-
পুঁজিবাদ, অদৃশ্য জীবাণু অথবা শুধুই কিছু অনুভূতির গল্প ২
২৩.০৪.২০২০
.
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ায় লুকোনো সহস্র পশু
.
১৪ আগস্ট, ১৯৭১.. দু’জন তরুনকে ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টো নামক জায়গা থেকে সম্পূর্ণ অকারণে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসমেন্টে একটি কারাগারে.. তাদের প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে গিয়েছিলো কারণ তারা ঐ তরুনদেরকে ভালো বলেই জানতো.. তারা জানতো না যা তা হলো, তাদের ঐ গ্রেপ্তারের মাধ্যমে শুরু হতে যাচ্ছিলো মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম কুখ্যাত একটি পরীক্ষণ “The Stanford Prison experiment”..
.
এই পরীক্ষায় যারা অংশগ্রহণ করেছিলো তাদেরকে প্রতিদিন ১৫ ডলার করে দেয়ার কথা বলা হয়েছিলো.. বিনিময়ে তাদেরকে একটা কারাগারে অভিনয় করতে হবে আসামী অথবা কারারক্ষীর ভূমিকায়.. কে আসামী হবে আর কে কারারক্ষী হবে এটা নির্ধারিত হয়েছিলো টস করে.. নির্ধারণ হওয়ার পর আসামীদেরকে তাদের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে আনা হয়.. তাদের পরিচয় গোপন করে তাদের নতুন নাম দেয়া হয় কয়েকটি সংখ্যার মাধ্যমে.. কারারক্ষীদেরও পরিচয় গোপন থাকে.. তাদের সবার পোষাক একই রকম, খাকি পোষাক.. তাদের সবার চোখে থাকে সানগ্লাস.. আর তাদের হাতে দেয়া হয় একটি করে লাঠি..
.
পরীক্ষার প্রথম দিন সবাই খুব স্বাভাবিক থাকে.. আসামীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কারাকক্ষে বন্দী হয়ে থাকে.. সব নিয়ম মানে.. কারারক্ষীরা তাদের দেখভাল করে..নিজেদের মধ্যে পরিচিত হয়.. গল্পগুজব করে সময় কাটায়.. অভিনয় করা নিয়ে হাসাহাসিও করে.. তাদের সমস্ত কার্যকলাপ ক্যামেরার মাধ্যমে বাইরে থেকে লক্ষ্য করতে থাকেন মনোবিজ্ঞানী ফিলিপ জিমবার্ডো ও তার দল..
.
কিন্তু দ্বিতীয় দিন হঠাৎ করেই কারারক্ষীদের ব্যবহার পরিবর্তন হওয়া শুরু করে.. তারা তাদের আধিপত্য প্রদর্শন করা শুরু করে কারাবন্দীদের ওপর.. নিয়ম লঙ্ঘনকারী আসামীদেরকে বিভিন্ন রকম শাস্তি দেয়া শুরু করে তারা.. যত দিন যায়, কারাবন্দীদের নিষ্ঠুরতায় যোগ হয় নতুন মাত্রা.. আসামীদেরকে উলঙ্গ করে ফেলা হয়.. তাদের পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়া হয়.. তাদের ফ্লোরে শুতে বাধ্য করা হয়.. এবং চলে আরো নানা মানসিক নির্যাতন.. অপরদিকে যারা কারারক্ষীদের আধিপত্য মেনে নেয় তাদের দেয়া হয় বিশেষ সুবিধা.. ভালো খাবার, ভালো থাকার ব্যবস্থা.. সুবিধা-বঞ্চিত আসামীরা বিদ্রোহ করে অচিরেই.. তাদের থামাতে কারারক্ষীরা তাদের ওপর ফায়ার এক্সটিংগুইশার এর সিলিন্ডার নিয়ে হামলে পড়ে.. একটা পর্যায়ে পরীক্ষাটি চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে.. ২ সপ্তাহের পরিকল্পিত একটি পরীক্ষা এভাবে অনিবার্য কারণবশত বন্ধ করে ফেলতে হয় ৬ দিন পরেই..
.
কেন এই পরিবর্তন হয়েছিলো কারারক্ষীদের ব্যবহারের মধ্যে?.. এই প্রশ্নের উত্তর খু্ঁজতে গিয়ে মানব মনের অনেক গভীরে নরকের আশ্চর্য সব কীটের বাসা পাওয়া যায়.. মনোবিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদি পরিচয় গোপন নিশ্চিত করা হয় (anonymity), যদি কাউকে তার নিজেকে ভুলে অন্য কেউ হয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয় (deindividuation) এবং তাকে যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষমতা (power) দেয়া হয়.. মানুষ পশু হয়ে যেতে খুব একটা সময় নেয় না, সে মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবনে যত ভালোই হোক..
.
আমাদের ফেসবুকের (বা অন্যান্য সোশ্যাল সাইটের) ভার্চুয়াল জগতে এই পরিস্থিতিটা যে কেউ চাইলেই নিজের জন্য তৈরি করে নিতে পারে খুব সহজেই.. যে কেউ নিজের নাম লুকিয়ে একটি আইডি খুলে ফেলতে পারে, যাতে থাকবে ভুল ঠিকানা কিন্তু সেটা হতে পারে বিশ্বাসযোগ্য.. ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তার পরিচয় গোপন রাখার পূর্ণ স্বাধীনতা দিচ্ছে.. সে ফেক আইডির মাধ্যমে মিথ্যা একটা ভাবমূর্তি তৈরী করে হয়ে যাচ্ছে অন্য কেউ.. এবং তাকে দেয়া হচ্ছে স্ট্যাটাস দেয়ার, বিভিন্ন পাবলিক স্ট্যাটাসে কমেন্ট করার এবং পেজ খুলে তাতে নিজের যা-খুশি-তাই মত প্রকাশ করার অবাধ স্বাধীনতা.. ফলাফল হচ্ছে স্ট্যানফোর্ডের সেই এক্সপেরিমেন্টের মতই.. কমেন্টে, স্ট্যাটাসে, ভিডিওতে এবং ট্রলে বিকশিত হচ্ছে পশুত্ব এবং মূর্খতা..
.
প্রথম প্রথম এ ধরণের কমেন্ট করার জন্য মানুষ ফেক আইডি ব্যবহার করলেও, এখন আর তা করে না.. এখন মানুষ রিয়েল আইডি থেকেই তার হিংসা আর লালসার বার্তা ছড়ায়.. কারণ, তারা দেখেছে ফেক আইডি ব্যবহার করে কারো তেমন কোন সমস্যা হয় নি.. কেউ তাদেরকে খোঁজে নি.. তখন তারা হয়ে গেছে আরো বেপরোয়া.. আরো হিংসাত্মক.. আরো বেশি পাশবিক পশু…
.
বাংলাদেশের ডাক্তারদেরকে সোশ্যাল সাইটগুলোতে আক্রমণের ঘটনা নতুন কিছু নয়.. এই আক্রমণ ও সংঘর্ষের পেছনে আরো অনেক কারণ বিদ্যমান থাকলেও, আমার কাছে সোশ্যাল সাইকোলজির এই দিকটাই সবচেয়ে বেশি দায়ী মনে হয়.. কারণ বাঙালি জাতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, জাতি হিসেবে আমরা খুব স্যাডিস্ট একটা মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠছি.. যতই ভালো কিছু করার চেষ্টা হোক, তাতে একটা বড় খুঁত থেকেই যাচ্ছে.. সেটা থেকে একটা বড় সমস্যা তৈরী হয়ে আবার আমরা পিছিয়ে পড়ছি.. আবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু হচ্ছে.. এই দুষ্ট চক্রের যেন শেষ নেই.. ভাগশেষ হিসেবে থেকে যাচ্ছে তীব্র কিছু ক্ষোভ, যেটা আমরা ঝেড়ে নেবার জায়গা পাচ্ছি না..
.
দিনশেষে সোশ্যাল সাইটগুলো হয়ে উঠছে সেই ক্ষোভ ঝাড়ার জায়গা.. ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে আমরা যে নিজেদেরকে পশু বানিয়ে ফেলছি সে খেয়াল আমাদের থাকছে না.. অনেকের ক্ষেত্রে স্যাডিজম থেকে জন্ম নিচ্ছে অদ্ভুত সব বিকৃত মানসিকতা.. আমাদের কেউ নিজের স্ত্রীকে খুন করার দৃশ্য লাইভে প্রচার করছে.. কেউ বা করোনায় মৃত ডক্টরকে নিয়ে ইচ্ছামত কুৎসা রটাচ্ছে..
.
এসব দেখে আমার প্রয়াত সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের একটি প্রবন্ধ গ্রন্থের কথা মনে হয় কেবল.. সেখানে তিনি বাঙালির প্রতিক্রিয়াশীলতা নিয়ে কথা বলেছেন.. আমারও বাঙালির সোশ্যাল সাইটের কার্যকলাপ দেখে শুনে এই বিশেষনটাই তাদের জন্য সেরা মনে হয়…
“অতি-প্রতিক্রিয়াশীল”.. পশুও বলতে চাই না.. মানুষও বলতে চাই না.. শুধু “অতি-প্রতিক্রিয়শীল”!..3 Comments
Friends
মীর অনাবিল
@miranabil
Shomik Adhikary Nandon
@shomikadhikarynandon
Neel tripura
@neel
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Md Ashfak Sayed
@ashfak
Sajid Raiyan ( সাজিদ রাইয়ান)
@sajid07
মোখলেসুর রহমান
@mokhles
আশ্রাফুজ জামান তানবীন
@ashrafujjaman001
Nipun Chandra
@nipunch



সুন্দর উপস্থাপনা।