সুরাইয়া

সুরাইয়া

      

আমেরিকান গল্পকার কেট শোপেন এর ছোটগল্পএটেনাইজএর ছায়া অবলম্বনে বাংলাদেশি গ্রাম্য পটভূমিতে লেখা ছোটগল্প।

একদিন সক্কাল সক্কাল ঘুম থেইকা উঠঠাই সুরাইয়া শিকদার বাপের বাড়ির দিকে মেলা দেয়। সুরমা নদীর এই পারে খাঁ-বাড়ি আর ঐপাড়ে বালিয়াডাংগা গ্রামে শিকদার বাড়ি। খাঁ-বাড়ির ছোট খাঁ কামালুদ্দি খাঁ বিয়া করছে সলিম শিকদারের একমাত্র মাইয়ারে। সন্ধ্যা পার হইয়া গেলো আইজও কিন্তু কামালুদ্দির বৌ যখন বাড়ি ফিরা আইলো না, নতুন জামাই তার বৌয়ের চিন্তায় অস্থির হইয়া গেলো এইবার।

রাইতের খাওন পাতে বাইরা দিতাছিলো কামালুদ্দির মা জমিলা খাতুন। কামালুদ্দি মায়ের লগে বৌরে নিয়া বেশি চিল্লাফাল্লাও করতে পারতেছে না, নিজে পছন্দ কইরা বিয়া করছে তাই। কিন্তু চুপচাপ বইয়া থাইকা ভাতগুলারে গিলতেও পারতেছে না, কয় – “এখনো ঘরে আইলো না সুরাইয়া, কই যে গেলো, শ্যায়!”

কামালুদ্দি কুপির আলোতে গপাগপ শিংমাছ-আলু তরকারির ঝোল দিয়া ভাপ-ওঠা নতুন চাউলের ভাত টানতেছিল আর এই কাইত থেইকা ঐ কাইতে বইতেছিল, মন তার ব্যাপক আউলা-ঝাউলা আজ।

পোলারে ভাত বাইরা দিয়া মা রাইতের এশার-নময পইড়া হাতের কন্নিতে একটা তব্জি প্যাচাইয়া গুনতে গুনতে ঘরের এই মাথা থিকা ওই মাথা ঘুন্না দিতে থাকলো। পোলার উসখুস করা দেইখা মার মুখে কোনো ‘রা আর টু শব্দ’ নাই; চেহারার ভাজে কোনো পরিবর্তন নাই। যেন হের দুইন্নাইডা-ভইরা-লাইছে-তব্জির মইদ্দে; হেই-লগে পোলার নতুন বৌ সুরাইয়ারেও জানি কোন-দানায় আটকাইয়া লইছে, সেইডা খুঁজতেছে আতাপাতি বুইড়া আঙ্গুল চালাইয়া তব্জির দানা টানতে টানতে।

কিন্তু পোলার এইরাম পাগলা-পাগলা আচরণ দেইখা চুপও থাকতে পারতাছে না জমিলা খাঁ। তব্জি গুনাতে খ্যান্ত দিয়া ঘরের কোনায় চৌকিতে পাও তুইলা বইলো; একটু পরে পাও দুইডা বিছনার উপরে ছড়াইয়া দিয়া হাত দুইডা হাঁটুর উপরে মেইল্লা রাইখা থম ধইরা বইয়া থাকলো আরেকটু সময়। কামালুদ্দি পুরা ভাত না শেষ কইরা প্লেটে নাড়াচাড়া করতেছে, এই দেইখা জমিলা খাঁ গজগজ কইরা কইতে শুরু করে- “মাত্র দুইমাস ধইরা এই বাড়ির বৌ বেডি হইয়া আইছে শ্যায়; অহনই কিরাম ফাল পারোনের তালে থাকে মাগি। বাঁওড় বেডি! এইরাম পোলার বৌ দিয়া আমি কী করমু! ওয় না আমারে রাইন্দা খাওয়াইবো, না আমার সেবা করবো। এইরাম মাইয়া আমার সংসারে চলত না।”

মার গজগজানিতে কান্দা মিলাইয়া পোলাও যেনো সায় দেয়; কিন্তু বেশি পাত্তা দেয় না মার কথারে। বিয়ার আগেও তো কামালুদ্দি খাঁ একলাই ছিলো। আর এইরাম দুই এক রাইত একলা থাকলে কি আর অইবো!

রাইতে ভাত খাওনের পরে কামালুদ্দি একটু বাইরের উঠানে খোলা হাওয়ায় হাঁটাহাঁটি করে—নাইলে  জানি হের পেটের ভাত হজম হয় না। রাইত বড় হইতে থাকলে উঠানের গাছগুলার উপরে আন্ধারগুলা পুরা হাত-পাও মেইল্লা শইলের ভর দিয়া জিরাইতে আইলে কামালুদ্দির মুখে হাই ওঠে। একটু দূরে বাতাসে বাঁশির শব্দ ভাইসা আসে। দালু পাগলা সারারাত বাঁশি বাজায়, হেরও বৌ ভাইগগা গেছে-গা ভরা যৌবনকালে। ওই পাগলা সারা রাইত বাঁশি বাজাইবো, যেদিন বাঁশি হাতে নিবো।

একটু দূরে খাঁ বাড়ির ক্ষেতি-জমি। রাইতে একবার জমির ভিডাতে একটা ঘুন্না দিয়া আসে কামালুদ্দি, নাইলে ঘুম হয় না ভালো। উঠান থিকা নাইমা আইসা গ্রামের রাস্তায় পাও চালাইয়া কিছু দূর আইলে বাঁশির সুরের পাশাপাশি দূরে কারো ঘর থিকা একটা বাচ্চার কান্নার শব্দও ভাইসা আসে। কামালুদ্দি পাও চালাইয়া পাশের জমিনে নামে, আইল ধইরা হাঁটতে থাকে। এই বছর কি মনে কইরা সে পিয়াইজের বীজ রুইছে ক্ষেতে। হঠাৎ সারা দেশে পিয়াইজের আকাল চলতাছে। ক্ষেত থিকাই কাঁচা পিয়াইজ তুল্লা নিয়া যাইতাছে চোরেরা। তাই রাইতেরবেলা ঘুমায় না পিয়াইজ চাষিরা, খেতি পাহারা দেয়। পুরা গ্রামের বেশ কয়েকজন পিয়াইজের আবাদ করছে এই বছর, জমির এক-ফসলি স্বাদ পাল্টাইতে, যেন পরেরবার অন্য কিছু রুইতে পারে। খেতে নাইমা কামে লাইগা গিয়া নয়া-বৌয়ের চিন্তা বেশিক্ষণ মাথায় থাকে না তার; কিন্তু দানাদার সারের গুড়ার মত কামালুদ্দির মনে অভিমানের আস্তরণ যেন লাইগাই থাকে, ঝাড়া দিলেও পইড়া সাফা হয় না ছোট খাঁর মন-ভার ব্যাপারটা।

সারারাত খেত পাহারা দিয়া শেষ রাইতে কামালুদ্দি যখন ঘরে ফিরা ঘুমের কোলে ঢইল্লা পড়ে, তখন স্বপ্নের ঘোরে সুরাইয়ার নরম ঠোট, মলিন কঁচিমুখের অভিমানভরা চোখের একটা ছবি ভাইসা ওঠে।

ধুর বাল! বিয়া করাই ভুল হইছে আমার। সুরাইয়ার মলিন মুখের ক্ষুব্ধ চোখের ভাষাতে যেন ফুইট্টা উঠছে—সে আর কামালুদ্দিকে এক ফোঁটাও ভালাবাসে না! কিন্তু বিয়া যখন হইয়াই গেছে, এই বিয়া তো আর ভাইঙ্গা দেওন যাইবো না। কামালুদ্দি খাঁ ভালা জামাই হইতে চায়, লগে সুরাইয়া শিকদারও যদি একটু সাহায্য করত, মানাইয়া চলতো কামালুদ্দিরে, তাইলেই বিয়াডা কত সুখের হইতো।

ঘুমে ঢুলুঢুলু তার ভাবনায় সারাক্ষণ সুরাইয়ার চোখগুলা জাইগা থাকে। ঘরের একটা মাত্র খোলা জানালা দিয়া চান্দের আলো আইসা বিছানা ভাসাইয়া দিতেছে। দূরে বাজে দালু পাগলার বাঁশি, খাঁ বাড়ির ছোট খাঁ মিয়া এক বুক অস্পষ্ট অফসোস নিয়া ঘুমের আন্ধা-কুয়ার পাত্তালে হারাইয়া যায়।

সুরাইয়া পরদিনও জামাই বাড়ি ফিরা আসে না। কামালুদ্দি পুব-পাড়ার সবুর ব্যাপারীরে দিয়া সুরাইয়ার ছোট ভাই জালালের কাছে সংবাদ পাঠাইছিল কিন্তু পোংটা জালাইল্লা এর কোনো উত্তর দেয় নাই।

এমনে কইরা আরো দুইদিন কাটে, কিন্তু মা জমিলা খাঁর প্রতিরাইতে পোলারে ভাত বাইরা দেওনের পরে গজগজানি শুনতে শুনতে ত্যাক্ত হইয়া কামালুদ্দি হাত,পা গুটাইয়া আর চুপচাপ বইয়া থাকতে পারে না। পরদিন সকালে জামা আর তফন পিন্দা সুরমা নদীর ঐ পাড়ে বালিয়াডাংগা গ্রামে শ্বশুরবাড়ি-মুখী মেলা দেয় সুরাইয়ারে বাড়ি ফিরাইয়া আনতে।

বালিয়াডাংগা গ্রামের সলিম শিকদারের মাইয়া সুরাইয়া শিকদার। এককালের গ্রামের মাতব্বর তৈয়ব শিকদারের পোলা সলিম শিকদার এখন বাপের সব জমি বর্গা-চাষিদের দিয়া বন্দোবস্ত কইরা যে পরিমাণ ধান পায়, তাতে সারা বছরের খোরাকি ভালো ভাবেই উঠা আসে। তৈয়ব মাতবরের বাকি দুই পোলা বৌ-বাচ্চা লইয়া আরব দেশে থাকে, সেই সুযোগে পুরা বাড়ি এখন সুরাইয়াদের দখলে। বাড়িতে লোকজনের তুলনায় ঘর খালি পইড়া থাকে। ব্যবহারের লোক নাই, তাই বাড়ির বেশিরভাগ ঘরই তালা মারা।

সুরাইয়ার মা সকালবেলা উঠানের এক কোনায় বইয়া তরকারি কুটতেছিলো। নতুন জামাইরে গেট দিয়া ঢুকতে দেইখা হাসিমুখে মাথার ঘুমটা আরো বড় কইরা টাইন্না ধইরা বসা থিকা উইঠা খাড়ায়।

শাশুড়ির মোটা শরীরের উপরে গোলগাল মুখের হাসি দেইখা কামালুদ্দি একটু আশ্বস্ত হয়; কিন্তু এইটাও খেয়াল করে, তার সেই হাসিতে কি জানি একটা দুশ্চিন্তার ছাপও লাইগা থাকে রসগোল্লার শিরাতে আটকাইয়া পড়া পিলপিলানি পিঁপড়ার মতন।

ঘরের দাওয়ায় সুরাইয়ার ছোট ভাই জালাল বহা আছিলো। দুলাভাইরে দেইখাও না দেখার ভান করে।

“শুয়োরের বাচ্চা”—মনে মনে বিড়বিড়ায় জালাল; যখন কামালুদ্দি খাঁ শাশুড়ির পিছে পিছে ঘরে ঢুকতে সিড়িতে পাও রাখে।

কয়েক বছর আগে জালাল শিকদার কি-কামে জানি কামালুদ্দি খাঁর কাছ থিকা টেকা ধার নিছিলো, কামালুদ্দি তখন সমিতি চালাইতো, সুদে-আসলে জালাল ওই টেকার অর্ধেক শোধ করতে পারছিল তারে; কিন্তু পরে শক্ত পাওনাদার কামালুদ্দি নানাভাবে জালালরে অপমান করছিল বাকি টাকা ফেরত না পাইয়া। হেই থিকা কামালুদ্দিরে দেকতে পারে না জালাল। আর এই জোড্ডার-পুতে অহন আদরের বইন-জামাই হইছে, শালা হারামখোর! এই সম্পর্কডা সেও মানতে পারে না।

কিন্তু সলিম শিকদার আর তার বড় পোলা দুইজনই কামালুদ্দিরে পছন্দ করে। প্রতিবছর ফসল বেচার মৌসুমে কামালুদ্দি খাঁ শ্বশুররে ভালোই সাহায্য করে।

কামালুদ্দিকে ঘরে ঢুকতে দেইখা সুরাইয়া ফুড়ুৎ কইরা উইড়া গিয়া চাচাগো ঘরে গিয়া পলাইয়া থাকে।

কামালুদ্দি বইয়া থাকে একলা একলা। একটু পরে শাশুড়ি জামাইরে নাস্তা খাইতে দেয়।

জিগায়–“তুমি কিরাম আছো, বাবা! বিয়াইন ছাবের শইলডা বালা নি!”

কামালুদ্দি শাশুড়িরে হালকা গলার আওয়াজে জানায়, তারা ভালা আছে। নতুন জামাইয়ের ভাব বুঝতে এইবার শাশুড়ি মা কয়–“সুরাইয়া আর কয়দিন এই বাড়ি থাকুক। মাত্র বিয়া দিলাম, এখনো মন আলগা হয় নাই মাইয়ার; আমগো ছাড়া থাকতে পারে না ওয়। আর ভাইয়েরাও বইনেরে ছাড়তে চায় না।” কামালুদ্দি শাশুড়ির কথা শোনে আর চুপচাপ নাস্তা খাইতে থাকে।

সুরাইয়ার মা এইবার কয়–“তোমারে তো কাইল সবুর ব্যাপারীরে দিয়া খবর পাঠাইলাম যে, সুরাইয়া আরো কয়ডাদিন নাইওর করুক। ওর মন ভইরা আইলে পাঠাইয়া দিমুনি তোমগো বাড়িতে ভাইগোরে লগে দিয়া।”

এই কথা শুনে কামালুদ্দি একটু অবাক হয়। কারণ, সবুর ব্যাপারী তো কোন খবরই দেয় নাই তারে কাইল রাইতে সুরমা নদীর এইপাড় থিকা ফিরা আইসা, হালা পাডার পুত পাডা। কিন্তু সবুর ব্যাপারীর উপরের বিরক্তি হঠাৎ কইরা শাশুড়ির লগে দেখায়; কয়–” শ্যায় গত সপ্তাহে না তিনদিন থাইকা গেলো, সারা মাসে যদি দুইদিনও আমগো বাড়ি না থাকে, তাইলে আপনেগো মাইয়া আপনেরা রাইখা দেন গা। তারে জিগান গিয়া যে, শ্যায় বাড়ি ফিরা যাইবো কী যাইবো না?”

জামাইয়ের গলায় অভিমান শুইন্না শাশুড়ির মুখের উপর থিকা দুশ্চিন্তার সইরা গিয়া হেনে হাসি ফুইটা ওঠে। দাওয়ায় বহা জালালরে ডাইক্কা কয়– “ওই, যা তো, সুরাইয়ারে ডাইকা লইয়া আয়। জামাই আইছে, সমাদর করতে হইবো না! আমি দুপুরের রান্দা-বারা দেহি গিয়া।”

মায়ের ডাকে জালাল প্রথমে সাড়া দেয় না। কিন্তু বারবার ডাকলে, তখন কয়–“মা, তুমি বুবুরে চিনো না! কিরাম জিদ আছে তার, জানো না! আমি ডাক পারতে গেলে আমারে ধইরা কিলাইবো। এই সক্কালবেলা বুবুর হাতে কিল খাইতে ইচ্ছা করতেছে না। তুমি আর বাবায় মিল্লা বুবুরে এই কয়দিন কম বুঝাইলা? শ্যায়, পাত্তা দেয় তোমগোরে!! একবার যখন কইছে, জামাই বাড়ি যাইবো না শ্যায়; তো যাইবো না। আমরা ভাইরা বুবুরে দেইখা রাখতে পারবো। বুবুরে নিজের মত থাকতে দেও তোমরা।”

এইসব শুনে কামালুদ্দির মেজাজ আরো বেশি বেশি গরম হইতে থাকে। কিন্তু জালাল যা কইতাছে, হেইডাও মিছা না। সুরাইয়া এক বেতাছিরা কিসিমের মাইয়া।

এইবার বাপের বাড়ি ফিরা আইসা সুরাইয়া সবাইরে জানাইছে, সে আর স্বামীর-ঘর করবো না; থাইকা যাইবো সারাজীবন। তার বিয়া-বুয়া ভালা লাগতেছে না। এইসব ফান্দাতে জড়াইয়া থাকতে চায় না সে। কিন্তু কামালুদ্দিরে বিয়ার আগে পছন্দ করত সুরাইয়া। বইনের কথা শুইনা জালাল শিকদার জিগায়, “কিতা এমুন ঘটছে সেখানে যে তার বইন আর ওই বাড়ি ফিরা যাইতে চায় না! কামালুদ্দি খাঁ কি তার আদরের বইনেরে মাইরধর করছে? নাকি ওই বাড়ির কেউ সুরাইয়ারে উল্টা-পাল্টা কিছু কইছে?”

“না,না,এইরাম কিছু হয় নাই রে, ভাই”—প্রশ্নের জবাবে সুরাইয়া কয়। আরো কয়, “বিয়া জিনিসটা আমার ভালা লাগতাছে না। আমার কারো বৌ হইয়া থাকতে না-পছন্দ লাগতাছে। আমি আবার স্বাধীন ময়না পাখি হইয়া উইড়া বেড়াইতে চাই। একটা ব্যাডার লগে এক ঘরে থাকতারুম না । ঘর ভর্তি ব্যাডার কাপড়-চোপড় আর ময়লা হাত-পাও, ঘামা ঘামা দুর্গন্ধ, এইসব আমার ভাল্লাগে না।”

কিন্তু জালাল শিকদার বইন-জামাইয়ের বিরুদ্ধে জুতসই কোন দোষ খুইজ্জা না পাইয়া ম্যালা হতাশ হয়। এইদিকে কামালুদ্দি খাঁর গরম চোখ আর রাগে লাল মুখ দেইখা মনে হইতাছে—আইজ   আবার জালালরে ধইরা মাইর দিবো, হের বৌরে আটকাইয়া রাখছে তাই।

কেউ সাহায্য করতেছে না দেইখা কামালুদ্দিই আন্দাগুন্দা সব ঘরে উঁকি মাইরা বৌরে বিচরাইতে শুরু করে। এক ঘরের ভিতরে উঁকি দিয়া খাটের কোনায় মাটিতে বসা সুরাইয়ারে খুইজ্জা পাইয়া যায়।

“সুরাইয়া, ওঠো,চলো।”—কামালুদ্দি  শান্ত গলায় কয়—বেলা  বাড়তাছে, রইদ মাথায় চড়োনের আগেই ঘাটা পার হইয়া যাই।”

সুরাইয়া কামালুদ্দির কাছ থিকা এমন নরম ব্যবহার আশা করে নাই। সে বিয়া ভাঙ্গার পক্ষে একশ একটা যুক্তি আর নানা রকমের ফন্দি-ফিকির বানাইতেছিলো এই কয়দিনে। কিন্তু কামালুদ্দি’র এইরাম নরম ব্যবহার তারে দুর্বল কইরা দিতাছে। সে চুপচাপ উঠে দাঁড়ায়। ট্রাংকে কাপড়-চোপড় ভইরা জামাইয়ের পিছে পিছে রওনা দেয়।

বাড়ি পৌঁছাইতে বেলা পার হয়। কামালুদ্দিরে মা ভাত বাইড়া দেয়। শাশুড়ির থমথমা চেহারা দেইখা সুরাইয়া কেমন একটু ভয় পায়। খাবার না খাইয়া চুপচাপ ঘরে ঢুইয়া এক কোনায় বইয়া কানতে থাকে।

বিয়ার আগে সুরাইয়ার উড়নচণ্ডী আর বৈতালের মত চলাফেরা দেইখা সুরাইয়ার বাপ-মা ভাবছিলো—বিয়া দিলে মাইয়া ঠিক হইয়া যাইবো। জামাই পাইলে নতুন মানুষের লগে ঘর-সংসারে মন দিবো, দায়িত্ব-জ্ঞান হইবো মাইয়ার। কিন্তু তারা বুঝতে পারে না, সুরাইয়া কেন বৌ হওয়ার মত এত সুন্দর ব্যাপারটা এইরাম অপছন্দ করতাছে! তাগোর জামাইডা কত ভালা। কখনো সুরাইয়ারে গালি-গালাজ করে না, রাগ দেখায় না তাগোর মাইয়ার উপরে। এমন কি সুরাইয়া যখন যা মর্জি করে করতে দেয়, বাজার থিকা কিন্না আইন্না দেয়, যা বায়না ধরে। জামাইয়ের একমাত্র দোষ দেখা যাইতেছে—সে তাদের মাইয়ারে পাগলের মত ভালোবাসে। কিন্তু সুরাইয়ার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ তারে ভালোও বাসতে পারবে না; উহু! একদম না।

খাঁ বাড়িতে পরদিন সকালে নাস্তা খাওনের সময়ে শাশুড়ি আশেপাশে ছিলো না। এই সুযোগে সুরাইয়া জামাইরে জিগায়–“ওই ব্যাডা! ওই! তুমি আমারে কেন বিয়া করলা? পুরা দেশে আমারে বাদে আর কোনো মাইয়া খুঁইজ্জা পাইলা না তুমি?”

এইসব শুনে কামালুদ্দি কিছু জবাব দেয় না। চুপচাপ খাবার খাইতে থাকে। জামাইয়ের এইরাম ঠাণ্ডা পান্তাভাতের মত চেহারা দেইখা সুরাইয়া আরো ক্ষেইপা যায়। গলা চড়াইয়া কয়–“তাইজ্জব হইয়া যাইতেছি আমি। তোমারে কিছু জিগাইতেছি, জবাব কেন দেও না, ব্যাডার গরের ব্যাডা! তুমি কামালুদ্দি খাঁ আমার ভাই দুডারে দেকতারো না; হেরপরেও হেগোর বইনেরে বিয়া করছো, কেন? কেন করছো? ব্যাডা! ক আমারে!”

কামালুদ্দি আর চুপ থাকতে পারে না; তুবড়ি ছোটায়–” আমার জানা নাই, তোমারে তোমার ভাইয়েরা এইরাম ফুসলাইছে কি-না আমার লগে কাইজ্জা লাগাইতে। আর হুনো তুমি, হুইন্না রাখো—তোমারে আমি ভালা পাই। তাই বিয়া করছি। আমি এক বলদা ব্যাডা; মনে হইছিলো জানি, তোমারে বিয়া কইরা সুখে রাখতে পারমু। এইর মাইদ্যমে তোমার ভাইগো লগেও পুরানা কাইজ্জা মিট্টা যাইবো। কিন্তু এই দেখি আবার নতুন গিট্টা লাগছে।”

দিন পার হইতে থাকে এইভাবে কিন্তু সুরাইয়ার মন টেকে না সংসারে, ভালো লাগে না জামাইয়ের ঘর করতে। তার বাপ-মা তারে শিকদার বাড়িমুখী হইতে এক্কেরে না কইরা দিসে। কিন্তু ভাইয়েরা সময়ে সময়ে আইসা আদরের বইনরে দেইখা যায়। সুরাইয়ার বান্ধবীগুলারও বিয়া হইয়া গেছে। কামালুদ্দি আছে তার পিয়াইজ ক্ষেতি লইয়া পইড়া, ঘরে আহে রাইত বিরাইতে। দুনিয়াতে ভাইয়েরা ছাড়া সুরাইয়ার দুঃখ বোঝার আর কেউ নাই। কিন্তু ভাইয়েরা বইনের কষ্ট সহ্য করতে পারে না। তারা বোনরে এইসব থেকে মুক্তি পেইতে এক বুদ্ধি দেয়। কিছুদিন পরে সাতপাঁচ ভেবে আর উপায় না পেয়ে সুরাইয়াও তাতে রাজি হয়।

একদিন সকালে কামালুদ্দি ঘুম থেকে জেগে দেখে, সুরাইয়া ঘরে নাই। তার লাল-সবুজে ফুল তোলা ট্রাংক আর জিনিসপত্র, কিছুই নাই। সব হাওয়ায় মিলাইয়া গেছে রাইতের আন্ধারে। হঠাৎ করেই কামালুদ্দির খুব মন খারাপ হয়। যদিও এইটা নতুন কোনো ঘটনা না। কিন্তু এইবার বেশ অনেকদিন মন খারাপ থাকে। বুঝতে পারে—সুরাইয়ারে কত ভালোবাসে সে । তার সব সুখ সুরাইয়ারে ঘিরাই, কামালুদ্দি সুরাইয়ারে ছাড়া অন্য নারীর চিন্তা করতে পারবে না; ভাবতেও পারতেছে না যে, সুরাইয়া কোনদিন তারে ভালাবাসবে বা ভালাবাসতে পারে। সে সুরাইয়ার ভাইগোরে খবর দেয়–“যতদিন ইচ্ছা সুরাইয়া বাপ-মার কাছে থাকুক। যেইদিন মন চাইবো, সেইদিন তার নিজের ঘরে ফিরা আইলেই চলবো। কামালুদ্দি আর জোর কইরা তারে আনতে যাইবো না কোনদিন।”

সুরাইয়ারে তার ভাইরা পাশের জেলায় নানাবাড়িতে রাইখা আসে। নানী মারা গেছে কয়েক বছর আগে। এক মামা বিরাট এক বাড়ির পুরাটা দখল নিয়া থাকে,  তিন পোলা আর পাঁচ মাইয়া লইয়া। সুরাইয়ার মামাতো ভাই-বোনগো লগে দিনকাল ভালোই কাটতে থাকে। মামীও বেশ হাসিখুশি ভালো একটা মানুষ; যত্ন করে ছোট্ট, সুন্দরী চঞ্চল মাইয়াডারে। সুরাইয়া তেমন বেড়াইতে আসে নাই আগে, এইবার কি মনে কইরা যে আইলো, তাও নতুন জামাইরে ছাড়া, খবর পাত্তা না দিয়া, ভাইয়েরা তারে পৌঁছায়া দিয়া গেলো।

মামাবাড়িতে বেশ অনেকদিন থাকতে থাকতে সুরাইয়া বাপের বাড়ি আর জামাই বাড়ির কথা ভুইলাই যায় এক প্রকার। মামাতো ভাইয়েরা সারাদিন সুন্দরী বইনের খাতির যত্ন করে, কোনো আবদার অপূরণ রাখে না। কিন্তু এভাবে কতদিন ভালো লাগে। মাস-খানেক পরে, একদিন হঠাৎ করে বাপের কথা মনে হয়, মা আর ভাইগোর কথা মনে পড়ে সুরাইয়ার, একটু চুপচাপ হইয়া যায়। একা একা ঘাটপারে বইসা থাকে। তার চুপচাপ শান্ত মেজাজ মামীর চোখে পড়ে। বেশ কয়দিন সুরাইয়ার চালচলন লক্ষ্য করতে থাকেন সাহেলা আক্তার। উনি বুদ্ধিমতী মহিলা, একদিন সুরাইয়ারে আড়ালে ডাইকা সবকিছু খুটাইয়া খুটাইয়া জিজ্ঞাসা করে। সুরাইয়া জবাব দেয় মামীর সব প্রশ্নের। সে মামীকে পছন্দই করে। সুরাইয়া কয়–“আমার শইলডা আজকাল ভালা লাগে না মামানি। কিরাম জানি সব বেতলা পাইনসা পাইনসা লাগে। কিচ্ছু ভাল্লাগে না আমার।”

সালেহা আক্তার সব বুঝতে পারে। সুরাইয়ার সরলমুখের দিকে তাকাইয়া থাকে কিছুক্ষণ। সেইদিন আর সুরাইয়ারে বাইরে চলাফেরা করতে দেন না বেশি। লোক-মারফত বাপ-মারে খবর দিয়া আনাইয়া মাইয়ারে বুঝাইয়া দেয়। সুরাইয়া তখনও কিছু বুঝতে পারে না, কেনো বাপ-মা আইসা এইভাবে তারে নিয়া যাইতাছে। বাড়ি ফিরা দুইয়েকদিন বাদে মা একদিন ঘটনা খুইলা বলে।

এইবার সুরাইয়া একটু থম ধইরা বইসা থাকে। ঝিমাইতে থাকে পুরা একটা দিন। সে প্রচণ্ড অবাক হয়, মনে মনে নিজেকে নিজেই কইতে থাকে–“আমার সন্তান হইবো। আমার একেবারেই নিজের মতন দেখতে একটা খেলার সাথী আসবো!”—অতি আনন্দে ভাইসা ভাইসা পাখির হালকা পালকের মত উড়াল পারতে থাকে সে। হঠাৎ তার কামালুদ্দির কথা মনে পড়ে এবং অন্যরকম একটা অনুভূতি সারা শইল্লে ছড়াইয়া পড়ে। ইচ্ছে করে, এখনই খাঁ বাড়ি ছুইট্টা গিয়া কামালের সামনে খাড়ায়, তারে এই কথাগুলি কয়।

পরদিন সক্কালবেলা ভাইয়েরা সুরাইয়ারে জামাই-বাড়ি পৌঁছাইয়া দেয়। সন্ধ্যায় ক্ষেতের কাম শেষ কইরা ঘরে ফিরা কামালুদ্দি বৌরে দেইখা ম্যালা অবাক হইয়া যায়। সেই রাইতে আসমানের চাঁন তার সম্পূর্ণ আলো শুধুমাত্র খাঁ বাড়ির উপরে ছড়াইয়া দিয়া বাড়িটা আলোর সমুদ্দুরে ভাসাইয়া দিতে থাকে! দেখতে লাগতেছে কেন-জানি-বা এক মিডা মিডা মায়া-জগতের নূর আইসা বাড়িটাতে ভর করছে। সারা বাড়িতে আসমানী ফেরেস্তারা ছুটাছুটি করতেছে। স্বামীর পাশে বইসা মুগ্ধ সুরাইয়া উপভোগ করতে থাকে নতুন এক জীবন। আজ দালু পাগলাও বাঁশিতে মধুর সুর বাজাইতাছে; আর দূরে কোন এক ঘর থেকে বাচ্চার কান্নার শব্দ ভাইসা আসতেছে, সেই বাঁশির সুরের পাশাপাশি আরেক মধুর সঙ্গীতের মত, ভ্যাপসা চৈত-মাইয়া ঘামা ঘামা রাইতে!

মাঝ রাইতে ঘুম ভাইঙ্গা, লাফ দিয়া উইঠা বইয়া সুরাইয়া কয়–“কার বাচ্চা এইভাবে সারারাত কানতেছে! এত গরম পরছে, আমার ইচ্ছা করতেছে, ওরে কোলে নিয়া বাইরে ঠাণ্ডা বাতাসে হাঁটতে আর ঘুম পাড়াইতে…।”

Loading

Leave a Reply

Skip to toolbar