নির্ধারিত হতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই কাঠামো যদি স্বীকারও করি, তবে সেটি আপাত। অর্থাৎ লিপিত হতে হতে সেটা যেমন পরিবর্তনশীল, লিপিত হওয়ার পরেও তা পরিবর্তিত হতে পারে নানা কারণে। মনে প্রশ্ন উঠতে পারে ছন্দ মেনে ও মেপে লিপিত হওয়া কবিতার ক্ষেত্রেও কি সেটা হতে পারে? একটু চিন্তা-ভাবনা ও সামান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেই আশা করি সেটাও বোঝা যাবে। একমাত্র ছাঁদে ও ছাঁচে ফেলা কবিতার ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্নতর। যেমন, চতুর্দশপদী কবিতা, ট্রিওলেট ইত্যাদি। কারণগুলো আমার না-জানালেও চলবে, কেননা তা সবারই জানা। একই সঙ্গে উঠে পড়বে পদ্য (Verse) এবং কবিতার (Poetry) মধ্যে গুণগত পার্থক্যটির কথা। মাপে, ছাঁচে, ছাঁদে পদ্যই সাবলীল। কবিতা অনেক বেশি মুক্ততা দাবী করে এবং তার সাবলীল প্রকাশ মাপ, ছাঁদ, ছন্দ, ছাঁচ, কাঠামো সব ছাড়িয়ে যায়। কবিতায় শুধু গঠনই নয়, বিগঠন, অ-গঠন সবই জড়িয়ে থাকে। জড়িয়ে যায়। তাই কাঠামো শুনলেই কেমন প্রতিমা গড়ার কথা প্রায় সংস্কারের মতো আমাদের মাথায় জাঁকিয়ে বসে। কিন্তু কবিতায় আদৌ কোনো মূর্তি গঠিত হয় না। কবিতার উদ্দেশ্য কোনো মূর্তি গঠন নয়। স্বাভাবিকভাবেই নির্দিষ্ট সুপরিকল্পিত কোনো কাঠামো কবিতার ক্ষেত্রে মোটেও জরুরি নয়। সে অনেক বেশি ভোলাটাইল, বেশ কিছুটা বিশৃঙ্খল, এবং অস্থির।

চিন্তা-চেতনা-মনন-ভাবনা বস্তু নয়। অথচ বস্তু নিয়েই তার যত খেলা। প্রত্যক্ষত বস্তু নিয়ে, আবার পরোক্ষভাবেও বস্তু নিয়ে। ভাব যা, তাও মূলত বস্তু থেকেই উদ্গত, বস্তু কেন্দ্রিকতার জাল উন্মুক্ত হলেই ভাবের সমাগম। বস্তুর (জড় ও জীব) সঙ্গে অবিরত সংসর্গে ও সংঘর্ষে সাড়া দেওয়া ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার প্রবণতা আর অনায়ত্ত অথচ কল্পনা করা চলে এমন কিছুর রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শে আলোকিত-অনালোকিত এক পরিসর সৃষ্টির নেশা মানুষের আছে। বস্তু থেকে উত্থিত হয়েও তাঁর জ্ঞান বস্তুতীতের দিকেই ছোটে, এবং অর্জন করে। আর এই-সমস্ত কিছুর প্রতিফলিত লিপিত ভাবনাটিকে আমরা ‘কবিতা’ অভিধা দিয়েছি। রূপ বল্লেই অবয়বের কথা আসে। কিন্তু রূপই বলি আর অবয়বই বলি, তাতে কবিতাটি থাকে না, সে থাকে আড়ালে। কারণ তাকে সীমায়িত করা চলে না। কবিতার যেমন সংজ্ঞা হয় না, তেমনই তার গতি ও প্রকৃতির কারনে তাকে কোনও আধারে ধরে রাখাও যায় না। সে অসীম। আমরা যে সীমায়নটি করি তার আগে মাঝে পরে অনির্দিষ্ট অসীম স্পেসটি থেকেই যায়। এটি কবিতার একটি মহত্ব।

গঠনকে আঙ্গিকের খোল-নলচেয় ফেললে, স্বাভাবিকভাবেই আমার ওপরের আলোচনার ভিত্তিতে বিশেষ গুরুত্ব দেবার থাকে না। আমার পড়ার যা চৌহদ্দি ও সীমিত অভিজ্ঞতা, তাতে এই সময়ের কবিতায় আঙ্গিকের বিষয়টি খুব মাথা চাড়া দিয়ে নেই। পদ্য আর কবিতার স্বরূপটি অনেক কবির কাছেই পরিস্কার। তাই কবিতা নির্মাণে কবিতা করা নিয়েই যত গুরুত্ব। অর্থাৎ ভাবনার প্রক্ষেপন ও পরিচলন, অনুভব-অনুভূতি প্রকাশের উপযোগী ভাষা আবিষ্কার, চেতনার বিস্তার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইত্যাদি। আঙ্গিক বা কাঠামো নিয়ে সেভাবে আলোড়ন দেখি না। থাকলেও এসময়ে তা উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। ফর্মের কথা উঠলে স্ট্রাকচারের কথাটি উঠে আসে। বলতে হয় ফর্মই তার প্রয়োজনানুসারে স্ট্রাকচারটি গড়ে তোলে। আবার কখনো স্ট্রাকচারটি ফর্মকে বহন করে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে আমি মনে করি, যে ভাব-ভাবনাটি কবিতা হিসেবে লিপিত হবে তারই স্পন্দনে আর আকাঙ্খায় ফর্মটি শেপ পেতে থাকে। ফলে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে তারা। তাই কখনো ভাবনা, পরিকল্পনা, চিন্তন ফর্মটি আবিষ্কার করে, আবার কখনো ফর্মটিই ভাবনা ও তার সম্প্রসারণকে বয়ে নিয়ে যায়। ভাষা-রূপটি এ-সকলকে সহায়তা করে চলে।

এই সময়ের কবিতার পরিকাঠামো, চিন্তাটি আমি ঠিক ঠাওর করতে পারছি না। কবিতার পরিকাঠামো কী হতে পারে, তা নিয়ে আমার সম্যক ধারণা নেই। পরিকাঠামো বলতে সাধারণত যা বুঝি, তা হলো, নীচের কাঠামো বা তৃণমূল-স্তরের কাঠামো। ইংরেজি প্রতিশব্দটি যদি, Infra-structure হয়, তাতেও আমরা তাই বুঝি। যেমন, যাপনের পরিকাঠামোর মধ্যে আসে, খাদ্য-স্বাস্থ্য-গৃহ-শিক্ষা ইত্যাদি। যেমন, শহরের পরিকাঠামোর মধ্যে আসে রাস্তা-যানবাহন-আলো-ফাঁকা জায়গা ইত্যাদি। তাহলে কবিতার পরিকাঠামো বলতে কী বুঝব? তবে কি কবিতার উপাদান, অনুষঙ্গ, আবহ, পরিমণ্ডল ইত্যাদি বোঝানো হচ্ছে? হতে পারে, নাও হতে পারে। অন্যকিছু বোঝানোর চিন্তাও থাকতে পারে। সুতরাং না জেনে, না বুঝে কতক কথার কথা উগড়ে দেওয়া ঠিক নয়। যদি উপাদান, অনুষঙ্গ, পরিমণ্ডল ইত্যাদিই বোঝানো হয়, সেক্ষেত্রে এক লাইনে এটা বলা ভুল হবে না যে তা সময় ও পরিসর নির্ভর আর এই দুই-কে ছাড়িয়ে যাওয়ায় অভিসারী।

এই সময়ের কবিতার চালচিত্র। কবিতাটিকে প্রতিমা ঠাওরালে, চালচিত্র শব্দটি খুবই এপ্রোপ্রিয়েট। কেননা সেক্ষেত্রে প্রতিমার পেছনে স্থাপিত চিত্রবিচিত্র গোলাকার পটটি চোখের সামনে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। এখন কবিতায় যিনি কবিতা-প্রতিমা গড়েন না, বা কাব্য-প্রতিমায় যার বিশ্বাস নাই, তার কাছে চালচিত্রের ভাবনা, অবস্থান, ভঙ্গি সবই পালটে যায়। আমার সেই ভাব, সেই বিশ্বাস। ফলে এই সময়ের কবিতার চালচিত্র বলতে আমি কবিতার গতি, অভিমু্‌খ, প্রকৃতি, সম্ভাবনা এসব বুঝি। বুঝি এই সময়ের কবিতার চিহ্ন, বৈশিষ্ট্য, স্বপ্ন। আর অবশ্যই পরিসরের উপাদান, অনুষঙ্গ, আবহ, পরিমণ্ডল ইত্যাদি।

এই সময়ে লেখা সব কবিতাকে আমি এই-সময়ের কবিতা বলে মানতে নারাজ। সাম্প্রতিক সময়ে লেখা আবার এই সময়ের এবং আগামীর চিহ্ন যেসব কবিতায় সচেতন এমনকি অসচেতন ভাবেও রয়েছে তাই আমার কাছে এই সময়ের কবিতা। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে এসে আজও বাংলা কবিতা অনেক ক্ষেত্রেই বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ, পঞ্চাশ বা সত্তর দশকের কবিতার অনুকরণে ব্যস্ত। কিন্তু এটি আসল মুখ নয়। এর বাইরে পড়ে রয়েছে এক ব্যাপ্ত জগৎ এবং পরিসর। সেটিই বাংলা কবিতার আগামীর ধার ধারা প্রকৃতি। এই পরিসরে মূলত দুটি কাজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এক, বাংলা কবিতার সাবেকি ধারাটিকে অন্তরে বজায় রেখে তার সংস্কার সাধন। যাতে অনেক সময় স্বতন্ত্রতার পরিচয় মেলে এবং সেই ধারায় ছোট-খাটো কিছু বাঁক লক্ষ্য করা যায়। আরেকটি কাজ বাংলা কবিতার ধারামুক্তি বা আমূল পরিবর্তন। এটি একটি গভীর বাঁক তথা উল্লম্ফন। আমূল পরিবর্তনের কাজ কখনও শেষ হয়ে যায় না। তাই এই কাজটি নব নব চিন্তনের প্রয়োগে উদ্ভাসিত হতেই থাকে।

স্বাভাবিকভাবেই এই-সময়ের কবিতার চালচিত্রে বিচিত্রতা আর বহুধার সম্মীলন। বাংলা কবিতায় ‘আধুনিক’ অভিধাটির গতিমুখ শ্লথ মলিন হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ষাটের আশির নব্বই-এর নানা আলোড়ন আন্দোলনে সৃষ্ট নব্য-ধারা আত্মস্থ করার মাধ্যমে এই-সময়ে কবিতায় এতো বিচিত্র উদ্ভাস। বৈচিত্রর উপাদানে, ভাবনা্‌য়, চেতনার উন্মীলনে, ভাষায়, এবং নির্মাণে। গল্প, নাটক, বাণী, প্রতিপাদ্যতা ইত্যাদির অবসান। কোথাও অবসান না-ঘটলেও গুরুত্ব হারানো। বিষয়-ভাবনার কেন্দ্রিকতা ভাঙা এই-সময়ের কবিতা। কবিতা আজ আর কেন্দ্রাভিগ নয়, কেন্দ্রাতিগ। এটাই প্রবণতা, ব্যতিক্রম নেই বলছি না। তাই তার প্রকৃতির বহুত্ব আর বহুধা। কবিতায় সাবেকি পদ্য-ভাবটি আজ অন্তর্হিত প্রায়। মূর্তি ভাঙা হচ্ছে শুধু মাত্র বিমূর্ত করার ভাবনায় নয়, টোটালিটি ভেঙে ফেলার জন্যও। টোটালিটি মানেই নান্দনিকতার পরাকাষ্ঠা, এ-ভাবনায় বা চিন্তায় পড়েছে ছেদ। ক্ষুদ্র, অংশ, ভাঙা, বিমূর্তকেও নান্দনিকতার চরমে নিয়ে যাওয়া যায়। ভাষার এক-মুখীনতা কাটিয়ে সে শুধু আপডেটেড স্মার্টই নয়, লেগেছে রং রস, আর স্বপ্ন দেখছে কবিতার ভাষা হয়ে উঠতে। সব মিলিয়ে এই সময়ের কবিতার চালচিত্রটি থেকে প্রতিফলিত আলোক-রশ্মিতে ক্যালাইডোস্কোপের খেলা।

1 Comment

  1. এতো বড় লেখা লেখতে খেই হারিয়ে ফেলা মানুষের দলে আমার নাম ও আছে। তবে ধারণা চাইছি কীভাবে গুছে আনা দরকার সে বিষয়ে।

Leave a Reply