ঢাকার কবিতা, কবিতায় ঢাকা

আশির দশকের শেষলগ্নেও কলিকাতার কবিতা ঢাকায় জনপ্রিয় ছিলো। ঐ সময় পর্যন্ত কলিকাতায় সদ্য-প্রকাশিত কবিতার বই ঢাকার পাঠকরা গো-গ্রেসে পাঠ করতো। শক্তি, সুনীল, সুভাষ, বিনয়, প্রেমেন, নীরেণ, পত্রী, মিত্র, শঙ্খ—এরা ছিলো ঢাকার কাব্য মহলে আলোচিত ব্যক্তিত্ব। কলিকাতার কবিদের প্রতি এই টান জয় গোস্বামীতে এসে শেষ হয়। এরপর কলিকাতার কোনো কবি ঢাকার পাঠককে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। এমনকি, উল্লেখ্য কবিদের নতুন বইয়ের প্রতিও ঢাকার পাঠকদের আগ্রহ কমে আসে। বিশ-শতকের শেষ-লগ্নেই ঢাকার কলিকাতা-প্রীতি নিঃশেষ হয়ে গেছে বলা যায়। তার মানে এই নয় যে, ঢাকার বোদ্ধারা কলিকাতার কবিদের অবজ্ঞা শুরু করে; কিংবা তাদের কবিতা পড়ে না। আসলে মোহ অবশিষ্ট থাকে না। একুশ-শতকে এসে ঢাকার পাঠক নিজেদের কবিতা পড়তে শুরু করে; স্থানীয় কবিদের সৃষ্টি-সম্ভার নিয়ে সংলাপে মত্ত হওয়ার অবকাশ পায়। এ-সময় কলিকাতার কবিতার সঙ্গে নিজেদের তুল্য-মূল্য করে বটে; কিন্তু বিশ্বের আরও আরো ভাষার কবিতার প্রতি যতটা আগ্রহ দেখায়, কলিকাতার প্রতি ততোখানি না। কালান্তরে পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গির এই রূপান্তর এখন স্পষ্ট। কবিতার পাঠক সর্বকালেই বিশিষ্ট, প্রাজ্ঞ, সুশীল এবং সংবেদনশীল। আসলে কবিরাই কবিতার পাঠক। এই বিবেচনায় স্বাধীনতার তিন-দশকান্তে ঢাকার কবিসমাজ নিজস্ব অবগাহন-ভূমি তৈরি করে ফেলেছে, বলা চলে। হাট হাটি পা পা করে ঢাকা হয়ে ওঠে বাংলা কবিতার নতুন কেন্দ্র। গুণে, মানে, বিষয়-বৈচিত্র্যে, সংখ্যায়—ঢাকার কবিতা কলিকাতার থেকে সত্যি আলাদা রূপ লাভ করে—যা বিস্ময়কর এবং বাংলা কবিতার জন্য ইতিবাচক। ঢাকার কবিতা বলতে বলছি বাংলাদেশের কবিতার কথা—যার সঙ্গে নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের যোগ আছে; যুক্ত আছে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ; জড়িয়ে আছে বাঙ্গালী জাতীয়তা বিকাশের সাতকাহন।  সাম্প্রদায়িয়কাতার সঙ্গে সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার দ্বৈরথে কবিতা কোন পথে এগুবে, এই বিষয়টি ক্রমে সামনে চলে আসে। ‘বাঙ্গালি থাকিবো না মুসলিম হইবো’—সেনা-শাসনকালে এ বড় জটিল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় স্বাধীন বাংলার কবিসমাজের সামনে। দেশভাগ বিরাট বিষাদ হয়ে আসে দুই-পারের কবিকুলের জন্য। কলিকাতার কবিতা থেকে শোনা যাক এই হাহাকার— ‘যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো                        আমি বিষপান করে মরে যাবো! বিষণ্ণ আলোয় এই বাংলাদেশ                        নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ                        প্রান্তরে দিগন্ত নিনির্মেষ-                        এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো                               আমি বিষপান করে মরে যাবো। ধানক্ষেতে চাপ চাপ রক্ত                     এইখানে ঝরেছিল মানুষের ঘাম এখনো স্নানের আগে কেউ কেউ করে থাকে নদীকে প্রণাম এখনো নদীর বুকে              মোচার খোলায় ঘোরে                    লুঠেরা, ফেরারী! শহরে বন্দরে এত অগ্নি বৃষ্টি                     বৃষ্টিতে চিক্কণ তবু এক একটি অপরূপ ভোর বাজারে ক্রূরতা, গ্রামে রণহিংসা                     বাতাবি লেবুর গাছে জোনাকির ঝিকমিক খেলা বিশাল প্রাসাদে বসে কাপুরুষতার মেলা                               বুলেট ও বিস্ফোরণ                               শঠ তঞ্চকের এত ছদ্মবেশ                               রাত্রির শিশিরে কাঁপে ঘাস ফুল-             এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি যদি নির্বাসন দাও আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো                  আমি বিষপান করে মরে যাবো। কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে নিথর দিঘির পাড়ে বসে আছে বক আমি কি ভুলেছি সব                     স্মৃতি, তুমি এত প্রতারক? আমি কি দেখিনি কোনো মন্থর বিকেলে                     শিমুল তুলোর ওড়া-উড়ি? মোষের ঘাড়ের মত পরিশ্রমী মানুষের পাশে                     শিউলি ফুলের মত বালিকার হাসি নিইনি কি খেজুর রসের ঘ্রাণ শুনিনি কি দুপুরে চিলের                         তীক্ষ্ণ স্বর? বিষণ্ণ আলোয় এই বাংলাদেশ…                         এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি যদি নির্বাসন দাও আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো                         আমি বিষপান করে মরে যাবো’। [যদি নির্বাসন দাও/ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়] ২) ৪৭-এর ভারত-ভাগ কোটি  মানুষকে জাত ভুলিয়ে ভিটে ছাড়া করে। পাঞ্জাবীরা সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে গিয়ে নিজভূমেই আপন সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে উর্দুওয়ালা হয়ে ওঠে। এই জোয়াল বাঙ্গালীর উপর চেপে বসেছিলো ২২ টি বছর। কিন্তু বাঙ্গালিত্ব এ-অঞ্চলের মানুষের মজ্জাগত বিধায় ঢাকার মধ্যবিত্ত সমাজ ৫২-র ভাষা-আন্দোলনের মতো অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটাতে সক্ষম হয়; এবং এই সংগ্রামের সফলতার ভিতর দিয়ে আপন সংস্কৃতিকে রক্ষা করার প্রেরণা অর্জন করে। বলা যায়, বাঙ্গালী জাতির বড় একটা বিপর্যয় ঠেকিয়ে দিয়েছিলো ৫২’র ভাষা-সংগ্রাম। ‘অমর একুশে’কবিতায় হাসান হাফিজুর রহমান বলেন— আয়ুর প্রথম হৃদয়-মন্থিত শব্দ মনুষ্যত্বের প্রথম দীক্ষা যে উচ্চারণ তারই সম্মানের জন্য তারা যূথবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছি … দেশ আমার, স্তব্ধ অথবা কলকণ্ঠ এই দ্বন্দ্বের সীমান্তে এসে মায়ের স্নেহের পক্ষে থেকে কোটি কণ্ঠ চৌচির করে দিয়েছি: এবার আমরা তোমার। ৫২-র সংগ্রামের ভিতর দিয়ে বাঙ্গালিত্বের অপূর্ব ঐশ্বর্যের যে-সন্ধান পাই, অচিরেই তা স্বাধিকারের দাবী হয়ে স্বাধীনতা-সংগ্রামের রূপ নেয়। আমরা অর্জন করি নতুন পতাকা, সার্বভৌমত্ব, বাংলায় কবিতা লেখার আশ্চর্য অধিকার। পাকিস্তানী আমলের  ভাষা ও সংস্কৃতির উপর জোর-জুলুমের বিপরীতে বিদ্যাসাগর প্রণীত বর্ণমালার প্রতি মুসলিম  বাঙ্গালির তীব্র মোহের প্রকাশ দেখি। তৎকালীন ঢাকার তরুণ কবি শামসুর রাহমান ভাষার প্রতি মমতা ঢেলে দিয়ে বলেন— নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়। মমতা নামের প্রুত প্রদেশের শ্যামলিমা তোমাকে নিবিড় ঘিরে রয় সর্বদাই। কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে শিউলিশৈশবে ‘পাখী সব করে রব’ বলে মদনমোহন তর্কালঙ্কার কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যহ দিতেন ডাক। তুমি আর আমি, অবিচ্ছিন্ন পরস্পর মমতায় লীন, ঘুরেছি কাননে তাঁ নেচে নেচে, যেখানে কুসুম-কলি সবই ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সংকেতে। আজন্ম আমার সাথী তুমি, আমাকে স্বপ্নের সেতু দিয়েছিলে গ’ড়ে পলে পলে, তাইতো ত্রিলোক আজ সুনন্দ জাহাজ হয়ে ভেড়ে আমারই বন্দরে। [বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা] ব্রিটিশ ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসির শেষ কাটাছেড়ার কারণে পূর্ব-বাংলা থেকে বাঙ্গালী-সংস্কৃতির বিলুপ্তির যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিলো, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ভিতর দিয়ে তা বিলীন হয়। পূর্ব-বাংলার মানুষের এই এক অবিস্মরণীয় অর্জন—যা রবীন্দ্রনাথের সম্মান বজায় রাখলো, নজরুলের বিদ্রোহকে সার্থক করলো, জাত-পাতের ভেদবুদ্ধিকে ম্লান করে বাঙ্গালিত্বকে স্থায়ী ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিলো; আপন নিবাস খুঁজে পেলো বাংলা কবিতা। তারুণ্যের কবি সুকান্তের ভাষায় বলতে হয়— হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে, সে কোলাহলে রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে। হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন জন্ম নিয়েছে সচেতনতার দান, গত আকালের মৃত্যুকে মুছে আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ। “হয় দান নয় প্রাণ”এ শব্দে সারা দেশ দিশাহারা, একবার মরে ভুলে গেছে আজ মৃত্যুর ভয় তারা। সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়: জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়। [দুর্মর] ৩) ৭১-এর আগে ঢাকার কবিদের দৃষ্টি কলিকাতার দিকে নিবদ্ধ ছিলো; কারণ, রাজধানী ইসলামাবাদ ছিলো ‘বহুত দূর কা রাস্তা’; আর বিজাতীয় সংস্কৃতির কেন্দ্র। ঢাকা ও কলিকাতার সাহিত্যিক আদান-প্রদান আধুনিক কালের বিচারেও শতবর্ষীয়। ঢাকা পূর্ব-বাংলার স্বাধীন রাজধানী হয়ে ওঠায় স্থানীয় কবিকুল এখানেই সমবেত হওয়ার অবকাশ পায়। পাকিস্তানী শোষণ-নিপীড়নের অন্তে কলিকাতায় গমনাগমনের অবসান ঘটিয়ে ঢাকায় কবিতা-কল্পতরুর রোপা বুনতে শুরু করে। ৭১-এর পর মুদ্রিত কবিতার বই ঢাকায় আসে বটে; কবিরা আর বুদ্ধদেব বসুর মতো কলিকাতায় ছুটে যায় না। নতুন সময়ে নব-উচ্ছ্বাসে শুরু হয় দুই বাংলার কবিতার আদান-প্রদান—গঙ্গা, যমুনার মিলিত স্রোতের মতো—যমুনা আমার হাত ধরো, স্বর্গে যাবো…। এক্ষেত্রে ৫০ ও ৬০-এর কবিদের ভূমিকা অনন্য। আর এই মেলবন্ধনে সোপান হয়—রবীন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ। এ সময় মুদ্রণ-ব্যবসায়ীরা বিপুল উৎসাহে বাংলাবাজারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কবিদের রচনা-সম্ভার পাঠকের হাতে তুলে দিতে শুরু করে; এবং বাংলা একাডেমীর প্রযত্নে আয়োজন করে সাহিত্যের বার্ষিক আয়োজন, যা ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে জগত-বিখ্যাত হয়। প্রকৃত বিবেচনায় ৫২-র ভাষা-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঢাকার মধ্যবিত্ত সমাজ বুঝতে পারে—সাম্প্রদায়িক চেতনার চেয়ে অনেক বেশি আপন, ঐতিহ্যময়, ঐশ্বর্যে ভরপুর আমাদের বাঙ্গালিত্ব; এবং এই সংস্কৃতি-বোধের স্ফুরণ ঘটাতে শুরু করে কবিদের হাতে; যা ধীরে ধীরে গুনে, মানে, বিষয় বৈচিত্র্যে ‘বাংলাদেশের কবিতা’ হয়ে ওঠে—যা অল্প দিনেই কলিকাতার কবিদের ছায়া অতিক্রম করে নতুন রূপ-লাবণ্য নিয়ে পাঠকের মন জয় করতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে অবদান সৃষ্টিকারী এক-ঝাঁক কবির নাম উচ্চারণ করা চলে; যেমন—জসীম উদদীন, সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবিব, হাসান হাফিজুর রহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শামসুর রাহমান, শহিদ কাদরী, বেলাল চৌধুরী,  আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী,  হুমায়ুন আজাদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হেলাল হাফিজ, সমুদ্র গুপ্ত, আবিদ আজাদ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ—আরো আরো কবি। এ তালিকা প্রত্যেক পাঠক ‘কবির জ্যেষ্ঠতা’র ভিত্তিতে সাজিয়ে নিয়ে ঢাকার কবিতার বিকাশ-ধারাকে মানসচক্ষে  প্রত্যক্ষ করতে পারেন। স্বীকার করতেই হয়, আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ ও তীব্র সংগ্রামের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলা বাংলার জনগণের অনন্য অর্জন এই নতুন কাব্য-সম্ভার—অনেক রক্তে লেখা—যা বাঙ্গালী জাতিকে ঐশ্বর্যময় রাখবে বহু-শতাব্দী—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করা নিশ্চয় ভুল কিছু না। ৪) ‘গতচেতনা’ হচ্ছে ঢাকার কবিতার গুরুত্বপূর্ণ ভাবসম্পদ। ভাষা-চেতনা, স্বাধিকার-বোধ, সাম্য-চেতনা, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ—ঢাকার কবিতায় ব্যাপক পরিমাণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ভাষা-সংগ্রামের সময় থেকে শত্তুর দশক পর্যন্ত কবিদের কলমে মা, মাটি, মানুষের জয়গান ধ্বনিত হয়েছে। কলিকাতার ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের কাব্যিক প্রেরণা এ ধারাকে সজীব রেখেছে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল—দুজনই এ ধারার কবিতার পুরোধা। বিষ্ণু দে, সুভাষ, দিনেশ, সুকান্তের প্রেরণাও ঢাকার কবিতায় গতচেতনা জাগ্রত রাখার ক্ষেত্রে প্রেরণা-সঞ্চারী ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে নাজিম হিকমত ও পাবলো নেরুদার কবিতাও শক্তিশালী প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। তবে সমাজ-বাস্তবতা তথা মানুষের নিরন্তর সংগ্রামের কারণে বাংলাদেশের কবিতার গণমুখী ধারা নিজস্ব মাত্রা লাভ করেছে। পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে শহীদ কাদরী বলেন— জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগড়ে দিলো যেনো দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নিচে, সন্ত্রস্ত শহরে শৃঙ্খলিত, বিদেশী পতাকার নীচে আমরা শীতে জড়সড় রক্তপাতে, আর্তনাদে, হঠাৎ হত্যায় চঞ্চল কৈশোরকাল। [উত্তরাধিকার ] যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, হানাহানি, গণহত্যা, শোষণ-নিপীড়নের একটানা প্রবাহের মধ্যে কয়েক প্রজন্ম বেড়ে ওঠার ফলে কবির চেতনায় শান্তি ও স্থিতির প্রত্যাশা ব্যক্ত হওয়া স্বাভাবিক। সৈয়দ শামসুল হক লেখেন— একটি দুটি তিনটি প্রজন্ম ধরে আমি একাধিক যুদ্ধ—একটি শান্তিকে, একাধিক মন্বন্তর—একটি ফসলকে, একাধিক স্তব্ধতা—একটি উচ্চারণকে, একাধিক গণহত্যা—একটি নৌকাকে, একাধিক পতাকা—একটি  স্বাধীনতাকে শরীরে আমার বীভৎস ক্ষতের মধ্যে লাল স্পন্দনের মতো অনুভব করতে করতে এই যে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছি— সে একটি বাড়ির দিকে, যে কখনো ভেঙ্গে পড়ে না; [আমি একটুখানি দাঁড়াবো] সমাজের অস্থিতিশীলতা যে আমাদেরকে বিপুলভাবে আলোড়িত করে, বাংলাদেশের কবিতায় তার উজ্জ্বল উদাহরণ অনেক। এ-অঞ্চলে কবি এবং জনতা বহু-সময়ে একাকার হয়ে গেছে। দুঃখ হয়ে উঠেছে সমুদ্রের মতো বিপুল। রফিক আজাদের একটি কবিতা থেকে উদ্ধৃত করছি— আত্মহত্যার বিন্দুমাত্র প্রবণতা নেই আমার মধ্যে—অতএব, নিজের জন্যও নয়; কিন্তু এটা সত্যি, আমি একটা কবর খুঁড়ছি—কার জন্য? আমি জানি না। [আমি একটা কবর খুঁড়ছি] স্বাধীনতা—এই শব্দটি; বাংলাদেশে এমন কবি নাই, যিনি একটিবারের জন্য উচ্চারণ করেনি। স্বাধীনতা শব্দটি বাংলাদেশের কবির কাছে দুঃখের—অনেক আকাঙ্ক্ষার, গৌরবের, আবেগের। কারণ, জয়-পরাজয়ের দীর্ঘ-দ্বৈরথের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এ দেশের কবি কলম চালায়—একটি ফুলকে বাঁচাবার জন্য। স্বাধীনতা—এই একটি প্রত্যাশার উপর ঢাকার কবিতা এতো বিচিত্র ধারায় থর থর কম্পমান, যা অতি-সাম্প্রতিক কালের যে-কোনো ভাষার কবিতায় বিরল। বাংলাদেশের কবি মানসে পরিবর্তন এনে দেয় এই একটি  চাওয়া। শামসুর রাহমানের কবিতাটি এক্ষেত্রে উদ্ধৃত করছি— তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা তোমাকে পাওয়ার জন্য আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়? আর কতবার দেখতে হবে খান্ডব্দাহন? …পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে, এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা। [তোমাকে পাওয়ার জন্য] স্বাধীনতার আকুলতা থেকে ক্রমে ক্রমে পাল্টে যেতে থাকে কবিতার বিষয় ও ভাষা, যা কলিকাতার কবিতা থেকে আলাদা মাত্রা দেয়; গড়ে ওঠে ঢাকার কবিতার নতুন আঙ্গিক; যা সরল এবং স্পর্শময়। ৫) ঢাকার কবিতায় স্থানীয় দ্বন্দ্ব-সংঘাতের যে-উপস্থিতি দেখি, তা কলিকাতার কবিতা থেকে ভিন্ন; যদিও সাম্য-চেতনার একটি ধারা তিরিশের দশক থেকে বহমান; যার ধারাবাহিকতা ঢাকার কবিতায়ও উজ্জ্বল। এক্ষেত্রে সুভাষ, সুকান্ত, দিনেশ, সমর প্রমুখ সুন্দর ফসল ফলিয়েছেন। দিনেশ দাসের ‘কাস্তে’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত করছি— বেয়নেট হোক যতো ধারালো কাস্তেটা ধার দিয়ো বন্ধু! লোহা আর ইস্পাতে দুনিয়া যারা কাল করেছিলো পূর্ণ, কামানে কামানে ঠোকাঠুকিতে নিজেরাই চূর্ণ-বিচূর্ণ। কলিকাতার গণমুখী কবিতায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক-চেতনা প্রধান-রূপে দেখা যায়। বাংলাদেশের কবিতায় জনচেতণা স্থানীয় ঘটনা ও তার অভিঘাত থেকে উদ্ভূত। এক্ষেত্রে নির্মলেন্দু গুণের ‘আগ্নেয়াস্ত্র’  কবিতাটি  স্মরণ করা যাক— পুলিশ স্টেশনে ভিড়, আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিচ্ছে শহরের সন্দিগ্ধ সৈনিক। সামরিক নির্দেশে ভীত মানুষের শটগান, রাইফেল, পিস্তল, কার্তুজ যেনো দরগার স্বীকৃত মানত। টেবিলে ফুলের মতো মস্তানের হাত। আমি শুধু সামরিক আদেশ অমান্য করে হয়ে গেছি কোমল বিদ্রোহী—প্রকাশ্যে ফিরছি ঘরে, অথচ আমার সঙ্গে হৃদয়ের মতো মারাত্মক একটি আগ্নেয়াস্ত্র, আমি জমা দিই নি। স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে আমরা যেমন বাংলাদেশ পাই, কবিরাও খুঁজে পায় অবগাহনের আপন ভুবন। জীবনানন্দ দাশ বাংলার যে রূপ-বৈচিত্র্য তুলে ধরেছেন, তারই মাত্রা গুনতে গিয়ে ঢাকার কবিরা ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক-উত্তরাধিকার—জাতিসত্তার নানা পরিচয় খুঁজতে শুরু করে। মুহাম্মদ নূরুল হুদা উচ্চকণ্ঠে বলেন— বৃষ্টিতে ভিজেছি আর রোদ্দুরে পুড়েছি আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি…। ঐতিহ্য-সন্ধানে সৈয়দ শামসুল হক, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ প্রমুখ কবি স্মরণীয় কবিতা লিখেছেন; কিন্তু তা জীবনানন্দের অনুগামী হয়ে নয়, বরং সনাতন জীবনধারাকে তুলে ধরে। আবিদ আনোয়ার ‘কবি’  কবিতায় বলছেন— আমার শৈশবে নাকি মাকে ডেকে বলেছিলো ময়াজ ফকির শেরেক বিন্নির সাথে নবান্নের খীর রেঁধে সিন্নি দিবি বাবার দরগায়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক অনাচার জনজীবনকে যেমন অস্থির করে, কবিদের মনেও জন্ম দিয়েছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। অভাব-অনটন, শোষণ, নিপীড়ন কবি-মানসে বিচলন আনে। বিশেষ করে দীর্ঘ সেনাশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট জনগণের দুর্দশায় কবিরা নীরব কলন-সৈনিক হয়ে থাকতে পারেনি। রীতিমত রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনে আশির দশক-জুড়ে ঢাকার কবিরা যে ভূমিকা নেয় তা বিভিন্ন ভাষা-সমাজে  বিরল। কবিতা হয়ে ওঠে সমাজ-বদলের হাতিয়ার। কয়েকটি কাব্যাংশের উধৃত করছি; যা থেকে জেগে উঠবে আপনার স্মৃতিপট— “সব শালা কবি হবে; পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে, উড়বেই; বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই;” (মোহাম্মদ রফিক/ খোলা কবিতা) “তোর হাতে রক্ত, পায়ে কুষ্ঠ, কণ্ঠে নালী ঘা— আল্লার দোহাই লাগে, তুই নেমে যা, নেমে যা ।” (নির্মলেন্দু গুণ/ দূর হ দু:শাসন) “গুলিবিদ্ধ শহর করছে অশ্রুপাত অবিরত, কেননা মিলন নেই। দিন দুপুরেই নরকের শিকারি কুকুর তার বুকে বসিয়েছে দাঁত…।” (শামসুর রাহমান/ মিলনের মুখ) তোমাকে চায় না এই মানচিত্র, জাতীয় পতাকা তুমি চলে যাও, দেশ ছেড়ে চলে যাও।” (মহাদেব সাহা/ বাংলাদেশ চায় না তোমাকে) এইসব কবিতায় এতো দ্রোহ—লালিত্যের কথা আর মনে থাকে না। একদিন নগরে-বন্দরে কবিরা এতো আগুন ছড়িয়েছিলো, বিতৃষ্ণায় ফেটে পড়েছিলো বাংলাদেশের মন। ৬) বাংলাদেশের কবিরা রাজপথে নেমে এসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও শুদ্ধতাবাদী একটা সমাজ বলতে চায়, কবিদের বেশীমাত্রায় গণ-সম্পৃক্ততা ঢাকার কবিতাকে অনেকক্ষেত্রে স্লোগান-ধর্মী করে তুলেছে। একথা সত্য যে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধে গলা মিলাতে গিয়ে কবিতা আর স্লোগান একাকার হয়ে যায়। আমি বলবো, এটা আমাদের কবিতায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যের বলে বিবেচিত হবে। এ ধারার পুরোধা কবি হচ্ছেন সিকান্দার আবু জাফর। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। সেনা শাসন ও ধর্ম ব্যবাসায়িদের প্রতি নিন্দা দেখি দেখি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহার কবিতায়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন— আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই, আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন-নৃত্য দেখি, ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে— এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়? …এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী, স্বাধীনতা, একি তবে নষ্ট জন্ম? একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল? জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ সেই পুরনো শকুন। [বাতাসে লাশের গন্ধ] এমন শত কবিতা থেকে আমরা বুঝে যাই, স্বাধীনতার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে কতো বিস্তর ব্যবধান ঘটে গেছে। সামরিক-শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা-মধ্যবিত্তরা যখন সোচ্চার , তখন ঢাকার সংবেদী পাঠকের চেতনায় স্থান করে নেয় বাংলা-কবিতার সবচেয়ে নিচু-স্বরের কবি জীবনানন্দের একটি কবিতা। সেটি হচ্ছে— অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা; যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই—করুণার আলোড়ন নেই পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া। যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয় মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়। [অদ্ভুত আঁধার] ষাট থেকে আশি পর্যন্ত ঢাকার কবিদের উচ্চকন্ঠি প্রবণতা কবিতার বিশুদ্ধ, তন্ময়, ইন্দ্রজালিক-অনুভূতির ধারাকে ব্যহত করেছে—এমন আলোচনা শোনা যায়। অনেকে এসব পদাবলীকে কাব্য-বিবেচনায় নিতে নারাজ। এ নিয়ে বোদ্ধা-মহলে অমীমাংসিত বিতর্ক আছে। আশি ও নব্বুইয়ের কবিরা এইসব স্লোগানধর্মীতাকে পাশে সরিয়ে শুদ্ধ-কবিতা লেখায় মন দেয় বলে আলোচনা আছে। কিন্তু কি হওয়া উচিত, কি হতে পারতো, এসবের চেয়ে অধিক মূল্যবান—সময়ের প্রয়োজনে কবি কি লেখেন, কেনো লেখেন, সেই বিবেচনা। ঢাকায় এমন কবি কম আছে, যারা তন্ময় কাব্যের চর্চা করতে গিয়ে সময়ের অভিঘাতে জর্জরিত হয়ে চুপ করে থাকতে পেরেছেন। কলিকাতার সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একটি কবিতা আশির দশক পর্যন্ত ঢাকার সকল কবির ক্ষেত্রে সত্য হয়ে উঠেছিলো— প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা, চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া। কবি মাত্রেই ‘আর্ট ফর আর্ট’—এই চেতনার দ্বারা উদ্ভূদ্ধ থাকেন; উন্নত শিল্প সৃষ্টিই তার আরাধনা; ফর্ম ও টেক্সটকে অঙ্গাঙ্গী করাই তার কাজ। কিন্তু নাজিম হিকমতের ভাষায় বলতে হয়— তুমি লিখেছ; যদি ওরা তোমকে ফাঁসী দেয় তোমাকে যদি হারাই আমি বাঁচব না। তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধূ আমার আমার স্মৃতি কালো ধোঁয়ার মত হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে তুমি বেঁচে থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী, বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর। [জেলখানার চিঠি] কবিতা তেমন হয়, যেমন তার সময়। নব্বই দশকে এসে ঢাকার কবিতা কণ্ঠ নামায়; চেয়ে দেখি, ক্লান্তিতে ছেয়ে গেছে কবির আনন। ৭) ‘আর্ট ফর আর্ট—এই ধারণার ক্ষেত্রে বাংলা কবিতা শুরু থেকে কলিকাতার শিল্পশৈলীর অনুগামী হয়ে বিকশিত। দূরবর্তী আলোচনায় না গিয়ে রবীন্দ্র-পরবর্তী জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সুধীন দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখ আধুনিকতাবাদীদের প্যাটার্ন  বিচিত্র-ভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিস্তার লাভ করেছে ঢাকার কাব্য মানসে। এদের মধ্যে জীবনানন্দের প্রভাব বিপুল পরিমাণে দেখা যায়। এর কারণ, তার কবিতার পূর্ব-বঙ্গীয় ক্রিয়াপদের ব্যবহার এবং এ অঞ্চলের চিত্রকল্প তৈরির মুন্সিয়না। একই সঙ্গে তার জগত-জুড়ে অভিজ্ঞতায় বিমুগ্ধ পরবর্তীর কবিকুল। তিনি যখন বলেন— ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর: অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে বসে আছে ভোরের দোয়েলপাখি…’। কিংবা যখন বলেন— ‘আবার আসিব ফিরে  ধানসিঁড়িটির  তীরে—এই  বাংলায় হয়তো মানুষ নয়—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে, হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে  কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়;  হয়তো বা হাঁস হব—কিশোরীর—ঘুঙুর রহিবে লাল পায়, সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে;  আবার আসিব আমি বাংলায় …’। তখন বলুন, কে-না আপ্লুত হয় এই বাংলায়! যে বাংলা রক্ত ঢেলে স্বাধীন করতে হয়েছে। পঞ্চ পাণ্ডবের এই প্রভাব অতিক্রম করে দুই বাংলার কবিকুল নতুন কাব্য-ভাষা নির্মাণ করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। সুধীন দত্ত বলেছেন— ‘ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে? মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া। অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে? কেবল শূন্যে চলবে না আগাগোড়া। তার চেয়ে আজ আমার যুক্তি মানো, সিকতা সাগরে সাধের তরণী হও…’। স্পষ্টতই বলা যায়, রবীন্দ্র-বলয় থেকে মুক্ত হয়ে তিরিশের কবিরা যে প্যাটার্ন গড়ে গেছেন তা বিশ-শতক অতিক্রম করে এখনো চর্চিত হচ্ছে । এক কথায়, ফর্মের দিক আধুনিক কবিতাকে ঢাকা ও কলিকাতায় আলাদা করা যায় না। এক্ষেত্রে দুয়েকটা ব্যতিক্রমের উল্লেখ করা যায়; যেমন, জসীম উদদীন; কিন্তু তার শৈলী পরবর্তীর কবিদের হাতে চর্চিত হয়ে প্রতিষ্ঠা পায়নি। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, গুণ, কিংবা রুদ্রর কবিতার কথা যদি বলি, সবাই কলিকাতার প্যাটার্নের অনুগামী। কিছুটা পরিবর্তন আসতে শুরু করে আশির দশক থেকে; যখন ইউরোপীয় কবিতার বঙ্গানুবাদের পাঠক গড়ে উঠতে শুরু করে। ঢাকার পাঠক বুদ্ধদেব বসুর  সুবাদে বদলেয়ার ও র‍্যাঁবোর কবিতার ভক্ত হয়ে ওঠে। এসময় রুশ, ফরাসি, স্পেনীয় কবিতা পাঠে মন দেয় ঢাকার পাঠক। তারা বুঝতে পারে, কবিতা নানান রকম। র‍্যাঁবো যখন বলে— ‘নিঃস্বনিত নোংরামির নেশায় বুদ মাছির ভিড় হোক সময় সময় তার হৃদয় প্রেমে পড়লো যার’—তখন কোন তরুণ নতুন কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা পায় না! ৮) আধুনিক কবি নিরন্তর একটি কাব্য-ভাষার পিছনে ছুটতে থাকেন। কেউ কেউ নির্মাণ করতে পারেন; অধিকাংশের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ কারণে কবি স্বীকার করেন, ব্যর্থতাই কবির প্রাপ্য। এ ব্যর্থতা ব্যক্তির নয়; অধরা ভাষাকে ধরতে না পারার। এই প্রচেষ্টার নামই কাব্যচর্চা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনো খানে…। জীবনানন্দ দাশ বলেন— আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে; স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়; আমি তারে পারি না এড়াতে, সে আমার হাত রাখে হাতে, সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়, সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময় শূন্য মনে হয়, শূন্য মনে হয়। [বোধ] ঢাকা কেন্দ্রিক কবি-সমাজের বয়স যদি ৫২’র ভাষা আন্দোলনের সময়কাল থেকে ধরি, তাতেও শতাব্দীর অর্ধাংশ জুড়ে যায়; তথাপি নতুন কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, এমন বলা যায় না। যদিও ঢাকার জনজীবনের ব্যবহারিক ভাষা সবসময়েই কলিকাতার থেকে আলাদা—উচ্চারণে, শব্দের ব্যবহারে, এমনকি বাক্য গঠনের ক্ষেত্রেও। এইক্ষণে বলতেই হয়, ঢাকার কবিরা ঢাকাইয়া না এখনো; তাদের চিন্তার প্রকাশ ঘটে ‘ক্যালকেশিয়ান বাংলা’য়। একটু খোলসা করে বলি, ঢাকার কবি বলার সময় বলেন—‘গেছে’, ‘খাইছে’; লিখতে গিয়ে লেখেন—‘গিয়েছে’, ‘খেয়েছে’। যদিও কবিরা প্রচুর পরিমাণে স্থানীয় ভাব-উপাদান ব্যবহার করছেন; তথাপি কবিতার কাঠামো কলিকাতার অনুগামী রয়ে যাচ্ছে বিধায় নব্বই দশকে এসে দেখি, নতুন কবিদের হাতে একটু একটু বদল আসতেছে। এমনকি সত্তুর, আশির কবিরাও নতুন লেখায় শৈলী বদল করতেছেন। এই সময়ে কবি যশ-প্রার্থীদের ভিতর কাব্য-তত্ত্বের প্রতি আগ্রহ দেখি। বিভিন্ন ইজমের ব্যবহারে মেতে ওঠেন অনেকে। দাদাবাদ, পরাবাস্তববাদ, ইম্প্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম নিয়ে অনুবাদক ও প্রাবন্ধিকদের প্রচুর লেখা কবিদের ফর্মে পরিবর্তন আনে। আব্দুল মান্নান সৈয়দের পরাবাস্তববাদী মাছ সিরিজ তরুণ কবিদের আলোচনার পথ্য হয়— পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ ঝর্না থেকে নেমে এসেছিলো। এখন, রহস্যময় জলে, খেলা করে অবিরল। পদ্মায় গিয়েছে একটি—মেঘনায়-যমুনায়-সুরমায়– আর-একটি গোপন ইচ্ছায়। পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ ঝর্না থেকে নেমে এসে সাঁতরে চলে বিভিন্ন নদীতে। পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ জলের রহস্য ভেদ করে এখন একাকী এক শব্দহীন সমুদ্রে চলেছে॥ (পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ ) বিশ শতকের শেষপ্রান্তে এসে ঢাকার কবি-মহলে আলোড়ন তোলে যাদুবাস্তবতা। এর সঙ্গে ইতিহাস-ঐতিহ্য-প্রীতি যুক্ত হওয়ায় কিঞ্চিৎ পরিমাণে ব্যবধান দেখা যায় কলিকাতার কবিতা থেকে। নতুন শতাব্দীতে এসে তরুণ কবিরা আধুনিকতার কাঠামোর সমালোচনা করে বলতে চান—এ সময় অবশ্যই উত্তরাধুনিক। তারা নতুন কবিতা উত্থাপন করে আধুনিকতাকে নস্যাত করতে চান। ব্রাত্য রাইসু লেখেন— সকাল আটটার চাইতে সাতটা যে বেশি ভালো তা কি আমরা বুঝতে পারতেছি অর্জয়িতা? ছয়টা কি বেশি ভাল নাকি নাকি অতটা ভাল না অল্প গবেষণা করার দরকার আমাদের বুঝতেছো? কোনো অল্প বয়স কোনো নারী দেখতে স্বাস্থ্যকর ভাল হাড় পাখনা ভাল এরকম গবেষণা সহকারী যদি বা বরাদ্দ দেয় আমার মতোই কোনো বেশি প্রতিভাবানের জন্যে তোমাদের গুড সরকার ধরো উন্নয়নহেতু বা ভাল লাগছে তাই বা অন্য কোনোই ভাবে সংগৃহীত হলো বা তা কেমনে হলো তোমারে তা পরে বলবো আমি…। [সকাল ছয়টায়] ৯) ‘৪৭ সালে ইংরেজরা ভারত ছেড়ে চলে গেছে বটে, রেখে গেছে ভাষার উপনিবেশ। আজও আমরা ব্রিটিশ সংস্কৃতির দাসত্ব করে চলতেছি। উপনিবেশ হস্তান্তর হয়। ইংরেজরা পূর্ব-বাংলাকে দিয়ে যায় সর্বভারতীয় উর্দুওয়ালাদের হাতে। ’৫২ সালে উর্দুওয়ালাদের হাত থেকে নিস্তার পেয়েছি, ’৭১-এ দেশ স্বাধীন করেছি ঠিকই, আরব-সংস্কৃতি আর ইংরেজির দাসত্ব থেকে মুক্তি মেলেনি; বরং যেনো চেপে বসছে দিনে দিনে। অতি সম্প্রতি ঢাকার ইংরেজি শিক্ষিতদের প্রযোজনায় লিটফেস্ট  হয়ে গেলো ভাষা-শহিদদের স্মৃতি-কেন্দ্র বাংলা একাডেমির বুক জুড়ে। এটা ভালো কি মন্দ সে বিচারে না গিয়ে বলতেই হয়—ঢাকার সাহিত্য আর শুধু আর বাংলা লেখক-পাঠকের নাই। ‘৭১-এর পর কলিকাতার অনুগামী ঢাকার সাহিত্য নিজস্ব ভাব-সম্পদ খুঁজে নিয়ে দাঁড়াতে পারবে, না-কি ইংরেজি সাহিত্যেরও নতুন বাজার হয়ে উঠবে—সেটা বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছে। সমস্ত আশংকা নিয়েও এইক্ষণে অভিনন্দন জানাই ঢাকার কবিদের। স্বাধীনতার প্রেরণায় উজ্জীবিত ছোট্ট কবি-সমাজ নব-উল্লাসে বিপুল ফসল ফলিয়েছে; এবং পাঠক-সাধারণের অসামান্য আগ্রহে তা ফলপ্রসূ হয়ে গড়ে উঠেছে কবিতার নতুন ভুবন—একুশের বইমেলা যার অনন্য দৃষ্টান্ত। অর্ধ-শতাব্দীর এই পথচলা মোটেই সহজ ছিলো না। সামন্ত অবস্থা থেকে বেরুবার চেষ্টারত ঢাকার অধুনিক সমাজ মূলত ব্রিটিশ-সংস্কৃতির অনুগামী হয়ে বিকশিত। ফলে আমরা যে কবিতা পাই তা কতটা বাংলা, নাকি বাংলা বর্ণমালায় রচিত ইউরোপীয় কবিতা সেই প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ, সাংস্কৃতিক দাসত্ব সূক্ষ্ম-মাত্রায় বিস্তার ঘটে—শিক্ষার বিভিন্ন ভাষা-মাধ্যমের কারণে। পাশাপাশি এও বলতে হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে উর্দুওয়ালারা প্রত্যক্ষভাবে ফিরে না এলেও মুসলিম-সংস্কৃতির মুখোশে কবিতার অনেক ফেরিওয়ালা দেখতে পাচ্ছি; যারা চিন্তায় ফেলে দেয় পাঠককে। তথাপি ঢাকার কবিরা যে ফসল ফলিয়েছে, তা পাঠের যে আনন্দ, তা পুরোমাত্রায় নতুন—কলিকাতা এবং ইউরোপীয় কবিতা থেকে। ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে, গড়ে উঠতে উঠতে আমাদের পরিচয়, আমাদের সংগ্রাম, ভাঁটফুল, নদীর ঢেউ, নগরের কোলাহল, জীবনের বিমূর্ত-বাস্তবতা—যা খুঁজে পাই—নিঃসন্দেহে  তা বেঁচে থাকার অভিলাষ জাগিয়ে রাখে, আরো একটা কবিতা পড়ার জন্য।  [*আমি সাহিত্যের অধ্যাপক নই। তথাপি অসীম রহমানের অনুপ্রেরণায়  লেখাটি ‘কাহ্নপা’ পত্রিকার জন্য লিখেছিলাম ২০১২ সালে। ভালো লেগে থাকলে খুশি হবো।]