Profile Photo

হাসনাত সৌরভOffline

  • Hasnat21
  • Profile picture of হাসনাত সৌরভ

    হাসনাত সৌরভ

    3 years, 10 months ago

    আলাপের আয়না
    হাসনাত সৌরভ
    =========================

    পাশাপাশি দুটো রেললাইন। একই কারখানায় তৈরি হলেও আগে দুজনের তেমন আলাপ ছিল না। লাইন পাতার পর একসাথে থাকতে থাকতে দিব্যি আলাপ হয়ে যায়, একসাথের অভ্যেস হয়ে যায়। তার ওপর দুজনকে যখন একসাথে কাজ করতে হয়, তখন তো একটা ঘনিষ্ঠতা হতে বাধ্য। তাই গরমের দুপুরে ট্রেন আসার টুটুক টুটুক শব্দটা ভেসে এলে একজন আরেকজন কে হাঁক দেয়, ‘চল রে, তৈরি তো?’ আর একজন পাল্টা হাঁকে, ‘হ্যাঁ ভাই। তবে গরমে পা পুড়ে যাচ্ছে।’ ট্রেন এগিয়ে আসে আরো, এদিকের জন হাঁক ছাড়ে, ‘ওসব বলে লাভ নেই ভাই, দে কাঁধ দে।’ ওদিকের লাইন নিজেকে গুছিয়ে নিতে নিতে বলে, ‘তাও তো তোর দিকে পুকুর আছে, আমার তো শালা ঝলসে দিচ্ছে পুরো।’ ট্রেন চলে আসে একদম সামনে। ঠিক চাকার মাপে-মাপে বসে যায় দুজনে সাথেসাথে। বিরাট দাম্ভিক লোহার শুঁয়োপোকাটা ঝনঝনিয়ে চলে যায় দিব্যি। নীচ থেকে কাঁধ দিতে দিতে এদিকের লাইন বলে ওঠে, ‘পুকুর শুধু দেখতেই ভাই, কচুরিপানা যা ভরেছে না, হাওয়ার হ টুকুও নেই আর।’ ট্রেনের আওয়াজে স্পষ্ট শোনা যায় না সবটা, তবে মনে হয় ওপারের লাইনটা বলে ওঠে, ‘দেখ কদিন পর পুকুর বুজিয়ে ফ্ল্যাট উঠল বলে।’

    এইবার গরমে অবশ্য একটু ছুটি। ট্রেন কম। মানুষ আরো কম। কাজ শুরুর পর থেকে এমন অবসর দুজনে কক্ষনো পায়নি। বেশ সারাদিন রোদের মধ্যে গা সেঁকে এটাসেটা গল্প করে দুজন। গল্পের মধ্যে চলে আসে গাঁয়ের কথা, সেই যে বুড়োটা কিচ্ছু খেতে পেত না কিন্তু একশো বছর বেঁচে ছিল, তার গল্প করে এই লাইনটা উল্টোদিকের লাইনটাকে। এ আবার নিজের দেশের কথা বলে, মেয়েটা কত বড় হয়েছে কে জানে, বিয়ের জন্য তো কিছুই জমানো হল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে দমবন্ধ পুকুরটার থেকে।

    খুব দেশে ফিরতে ইচ্ছে করে দুজনের। রেললাইন দুটোর ভীষণ ইচ্ছে করে দেশে ফিরতে। দেশে ফিরলে সব ঠিক হয়ে যায়। মায়ের সামনে পাত পেড়ে বসলে ঠিক খুদকুঁড়ো জুটে যাবেই। রেল লাইন দুটো হাঁটতে শুরু করে রাতের দিকে। ওরা শুনেছে নাকি গোটা দেশে যত রেললাইন আছে সব পরপর জোড়া লাগালে এই দেশের ম্যাপটাকে দু তিনবার মুড়ে ফেলা যাবে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা ভাবে এইভাবে সত্যিই সব রেললাইন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গোটা দেশটা মুড়ে দিয়েছে একদিন, একটা গোটা দেশ, তার সমস্ত কচুরিপানা ঢাকা পুকুর নিয়ে অবাক হয়ে ভাবছে, এত বড় রেললাইন এতদিন কোথায় ছিল!

    হাঁটতে হাঁটতে রাত গভীর হয় আরো। বাড়ির দিক থেকে হাওয়া আসে একটা। চোখ জুড়িয়ে আসে দুজনের। পা দুটোও বিশ্রাম চায়। গামছা বিছিয়ে শুয়ে পড়ে ওরা। তারপর ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যেই বাড়ি পৌঁছে যায়, গরম ভাতের থালা এগিয়ে দেয় বউ, ছেলেটা গা ঘেঁষে থাকে, মেলা বসে ফসল ওঠার পর। ঘুমের মধ্যে একটা দারুন জমজমাট গ্রামের মেলায় ঘুরতে থাকে দুটো রেললাইন। বাঁশি বাজে, খুব খুব বাঁশি বাজে। বাচ্চাকাচ্চার হাসি, হইহই চিৎকার, কলরবে ডুবে যায় ওরা ঘুমের মধ্যেই।

    ফলে ট্রেনটা কখন ওদের বুকের ওপর দিয়ে চলে যায় ওরা জানতেই পারে না।

    @হাসনাতের হস্তাক্ষর

    6
    2 Comments
Skip to toolbar