-
শিক্ষকেরা যখন সহযাত্রী
শীতল ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। গ্রামের স্কুলের লালচে দালানটার সামনে দাঁড়িয়ে মোবারক স্যার প্রতিদিনের মতো কয়েক মুহূর্ত থামলেন। হাতে ধরা নোটখাতার ভেতরে ছিল আজকের ক্লাসের পরিকল্পনা—কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল গত রাতের ভাবনাগুলো। তিনি গত কয়েক মাস ধরে অনুভব করছিলেন, শিক্ষকতা আর আগের মতো একা-একা করার কাজ নেই। সময় বদলেছে, শিক্ষার্থীরা বদলেছে, আর বদলাতে হচ্ছে শিক্ষকদেরও। এই বদলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন এক নতুন আশ্রয়—একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যেখানে দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষকরা একে-অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, শিখছেন, শেখাচ্ছেন, আর নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করছেন।
মোবারক স্যার প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেননি বিষয়টিকে। সহকর্মীদের মুখে শুনেছিলেন—অনলাইনে নাকি শিক্ষকরা পাঠ পরিকল্পনা শেয়ার করেন, ভিডিও দেন, গল্প লেখেন, মন্তব্য করেন। তিনি ভেবেছিলেন, এসব তো শহরের স্কুলের জন্যই বেশি কাজে লাগে। কিন্তু একদিন বিজ্ঞান ক্লাসে যখন নবম শ্রেণির ছাত্ররা তার বোঝানো বৈদ্যুতিক বর্তনী ঠিকমতো আঁকতে পারল না, তখন রাতে বাড়ি ফিরে মোবাইল হাতে নিয়ে তিনি আবার সেই কথাটাই মনে করলেন। কৌতূহল থেকে ঢুকে পড়লেন প্ল্যাটফর্মটিতে। দেখলেন—শত শত লেখা, ছবি, ভিডিও, দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষকদের অভিজ্ঞতার গল্প। কেউ লিখেছে কীভাবে স্থানীয় উপকরণ দিয়ে বিজ্ঞান শেখাচ্ছে, কেউ আবার দূরবর্তী গ্রামে অনলাইন কুইজ চালুর অভিজ্ঞতা ভাগ করেছে।
সেদিন রাতেই তিনি একটি ভিডিও দেখলেন—একজন শিক্ষক বোতল আর তার ব্যবহার করে চাপের সূত্র বোঝাচ্ছেন। পরদিন ক্লাসে সেটাই প্রয়োগ করলেন। অবাক হয়ে দেখলেন, ছাত্রদের চোখ চকচক করছে। যে ছাত্ররা আগে চুপ করে থাকত, তারাও প্রশ্ন করছে। এই ছোট্ট সাফল্য মোবারক স্যারের মনে সাহস জোগাল। তিনি বুঝলেন, এখানে শুধু শেখা নয়—এখানে শেখানোর নতুন ভাষা খুঁজে পাওয়া যায়।
কয়েকদিন পর তিনি সাহস করে নিজের প্রথম লেখা পোস্ট করলেন। শিরোনাম দিলেন—“গ্রামে সহজ উপকরণে বিজ্ঞান শেখানো।” সেখানে লিখলেন কীভাবে প্লাস্টিকের বোতল, তার আর বাল্ব দিয়ে তিনি বৈদ্যুতিক সার্কিট বানিয়েছেন, কীভাবে ছাত্ররা নিজেরাই দল বেঁধে পরীক্ষা করেছে। লেখা প্রকাশ হওয়ার পর নোটিফিকেশন আসতে লাগল—কেউ ধন্যবাদ জানাচ্ছে, কেউ প্রশ্ন করছে, কেউ পরামর্শ দিচ্ছে আরও ভালো করার উপায়। প্রথমবারের মতো তিনি অনুভব করলেন—তিনি একা নন। দেশের অন্য প্রান্তে বসে কেউ তার অভিজ্ঞতা পড়ে শিখছে, আবার কেউ তাকে নতুন পথ দেখাচ্ছে।
দিন যেতে যেতে সেই অনলাইন জগৎটাই যেন হয়ে উঠল তার আরেকটা শিক্ষক-কক্ষ। স্কুলের টিফিন টাইমে সহকর্মীদের সঙ্গে বসে যেমন কথা হয়, তেমনি রাতে মোবাইল স্ক্রিনে আলো জ্বেলে তিনি ঢুকে পড়তেন সেই ডিজিটাল পাঠশালায়। একদিন খুলনার এক শিক্ষকের পোস্টে দেখলেন, কীভাবে তারা “ভুল থেকে শেখা” নামের বোর্ড চালু করেছেন। ছাত্ররা নাম না লিখে ভুল টাঙিয়ে দেয়, আর সবাই মিলে তা নিয়ে আলোচনা করে। মোবারক স্যার সঙ্গে সঙ্গে ভাবলেন—এটা তো আমার ক্লাসেও করা যায়।
পরের সপ্তাহে নিজের স্কুলে চালু করলেন সেই ধারণা। ক্লাসের দেয়ালে টাঙালেন একটি বোর্ড, লিখলেন—“ভুল থেকে শেখা।” প্রথমে ছাত্ররা ভয় পেলেও তিনি বোঝালেন—এখানে কাউকে বকা দেওয়া হবে না। ধীরে ধীরে বোর্ডে কাগজ জমতে লাগল। ক্লাসের পরিবেশ বদলাতে লাগল। কয়েক সপ্তাহ পর আবার সেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ফিরে গিয়ে তিনি নতুন একটি লেখা দিলেন—“ভুল থেকে শেখা: আমার শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতা।” সেখানে লিখলেন কীভাবে অন্য শিক্ষকের আইডিয়া দেখে তিনি সেটি প্রয়োগ করেছেন, আর কীভাবে তার ছাত্ররা আগের চেয়ে বেশি প্রশ্ন করতে শুরু করেছে।
এই লেখার প্রতিক্রিয়া আরও বেশি এলো। কেউ লিখল, “আমি আগামী সপ্তাহেই চেষ্টা করব।” কেউ প্রশ্ন করল, “আপনি কীভাবে শুরুতে ভয়টা কাটালেন?” মোবারক স্যার উত্তর দিলেন যত্ন করে। তার লেখাটা যেন আর শুধু তার নিজের থাকল না—তা হয়ে উঠল সবার।
একদিন জেলা পর্যায়ের এক প্রশিক্ষণে তিনি অংশ নিলেন। সেখানে পরিচয় হলো অন্য স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে। কথা বলতে গিয়ে বুঝলেন, অনেকেই তাকে চেনে তার অনলাইন লেখার মাধ্যমে। একজন বলল, “স্যার, আপনার ‘ভুল থেকে শেখা’ পোস্টটা পড়ে আমি আমার স্কুলে চালু করেছি।” মোবারক স্যারের বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত এক উষ্ণতা—তার ছোট উদ্যোগ কোথাও গিয়ে বড় পরিবর্তনের বীজ বুনেছে।
তিনি উপলব্ধি করলেন, এই প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পারস্পরিকতা। এখানে কেউ বড় শিক্ষক, কেউ ছোট শিক্ষক নয়—সবাই শেখার পথে সহযাত্রী। কেউ নতুন প্রযুক্তি জানে, কেউ জানে কীভাবে সীমিত উপকরণে পড়ানো যায়। এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।
বছর ঘুরতেই তার নিজের ক্লাসে শিক্ষার্থীদের ফলাফল উন্নত হলো। কিন্তু তার চেয়েও বড় অর্জন—ছাত্রদের চোখে শেখার আনন্দ ফিরে এসেছে। আর তিনি নিজেও আর ক্লান্ত বোধ করেন না। প্রতিদিন নতুন কোনো লেখা পড়েন, নতুন কিছু চেষ্টা করেন, আবার নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
এক বিকেলে স্কুল ছুটির পর ফাঁকা ক্লাসরুমে বসে তিনি জানালার বাইরে তাকালেন। সূর্য ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। হাতে ধরা মোবাইলে আবার ভেসে উঠল নতুন নোটিফিকেশন—কোনো এক শিক্ষক তার পোস্টে মন্তব্য করেছেন, ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মোবারক স্যার মৃদু হাসলেন। মনে হলো, এই ছোট্ট স্ক্রিনের ভেতর দিয়েই ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য শ্রেণিকক্ষের আলো।
তিনি বুঝলেন, শিক্ষা এখন আর চার দেয়ালের ভেতর বন্দী নয়। শিক্ষকরা যখন একে-অপরের পাশে দাঁড়ান, নিজেদের ভুল–সফলতা ভাগাভাগি করেন, তখনই তৈরি হয় সত্যিকারের ডিজিটাল পাঠশালা—যেখানে শেখা থামে না, বরং প্রতিদিন নতুন করে শুরু হয়।1 Comment
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


শিক্ষার আলো যখন চার দেয়াল ভাঙে, তখনই সমাজ সত্যের পথে হাঁটে। মোবারক স্যাররা সেই পথের আলোকবর্তিকা।