বাংলাদেশের ‘নতুন’ সিনেমা – একটি ব্যক্তিগত রিভিউ

বাংলাদেশের ‘নতুন’ সিনেমা – একটি ব্যক্তিগত রিভিউ

[প্রথমে বলে রাখা দরকার বাংলাদেশের ‘নতুন সিনেমা’ বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছি। নতুন সিনেমা বলতে আপাতত সেগুলিকেই ইঙ্গিত করছি যেগুলি আমাদের ট্রেডিশনাল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, অর্থাৎ, এফ ডি সি-র সাথে ততখানি সংশ্লিষ্ট নয়। দেখা যাবে অভিনেতা অভিনেত্রী বেশিরভাগ ক্ষেত্রে (অথবা সম্পূর্ণ ভাবেই) আলাদা। উনারা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সুপরিচিত তারকারা নন। পরিচালকও সামগ্রিক ভাবে এফডিসি- সংশ্লিষ্ট অথবা এফডিসি-নির্ভর ছবি আগে বানান নি। প্রযোজক, পরিবেশক – উনারাও আলাদা। তবে, ছবিগুলি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হচ্ছে। হয়ত স্টার সিনেপ্লেক্স, আর অল্প কিছু ট্রেডিশনাল হলে। নতুন পরিচালক, নতুন অভিনেতা অভিনেত্রী, যাঁরা এফ-ডিসী-র প্রতিষ্ঠিত পরিবেশে গ্রুমিং হয়ে আসেন নি। এমন ছবিগুলিকেই নতুন সিনেমা বলতে চাইছি। এগুলি আবার পরীক্ষামূলক ভাবে নির্মিত “শর্ট ফিল্ম’ বা “আর্ট ফিল্ম” নয়। আপামর জনসাধারণের কাছে পৌঁছনোর জন্য পূর্ণ দৈর্ঘ ছবি। এবং অবশ্যই, সিনেমা হলে প্রদর্শিত। টিভি কিংবা ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মে নয়। এগুলিকেই বলতে চাইছি ‘নতুন সিনেমা’। কারণ সিনেমা তৈরী ও পরিবেশনার এই প্রবণতাটি অপেক্ষাকৃত নতুন।]

একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য “শর্ট ফিল্ম” দেখলাম যেন আজ। Albert Hughes পরিচালিত “আলফা”। বাণিজ্যিক চ্যানেলে আসা আমেরিকান ছবি, এবং একটা বাণিজ্যিক সিনেমাহলে বসেই দেখলাম। ২০,০০০ বছর আগের কাহিনী এবং সেট আপ – ফলে পুরা ছবি জুড়ে একটা ইচ্ছাকৃত অজানা ভাষায় কথাবার্তা, নিচে ইংরেজি সাব-টাইটেল। (এই কারণেই বলিছি, ‘শর্ট ফিল্ম’)।

কাহিনীও খুব সরল। একটা গোত্রের কিছু লোক বহুদূরে বাৎসরিক শিকারে গেলে দুর্ঘটনায় গোত্রপ্রধানের ছেলে মারা যাওয়ার মত অবস্থা হলে মৃত ভেবে তাকে ফেলে রেখে চলে আসা হয়। পরে পুরা ছবি জুড়ে সেই ছেলেটার বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে নিজের ডেরায় ফিরে আসার সংগ্রাম। -এই নিয়ে কাহিনী। পথিমধ্যে এক বুনো নেকড়ে (কিংবা কুকুরের) সাথে দোস্তি।

এই ধরণের ‘সরল’ কাহিনীও শর্ট-ফিলমের কাহিনী মনে করায়ে দেয়। বাজেট কম থাকার কারণে অনেক সময় স্ক্রিপ্ট নিয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং অবস্থানে যেতে চান না পরিচালক / ডিরেক্টর। যদিও অবশ্য বুদ্ধিমান কিংবা অভিজ্ঞ একজন স্ক্রিপ্ট-রাইটার একটা ছোটো সেটিঙেও অনেক জটিল কাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম, যার শুটিং ব্যয়বহুল হবে না। সেইরকম জটিল শর্ট-ফিলমও হাজার হাজার আছে। মাঝে মাঝে এত জটিল – যে ছবি শেষ হওয়ার পরেও বুঝতে পারা যায় না কী হলো !

‘আলফা’র এই আপাত ‘সরল’ কাহিনী অবশ্য যে খুব কম টাকায় শুট করছে – তা মোটেও না। তো ভাবতেছিলাম শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরির বড় মিলনায়তনে বসে প্রতিবছর ডিসেম্বরে যেই শর্ট-ফিল্ম গুলি দেখি – সেগুলাতেও থাকে সাব-টাইটেল – আবার, বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে বসে বিদেশী পূর্ণ দৈর্ঘ ছবি দেখতে গিয়েও সেই একই ঘটনা, সাব-টাইটেল। পার্থক্যটা তাইলে কোথায় – এটা ভাবতেছি।

* * *

পার্থক্য তো অবশ্যই আছে।

১) ইন্টারেস্টিং দৃশ্য-কাহিনী পরম্পরা – যা দর্শককে ধরে রাখতে পারছে প্রায় দেড় ঘন্টা। প্রথম থেকে শেষ। অর্থবোধক কোনো সংলাপ না থেকেও, বাণিজ্যিকভাবে সফল।

* * *

ছবিটার ভাষা কিন্তু ইংরেজি কিংবা বোধগম্য অন্য কোনো ভাষা না। এমনকি ইংরেজ দর্শকদের জন্যেও না। তাইলে দর্শক ধরে রাখল কিভাবে?

এইখানেই মনে হয় মজাটা লুকিয়ে আছে। সিনেমার একটা বেসিক নিয়ম (সম্ভবত:) হলো — সিনেমাকে হতে হবে “চিত্র-পরম্পরা” নির্ভর। (সিনেমার স্টুডেন্টরা, নির্মাতা, কর্মীরা অনেক ভালো বলতে পারবেন নিশ্চয়ই – আমি শুধু লেইম্যান্স ভাষায় আমার কথা বলতেছি)

সত্যজিৎ রায় এরকম একবার বলেছিলেন মনে পড়ে (আমার মতো করে লিখছি) – ডিরেক্টর / সিনেমাটোগ্রাফার / স্ক্রিপ্ট-রাইটারকে চিন্তা করতে হবে ছবিতে ছবিতে। গল্প আগাবে ছবিতে ছবিতে, কথাবার্তার মাধ্যমে গল্প আগাবে না। নায়ক-নায়িকা কিংবা অন্য কোনো চরিত্রের মুখে সংলাপ দিয়ে যদি কিছু একটা বুঝাইতে হয় – তাইলে সেটা একটা দুর্বল ফিল্ম হবে। মঞ্চ কিংবা টিভি নাটক হতে পারে, কিন্তু ছবি, কিংবা ফিল্ম সেইরকম না।

সিনেমা লাইনে অন্যতম গুরু আইজেনস্টাইনও আরও অনেক আগে উনার “ফিল্ম সেন্স” বইয়ে এরকম ব্যাখ্যা করছিলেন মনে পড়ে, দৃশ্য দিয়ে কিভাবে ভিন্ন ধরণের অনেক কিছু একসাথে বুঝানো যায়। (নিজের স্মৃতি থেকে লিখতেছি)

একজন লোক যদি ক্লান্ত পরিশ্রান্ত, ধুলা ধূসরিত অবস্থায় হেঁটে হেঁটে নগরে নিজের বাড়ির দরজার সামনে এসে চাবি দিয়ে দরজা খুলতে গিয়ে নিচে তাকায়ে দেখে যে – অনেকগুলা ভাজ না খোলা পত্রিকা একটার উপর একটা এলোমেলোভাবে পড়ে আছে – তাইলে জাস্ট এই একটা দৃশ্য থেকেই কিন্তু দর্শক বুঝে নিবে – লোকটা নিজের বাড়িতে অনেকদিন পরে ফিরেছে। এতদিন পত্রিকাগুলা ভিতরে নিয়ে যাবার মত কেউ ছিল না। হকার প্রতিদিন একটা করে পেপার দিয়ে গেছে। অর্থাৎ এর আথে সাথে আরেকটা সিদ্ধান্ত, বাড়িতে লোকটা ছাড়া আর কেউ থাকে না। একা মানুষ। অনেকদিন পর বাড়িতে ফিরেছে। ছবিগুলা হলো পেপারের, কিন্তু দর্শক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিছে কত না ভিন্ন একটা বিষয়। লোকটা একা, অনেকদিন পরে বাড়িতে ফিরছে।

আবার আরেকটা দৃশ্যের বর্ণনা করতেছিলেন উনি [আইজেনস্টাইন] – একটা কবরের পাশে শোকের কালো জামা পরা একজন কম-বয়স্কা মহিলাকে যদি কাঁদতে দেখা যায় তাইলে যেকোনো ব্যক্তি সাধারণভাবে প্রথমেই ধরে নিবেন যে – খুব রিসেন্টলি ঐ মহিলার স্বামী মারা গেছেন। … এই যে কবর + কালো জামা + কান্না-রতা মহিলা – এই ছোটো তিনটা আলাদা আলদা দৃশ্য-এলিমেন্ট নিয়ে আমরা সম্পূর্ণ নতুন একটা সিদ্ধান্তে আসলাম যে – মহিলার স্বামীর মারা গেছেন। ঠিক এই জিনিসগুলাই দরকার একটা ফিল্মে। এই জিনিসটা উনি বলতেছিলেন। দুই কি তিনটা বিচ্ছিন্ন এলিমেন্ট একসাথে করে সম্পূর্ণ ভিন্ন, নতুন একটা সিদ্ধান্তে দর্শককে পাঠিয়ে দেওয়া…

অর্থাৎ ২+২ = ৫। দর্শককে কন্টিনিউয়াসলি এরকম অবচেতনভাবে নতুন নতুন সিদ্ধান্ত নিতে থাকার মধ্যে রাখতে হবে। তখন দেখা যাবে যে, সংলাপের খুব একটা দরকার পড়ে না, দর্শক আর ক্লান্ত কিংবা বোরড হচ্ছে না।

* * *

আমার মনে হয় আমাদের দেশে এফডিসি ব্যতিরেকে বিকল্প ধারার ছবিগুলায় এই সমস্যাটা বহুদিন ধরে ছিল। দৃশ্য পরম্পরায় একটা কাহিনী গড়ে তুলতে না পারা। সংলাপের উপরে নির্ভর করা। খুব রিসেন্টলি হয়ত এটা থেকে উত্তোরিত হতে পারছে এখনকার মেকার-রা। ‘আয়নাবাজি’ আমার দেখা একটা ছবি, মনে হয় – যেখানে কাহিনী ঝুলে পড়ে নাই। দৃশ্য পরম্পরা টাইট। একটা সম্পূর্ণ গল্প ডিরেক্টর অন্তত বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। ‘ঢাকা এটাক’: এই হিসাবে খারাপ ছিল না। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’, কাহিনী, ছবি, ভালো আর ইন্টারেস্টিং, কিন্তু একটু যেন অতিরিক্ত সংলাপ নির্ভর। সংলাপ দিয়ে দর্শককে মজা দেওয়া যেন। ‘হালদা’ নদীতে কাহিনী টান টান – কিন্তু ওই যে, বাঙালি টাইপ ইমোশন আর দেখতে ভালো লাগে না (ব্যক্তিগতভাবে) কত আর দেখব? তবে হ্যাঁ – এখানে দৃশ্যের মাধ্যমে দর্শককে মাঝেমধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হয়েছে – ফলে শেষ পর্যন্ত খারাপ লাগে না।

* * *

এই আর কি বিষয়। ছবি দিয়ে দিয়ে ঘটনা বলতে হবে। সংলাপ দিয়ে নয়। তাইলে, যে ভাষাতেই ছবি হোক, অথবা সংলাপ খুব কম থাকুক, ভালো লাগবে। ছোট

কালে ভালো ভালো যেই কমিকগুলা পড়তাম – টিনটিন, এ্যাসটেরিক্স, আর্চি, কিংবা নন্টে ফন্টে – সেগুলাতেও এই বৈশিষ্ট্য ছিল। আমি সংলাপ না পড়ে শুধু যদি ছবিগুলা পর পর দেখে যাইতাম – তাইলেও টের পাওয়া যেত কাহিনী কিভাবে আগাচ্ছে।

সংলাপ হলো উপরি পাওনা।

[সংযোজনা: এই লেখাটি প্রথম ২০১৮-র সেপ্টেম্বরে লেখা হয়। পরবর্তীকালে ২০১৯ সনের মার্চ/এপ্রিলে জনাব আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ নির্দেশিত ‘Live from Dhaka’ ছবি মুক্তি পায়। ছবি দিয়ে কাহিনী বলার ক্ষেত্রে, মনে হয়েছে এই ছবিটি যেন বেশ খানিকটা এগিয়ে। দৃশ্যকে নির্ভর করেই কাহনী এগিয়ে গেছে। এই কারণেই সম্ভবত, ছবিটা ব্ল্যাক এন্ড ওয়াইট হওয়ার পরেও, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শকদের টেনে রাখতে পারছে। চিত্রনাট্য আর কাহিনীও যেন অনেক ম্যাচিউরড। প্রযোজক, ডিরেকটর, অভিনেতা অভিনেত্রীদের প্রতি শুভ কামনা।]

… … …

আলফা ছবির আই এম ডি বি লিঙ্ক: [এখানে]
লাইভ ফ্রম ঢাকা ছবির লিঙ্ক: [এখানে]
Image [moderated] at the top by creative_designer from Pixabay

পাখিদের এই ডাকটাকে ডেকে নিয়ে বলতে চাই আমার আসলে / কিছু নাই যা দিয়ে বসার ঘরের কাচের টেবিলে সাজানো / বাচ্চু তুমি বাচ্চু তুই চলে গেলে একা পুরা বাগানের মালিক আমি ...

8 Comments

  1. খুব ভালো বিশ্লেষণ করেছেন। অনেক শুভকামনা রইলো

    • অসংখ্য ধন্যবাদ জানবেন আপনার এপ্রেসিয়েশনের জন্য। উৎসাহ পেলাম।

  2. ধন্যবাদ জানবেন @Neel tripura ইন্টারেসটিং কমেন্টের জন্য। আশা করি ছবিগুলো ভালো লাগবে। মাঝখান দিয়ে পর পর কয়েকটা ‘টাইট’ বা চালু ধরণের সমান্তরাল ছবি প্রকাশ পেল। “ন ডরাই”-ও সেই অর্থে সুনির্মিত। কিন্তু এর পরে পরেই আবার দেখা গেল কিছু কিছু অনুদানপ্রাপ্ত ছবি এই টাইট বা চালু ভাবটা ধরে রাখতে পারে নাই। আন-নেসেসারি ভাবে স্লো, প্রচণ্ড স্লো এবং দূর্বল চিত্রনাট্য, অভিনয় ও নির্মান। যাই হোক, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ছবিগুলা ভালো (স্মার্ট) হয়ে উঠুক – এই আমাদের প্রত্যাশা। শুভেচ্ছা নিবেন।

  3. অনেক কিছু জানাতে পারলাম আপনার এই লেখা থেকে। উল্লেখিত অদেখা ছবিগুলো দেখার আগ্রহ বোধ করছি। গতকাল ফেসবুকে দেখা একটি লেখা শেয়ার করতে চাই। (নিজের মত করে অনুবাদ করছি) “নিউটনের সাথে চার্লি চ্যাপলিনের এক সাক্ষাৎকারে নিউটন বলছে “আপনি তো দারুন মানুষ মশাই, আপনার কথা কেউ শুনতে না পেলেও সবাই আপনাকে বুঝতে পারে। উত্তরে চার্লি চ্যাপলিন বলে আপনি তো মশাই আমার থেকেও দারুন। আপনার কথা সবাই বুঝতে না পারলেও সবাই আপনার কথা মানে। প্রীতি শুভেচ্ছা রইল।

    • হা হা, খুব ভালো বলছেন। চমৎকার টান টান কথোপকথন

    • ধন্যবাদ জানবেন @Neel tripura ইন্টারেসটিং কমেন্টের জন্য। আশা করি ছবিগুলো ভালো লাগবে। মাঝখান দিয়ে পর পর কয়েকটা ‘টাইট’ বা চালু ধরণের সমান্তরাল ছবি প্রকাশ পেল। “ন ডরাই”-ও সেই অর্থে সুনির্মিত। কিন্তু এর পরে পরেই আবার দেখা গেল কিছু কিছু অনুদানপ্রাপ্ত ছবি এই টাইট বা চালু ভাবটা ধরে রাখতে পারে নাই। আন-নেসেসারি ভাবে স্লো, প্রচণ্ড স্লো এবং দূর্বল চিত্রনাট্য, অভিনয় ও নির্মান। যাই হোক, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ছবিগুলা ভালো (স্মার্ট) হয়ে উঠুক – এই আমাদের প্রত্যাশা। শুভেচ্ছা নিবেন।

Leave a Reply