গণ-গ্রাফিটির জোয়ার এবং অদৃশ্য ক্যামেরা!
২০২৪এর ১৬ জুলাই, ২২ বছর বয়সী আবু সাঈদ যখন রংপুরে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় তোরণের সামনে নিহত হন, আমি তখন নড়াইলে… চিত্রা নদী তীরে ঘুরেফিরে সুলতান সংগ্রহশালাটি কয়েক দিন ধরে দেখার ইচ্ছে ছিলো। পদ্মা সেতু বন্ধ হবার আশঙ্কায় ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে ১৭ জুলাই সকালে বাসে ঢাকা ফিরে এলাম। সেদিন বিকেল থেকে দফায় দফায় কারফিউ, আর অনলাইন বিচ্ছিন্নতা। বুঝতে পারছিলাম, সরকারি দলের সুবিধাভোগী বাদে সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।,শিল্প জীবনকে অনুসরণ করে, জীবন শিল্পকে অনুসরণ করে। একটি জনগোষ্ঠীর জীবন যাপন এবং শিল্পের ভঙ্গির ভেতর মগ্ন চেতনা প্রবাহের গহীন স্রোতগুলো বোঝা যায়। ২০২৪এর ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর পর রাজধানীর তরুণ, তরুণীদের রঙ, তুলিতে বিভিন্ন পাড়ায়, রাজপথে, অলিগলিতে, দেয়ালে দেয়ালে, গ্রাফিটির যে জোয়ার, দেশে ও ডিয়াস্পোরায় সৌখিন এবং পেশাদার শিল্পীদের ভেতর আঁকিবুঁকির যে বিস্ফোরণ, তার বয়ান তৈরি এ লেখাটির লক্ষ্য। নিমন্ত্রিত শিল্পীদের হাতে চিত্রিত গণ-অভ্যুত্থান ‘লিংকবাংলা’ প্রতিষ্ঠান, কুমিল্লা, ঝাউতলা গ্যালারিতে প্রদর্শন করছে এবং তার ক্যাটালগে মূল রচনা হিসেবে এ লেখাটি যাচ্ছে। বয়ানে বিস্তৃত হবার আগে, নিজের কাছে প্রথম প্রশ্ন, যে ঘটনাটির চিত্রণ-রসায়ন পুরোটা ঘটেছে প্রকাশ্য রাজপথে, তার অনুকৃত কিউরেটিং গ্যালারি দেয়ালের গণ্ডিতে হতে পারে কি না? দ্বিতীয় প্রশ্ন, ওপরে যে ‘গ্রাফিটির জোয়ার’ এবং ‘আঁকিবুঁকির বিস্ফোরণ’ উল্লেখ, একাধারে তার মূর্ত এবং অনুভূতি সঞ্জাত স্বরূপ কি হতে পারে? এ বিস্ফোরণ কোটি হাততালির মত ঝকঝকে শরতের আকাশে এক ঝাঁক গ্রেবাজকে একত্রে ডিগবাজি খাওয়ায়, এ জোয়ার প্রেমিক, প্রেমিকাদের রংধনুর দিকে ছোঁটায়। মাদ্রাসার ছেলেটি রং-এর টিন এগিয়ে দিচ্ছে ঢোলা জিন্স, টি শার্ট পরা মেয়েটির দিকে। বেহিজাবি তরুণীদের শিরিষ ঘসা দেয়ালে আলপনা চড়াচ্ছে হিজাবি তরুণী। এ বিচিত্রতা গণতান্ত্রিক সহনশীলতার মন্ত্রগুপ্তি। সাম্প্রদায়িক দর্শনগুলোকে বিফল করে দেয় এক নতুন সক্ষমতার সঙ্গীত, অক্ষম, প্রতিবন্ধীকে যে সঙ্গীত পিছে ফেলে যেতে চায় না। রঙ, তুলি আন্দোলনকারীরা যখন ট্রাফিকের দায়িত্ব নিলো, ঢাকার দানবীয় জ্যামের ভেতর মাইলকে মাইল অগ্রাধিকার পেলো এমবুল্যন্স। ২০২৪এর মে মাস থেকে ১২ই আগস্ট অবধি ‘নন্দন বিশ্বমেলা’ আয়োজনে ঢাকা কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ঘুরেছি। বিলাতে দেখেছি রহস্যময় পথশিল্পী ব্যাঙ্কসির গ্রাফিটি, কয়েক বছর ধরে ঢাকায় দেখেছি হোবেকি’র লক্ষ্যভেদী স্টেনসিল। আশির দশকে সামরিক স্বৈরতন্ত্র বিরোধী মিছিলে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সরাসরি জড়িত থাকা এবং দেয়ালের চিকাগুলো নৈমিত্তিকভাবে দেখার সুবাদেও আমার মনে হয়েছে, ২০২৪এর তারুণ্য উদ্ভাসিত গণ-গ্রাফিটির জোয়ার পুরোপুরি ধারণ কোনো গ্যালারিতে সম্ভব নয়, চুম্বক আর্কাইভিং কিউরেটিং সম্ভব। তাহলে, ২০২৪ গণ-গ্রাফিটির মূল প্রবণতাগুলো কিভাবে একটি সীমিত বয়ানে মেলে ধরা যায়? ৫থেকে ১১-আগস্ট ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্রাফিটি চিত্রণকারী কিশোর, কিশোরীদের সাথে কথা বলেছি, ছবি তুলেছি প্রচুর, ফোনের লেন্সটিকে কিভাবে গৌণ করতে হয়, তা নিয়ে ভেবেছি এন্তার। বর্তমান বয়ানে ধার নিয়েছি জয়নুল আবেদিনের ‘দুর্ভিক্ষ সিরিজ’ লোকনকাচ; চলচ্চিত্রকার লুই মাল ‘ফ্যান্টম ইন্ডিয়া’ নির্মাণে, ক্যামেরা অদৃশ্য করতে যে তাৎক্ষনিক ধারাভাষ্য ব্যাবহার করেছিলেন, সে কৌশল। লুই মালের আগে আলোক-চিত্রশিল্পী ডোরা মার ১৯৩৭ সালে একই কৌশল পিকাসোকে শিখিয়েছিলেন, ‘গের্নিকা’ ধ্বংসযজ্ঞের পর পিকাসো যখন একই শিরোনামে তার কালজয়ী তেলচিত্রটি আঁকেন। ডোরা মারের, ‘Cameraless Photography”কে, লুই মাল নবায়িত নাম দিয়েছিলেন, ‘Invisible Camera’। এক দিকে অবদমন থেকে ছিটকে আসা নৈরাজ্যের উস্কানি, আরেক দিকে ভাষা, কৃষ্টির নোঙ্গরে গৌরবের দীপ্তি, এ বৈপরীত্য হচ্ছে ২০২৪এর গণ-গ্রাফিটির প্রাণ-ভোমরা। ভোমরাটির গুঞ্জন সচেতন স্থানীয় ইতিহাসের পাশাপাশি অবচেতনভাবে বিশ্বায়িত শিল্পধারাগুলো ধারণ করে। ২০২৪, আগস্টে ঢাকার গ্রাফিটিগুলোতে, বাংলা বর্ণমালা এবং আনুষঙ্গিক প্রতীকের ব্যাবহার ১৯৫২’ ভাষা আন্দোলনের সার্থক উত্তরাধিকার। ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের কাছাকাছি এক দঙ্গল কিশোর, কিশোরীর দেয়াল চিত্রের ছবি তুলে পাঠিয়েছিলাম ফ্রান্সে ছেলের মা প্যাট্রিসিয়াকে। তাদের একাংশ দেখে প্যাটি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলো, ‘’আরে, এতো মন্দ্রিয়ানের জ্যামিতিক আকৃতিগুলোর ভেতর মূর্ততার মিশেল।’’ ভুলে গেলে চলবে না, বাংলার প্রাচীন অস্ট্রো-এশিয়াটিক সাঁওতাল সম্প্রদায় মাটির দেয়াল চিত্রিত করে আসছে হাজার বছর ধরে। হাজার বছর আগে বাংলার অতীশ দীপঙ্কর সহ অনেক বৌদ্ধিক আচার্য সারা এশিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। অজন্তা, খাজুরাহো, আঙ্করভাটের দেয়ালে পাথর কুদে যেসব প্রাচীন কাহিনীগুলো দেখা যায়, ধরে নেয়া যেতে পারে অতীশের মত ভ্রমণপিপাসু বাঙালিদের হাত ধরে সাঁওতালদের দেয়াল চিত্রণ প্রক্রিয়াও দেশান্তরে গিয়েছিলো। আগস্টের ঢাকাতে গ্রাফিটির উচ্ছ্বাসে মনোযোগী হবার ফলে আরো বেশি করে বুঝতে পেলাম রাজধানীতে বেশুমার দেয়াল আছে, সাঁওতালেরা নেই। সাঁওতালদের চিত্রিত বাড়িগুলোর চার পাশে কোনো দেয়াল নেই। যে কোনো গ্রাফিটির বিষয় হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট জনপদের প্রতীকী অভিমত। সোভিয়েত পতনের আগে এবং পরে বার্লিন দেয়ালের গ্রাফিটিগুলো বদলে গেছে। অধিকৃত ফিলিস্তিনে গ্রাফিটিগুলো বিশ্ববাসীকে মানবাধিকারের জায়গাগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে। ব্রিটিশদের সবচেয়ে পুরনো উপনিবেশ উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে গ্রাফিটিগুলো ধর্মীইয় সহিংসতা, অসাম্প্রদায়িক সেকুলার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরছে। স্কুল ছাত্ররা তাদের স্কুলের আঙ্গিনায় আসাদ শাসনের বিরুদ্ধে গ্রাফিটি আঁকলে, সে ছাত্রদের ধরপাকড়, অত্যাচার কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিলো সাম্প্রতিক কালের ভয়াবহতম সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ। ব্রিটিশ গ্রাফিটি শিল্পী ব্যাঙ্কসি-ভঙ্গিমায় হাস্যরসাত্মক গ্রাফিটির দেখা মিলবে কেরালার কোচিন কেল্লা এলাকায়। এখানে দেয়ালে অজ্ঞাত শিল্পীরা বিপুল সব বব মার্লি, মোনালিসা, মার্ক্স, জেমস বন্ড, প্রেম নাজিরের হাতে বীণা, তানপুরা ধরিয়ে ব্যাঙ্গ করেছে এশিয়ার সবচেয়ে বড় চারুকলা উৎসব কোচিন-মাজুরিস আর্ট বিএনালকে। গ্রাফিটি হচ্ছে শিল্পের সমান্তরাল গণমুখী ভাষা, শিল্প দিয়ে কায়েমি শিল্পের প্রতিরোধ। এ পর্যায়ে এসে, শুরুতে যে ‘প্রথম এবং ‘দ্বিতীয় প্রশ্নটি’ করেছিলাম, তার আবশ্যকীয় পটভূমি হিশেবে ‘তৃতীয় একটি প্রশ্ন’ বিবেচনা করা যায়, তা হচ্ছে, যাকে আমরা ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলছি, তার ‘দ্বিতীয়’ অভিধাটি কোথা থেকে এসেছে? এটি যদি ১৯৭১এ অর্জিত ‘প্রথম স্বাধীনতা’ থেকে এসে থাকে, যাকে ভাস্কর গড়েছে ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ বলে, তার প্রবর্তনাগুলো কতটুকু আমরা ধারণ করতে পেরেছি? ৫ই আগস্ট পুরো দেশ জুড়ে বঙ্গবন্ধু জাদুঘর সহ যেসব ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে তা থেকে ঢাকাই গ্রাফিটিকে আলাদা করা যাবে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমর্পণ মঞ্চের স্মারক ভাস্কর্য ক্লাস্টার এবং ভাস্করদের আবাসিক ব্যবস্থার ধ্বংসযজ্ঞ দেখে মনে হয়েছে, যে প্রমিথিউস দেবালয় থেকে মানুষকে আগুন চুরি করে এনে দিয়েছিলো, তাকে অনন্তকালের শাস্তি দিয়েছে ক্রুদ্ধ দেবাদিদেব জিউস। দেবলোকের পাঠানো ঈগল প্রমিথিউসের যকৃত বার বার উপড়ে ফেলছে, তা আবার গজাচ্ছে। বীর হারকিউলিস প্রমিথিউসকে এই অনন্তকালীন শাস্তি থেকে মুক্ত করেছিলো। পম্পে নগরীর দেয়াল চিত্রগুলো পুড়ে গেছে ভিসুভিয়াস উদগীরণে, ইস্তাম্বুলের হাজিয়া সোফিয়ার দেয়াল একসময় ধারণ করেছে খ্রিস্টান গ্রাফিটি, আরেক সময় তার ওপর মুসলিম ক্যালিগ্রাফি, তার পর রূপান্তরিত হয়েছে জাদুঘরে। ঢাকাই গ্রাফিটি জোয়ারকে বলা যেতে পারে অবসাদগ্রস্ত মহানগরের দেয়াল ফাটিয়ে বিচিত্রমুখী ঝর্ণাধারার উৎসারণ। ট্যাবু ভেঙ্গে সে ঝর্ণা-জলে সাতার কাটা কিশোর, কিশোরীদের বিচিত্র সাজ, পোশাক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পোশাকের জন্য নারীদের ওপর যে জুলুম, তা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে গণতন্ত্রের বুনিয়াদ অনেক শক্ত করতে হবে। ৫ই আগস্ট যখন জনতার সাথে গণভবনে ঢুকি, আমার সাথে ছিলেন ‘নন্দন বিশ্ব মেলার’ সমন্বয়কারী ড. শাহনাজ পারভীন। আমি লম্বা হওয়াতে যেভাবে দেয়াল টপকাতে পেরেছিলাম, উনি তা পারেন নাই। কিন্তু আমি যে লোহার জালি মার্কা মেক-শিফট-সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলাম, তা উনি ধরে রেখেছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষের সব মঞ্চ এভাবে একে অন্যকে সেই তল্পিবাহক ঘেরা, গণ-বিচ্ছিন্ন গণভবনে জনতার দখল কায়েম করতে সহায়তা করেছে। ৫ই আগস্ট গণভবনে ঢুকে আমি লুটপাট দেখি নাই, দেখেছি ক্রুদ্ধ, অপদস্থ, অধিকার হারানো, অপমানিত জনতা এক দানবের মগজ, হৃৎপিণ্ড, ধমনি উপড়ে ফেলছে। আগুন ঝলসানো আকাশে বাংলাদেশি ফিনিক্সকে ঝাঁকুনি দিয়ে ডানা মেলতে দেখেছি। হাসতে ভুলে যাওয়া, চমকে চমকে এদিক ওদিক তাকিয়ে সচকিত বাংলাদেশিদের হাসতে দেখেছি। প্রত্যাখ্যাত এ গণভবনকে গণ-অভ্যুত্থানের স্মারক জাদুঘর করার সিদ্ধান্ত জনতার অভিলাষের প্রতিফলন বৈ কি। ঢাকা শহরে আমি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছি। এ শহরে বার বার ফিরে শুনেছি সাধারণ বিত্তের লোকজনের ক্রয় ক্ষমতা কমতে কমতে পুষ্টিহীনতার আক্ষেপ। একের পর এক নদী খুন করে আততায়ীরা হয়ে গেছে সামাজিক অভিভাবক, তাদের তৈরি মাকড়শার জালে ঝুলে ঝুলে লোকজন ভিড় করেছে ইত্যাকার শপিং মলে, ভুলে গেছে খেলার মাঠ, পার্ক এবং পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা। সার্বজনীন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার’ আয়োজন করতে হয়েছে সৈনিকদের বর্মের আড়ালে। একই মঞ্চে ঘটছে ক্রসফায়ার, গুম, ব্যাঙ্ক লুটপাট, আদিবাসীদের ওপর ভূমি দস্যুতা, পদ্মা সেতু, মেট্রো রেলের পৈশাচিক মহড়া। রাজধানী হয়ে গেছে সারা দেশের বিচূর্ণ আয়না, যার ভাঙ্গা কাচগুলো জুড়ে দিতে য্যানো এ গ্রাফিটি-জোয়ারের আয়োজন। আমাদের চারুশিল্প নৈর্ব্যক্তিক বিমূর্ত হতে হতে, রূপ সৃষ্টির লীলা ব্যাহতকারী দানবীয়তাকে তুলে ধরতে সম্পূর্ণ ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মূর্ততা হয়ে গেছে পুনরাবৃত্তির কাল্ট। সাংস্কৃতিক, সামাজিক যে কোনো ধাঁচ ভেঙ্গে বেরোতে আমাদের একটা জড়তা, আড়ষ্টতা আছে। ছন্দ এবং নন্দনের চাপানো ধাঁচ আমাদের দেহকে বিচ্ছিন্ন করছে আবহমান দেহছন্দ থেকে। প্রতিষ্ঠিত মূলধারা বলতে আমরা যা বুঝি তা আমাদের মনকে বিচ্ছিন্ন করছে বিশ্বজনীন মনন থেকে। প্রতিষ্ঠিত শিল্পী বা শিল্পধারা আমাদের সমস্যা নয়, কোন পথে তা হচ্ছে তা আমাদের বার বার সঙ্কটে ফেলছে, বিচিত্রতা দেখলে আমরা শঙ্কাগ্রস্থ হয়ে উঠছি। ৫ আগস্টের পর আঁকা গ্রাফিটিগুলো কাল্ট-প্রবণতা ভেঙ্গে গল্প-দাদু রিপ ভ্যান উইঙ্কেলের পুরনো গল্পটি শুনতে চেয়েছে, গ্রাফিটি আঁকতে আঁকতে গল্প-দাদুকে হাটার লাঠিটিও এগিয়ে দিতে চেয়েছে। প্রত্যেকটি গ্রাফিটির বিচিত্র বিষয়ের ভেতর আমি শুনতে পেয়েছি, মুগ্ধে’র সাশ্রয়ী বাক্য, ‘‘ভাই পানি লাগবে কারও, পানি ’’! এ সাশ্রয় বাক্যটুকু সে শহরে লালিত হয়েছে, যে শহরের রাজনৈতিক এলিট যত্নবোধকে করে তুলেছিলো দলিয় অগ্রাধিকারের বিজ্ঞাপিত রিল। প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলন, প্রতি-আন্দোলন ছোট, বড় অর্থে সামাজিক উল্লম্ফন, আবার উভয়ত চলিষ্ণুতা, স্থবিরতার দর্পণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাক স্বাধীনতাকে সাংবিধানিক সর্বোচ্চ মর্যাদা দেবার পরও, খ্রিষ্টান বলয় বলে পরিচিত ডানপন্থী এলাকাগুলো পাঠ্যতালিকা থেকে এখনো বিভিন্ন প্রাগ্রসর প্রকাশনা নিষিদ্ধ করছে। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব নামান্তরে রাজনৈতিক অধিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা, মিশ্র অর্থনীতি গ্রহণ করলেও যা এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে চলছে। অনেক আন্দোলনকারী রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে শিল্পীকে, লেখককে তাদের মাপে বাধতে চায়, তাদের দর্পণে দেখাতে চায়। বিপ্লবের বরপুত্র বলে পরিচিত রুশ কবি মায়াকোভস্কি তাত্ত্বিক নজরদারিতে বিধ্বস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন, একই পথ বেছে নেন কবি এসেনিন। সোভিয়েত নজরদারিতে গৃহবন্দিত্ব বরণ করেন পাস্তেরনাক, চূড়ান্ত হেনস্তার শিকার হন আনা আখমাতোভা, গুলাগে অন্তরিন হন সোলঝেনিৎসিন। সোভিয়েত অভিভাবকেরা বলেছিলেন, বিমূর্ত শিল্প করা যাবে না; ইরানি মোল্লাদের ফতোয়া হচ্ছে মূর্ত শিল্প করা যাবে না। অশোক আমলে বৌদ্ধিক অধ্যক্ষদের থেকে হিটলার, মুসোলিনির আমলে ফ্যাশিস্ট তাত্ত্বিকেরা শিল্পী, লেখককে শাসিয়েছে, নির্বাসনে পাঠিয়েছে, হত্যা করেছে। পাকিস্তান অভ্যুদয়ের পর বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে। আস্তিক, নাস্তিক বিভেদ উস্কে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ঘটে একের পর এক ব্লগার, প্রকাশক হত্যা এবং নির্বাসন। আগস্টে রাজনৈতিক পালাবদলের পাশাপাশি একটি ঘটনা আমার মনে থাকবে। বেহুলা কেন্দ্রিক বিভিন্ন নান্দনিক পরিবেশনাকে আমরা ‘নন্দন বিশ্বমেলা- ২০২৫’এর থিম হিশেবে নির্ধারণ করি। আজকের চারুকলার শিক্ষানবিশি নারী কিভাবে বেহুলাকে ধারণ করে তা বুঝতে জুলাইর মাঝামাঝি রাজধানীর এক গ্যালারিতে ‘বেহুলা ওয়ার্কশপের’ আয়োজন করেছিলাম, যেখানে চারুকলার ৯ জন ছাত্রী নতুন শেখাএগ-টেম্পেরা মাধ্যমে দু’দিন ধরে নিজেদের মত বেহুলাকে ফুটিয়ে তোলেন। ১৬ জুলাই দেশব্যাপী শিক্ষাঙ্গনগুলো অনির্দিষ্ট-কালীন বন্ধ ঘোষণা করে, হল খালি করবার নির্দেশ দেয়া হলে, ‘বেহুলা ওয়ার্কশপে’ অংশগ্রহণকারীদের ভেতর যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রী, আক্ষরিক ভাবে তাদের সাপে দংশানো, অনিশ্চিত অবস্থা। ৫ই আগস্টের পর যখন বিভিন্ন এলাকায় গ্রাফিটিগুলো দেখতে পেলাম, তখন ঐ ৯ তরুণীর আকা বেহুলা এবং বিশেষ করে সাপের প্রতীকটিকে মনে পড়ছিলো। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার, টেম্পেরা হচ্ছে ফ্রেস্কো, ম্যুরালের প্রাচীনতম মাধ্যমগুলোর একটি। যদিও গ্রাফিটি স্বাক্ষর বিহীন, কিন্তু একটি পুরো প্রজন্ম যখন তাদের বেদনা এবং উচ্ছ্বাসকে নিজের মত করে দেয়ালের পর দেয়ালে ধরে রাখে, তখন স্বাক্ষরবিহীন নাম অর্জন করে অস্থি, মজ্জা, রক্ত, মাংস এবং সর্বোপরি চেহারা। ২০২৪এর ঢাকায় ঝাঁকে ঝাঁকে গ্রাফিটি চিত্রণকারী শিশু, কিশোরদের দেখে মনে হয়েছে, অবরুদ্ধ, অবদমিত যে শহর থেকে হ্যামিলনের বংশীবাদকের পেছনে শিশুরা হারিয়ে গিয়েছিলো, তারা ফিরে এসেছে। প্রতিটি দেয়াল য্যানো স্বপ্নের আলোকসজ্জা, স্বপ্নের হাওয়াই কার্পেটে উড়ে যাচ্ছে বিশ্বায়িত বাংলাদেশে! চয়ন খায়রুল হাবিবকবি, নাট্যকার, কিউরেটার৭/৯/২৪ব্রিটানি, ফ্রান্সকপিরাইট এবং মেধাস্বত্ব : চয়ন খায়রুল হাবিব এস্টেট সংরক্ষিত। [লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় এইখানে: https://shombhabonarbangladesh.wordpress.com/article/]
Copy and paste this URL into your WordPress site to embed
Copy and paste this code into your site to embed