<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?>
<rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>তুলট | Israt Jahan Iqra | Activity</title>
	<link>https://toulot.com/n_members/isratjahaniqra/activity/</link>
	<atom:link href="https://toulot.com/n_members/isratjahaniqra/activity/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<description>Activity feed for Israt Jahan Iqra.</description>
	<lastBuildDate>Thu, 05 Nov 2026 22:38:26 +0600</lastBuildDate>
	<generator>https://buddypress.org/?v=</generator>
	<language>en-US</language>
	<ttl>30</ttl>
	<sy:updatePeriod>hourly</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>2</sy:updateFrequency>
	
						<item>
				<guid isPermaLink="false">38c759009c9563a4247052b0f43068f6</guid>
				<title>কবরের নীরবতা

সন্ধ্যার শেষ আলোটুকু তখন পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছিল।

পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে গেছে। চারদিকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে রাতের অন্ধকার। গ্রামের পুরোনো কবরস্থানটির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকজন তরুণ। তাদের হাসি, ঠাট্টা আর বেপরোয়া কথাবার্তায় কবরস্থানের নীরবতা বারবার ভেঙে যাচ্ছিল।

একজন কবরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

—“এখানে যারা শুয়ে আছে, তাদের জীবন তো শেষ! এখন আর কী করার আছে? আমরা তো এখনো বেঁচে আছি। জীবনটা উপভোগ করা উচিত!”

আরেকজন বলল,

—“ঠিক বলেছিস! মৃত্যু নিয়ে এত চিন্তা করার কী আছে? যখন মরব, তখন দেখা যাবে!”

তৃতীয়জন কবরের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

—“মানুষ মরে গেলে সব শেষ। তাই যতদিন বেঁচে আছি, নিজের মতো করে জীবন কাটাই!”

তারা হাসতে লাগল।

কেউ ভাবল না—এই কবরগুলোর ভেতরে একসময় এমন মানুষও শুয়ে আছে, যারা হয়তো মৃত্যুর আগে বলেছিল, “আমার সামনে অনেক সময় আছে।”

কেউ ভাবল না—এই মাটির নিচে এমন মানুষও আছে, যারা একদিন নিজেদের জীবনের প্রতিটি অবহেলার কথা মনে করে আফসোস করবে।

কেউ ভাবল না—একদিন তাদেরও নাম ধরে জানাজা পড়ানো হবে। তাদের পরিচিত মানুষগুলো কাঁধে করে নিয়ে আসবে। তারপর তাদেরও এই মাটির নিচে রেখে ফিরে যাবে।

হঠাৎ—

একটি ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল।

তরুণদের হাসি থেমে গেল।

কবরস্থানের ভেতর থেকে একটি অস্পষ্ট কণ্ঠ ভেসে এল।

—“হায়… যদি আরেকবার ফিরে যেতে পারতাম!”

তরুণেরা চমকে উঠল।

একজন বলল,

—“কে কথা বলল?”

কেউ উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণ পর সেই কণ্ঠ আবার শোনা গেল।

—“যদি আরেকবার সুযোগ পেতাম… যদি আমার জীবনটা আরেকবার শুরু করতে পারতাম…”

তাদের বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।

একজন ভয়ে বলল,

—“চল, এখান থেকে চলে যাই!”

কিন্তু ঠিক তখনই কবরস্থানের ভেতর থেকে আরও একটি কণ্ঠ শোনা গেল।

—“তুমি এখন ফিরে যেতে চাও? যখন দুনিয়ায় ছিলে, তখন কি এই দিনের কথা মনে রেখেছিলে?”

প্রথম কণ্ঠটি কেঁদে উঠল।

—“না… আমি মনে রাখিনি। আমি ভেবেছিলাম, আমার সামনে অনেক সময় আছে। আমি ভেবেছিলাম, পরে তওবা করব। পরে নামাজ পড়ব। পরে ভালো হয়ে যাব…”

দ্বিতীয় কণ্ঠটি বলল,

—“তুমি তোমার কর্মের ফল ভোগ করছ। তুমি কখনোই ওই দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারবে না!”

প্রথম কণ্ঠটি আকুল হয়ে উঠল।

—“না! আমাকে আরেকবার ফিরতে দাও! আমি আমার ভুলগুলো শুধরে নেব! আমি আমার রবের কাছে ক্ষমা চাইব! আমি আর আগের মতো জীবন কাটাব না!”

কিন্তু সেই কবরের ভেতর থেকে আর কোনো উত্তর এল না।

তরুণেরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারা বুঝতে পারছিল না, কী শুনছে। তাদের হাসি যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গেছে। বুকের ভেতর জমতে শুরু করেছে এক অজানা ভয়।

### প্রথম কবর: নামাজ অবহেলা করা মানুষ

কিছুক্ষণ পর কবরস্থানের এক পাশে থাকা একটি কবরের ভেতর থেকে একজন মানুষের কণ্ঠ ভেসে এল।

কণ্ঠটি ছিল ভাঙা, অনুতাপে ভারী।

—“হায়! আমি আমার জীবনটা কীভাবে কাটিয়েছি! আমার কাছে সময় ছিল। আমার কাছে সুস্থ শরীর ছিল। আমি আজান শুনেছি। আমি জানতাম, আমার রব আমাকে নামাজের জন্য ডাকছেন। কিন্তু আমি কতবার সেই ডাককে অবহেলা করেছি!”

কণ্ঠটি থেমে গেল।

তারপর আবার বলল,

—“আমি বলতাম, এখন কাজ আছে। পরে নামাজ পড়ব। কখনো বলতাম, একটু বিশ্রাম নিয়ে পড়ব। কখনো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতাম। কখনো নিজের ইচ্ছাকে নামাজের চেয়ে বড় করে দেখতাম।”

তরুণদের একজন মাথা নিচু করে ফেলল।

তারও কত নামাজ কাজের অজুহাতে ছুটে গেছে। কতবার আজান শুনেও সে মোবাইল হাতে বসে থেকেছে।

কবরের ভেতর থেকে সেই ব্যক্তি আবার বলল,

—“আমি ভেবেছিলাম, একদিন নিজে থেকেই ভালো হয়ে যাব। একদিন আমার মন বদলে যাবে। কিন্তু সেই দিন আসার আগেই আমার জীবন শেষ হয়ে গেল!”

তার কণ্ঠে ছিল গভীর অনুশোচনা।

—“আমি যদি আরেকবার ফিরে যেতে পারতাম! আমি যদি আবার ফজরের আজান শুনতে পেতাম! আমি যদি আবার সিজদায় মাথা রাখতে পারতাম! আমি যদি আমার রবের কাছে কাঁদতে পারতাম!”

সেই কবরের ভেতর থেকেই দ্বিতীয় কণ্ঠ শোনা গেল।

—“তুমি তোমার কর্মের ফল ভোগ করছ। তুমি কখনোই ওই দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারবে না!”

প্রথম কণ্ঠটি কেঁদে বলল,

—“আমি জানতাম নামাজ আমার জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ। তবুও আমি অবহেলা করেছি। আমি নিজের ইচ্ছাকে বড় করেছি। আজ আমার সেই অবহেলার কথা মনে পড়ছে। কিন্তু এখন আমার আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই!”

কবরস্থানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন তরুণ কাঁপতে কাঁপতে বলল,

—“আমিও তো কত নামাজ ছেড়ে দিয়েছি…”

তার চোখে পানি চলে এল।

সে নিজের মনে বলতে লাগল,

—“আমি এখনো বেঁচে আছি। আমার সামনে এখনো নামাজ পড়ার সুযোগ আছে। আমি কেন সেই সুযোগ নষ্ট করব?”

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

&#062; “নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ।”—সূরা আন-নিসা, ৪:১০৩

আর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

&#062; “মানুষের মধ্যে এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ ত্যাগ করা।”—সহিহ মুসলিম, ৮২

তরুণটি আর হাসছিল না।

তার মনে হচ্ছিল, নামাজের ডাককে অবহেলা করে সে কত বড় ভুল করেছে।

### দ্বিতীয় কবর: মানুষের অধিকার নষ্ট করা ব্যক্তি

কবরস্থানের অন্য একটি কবরের ভেতর থেকে আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল।

—“আমি দুনিয়ায় থাকতে মানুষের সঙ্গে অন্যায় করেছি। আমি মানুষের টাকা আটকে রেখেছি। আমি মিথ্যা বলে অন্যের অধিকার নিয়েছি। আমি ভাবতাম, কেউ জানে না। কেউ আমার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না।”

কণ্ঠটি থেমে গেল।

তারপর বলল,

—“আমি মানুষের কষ্টকে ছোট মনে করতাম। কেউ আমার কাছে তার পাওনা চাইলে আমি বিরক্ত হতাম। কেউ তার অধিকার চাইলে আমি তাকে এড়িয়ে যেতাম। আমি ভাবতাম, পরে দিয়ে দেব। কিন্তু সেই পরে আর আসেনি।”

সেই কবরের ভেতর থেকেই দ্বিতীয় কণ্ঠ বলল,

—“তুমি তোমার কর্মের ফল ভোগ করছ। তুমি কখনোই ওই দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারবে না!”

প্রথম কণ্ঠটি আকুল হয়ে বলল,

—“আমি যদি ফিরে যেতে পারতাম! আমি যদি তাদের টাকা ফিরিয়ে দিতে পারতাম! আমি যদি তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে পারতাম! আমি যদি তাদের কষ্টের প্রতিকার করতে পারতাম!”

কণ্ঠটি যেন ভেঙে পড়ল।

—“আমি ভেবেছিলাম, আমার সম্পদ আমারই। আমি ভুলে গিয়েছিলাম, মানুষের অধিকার নষ্ট করে নিজের শান্তি পাওয়া যায় না। আমি যদি তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতাম, যদি তাদের কাছে ক্ষমা চাইতাম, যদি অন্যায়ের বদলে ন্যায় করতাম…”

দ্বিতীয় কণ্ঠটি আবার বলল,

—“তুমি তোমার কর্মের ফল ভোগ করছ। তুমি কখনোই ওই দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারবে না!”

তরুণদের একজন নিজের হাতের দিকে তাকাল।

তার মনে পড়ল, সে এক বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিল। ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও সে নানা অজুহাতে সময় পার করেছে।

সে কাঁপা গলায় বলল,

—“আমি তো এখনো তার টাকা ফেরত দিতে পারি…”

তার বন্ধু বলল,

—“তাহলে চল, আমরা সেই ভুলটা এখনই ঠিক করি।”

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

&#062; “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার হকদারদের কাছে ফিরিয়ে দিতে।”—সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮

আর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যার কাছে অন্যের ওপর কোনো জুলুমের দায় রয়েছে, সে যেন দুনিয়াতেই তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়—কারণ আখিরাতে টাকা-পয়সা দিয়ে সেই অধিকার মেটানো যাবে না; সৎকর্ম ও পাপের হিসাব হবে।

—সহিহ বুখারি, ২৪৪৯

তরুণটি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,

—“আমি আর কারও অধিকার নষ্ট করব না। কারও টাকা আটকে রাখব না। কারও সঙ্গে অন্যায় করলে তার প্রতিকার করব।”

### তৃতীয় কবর: মিথ্যা ও প্রতারণার জীবন

কিছুক্ষণ নীরবতার পর আরেকটি কবরের ভেতর থেকে এক ব্যক্তির কণ্ঠ শোনা গেল।

—“আমি দুনিয়ায় থাকতে মিথ্যা বলেছি। আমি মানুষকে প্রতারণা করেছি। নিজের লাভের জন্য অন্যের বিশ্বাস ভেঙেছি। আমি এমনভাবে কথা বলতাম, যেন সবাই আমাকে ভালো মানুষ মনে করে। কিন্তু আমার অন্তরে ছিল অন্য উদ্দেশ্য।”

কণ্ঠটি ভারী হয়ে উঠল।

—“আমি ব্যবসায় মিথ্যা বলেছি। আমি নিজের ভুল ঢাকতে মিথ্যা বলেছি। আমি অন্যের সামনে নিজেকে ভালো দেখাতে মিথ্যা বলেছি। আমি ভাবতাম, মিথ্যা বলে লাভবান হওয়া যায়। আমি বুঝিনি, মিথ্যা আমার জীবনকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।”

সেই কবরের ভেতর থেকে দ্বিতীয় কণ্ঠ বলল,

—“তুমি তোমার কর্মের ফল ভোগ করছ। তুমি কখনোই ওই দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারবে না!”

প্রথম কণ্ঠটি কেঁদে উঠল।

—“আমি যদি আরেকবার ফিরে যেতে পারতাম! আমি যদি সত্য কথা বলার সুযোগ পেতাম! আমি যদি যাদের প্রতারণা করেছি, তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে পারতাম! আমি যদি আমার ভুলগুলো ঠিক করতে পারতাম!”

দ্বিতীয় কণ্ঠটি বলল,

—“তুমি দুনিয়ায় থাকতে সত্যকে অবহেলা করেছ। তুমি মানুষের বিশ্বাসকে নিজের লাভের জন্য ব্যবহার করেছ।”

প্রথম কণ্ঠটি বলল,

—“আমি বুঝিনি, বিশ্বাস ভেঙে দেওয়া কত বড় অন্যায়। আমি বুঝিনি, মানুষের কাছে ভালো মানুষ বলে পরিচিত হওয়ার চেয়ে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হওয়া কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ!”

একজন তরুণ নিজের জীবনের কথা ভাবল।

কতবার সে নিজের ভুল ঢাকতে মিথ্যা বলেছে। কতবার অন্যকে দোষ দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়েছে।

সে বলল,

—“আমি আর মিথ্যা বলে নিজের ভুল ঢাকব না। আমি সত্য বলব, যদিও সেটা আমার জন্য কঠিন হয়।”

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

&#062; “সত্যবাদিতা নেকির দিকে নিয়ে যায়, আর নেকি জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।”—সহিহ বুখারি, ৬০৯৪; সহিহ মুসলিম, ২৬০৭

### চতুর্থ কবর: গিবত ও মানুষের সম্মান নষ্ট করা

একটি কবরের ভেতর থেকে একজন মানুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

—“আমি মানুষের অনুপস্থিতিতে তাদের নিয়ে কথা বলতাম। আমি তাদের দোষ অন্যের কাছে বলতাম। আমি ভাবতাম, এটা তো শুধু কথার বিষয়। এতে এমন কী ক্ষতি হবে?”

কণ্ঠটি থেমে গেল।

তারপর বলল,

—“আমি বুঝিনি, আমার কথায় মানুষের সম্মান নষ্ট হচ্ছে। আমি বুঝিনি, আমার জিহ্বা দিয়ে অন্যের হৃদয়ে কত কষ্ট পৌঁছে দিচ্ছি। আমি নিজের ভুলের দিকে তাকাইনি। অন্যের ভুল নিয়ে আলোচনা করতেই বেশি আনন্দ পেয়েছি।”

সেই কবরের ভেতর থেকেই দ্বিতীয় কণ্ঠ বলল,

—“তুমি তোমার কর্মের ফল ভোগ করছ। তুমি কখনোই ওই দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারবে না!”

প্রথম কণ্ঠটি কেঁদে বলল,

—“আমি যদি ফিরে যেতে পারতাম! আমি যদি যাদের নিয়ে গিবত করেছি, তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে পারতাম! আমি যদি আমার জিহ্বাকে সংযত করতে পারতাম!”

তার কণ্ঠে ছিল গভীর অনুশোচনা।

—“আমি কত সহজে বলেছি, ‘আমি তো শুধু সত্য কথাই বলেছি।’ কিন্তু আমি কি ভেবেছিলাম, সেই সত্য কথাটি অন্যের অনুপস্থিতিতে বলা তার সম্মান নষ্ট করছে? আমি কি ভেবেছিলাম, আমার কথারও হিসাব দিতে হবে?”

তরুণদের একজন চোখের পানি মুছল।

তার মনে পড়ল, কতবার সে বন্ধুদের সঙ্গে বসে অন্যের দোষ নিয়ে হাসাহাসি করেছে। কতবার কারও ব্যক্তিগত বিষয় অন্যের কাছে বলেছে।

সে বলল,

—“আমরা তো কথাকে খুব ছোট মনে করি। কিন্তু কথাও যে মানুষের আমল, তা ভুলে যাই।”

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

&#062; “তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করবে।”—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২

এই আয়াতের কথা মনে করে তরুণদের একজনের বুক কেঁপে উঠল।

সে নিজের মনে বলল,

—“আমি আর কারও সম্মান নষ্ট করব না। কারও দোষ নিয়ে হাসাহাসি করব না। আমার জিহ্বাকে সংযত রাখব।”

### পঞ্চম কবর: বাবা-মায়ের অবাধ্য সন্তান

কবরস্থানের নির্জন অংশ থেকে একটি ভাঙা কণ্ঠ ভেসে এল।

—“আমি আমার বাবা-মায়ের কথা শুনিনি। তারা আমাকে ভালো হতে বলেছিল। তারা আমাকে নামাজ পড়তে বলেছিল। তারা আমাকে মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে বলেছিল। কিন্তু আমি তাদের কথা শুনে বিরক্ত হতাম।”

কণ্ঠটি থেমে গেল।

তারপর বলল,

—“আমি মনে করতাম, তারা শুধু আমাকে বাধা দিচ্ছে। আমি তাদের উপদেশকে গুরুত্ব দিইনি। আমি তাদের কষ্ট বুঝিনি। আমি তাদের সঙ্গে কঠিন কথা বলেছি। আমি তাদের মনে কষ্ট দিয়েছি।”

সেই কবরের ভেতর থেকেই দ্বিতীয় কণ্ঠ বলল,

—“তুমি তোমার কর্মের ফল ভোগ করছ। তুমি কখনোই ওই দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারবে না!”

প্রথম কণ্ঠটি কেঁদে বলল,

—“আমি যদি আরেকবার ফিরে যেতে পারতাম! আমি যদি আমার মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে পারতাম! আমি যদি আমার বাবার মুখে হাসি ফিরিয়ে দিতে পারতাম! আমি যদি তাদের সেবা করতে পারতাম!”

কণ্ঠটি যেন আরও দুর্বল হয়ে পড়ল।

—“আমি কতবার তাদের ডাকে বিরক্ত হয়েছি। কতবার তাদের কথা শুনে রাগ করেছি। আজ তাদের কথা মনে পড়ছে। কিন্তু আমি আর তাদের কাছে ফিরে যেতে পারব না!”

একজন তরুণের চোখে পানি চলে এল।

তার মনে পড়ল, মা কতবার তাকে নামাজের জন্য ডাকেন। বাবা কতবার তাকে ভালো পথে চলতে বলেন।

সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“আমার মা-বাবা তো এখনো বেঁচে আছেন। আমি কি এখনো তাদের কাছে ভালো হতে পারি?”

তার বন্ধু বলল,

—“পারিস। এখনো পারিস। চল, আমরা তাদের কাছে ফিরে যাই। তাদের কথা শুনি। তাদের কষ্ট না দিই।”

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

&#062; “তোমার রব আদেশ দিয়েছেন, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।”—সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৩

তরুণটি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,

—“আমি আর আমার বাবা-মায়ের মনে কষ্ট দেব না। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব। তাদের জন্য দোয়া করব। তাদের সেবা করব।”

### ষষ্ঠ কবর: অহংকারে ডুবে থাকা মানুষ

একটি কবরের ভেতর থেকে এক ব্যক্তির কণ্ঠ শোনা গেল।

—“আমি দুনিয়ায় থাকতে নিজের সম্পদ নিয়ে গর্ব করতাম। আমি আমার পোশাক নিয়ে গর্ব করতাম। আমি আমার পরিচিতি নিয়ে গর্ব করতাম। আমি মনে করতাম, অন্যদের চেয়ে আমি বড়।”

কণ্ঠটি ভারী হয়ে উঠল।

—“আমি গরিব মানুষকে অবহেলা করেছি। আমি দুর্বল মানুষকে ছোট করেছি। আমি অন্যের কথা শুনতে চাইতাম না। আমি মনে করতাম, আমার সম্পদ আমাকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ করে তুলেছে।”

সেই কবরের ভেতর থেকে দ্বিতীয় কণ্ঠ বলল,

—“তুমি তোমার কর্মের ফল ভোগ করছ। তুমি কখনোই ওই দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারবে না!”

প্রথম কণ্ঠটি কেঁদে বলল,

—“আমি যদি ফিরে যেতে পারতাম! আমি যদি মানুষের সঙ্গে বিনয়ী হতে পারতাম! আমি যদি গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারতাম! আমি যদি আমার সম্পদ দিয়ে অসহায়দের সাহায্য করতে পারতাম!”

তারপর সে বলল,

—“আমি ভুলে গিয়েছিলাম, আমার সম্পদ আমার সঙ্গে যাবে না। আমার পোশাক আমার সঙ্গে যাবে না। আমার পরিচিতি আমার সঙ্গে যাবে না। আমি শুধু আমার আমল নিয়ে এসেছি।”

তরুণদের একজন নিজের পোশাকের দিকে তাকাল।

সে ভাবল,

—“আমি কতবার নিজের বাহ্যিক বিষয় নিয়ে গর্ব করেছি। কতবার অন্যকে ছোট মনে করেছি। অথচ আমারও একদিন এই মাটির নিচে আসতে হবে।”

### সপ্তম কবর: দুনিয়ার মোহে জীবন কাটানো মানুষ

কবরস্থানের ভেতর থেকে আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল।

—“আমি দুনিয়ার পেছনে ছুটেছি। আমি ভেবেছিলাম, আরও সম্পদ হলে সুখী হব। আরও পরিচিতি হলে সুখী হব। আরও আনন্দ পেলে সুখী হব। আমি আমার জীবনকে শুধু দুনিয়ার বিষয়গুলো দিয়ে পূর্ণ করেছি।”

কণ্ঠটি থেমে গেল।

তারপর বলল,

—“আমি আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য সময় রাখিনি। আমি কুরআন পড়ার জন্য সময় রাখিনি। আমি মানুষের উপকার করার জন্য সময় রাখিনি। আমি ভাবতাম, এসব পরে করব।”

সেই কবরের ভেতর থেকেই দ্বিতীয় কণ্ঠ বলল,

—“তুমি তোমার কর্মের ফল ভোগ করছ। তুমি কখনোই ওই দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারবে না!”

প্রথম কণ্ঠটি আকুল হয়ে বলল,

—“আমি যদি আরেকবার ফিরে যেতে পারতাম! আমি যদি আমার সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারতাম! আমি যদি আমার জীবনের কিছু অংশ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করতে পারতাম!”

তারপর সে বলল,

—“আমি ভেবেছিলাম, দুনিয়ার জীবন অনেক দীর্ঘ। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, সময় কত দ্রুত চলে যায়। কত দিন, কত রাত, কত বছর আমার হাত থেকে চলে গেছে। আমি বুঝতেই পারিনি, আমার জীবন শেষ হয়ে আসছে!”

তরুণদের একজন বলল,

—“আমরা তো প্রতিদিন সময় নষ্ট করি। ভাবি, পরে ভালো হব। পরে নামাজ পড়ব। পরে কুরআন পড়ব। পরে তওবা করব।”

আরেকজন বলল,

—“কিন্তু সেই পরে যদি আর না আসে?”

তারা নীরব হয়ে গেল।

### জীবিতদের সামনে মৃত্যুর সত্য

এবার কবরস্থানের চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।

তরুণেরা আর কোনো হাসি-ঠাট্টা করছিল না। তারা যেন নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেছিল।

একজন ধীরে ধীরে বলল,

—“আমরা এতক্ষণ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে নিয়ে হাসছিলাম। অথচ আমরা জানি না, আমাদের মৃত্যু কখন আসবে।”

আরেকজন বলল,

—“আমরা ভাবছিলাম, জীবন অনেক বড়। কিন্তু আমাদের হাতে কতটা সময় আছে, তা তো আমরা জানি না।”

তৃতীয়জন কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“আমি কত ভুল করেছি! কত নামাজ অবহেলা করেছি! কতবার মানুষের সঙ্গে অন্যায় করেছি! কতবার আল্লাহর কথা ভুলে গেছি!”

তার বন্ধু বলল,

—“কিন্তু আমরা এখনো বেঁচে আছি। এখনো তওবা করার সুযোগ আছে। এখনো আমাদের জীবন বদলানোর সুযোগ আছে।”

তাদের একজন কুরআনের একটি আয়াত মনে করল।

সে ধীরে ধীরে বলল,

&#062; “অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, ‘হে আমার রব! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি ছেড়ে এসেছি।’ কখনোই নয়! এটা তো তার একটি কথামাত্র। আর তাদের সামনে রয়েছে বারযাখ, পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত।”—সূরা আল-মুমিনূন, ২৩:৯৯–১০০

তরুণেরা একে অপরের দিকে তাকাল।

তারা বুঝতে পারল—মৃত মানুষ ফিরে যেতে চাইবে, কিন্তু জীবিত মানুষ এখনো ফিরে যাওয়ার আগেই নিজের জীবন বদলাতে পারে।

### আল্লাহর রহমতের দরজা

একজন তরুণ কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“আমরা এত পাপ করেছি। আল্লাহ কি আমাদের ক্ষমা করবেন?”

তার বন্ধু বলল,

—“আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন—”

&#062; “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন।”—সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩

তরুণটি কেঁদে বলল,

—“তাহলে আমাদের এখনই তওবা করতে হবে। শুধু ভয় পেলে হবে না। আমাদের সত্যিই জীবন বদলাতে হবে।”

আরেকজন বলল,

—“আমরা নামাজ পড়ব। মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেব। বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব। মিথ্যা বলব না। গিবত করব না। আমাদের ভুলগুলো শুধরে নেব।”

তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

সেই রাতে তারা আর আগের মতো ছিল না।

### শেষ উপলব্ধি

ধীরে ধীরে তারা কবরস্থান থেকে বেরিয়ে এল।

পেছনে রয়ে গেল সারি সারি কবর।

তারা জানত না, সেই কবরগুলোর ভেতরে কী ঘটছে। তারা জানত না, কোন মানুষ কী অবস্থায় আছে। কিন্তু তারা বুঝতে পেরেছিল—মৃত্যু সত্য, আর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান।

একজন তরুণ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমাদের জানাজায়ও একদিন মানুষ আসবে। কেউ কাঁদবে। কেউ আমাদের ভালো কথা বলবে। তারপর সবাই চলে যাবে। কিন্তু আমাদের জীবনটা তখন আর বদলানো যাবে না।”

আরেকজন বলল,

—“আমরা যেন সেই মানুষ না হই, যারা মৃত্যুর পরে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানায়। আমরা যেন বেঁচে থাকতেই আল্লাহর কাছে ফিরে আসি।”

তৃতীয়জন বলল,

—“আমরা যেন শুধু কবরের ভয় নিয়ে না থাকি। আমরা যেন সেই ভয় থেকে ভালো কাজের দিকে এগিয়ে যাই। আমরা যেন আল্লাহর রহমতের আশা নিয়ে তওবা করি।”

তারা বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।

সেই রাত তাদের মনে এক গভীর প্রশ্ন রেখে গেল—

“আমি যদি আজই চলে যাই, তাহলে আমার জীবনের কোন কাজটির জন্য সবচেয়ে বেশি আফসোস করব?”

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই মানুষ যেন নিজের ভুলগুলো শুধরে নেয়।

নামাজের ডাক শুনে যেন আর অবহেলা না করে।

মানুষের অধিকার নষ্ট করে যেন নিজের জীবনকে কলঙ্কিত না করে।

মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে যেন নিজেকে দূরে রাখে।

বাবা-মায়ের সঙ্গে যেন ভালো ব্যবহার করে।

দুনিয়ার মোহে যেন নিজের আখিরাত ভুলে না যায়।

কারণ, একদিন এমন সময় আসবে, যখন মানুষ ফিরে যেতে চাইবে—কিন্তু আর ফিরে যেতে পারবে না।

তখন তার মুখে হয়তো থাকবে শুধু একটি আকুতি—

“হায়! যদি আরেকবার ফিরে যেতে পারতাম!”

কিন্তু সেই আকুতির আগেই, বেঁচে থাকতে, আমাদের ফিরে আসতে হবে আমাদের রবের দিকে।

আন্তরিক তওবা নিয়ে।

ভালো কাজের সংকল্প নিয়ে।

আল্লাহর রহমতের আশা নিয়ে।

কারণ, মৃত্যুর পরে ফিরে আসার আকুতি করার চেয়ে—বেঁচে থাকতেই ফিরে আসা অনেক বড় সৌভাগ্য।
No</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/287821/</link>
				<pubDate>Sun, 01 Nov 2026 17:59:50 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> কবরের নীরবতা</p>
<p>সন্ধ্যার শেষ আলোটুকু তখন পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছিল।</p>
<p>পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে গেছে। চারদিকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে রাতের অন্ধকার। গ্রামের পুরোনো কবরস্থানটির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকজন তরুণ। তাদের হাসি, ঠাট্টা আর বেপরোয়া কথাবার্তায় কবরস্থানের নীরবতা বারবার ভেঙে যাচ্ছিল।</p>
<p>একজন কবরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,</p>
<p>—“&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-287821"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/287821/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">fa1e766481c4f066d72470ce7170563a</guid>
				<title>নিরাপত্তা কোথায়—প্রশ্নের শেষ কোথায়?

একজন মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার পর ঠিক কতগুলো বিপদের সঙ্গে চুক্তি করে যে সে সন্ধ্যায় জীবিত ফিরে আসবে?

রাস্তায় বের হলে দুর্ঘটনা হবে না—এর নিশ্চয়তা কে দেয়?

অপরাধীর সামনে পড়বে না—এর নিশ্চয়তা কোথায়?

অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তার পরিচয়ই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে না—এর নিশ্চয়তা কে দেবে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

আইনের কাছে গেলে আইনই তার পাশে থাকবে, সেই নিশ্চয়তা কি সত্যিই আছে?

নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের জীবনের ন্যূনতম নিশ্চয়তা—রাস্তায় বের হলে ফিরে আসার নিশ্চয়তা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে ভয় না পাওয়ার নিশ্চয়তা, বিচার চাইলে সত্য হারিয়ে না যাওয়ার নিশ্চয়তা, আর ভোট দিতে গেলে নিজের ভোটটি নিজেরই থাকার নিশ্চয়তা।

কিন্তু আজ নিরাপত্তার প্রশ্নটি কি শুধু অপরাধের প্রশ্ন?

নাকি রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, আইন, রাজনীতি, অর্থনীতি—সবকিছুর ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এই অনিশ্চয়তা?

একজন মানুষ সকালে ঘর থেকে বের হন।

কেউ অফিসে যান, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কেউ হাসপাতালে, কেউ বাজারে।

গন্তব্য আলাদা।

কিন্তু প্রত্যাশা একটাই—

ফিরে আসা।

সেই ফিরে আসাটুকুও যদি অনিশ্চিত হয়, তাহলে উন্নয়ন, আধুনিকতা আর নগরায়ণের হিসাব কতটা পূর্ণ?

একটি মানুষ রাস্তা দিয়ে হাঁটছে।

তার সামনে গাড়ি, বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল।

সে কি জানে, কোন মুহূর্তে একটি ভুল তার জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে?

২০২৬ সালের জুন মাসে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে দেশে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত এবং ৫৬১ জন আহত হয়েছেন।

প্রশ্ন হলো—

একটি দুর্ঘটনার পর শুধু মৃতের সংখ্যা গোনা হয় কেন?

কতগুলো দুর্ঘটনার আগে সতর্কতা ছিল?

কতগুলো রাস্তা আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল?

কতগুলো যানবাহন নিয়ম ভেঙে চলছিল?

কতগুলো অভিযোগ আগে থেকেই জমা ছিল?

আর কতগুলো মৃত্যুর পর আবারও বলা হয়েছে—

“ব্যবস্থা নেওয়া হবে”?

কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি একই জায়গায়, একই কারণে, একইভাবে মানুষ মারা যায়—

তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

রাস্তার নকশায়?

আইনের প্রয়োগে?

নাকি এমন এক ব্যবস্থায়, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়, কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটার আগের সতর্কতাগুলো হারিয়ে যায়?

একজন নারী রাতে বাড়ি ফিরছেন।

তার কি শুধু অন্ধকারকে ভয় পাওয়ার কথা?

নাকি সেই সমাজকেও ভয় পাওয়ার কথা, যেখানে একজন মানুষের স্বাধীন চলাফেরার অধিকারটুকুও কখনো কখনো নিরাপত্তার প্রশ্নে আটকে যায়?

নারী ও কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা আমাদের সামনে আসে।

তাহলে প্রশ্নটা কি শুধু—

অপরাধী কে?

নাকি আরও আগে প্রশ্ন করা দরকার—

একজন নারীকে কেন নিজের পোশাক, সময়, পথ, সঙ্গী, ফোনকল—সবকিছুর হিসাব করে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করতে হবে?

একটি শিশুকে কেন ছোটবেলা থেকেই শেখানো হবে—

“সাবধানে থেকো”?

কিন্তু তাকে কি কখনো শেখানো হবে না—

“অন্যায় করলে তুমি শাস্তি পাবে”?

নিরাপত্তার দায়িত্ব কি শুধু সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর?

নাকি সম্ভাব্য অপরাধীরও?

আর যদি সমাজ বারবার ভুক্তভোগীকেই সাবধান হতে শেখায়—

তাহলে অপরাধীর জন্য আমাদের শিক্ষা কোথায়?

ডিজিটাল জগতেও কি মানুষ নিরাপদ?

একটি অচেনা লিংক।

একটি ভুয়া ওয়েবসাইট।

একটি চাকরির বিজ্ঞাপন।

একটি ফোনকল।

একটি OTP।

একটি পরিচয়পত্রের ছবি।

একটি ভুল ক্লিক।

কত সহজে একজন মানুষের পরিচয়, টাকা, ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা অন্য কারও হাতে চলে যেতে পারে?

যে প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে—

সেই প্রযুক্তিই যদি প্রতারণার নতুন দরজা খুলে দেয়, তাহলে নিরাপত্তা কোথায়?

আর প্রতারণার শিকার হলে মানুষ কোথায় যাবে?

যে প্রতিষ্ঠান থেকে সাহায্য পাওয়ার কথা, সেখানেই যদি অভিযোগ জানাতে ভয় লাগে—

তাহলে প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, মানুষ কি সত্যিই নিরাপদ?

আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি কি এখানে—

অপরাধ কি সবসময় একা একজন মানুষের কাজ?

নাকি কখনো কখনো তার পেছনে থাকে অর্থ, যোগাযোগ, প্রভাব কিংবা সংগঠিত কোনো নেটওয়ার্ক?

কোনো অপরাধে কোনো এমপি, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পুলিশ সদস্যের নাম অভিযোগ হিসেবে এলে—

সেই অভিযোগকে কি শুধু পরিচয়ের কারণে সত্য ধরে নেওয়া যায়?

অবশ্যই নয়।

অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।

সত্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়া।

কিন্তু তখনই তো আরও বড় প্রশ্ন সামনে আসে—

অভিযোগ যদি ক্ষমতাবান কারও বিরুদ্ধে হয়, তদন্ত কতটা স্বাধীন থাকবে?

অভিযোগ যদি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হয়, তদন্ত করবে কে?

একটি প্রতিষ্ঠান কি নিজেরই একজন সদস্যের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে?

আর যদি কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম তদন্তে আসে—

তখন তদন্তকারীর ওপর কোনো অদৃশ্য চাপ কাজ করে কি না, সেটি যাচাই করবে কে?

প্রতিটি অপরাধের পেছনে ক্ষমতাবান কেউ থাকে—এমন দাবি করার কোনো ভিত্তি নেই।

কিন্তু কোনো অপরাধের পেছনে যদি সত্যিই ক্ষমতা, অর্থ বা প্রভাবের ছায়া থাকে—

তাহলে তদন্ত কি শুধু অপরাধীকে খুঁজবে?

নাকি খুঁজবে সেই অর্থের উৎস?

সেই যোগাযোগের পথ?

সেই আশ্রয়?

সেই প্রভাব?

সেই মানুষগুলোকে, যারা সামনে না থেকেও পেছন থেকে পুরো ঘটনাটিকে চালিয়ে যেতে পারে?

কারণ একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা আর একটি অপরাধের পুরো কাঠামোকে ভেঙে দেওয়া—

দুটো কি একই বিষয়?

একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলো।

কখনো দুর্ঘটনায়।

কখনো অনিয়মে।

কখনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতায়।

কখনো কোনো অভিযোগের পর।

কখনো কোনো আন্দোলনের চাপে।

তদন্ত কমিটি কি শুধু একটি প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য?

নাকি তার কাজ সত্য বের করা?

দায় নির্ধারণ করা?

কারণ খুঁজে বের করা?

ভবিষ্যতে একই ঘটনা যেন না ঘটে, তার পথ দেখানো?

আর প্রতিবেদন তৈরি হওয়ার পর?

সেটি কোথায় যায়?

কে পড়ে?

কী সুপারিশ করা হয়েছিল?

কতগুলো সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়?

আর কতগুলো সুপারিশ ফাইলের ভাঁজে হারিয়ে যায়?

একটি তদন্ত প্রতিবেদন যদি প্রকাশ না হয়—

মানুষ জানবে কীভাবে কী পাওয়া গেছে?

একটি সুপারিশ যদি বাস্তবায়িত না হয়—

তদন্তের অর্থ কী?

একজন সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে যে আইন তার ওপর প্রয়োগ হয়—

ক্ষমতাবান কেউ অভিযুক্ত হলে সেই একই মানদণ্ড কি থাকে?

আর যদি কোনো তদন্তে সত্যিই কোনো এমপি, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়—

তখন কি পরিচয়টি তদন্তের গতি বদলে দিতে পারে?

আর যদি প্রমাণ না পাওয়া যায়—

তাহলে কি সেই ব্যক্তিকে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী বলা যায়?

না।

তাহলে প্রশ্নটা আরও গভীর—

ক্ষমতাবান হোক বা সাধারণ মানুষ—

আইনের সামনে কি দুজনের জন্য একই দরজা খোলা?

একই তদন্ত?

একই প্রমাণের মানদণ্ড?

একই জবাবদিহি?

দুর্নীতির ক্ষেত্রেও কি নিরাপত্তা হারিয়ে যায় না?

ঘুষ কি শুধু মানুষের টাকা নেয়?

নাকি তার সঙ্গে আরও কিছু নিয়ে যায়?

আস্থা?

সম্মান?

অধিকার?

একজন মানুষ যদি মনে করেন—

“টাকা না দিলে কাজ হবে না”,

তাহলে সে কি শুধু একটি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে?

নাকি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ওপর তার বিশ্বাসটুকুও হারাচ্ছে?

আর যখন অভিযোগ করার জায়গা থাকে, কিন্তু অভিযোগ করেও যদি প্রতিকার না হয়—

তখন মানুষ পরেরবার অভিযোগ করবে কেন?

ভয় কি তখন দুর্নীতির সবচেয়ে বড় সহকারী হয়ে ওঠে না?

মাদক কি শুধু একটি প্যাকেট?

নাকি তার পেছনে থাকে একটি দীর্ঘ পথ?

যে মানুষটি সীমান্ত পেরিয়ে পণ্য বহন করে—

সে কি পুরো চক্রের মূল ব্যক্তি?

নাকি তার পেছনে থাকে অর্থদাতা, সংগঠক, পরিবেশক এবং আরও বড় কোনো নেটওয়ার্ক?

শুধু বাহক ধরা পড়লে কি ব্যবসা বন্ধ হয়?

নাকি পরের দিন আরেকজন বাহক এসে সেই জায়গা পূরণ করে?

তাহলে প্রশ্ন—

আমরা কি অপরাধের মানুষটিকে ধরছি?

নাকি অপরাধের ব্যবস্থাটিকেও খুঁজছি?

একজন কিশোর কি এক সকালে ঘুম থেকে উঠে অপরাধী হয়ে যায়?

নাকি তার আগে অনেকগুলো দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়?

পরিবার থেকে দূরত্ব।

শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতা।

অবহেলা।

অর্থনৈতিক সংকট।

খারাপ সঙ্গ।

গ্যাংয়ের প্রলোভন।

ক্ষমতার ভুল ব্যবহার।

আর পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষের অভাব।

তাহলে কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর শুধু তাকে শাস্তি দিলেই কি প্রশ্ন শেষ?

নাকি তার আগে জানতে হবে—

কোন জায়গায় আমরা তাকে হারিয়েছিলাম?

কোন মুহূর্তে তার হাত থেকে বই সরে গিয়ে অন্য কিছু উঠেছিল?

কোন দরজাটি তখন বন্ধ ছিল?

শিক্ষা কি সত্যিই সবার জন্য সমান সুযোগ?

নাকি শিক্ষাও ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে সামর্থ্য থাকলে পথ সহজ হয়, আর সামর্থ্য না থাকলে স্বপ্নটাই কঠিন হয়ে যায়?

একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পড়াশোনা করে।

সনদ পায়।

তারপর চাকরির জন্য অপেক্ষা করে।

একটি পরীক্ষা।

আরেকটি পরীক্ষা।

আরেকটি ফলাফল।

আরেকটি অপেক্ষা।

কখনো প্রতারণামূলক চাকরির বিজ্ঞাপন।

কখনো ভুয়া নিয়োগ।

কখনো অর্থের বিনিময়ে চাকরির প্রতিশ্রুতি।

তাহলে শিক্ষা যদি ভবিষ্যতের দরজা হয়—

সেই দরজার চাবি কি যোগ্যতা?

নাকি টাকা?

আর যোগ্যতা থাকার পরও যদি একজন তরুণ বছরের পর বছর কাজ না পায়—

তার হতাশার দায় কার?

স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও কি মানুষ নিরাপদ?

হাসপাতালে একজন মানুষ যায় সুস্থ হওয়ার আশায়।

তার হাতে থাকে টাকা।

মনে থাকে বিশ্বাস।

সঙ্গে থাকে পরিবার।

কিন্তু চিকিৎসা নিতে গিয়ে যদি কোনো ভুল, অবহেলা বা ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার অভিযোগ ওঠে—

তখন প্রশ্নটা কে করবে?

রোগী?

পরিবার?

নাকি তদন্ত কমিটি?

আর তদন্ত কমিটি যদি বলে—

“ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে”—

তাহলে সেই পরিবারের অপেক্ষার শেষ কোথায়?

একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়।

কিন্তু যে ভুলের অভিযোগ উঠেছে, সেটি যদি আগে থেকেই প্রতিরোধ করা যেত—

তাহলে তদন্ত কি তখনও যথেষ্ট?

পরিবেশের নিরাপত্তার কথাও কি বলা যায়?

নদী দখল হচ্ছে।

খাল ভরাট হচ্ছে।

গাছ কাটা হচ্ছে।

জলাধার হারিয়ে যাচ্ছে।

ফুটপাত দখল হচ্ছে।

অপরিকল্পিত ভবন উঠছে।

তারপর বৃষ্টি হলে পানি জমে।

রাস্তা ডুবে যায়।

মানুষের ঘর ডুবে যায়।

যাতায়াত বন্ধ হয়।

তখন কি আমরা শুধু বলব—

“প্রকৃতি আমাদের শাস্তি দিচ্ছে”?

নাকি প্রশ্ন করব—

প্রকৃতির স্বাভাবিক পথটা আমরা কতদিন ধরে বন্ধ করে রেখেছি?

একটি শহর যত উঁচু ভবনে ভরে ওঠে—

তার নিচে মাটি কি ততটাই নিরাপদ থাকে?

উন্নয়ন যদি মানুষের জীবনকে সহজ করার কথা বলে—

তাহলে সেই উন্নয়নে মানুষ কেন বারবার নতুন ঝুঁকির মুখোমুখি হয়?

আর ভোট?

একজন নাগরিক ভোটকেন্দ্রে যায়।

তার হাতে একটি ব্যালট।

সেই ব্যালটের সঙ্গে কি শুধু একটি প্রতীক থাকে?

নাকি তার সঙ্গে থাকে তার নিজের সিদ্ধান্ত, তার নিজের অধিকার, তার নিজের কণ্ঠ?

নির্বাচন নিয়ে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে—

অভিযোগ মানেই কি সত্য?

না।

আবার অভিযোগ উঠেছে বলেই সেটিকে উপেক্ষা করা যায় কি?

তাও নয়।

তাহলে প্রশ্ন—

এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের সবচেয়ে স্বচ্ছ পথ কী?

প্রতিটি কেন্দ্রের ফল কি সহজে দেখা যায়?

রিটার্নিং কর্মকর্তার নথি কি যাচাইযোগ্য?

পোলিং এজেন্টদের তথ্য কি মিলিয়ে দেখা যায়?

প্রয়োজনে পুনর্গণনার সুযোগ কি কার্যকর?

আর কোনো ভোট বাতিল হলে—

কেন বাতিল হলো, সেটি জানার অধিকার কি ভোটারের নেই?

নির্বাচন শুধু ভোট দেওয়ার দিনটির নাম নয়।

নির্বাচন হলো—

ভোট দেওয়ার আগে বিশ্বাস,

ভোট দেওয়ার সময় নিরাপত্তা,

আর ভোট দেওয়ার পরে ফলাফলের প্রতি আস্থা।

এই তিনটির কোনো একটি যদি দুর্বল হয়—

তাহলে ভোটের কাগজ অক্ষত থাকলেও মানুষের বিশ্বাস কি অক্ষত থাকে?

সীমান্তে চোরাচালান বন্ধের কথা বলা হয়।

কিন্তু প্রশ্ন—

শুধু পণ্য আটকানো হচ্ছে?

নাকি পেছনের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কও খুঁজে বের করা হচ্ছে?

মানুষ বিদেশে কাজ করতে যায়।

কেউ ঋণ নেয়।

কেউ জমি বিক্রি করে।

কেউ পরিবারের শেষ সঞ্চয়টুকু দেয়।

তারপর যদি কোনো দালালের প্রতারণায় সে নিখোঁজ হয়—

তাহলে অপরাধী শুধু সেই ব্যক্তি, যে তাকে নিয়ে গিয়েছিল?

নাকি তার পেছনে আরও কেউ ছিল?

যে মানুষগুলো স্বপ্ন বিক্রি করে টাকা নেয়—

তাদের নেটওয়ার্ক কতদূর?

আর যারা সেই নেটওয়ার্ক চালায়—

তাদের কাছে পৌঁছানো কি সবসময় সম্ভব?

একটি অভিযোগ উঠল।

মানুষ রাস্তায় নামল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হলো।

ক্যামেরা এলো।

শিরোনাম হলো।

তদন্ত কমিটি হলো।

প্রতিবেদন হলো।

তারপর?

কিছুদিন পর নতুন একটি ঘটনা এলো।

নতুন শিরোনাম।

নতুন আলোচনা।

নতুন তদন্ত।

পুরোনো ঘটনাটি ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে সরে গেল।

কিন্তু সেই পুরোনো ঘটনার প্রশ্নগুলো কি সত্যিই শেষ হয়ে গেল?

নাকি তারা কোথাও জমে রইল?

একটি ফাইলে।

একটি পরিবারের মনে।

একজন ভুক্তভোগীর নীরবতায়।

একজন সাক্ষীর ভয়ে।

একজন নাগরিকের অবিশ্বাসে।

তাহলে “ব্যবস্থা নেওয়া হবে”—এই কথাটির পর আসলে কী হওয়া উচিত?

তদন্ত?

প্রতিবেদন?

দায় নির্ধারণ?

শাস্তি?

সংস্কার?

নাকি শুধু আরেকটি সংবাদ সম্মেলন?

নিরাপত্তা তাই শুধু পুলিশের হাতে অস্ত্র, রাস্তায় ক্যামেরা, ভবনে পাহারা কিংবা আইনের কঠোরতা নয়।

নিরাপত্তা হলো আস্থা।

আস্থা যে অভিযোগ করলে তদন্ত হবে।

আস্থা যে তদন্ত হলে রিপোর্ট হবে।

আস্থা যে রিপোর্ট হলে ব্যবস্থা হবে।

আস্থা যে ভোট দিলে ভোট গণনা হবে।

আস্থা যে মামলা করলে পরিচয় নয়, প্রমাণ কথা বলবে।

আস্থা যে ক্ষমতার সামনে আইন ছোট হবে না।

আস্থা যে কোনো শিশু অন্যায়ের শিকার হলে তার কণ্ঠ হারিয়ে যাবে না।

কিন্তু সেই আস্থার জায়গাটিই যদি বারবার প্রশ্নের সামনে দাঁড়ায়—

তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে কি সেই শূন্যতা পূরণ করা যায়?

একটি সমাজের নিরাপত্তা শুধু কতজন অপরাধী গ্রেপ্তার হলো, কতটি মামলা হলো, কতটি তদন্ত কমিটি হলো—সেই হিসাবেও কি মাপা যায়?

নাকি নিরাপত্তার আসল হিসাবটা লুকিয়ে আছে মানুষের মনে?

মানুষ রাতে একা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কতটা ভয় পায়?

অন্যায় দেখেও কতজন চুপ করে যায়?

অভিযোগ করার আগে কতজন ভাবে—

“আমার কিছু হবে না তো?”

বিচার চাইতে গিয়ে কতজন ভাবে—

“বিচার চাইতে গিয়ে আমি নিজেই বিপদে পড়ব না তো?”

আর একজন সাধারণ মানুষ যখন ক্ষমতাবান কারও বিরুদ্ধে কথা বলার আগে চারপাশে তাকায়—

সেই একবার চারপাশে তাকানোর মধ্যেই কি একটি সমাজের নিরাপত্তার প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে নেই?

আমরা কতবার বলেছি—

“তদন্ত চলছে”?

কতবার বলেছি—

“ব্যবস্থা নেওয়া হবে”?

কতবার বলেছি—

“দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে”?

কিন্তু কতবার নিজেদের জিজ্ঞেস করেছি—

তারপর?

তারপর কী হয়েছিল?

কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?

কী পরিবর্তন হয়েছিল?

আর যে মানুষটি অন্যায়ের শিকার হয়েছিল—

তার জীবনে কি সত্যিই কিছু ফিরে এসেছিল?

নাকি শুধু সংবাদটি পুরোনো হয়েছিল?

শিরোনাম বদলেছিল?

ক্যামেরা সরে গিয়েছিল?

মানুষ ভুলে গিয়েছিল?

আর ফাইলটি থেকে গিয়েছিল?

যদি একটি অপরাধের বিচার হয়, কিন্তু একই ধরনের অপরাধ আবার ঘটে—

তাহলে আমরা কি শুধু একজন অপরাধীকে শাস্তি দিয়েছি?

নাকি সমস্যাটিকে বাঁচিয়ে রেখেছি?

যদি একটি তদন্ত সত্য প্রকাশ করে, কিন্তু সেই সত্য প্রকাশের পরও কোনো পরিবর্তন না আসে—

তাহলে সত্য জানার মূল্য কোথায়?

যদি আইন সবার জন্য সমান হয়—

তাহলে একজন সাধারণ মানুষের ভয় আর একজন ক্ষমতাবানের ভয় কি একই হওয়ার কথা নয়?

আর যদি একই না হয়—

তাহলে আইনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অদৃশ্য দেয়ালটি কোথায়?

কে বানিয়েছে?

কে পাহারা দেয়?

আর কে ভাঙবে?

যদি কোনো অপরাধের আড়ালে সত্যিই ক্ষমতা, অর্থ কিংবা প্রভাবের ছায়া থাকে—

আমরা কি সেই ছায়ার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে চাই?

নাকি সত্যটা জানার আগেই আমাদের সবচেয়ে বড় ভয়টা অন্য কোথাও—

সত্যটা যদি সত্যিই বেরিয়ে আসে, তাহলে তারপর কী হবে?

আর যদি সত্যের পথ আমাদের এমন কারও দরজায় নিয়ে যায়, যাকে আমরা প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত নই—

তখন কি প্রশ্ন থেমে যাবে?

যদি সত্য আমাদের নিজের প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করে—

আমরা কি প্রতিষ্ঠানকে বদলাব, নাকি সত্যটাকেই অস্বস্তিকর বলে সরিয়ে রাখব?

যদি সত্য আমাদের সমাজের দিকে আঙুল তোলে—

আমরা কি আয়নার দিকে তাকাব?

আর যদি একদিন বুঝতে পারি—

অপরাধী শুধু একজন মানুষ নয়,

কখনো কখনো তাকে তৈরি করে একটি নীরব সমাজ,

একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠান,

একটি ভয় পাওয়া সাক্ষী,

একটি অদৃশ্য প্রভাব,

একটি অসম আইনপ্রয়োগ,

অথবা আমাদের নিজেদের নীরবতা—

তাহলে দায়টা ঠিক কোথায় গিয়ে থামে?

অপরাধীর কাছে?

প্রতিষ্ঠানের কাছে?

ক্ষমতার কাছে?

নাকি আমাদের কাছেও এসে দাঁড়ায়?

আর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন—

আমরা কি সত্যিই নিরাপত্তা চাই?

নাকি শুধু চাই, বিপদটা যেন আজ আমাদের দরজায় না আসে?

আমরা কি সত্য চাই?

নাকি এমন একটি সত্য চাই, যেটা আমাদের স্বস্তি নষ্ট করবে না?

আমরা কি বিচার চাই?

নাকি শুধু চাই, বিচারটা অন্য কারও জন্য হোক?

আমরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাই?

নাকি এমন দিনটির অপেক্ষায় থাকি, যেদিন অন্যায়টা আমাদের সঙ্গে ঘটবে না?

আর যদি কোনো একদিন সেই অন্যায় আমাদের দরজায় এসে দাঁড়ায়—

তখন কি আমরা এখনও চুপ থাকব?

নাকি তখন বুঝব—

যে ভয়কে আজ অন্যের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিলাম,

সেই ভয় আসলে ধীরে ধীরে আমাদের সবার জন্যই একটি ঘর বানাচ্ছিল?

তখন হয়তো প্রশ্নটা আর হবে না—

“নিরাপত্তা কোথায়?”

প্রশ্নটা হবে—

“নিরাপত্তা হারাল কে?”

রাষ্ট্র?

সমাজ?

প্রতিষ্ঠান?

আইন?

নাকি আমরা নিজেরাই?

আর যদি উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়—

আমরা সবাই কোনো না কোনো জায়গায় চুপ ছিলাম,

তাহলে সেই নীরবতারও কি কোনো দায় নেই?

আর যদি থাকে—

সেই দায়ের বিচার করবে কে?

আর যদি বিচার করার মানুষটিও একদিন প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়—

তখন?

তখন আমরা কোথায় যাব?

কার কাছে যাব?

কোন দরজায় কড়া নাড়ব?

আর যদি শেষ পর্যন্ত এমন কোনো দরজাই না থাকে—

তাহলে আমরা কি সত্যিই নিরাপদ?

নাকি এতদিন শুধু নিরাপদ থাকার অভিনয়টাই করে এসেছি?

আর যদি কোনো একদিন সব প্রশ্নের উত্তর সত্যিই আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়—

আমরা কি সেই উত্তর শুনতে প্রস্তুত?

নাকি কিছু সত্য জানার চেয়ে,
অজানার ভেতর নিরাপদ থাকার ভান করাটাই আমাদের কাছে সহজ?

যদি সত্য প্রকাশের আগে মানুষ ভয় পায়—

তাহলে ভয়টা কিসের?

সত্যের?

নাকি সত্য প্রকাশের পর যে পরিবর্তন আসতে পারে, তার?

আর যদি একটি সমাজে মানুষ অপরাধের চেয়ে অপরাধ প্রকাশ করাকে বেশি ভয় পেতে শুরু করে—

তাহলে সেখানে আসলে শক্তিশালী কে?

অপরাধী?

ক্ষমতা?

নাকি সেই ভয়?

আর যদি ভয়ই ধীরে ধীরে মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে যায়—

তাহলে নীরবতাকে কি আর নীরবতা বলা যায়?

নাকি সেটিও এক ধরনের সম্মতি?

একদিন যদি কোনো শিশু বড় হয়ে আমাদের জিজ্ঞেস করে—

“তোমরা যখন এসব দেখেছিলে, তখন কী করেছিলে?”

আমরা তাকে কী উত্তর দেব?

বলব—

“আমরা জানতাম না”?

যদি জানতাম?

বলব—

“আমরা পারিনি”?

কেন পারিনি?

বলব—

“আমরা ভয় পেয়েছিলাম”?

তাহলে সেই ভয় তৈরি করেছিল কে?

আর যদি আমরা সবাই একটু একটু করে ভয় পেয়ে চুপ করে থাকি—

তাহলে সেই নীরবতার ভেতর দিয়ে যে অন্যায় বড় হয়ে উঠল,

তার দায় কি শুধু অন্যায়কারীর?

নাকি ইতিহাস কোনো একদিন আমাদের কাছেও এসে জানতে চাইবে—

“তুমি যখন প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছিলে, তখন চুপ ছিলে কেন?”

হয়তো সেদিন আমাদের হাতে কোনো উত্তর থাকবে না।

শুধু থাকবে কিছু পুরোনো প্রশ্ন।

কিছু অসমাপ্ত বিচার।

কিছু বন্ধ দরজা।

কিছু মানুষের নীরব মুখ।

আর একটি অস্বস্তিকর সত্য—

নিরাপত্তা হারানোর দিনটি হয়তো সেই দিন ছিল না, যেদিন রাস্তায় অপরাধ ঘটেছিল।

হয়তো তারও আগে—

যেদিন আমরা অন্যায়ের খবর শুনে বলেছিলাম,

“এটা আমার সঙ্গে তো ঘটেনি।”

তাহলে শেষ প্রশ্নটি কি নিরাপত্তা কোথায়—সেটি নয়?

শেষ প্রশ্নটি কি আরও ভয়ংকর—

যেদিন অন্যায় আমার দরজায় কড়া নাড়বে, তার আগে আমি কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলেছি, যে সমাজ আমার দরজার সামনে দাঁড়াবে?

নাকি সেদিন দরজার ওপাশে আমি একাই থাকব?

আর যদি একাই থাকি—

তাহলে এতদিন যাকে আমরা “সমাজ” বলে এসেছি,

সেটি আসলে কোথায় ছিল?</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/279456/</link>
				<pubDate>Sun, 27 Sep 2026 17:28:25 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>নিরাপত্তা কোথায়—প্রশ্নের শেষ কোথায়?</p>
<p>একজন মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার পর ঠিক কতগুলো বিপদের সঙ্গে চুক্তি করে যে সে সন্ধ্যায় জীবিত ফিরে আসবে?</p>
<p>রাস্তায় বের হলে দুর্ঘটনা হবে না—এর নিশ্চয়তা কে দেয়?</p>
<p>অপরাধীর সামনে পড়বে না—এর নিশ্চয়তা কোথায়?</p>
<p>অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তার পরিচয়ই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে না—এর নিশ্চয়তা কে দেবে?</p>
<p>আর সবচেয়ে বড় প্রশ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-279456"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/279456/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">d14fbc3842c8daaaebe35aeec509820f</guid>
				<title>আসসালামুয়ালাইকুম সবাইকে, আশা করি সবাই ভালোই আছেন। আমি আপনাদের মন্তব্য জানাতে চাই।আমার লেখাগুলো পড়ে আপনার বা আপনাদের কেমন মনে হয় মানে আমার লেখাগুলো আপনাদের কাছে কেমন লাগে ? কোন কোন ক্ষেত্রে কিভাবে লিখলে ভালো হবে সেটাও জানাবেন দয়া করে। আসসালামুয়ালাইকুম সবাইকে ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন সবসময় সাহিত্যের রসে থাকবেন।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/278966/</link>
				<pubDate>Sat, 26 Sep 2026 17:08:08 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>আসসালামুয়ালাইকুম সবাইকে, আশা করি সবাই ভালোই আছেন। আমি আপনাদের মন্তব্য জানাতে চাই।আমার লেখাগুলো পড়ে আপনার বা আপনাদের কেমন মনে হয় মানে আমার লেখাগুলো আপনাদের কাছে কেমন লাগে ? কোন কোন ক্ষেত্রে কিভাবে লিখলে ভালো হবে সেটাও জানাবেন দয়া করে। আসসালামুয়ালাইকুম সবাইকে ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন সবসময় সাহিত্যের রসে থাকবেন।</p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c360241e91247bc0cdf3d32ee0a1ce37</guid>
				<title>Israt Jahan Iqra and Md Najmul are now friends</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/278439/</link>
				<pubDate>Fri, 25 Sep 2026 10:10:34 +0600</pubDate>

				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">cd5eb065b4a3d6c3a93345361db935f0</guid>
				<title></title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/277845/</link>
				<pubDate>Thu, 24 Sep 2026 06:19:27 +0600</pubDate>

				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">d45085662680f54b56ba0dc8195b71e0</guid>
				<title>আরও একটা দিন

রাত সাড়ে এগারোটা।

ঢাকার রাস্তাগুলো তখনও পুরোপুরি ঘুমোয়নি। কোথাও গাড়ির হর্ন, কোথাও দোকানের শেষ শাটার নামার শব্দ, কোথাও দূরের কোনো বাসের আলো অন্ধকার কেটে চলে যাচ্ছে।

এই শহরটা কাউকে নিয়ে থেমে থাকে না।

তবু সেই রাতে রাফির মনে হচ্ছিল, তার জন্যই যেন পৃথিবীটা থেমে গেছে।

রাফির বয়স ছাব্বিশ।

খুব সাধারণ একটা ছেলে।

অতিরিক্ত মেধাবী নয়, আবার অমনোযোগীও নয়। খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু কাছের মানুষদের সঙ্গে বসলে হাসতে হাসতে সময় পার করে দিতে পারে।

ছোটবেলায় তার একটা অভ্যাস ছিল—বৃষ্টি নামলেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির গন্ধ নিত।

মা প্রায়ই বলতেন,

—“এই ছেলে, ভিজবি না কিন্তু!”

রাফি হাসত।

—“আমি ভিজছি না মা, শুধু বৃষ্টি দেখছি।”

তার জীবনটাও তেমনই ছিল।

খুব বড় কিছু নয়।

কিন্তু তার নিজের।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছিল। বেতন খুব বেশি নয়, কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আনন্দ ছিল।

প্রথম বেতন হাতে পেয়ে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনেছিল।

মা শাড়িটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারেননি।

শুধু বলেছিলেন,

—“নিজের জন্য কিছু কিনিসনি?”

রাফি হেসে বলেছিল,

—“আমার তো তুমি আছ।”

বাবা পাশ থেকে বলেছিলেন,

—“বেশি বড় হয়ে যাস না আবার।”

রাফি হেসেছিল।

তাদের ছোট পরিবার।

বাবা, মা, রাফি আর তার ছোট বোন মিতু।

মিতু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত।

রাফির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো।

মাঝে মাঝে ঝগড়া—চকলেট নিয়ে, রিমোট নিয়ে, কে আগে বাথরুমে যাবে সেটা নিয়েও।

কিন্তু রাতে মিতু পড়তে বসলে রাফিই চুপচাপ তার জন্য চা বানিয়ে দিত।

বন্ধুদের মধ্যেও রাফি ছিল পরিচিত মুখ।

তিনজনের একটা দল ছিল—রাফি, নিলয় আর সাকিব।

তাদের আড্ডার সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল কোনো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ নয়।

কে কোথায় খেয়েছে।

কে কার সঙ্গে ঝগড়া করেছে।

কে চাকরি বদলাবে।

কে বিয়ে করবে।

আর মাঝেমধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন।

নিলয় একদিন বলেছিল,

—“দেখিস, আমরা তিনজন একসঙ্গে একটা ব্যবসা করব।”

রাফি হেসে বলেছিল,

—“তুই আগে নিজের মাসের খরচ চালা।”

সবাই হেসেছিল।

আর ছিল মায়া।

রাফির জীবনে মায়ার জায়গাটা একটু আলাদা ছিল।

তাদের সম্পর্কটা খুব নাটকীয় ছিল না।

মায়া রাফিকে প্রতিদিন “ভালোবাসি” বলত না।

রাফিও না।

কিন্তু মায়া জানত, রাফি দেরি করে বাসায় ফিরলে সে চিন্তা করে।

রাফি জানত, মায়া রাগ করলে আসলে সে কষ্ট পেয়েছে।

তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা হয়েছিল।

একদিন মায়া বলেছিল,

—“সবকিছু ঠিকঠাক হলে আমরা একটা ছোট বাসা নেব।”

রাফি বলেছিল,

—“ছোট কেন?”

—“কারণ বড় বাসার টাকা কোথায় পাব?”

—“তাহলে ছোট বাসাই নেব।”

মায়া হেসেছিল।

সেই সময় তাদের কাছে ভবিষ্যৎটা খুব দূরের কোনো ব্যাপার মনে হয়নি।

কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না।

---

প্রথমে রাফির অফিসে সমস্যা শুরু হলো।

কোম্পানিতে লোক কমানো হচ্ছিল।

একদিন বস তাকে ডেকে বললেন,

—“পরিস্থিতি ভালো না। তোমাকে অন্য চাকরির জন্যও চেষ্টা করতে বলছি।”

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তারপর শুধু বলল,

—“বুঝেছি, স্যার।”

সেদিন অফিস থেকে বেরিয়ে অনেকক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল সে।

কয়েক দিনের মধ্যেই কথাটা সত্যি হলো।

রাফির চাকরিটা চলে গেল।

চাকরি যাওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পর সে আবার সেই অফিসের সামনে দাঁড়িয়েছিল।

ভেতরে ঢোকার সাহস তার ছিল না।

তবু দূর থেকে কাচের দরজার ওপাশে তাকিয়ে সে দেখল—

তার পুরোনো ডেস্কে একজন নতুন ছেলে বসে আছে।

একই চেয়ার।

একই কম্পিউটার।

একই জায়গা।

শুধু মানুষটা অন্য।

রাফি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হলো, মাত্র এক সপ্তাহেই যেন তার জীবনের একটা অধ্যায় অন্য কারও নামে লিখে ফেলা হয়েছে।

সে ফিরে এল।

কিন্তু অফিসের দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের অন্য দরজাগুলোও যেন একে একে বন্ধ হতে শুরু করল।

বাবার ব্যবসায় ক্ষতি হলো।

বাড়ির খরচ বাড়তে লাগল।

মায়ের ওষুধ।

মিতুর পড়াশোনার খরচ।

বাড়ির ঋণ।

সবকিছু মিলিয়ে রাফির মাথার ভেতর যেন প্রতিদিন নতুন একটা হিসাব খুলে বসত।

তারপর মায়ার সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হলো।

একদিন মায়া বলল,

—“তুমি আগের মতো কথা বলো না।”

রাফি বলল,

—“অনেক চাপ যাচ্ছে।”

—“আমার সঙ্গেও তো বলতে পারো।”

রাফি চুপ করে থাকল।

কারণ সে জানত না কীভাবে বলতে হয়—

“আমি নিজেই জানি না কীভাবে সামলাব।”

একদিন মায়া বলল,

—“তুমি আমাকে তোমার জীবনের বাইরে করে দিচ্ছ।”

রাফি কোনো উত্তর দিতে পারেনি।

কিছুদিন পর তাদের কথা বলা কমে গেল।

তারপর প্রায় বন্ধ।

---

এক রাতে মা জিজ্ঞেস করলেন,

—“কী হয়েছে বাবা? তুই এত চুপচাপ কেন?”

রাফি হাসল।

—“কিছু হয়নি।”

মা বললেন,

—“মায়ের কাছে কিছু হয়নি বলে পার পাবি?”

রাফি মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,

—“ঘুমাও মা।”

সেই রাতে সে অনেকক্ষণ জেগে ছিল।

পরদিনও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।

বন্ধুর ফোন ধরল না।

মায়ার পুরোনো মেসেজ খুলে আবার বন্ধ করল।

অফিসের মেইল দেখল না।

মিতুর সঙ্গেও কথা বলল না।

তার মনে হচ্ছিল—

“সবাইকে আমার জন্য এত কষ্ট করতে হচ্ছে কেন?”

ভাবনাটা ধীরে ধীরে তার মাথার ভেতর জায়গা করে নিল।

সেদিন রাতে রাফি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

কোথায় যাচ্ছে, কাউকে বলল না।

শুধু জানত, সে এখন কারও মুখোমুখি হতে চায় না।

ঢাকার রাস্তায় তখন রাত নেমেছে।

মানুষ কমে এসেছে।

দোকানের শাটার নামছে।

দূরে কোনো বাস চলে যাচ্ছে।

রাফি হাঁটতে হাঁটতে একটা অপেক্ষাকৃত নির্জন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল।

তার মাথার ভেতর তখন একটাই অন্ধকার সিদ্ধান্ত ঘুরছিল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—

—“ভাই?”

রাফি থামল না।

—“একটু দাঁড়াবেন?”

রাফি এবার থামল।

পেছনে তাকিয়ে দেখল, একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। বয়স তিরিশের কাছাকাছি।

লোকটা কয়েক পা এগিয়ে এসে বলল,

—“খুব কষ্ট হচ্ছে?”

রাফি কোনো উত্তর দিল না।

লোকটা আবার বলল,

—“আপনি কি সত্যিই মরতে চান, নাকি এই কষ্টটা আর সহ্য করতে পারছেন না?”

রাফি মাথা তুলল।

কথাটা তার ভেতরে কোথাও গিয়ে আটকে রইল।

অনেকক্ষণ পর সে ফিসফিস করে বলল,

—“আমি চাই... সবাই বুঝুক।”

—“কী বুঝুক?”

রাফির গলা কেঁপে উঠল।

—“আমি কতটা কষ্টে ছিলাম।”

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“একটা কাজ করবেন?”

রাফি তাকাল।

—“চোখ বন্ধ করুন।”

রাফি কিছুক্ষণ দ্বিধা করল।

তারপর চোখ বন্ধ করল।

লোকটা ধীরে বলল,

—“এবার ভাবুন, আপনি আর নেই।”

চারপাশের শব্দ যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।

—“আপনার জীবনটা আপনাকে ছাড়াই এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি শুধু দেখছেন। কিছু করতে পারবেন না। কাউকে ডাকতে পারবেন না। কাউকে ছুঁতে পারবেন না।”

রাফির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

তারপর—

হঠাৎ চারপাশ বদলে গেল।

রাফি দেখল তার নিজের বাড়ি।

তার ঘর।

সবকিছু আগের মতো।

শুধু সে নেই।

ভেতর থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল—

—“রাফি... বাবা?”

রাফি ছুটে ঘরের দিকে গেল।

মা তার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

বিছানাটা খালি।

টেবিলের ওপর তার বই।

চেয়ারে ঝোলানো জামা।

মা ধীরে ধীরে সেই জামাটার দিকে হাত বাড়ালেন।

কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকলেন।

তারপর চুপ করে বসে পড়লেন।

রাফি চিৎকার করে বলল,

—“মা!”

কিন্তু মা শুনলেন না।

রাফি এগিয়ে গিয়ে মায়ের কাঁধে হাত রাখতে চাইল।

পারল না।

তার হাত যেন শূন্যতার ভেতর দিয়ে চলে গেল।

দৃশ্য বদলে গেল।

ডাইনিং টেবিলে বাবা একা বসে আছেন।

সামনে খাবার।

কিন্তু তিনি খাচ্ছেন না।

চুপচাপ তাকিয়ে আছেন রাফির খালি চেয়ারটার দিকে।

রাফি ধীরে বলল,

—“বাবা...”

বাবা শুনলেন না।

দৃশ্য আবার বদলে গেল।

মিতু রাফির ঘরে ঢুকেছে।

তার হাতে রাফির একটা পুরোনো জিনিস।

মিতু সেটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“ভাইয়া, এটা আমাকে দিতে চেয়েছিলে, মনে আছে?”

রাফি ছুটে গেল তার কাছে।

—“মিতু...”

মিতু তাকে দেখতে পেল না।

দৃশ্য আবার বদলে গেল।

একটা ক্যাফে।

নিলয় আর সাকিব বসে আছে।

তাদের সঙ্গে আরেকজন।

আড্ডা চলছে।

হাসি চলছে।

জীবন থেমে নেই।

রাফি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখল।

তার জায়গায় অন্য কেউ বসেছে।

দৃশ্য বদলে গেল।

মায়া।

সে নিজের জীবনে এগিয়ে গেছে।

তার মুখে হাসি।

রাফি দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজের চোখ নামিয়ে নিল।

সে বুঝতে পারল—

মানুষের জীবন থেমে থাকে না।

কেউ তার জায়গায় অন্য কাউকে বসিয়ে নেয়।

কেউ পুরোনো জিনিস সরিয়ে ফেলে।

কেউ নতুন করে হাসতে শেখে।

কিন্তু তারপর দৃশ্যটা আবার বদলে গেল।

বহু বছর পরে।

রাফির বাড়ি।

মা বয়সে আরও বড় হয়েছেন।

চুলে সাদা।

হাতে রাফির পুরোনো একটা শার্ট।

তিনি শার্টটা বুকের কাছে চেপে ধরে খুব আস্তে বললেন,

—“তুই থাকলে আজ কত কথা বলতাম বাবা...”

রাফি ছুটে গেল মায়ের দিকে।

—“মা!”

কোনো উত্তর নেই।

বাবা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।

নীরব।

তার চোখের দিকে তাকিয়ে রাফি বুঝতে পারল—

কিছু শূন্যতা সময়ের সঙ্গে ছোট হয় না।

দৃশ্যগুলো দ্রুত বদলাতে লাগল।

তার অফিসের ডেস্কে নতুন মানুষ।

তার পুরোনো ফোন অন্য কারও হাতে।

তার জিনিসপত্র একটা বাক্সে।

তার ঘর অন্যভাবে সাজানো।

তার বন্ধুরা নিজেদের জীবনে ব্যস্ত।

মায়া নিজের জীবনে এগিয়ে গেছে।

সবকিছু বদলে গেছে।

শুধু একটা জায়গায় যেন কিছুই বদলায়নি—

তার বাবা-মায়ের ভেতরের সেই শূন্যতাটা।

রাফির বুক ভারী হয়ে এল।

শ্বাস দ্রুত হয়ে গেল।

কপাল বেয়ে ঘাম নামতে লাগল।

সে চোখ খুলতে চাইল।

পারল না।

আরও কয়েক মুহূর্ত—

তারপর হঠাৎ সব অন্ধকার।

---

রাফি চোখ মেলে তাকাল।

সে আবার সেই রাতের রাস্তায়।

কপাল ঘামে ভিজে গেছে।

শ্বাস দ্রুত চলছে।

কিছুক্ষণ সে কোনো কথা বলতে পারল না।

লোকটা তার সামনে বসে ছিল।

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“এখনও সময় আছে।”

রাফি কাঁপা গলায় বলল,

—“আমি... আমি ওগুলো দেখতে চাই না।”

—“তাহলে ফিরুন।”

রাফি মাথা তুলল।

—“কিন্তু আমার কিছুই তো ঠিক হয়নি।”

লোকটা শান্ত গলায় বলল,

—“আমি বলিনি ঠিক হয়ে গেছে।”

রাফি চুপ।

—“চাকরি গেছে?”

—“হ্যাঁ।”

—“মায়া দূরে চলে গেছে?”

রাফি মাথা নিচু করল।

—“বাড়ির সমস্যা আছে?”

সে মাথা নাড়ল।

লোকটা বলল,

—“সবগুলো সত্যি।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর লোকটা বলল,

—“কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখবেন। এগুলো আপনার জীবনের সমস্যা। আপনার জীবন নিজে সমস্যা নয়।”

রাফির চোখে আবার পানি এসে গেল।

—“যদি কিছুই ঠিক না হয়?”

লোকটা বলল,

—“তাহলে কাল আবার ভাববেন।”

রাফি তাকাল।

—“আর কালও যদি ঠিক না হয়?”

—“তাহলে পরশু।”

রাফি কিছু বলল না।

লোকটা ধীরে বলল,

—“সব সমস্যার সমাধান আজ রাতেই করতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।”

অনেকক্ষণ পর রাফি মাথা নাড়ল।

লোকটা উঠে দাঁড়াল।

—“চলুন। আগে বাসায় যাই।”

রাফি এবার আর আপত্তি করল না।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

রাফি একবারও পেছনে তাকাল না।

---

বাড়িতে ফিরে সে চুপচাপ বসে রইল।

মা ঘুমিয়ে পড়েছেন।

মিতুর ঘরের দরজা বন্ধ।

বাবার ঘর থেকেও কোনো শব্দ আসছে না।

রাফি নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।

তার সমস্যাগুলো একই জায়গায় রয়ে গেছে।

চাকরি নেই।

টাকার চিন্তা আছে।

মায়ার সঙ্গে সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে জানে না।

আগামীকাল কী করবে তাও জানে না।

কিন্তু সেদিন রাতে সে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল না।

শুধু নিজেকে বলল—

“আজ না।”

---

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই রান্নাঘর থেকে মায়ের কণ্ঠ এল,

—“রাফি, চা খাবি?”

রাফি কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইল।

তারপর উঠে রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।

মা কাপ হাতে তাকালেন।

—“কী হলো?”

রাফি মৃদু হেসে বলল,

—“চা দাও।”

মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

—“এত সকালে তোর চা খাওয়ার শখ হলো?”

রাফি কিছু বলল না।

শুধু মায়ের হাত থেকে কাপটা নিল।

সাধারণ একটা সকাল।

সাধারণ একটা চা।

কিন্তু রাফির কাছে সকালটা আর আগের মতো ছিল না।

সে জানত না তার জীবন কোথায় যাবে।

জানত না মায়া ফিরবে কি না।

জানত না নতুন চাকরি কবে পাবে।

জানত না বাবার ব্যবসা ঠিক হবে কি না।

জানত না আগামী মাসের খরচ কীভাবে চলবে।

শুধু একটা জিনিস জানত—

সবকিছুর উত্তর আজই দিতে হবে না।

সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে মানুষ কাজে যাচ্ছে।

একটা বাচ্চা স্কুলব্যাগ নিয়ে দৌড়াচ্ছে।

একজন রিকশাওয়ালা হাসতে হাসতে কারও সঙ্গে কথা বলছে।

একটা বাস ধোঁয়া ছেড়ে সামনে এগিয়ে গেল।

জীবন চলছে।

রাফি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—“জানি না জীবনটা কোথায় যাবে।”

একটু থামল সে।

—“কিন্তু সেটা জানার জন্য আমাকে থাকতে হবে।”

জানালার বাইরে তখন সকালটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।

রাফি চোখ মুছে নিল।

তার সামনে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।

কোনো অলৌকিক সমাধানও ছিল না।

ছিল শুধু একটা নতুন দিন।

আর সেই মুহূর্তে সেটাই যথেষ্ট ছিল।

আরও একটা দিন।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/277842/</link>
				<pubDate>Thu, 24 Sep 2026 06:15:04 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>আরও একটা দিন</p>
<p>রাত সাড়ে এগারোটা।</p>
<p>ঢাকার রাস্তাগুলো তখনও পুরোপুরি ঘুমোয়নি। কোথাও গাড়ির হর্ন, কোথাও দোকানের শেষ শাটার নামার শব্দ, কোথাও দূরের কোনো বাসের আলো অন্ধকার কেটে চলে যাচ্ছে।</p>
<p>এই শহরটা কাউকে নিয়ে থেমে থাকে না।</p>
<p>তবু সেই রাতে রাফির মনে হচ্ছিল, তার জন্যই যেন পৃথিবীটা থেমে গেছে।</p>
<p>রাফির বয়স ছাব্বিশ।</p>
<p>খুব সাধারণ একটা ছেলে।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-277842"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/277842/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">dd0acb4fcfef379f8fcebd53f9541ac3</guid>
				<title>শহরটা কার?

সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা অদ্ভুত রকম ভারী।

বৃষ্টি হবে কি হবে না—বোঝার উপায় নেই। সেপ্টেম্বরের সকাল অথচ গরমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে ক্লান্তির ছাপ।

আরিফ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল।

পাশের চায়ের দোকানের পুরোনো টেলিভিশনে খবর ভেসে উঠল—

“আগামী কয়েক ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। নগরবাসীকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।”

চায়ের দোকানের বৃদ্ধ লোকটা চায়ে চুমুক দিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—“প্রতি বছরই তো সতর্ক করে। শহরটাকেই কেউ সতর্ক করে না!”

কেউ কথাটার উত্তর দিল না।

বাস এলো।

আরিফ উঠে জানালার পাশে বসল।

শহরটা পেছনে ছুটতে লাগল।

যেখানে একসময় বড় বড় গাছ ছিল, সেখানে এখন কাচের দেয়ালওয়ালা উঁচু ভবন। ফুটপাতের অর্ধেক দোকানের দখলে, বাকি অর্ধেক গাড়ির।

রাস্তার পাশে একটি শুকিয়ে যাওয়া গাছ দাঁড়িয়ে আছে।

গাছটার গায়ে একটি চকচকে বিজ্ঞাপন—

“নতুন শহর—নতুন ভবিষ্যৎ।”

আরিফ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিল।

অফিসে পৌঁছানোর আগেই বৃষ্টি শুরু হলো।

প্রথমে টুপটাপ।

তারপর হঠাৎ যেন আকাশের সব দরজা খুলে গেল।

দুপুরের মধ্যেই রাস্তা পানির নিচে।

অফিসের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়েছে। কেউ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, কেউ ছুটির আশায় হাসাহাসি করছে।

আরিফের ফোন বেজে উঠল।

মা।

—“বাবা, তুই কোথায়?”

—“অফিসে।”

—“বাসায় ফিরবি কীভাবে? আমাদের গলিতেও পানি ঢুকেছে।”

আরিফ জানালার বাইরে তাকাল।

—“চিন্তা করো না মা। আমি আসব।”

ফোনটা কেটে গেল।

বাইরে তখনও বৃষ্টি।

আরিফের হঠাৎ মনে হলো, শহরটা বৃষ্টিতে ভাসছে না।

শহরটা যেন নিজের জমিয়ে রাখা ভুলগুলোর নিচে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে।


---

সন্ধ্যার দিকে পানি একটু কমলে আরিফ বের হলো।

রাস্তার পাশে একজন বৃদ্ধ কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হাতে ভাঙা ছাতা।

—“আমার দোকানটা... সব শেষ হয়ে গেল।”

কথাটা তিনি কাকে বললেন, বোঝা গেল না।

একটু সামনে কয়েকজন তরুণ পানি সরানোর চেষ্টা করছিল।

আরিফও তাদের সঙ্গে দাঁড়াল।

একজন পানির নিচে হাত দিয়ে কিছু খুঁজতে খুঁজতে বলল,

—“ভাই, এখানে তো ড্রেন ছিল!”

অন্যজন চারপাশে তাকিয়ে হেসে ফেলল।

—“ছিল। এখন বিল্ডিং।”

সামনেই বিশাল একটি ভবন।

নিচে মার্বেলের ফলক—

“উন্নয়ন প্রকল্প।”

আরিফ কিছুক্ষণ ফলকটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর চোখ তুলে ভবনটার দিকে তাকাল।

কথাটা মুখে এল না।

শুধু মনে হলো—

যে শহরে পানি বের হওয়ার জায়গা নেই, সেখানে ভবনগুলো এত উঁচু হয় কীভাবে?


---

কয়েকদিন পর অফিসে আরেকটা ঘটনা ঘটল।

দশ বছর ধরে কাজ করা একজন কর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হলো।

লোকটি ফাইল হাতে নিয়ে কর্মকর্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

মুখে কোনো রাগ নেই।

শুধু ক্লান্তি।

আরিফ তাকে জিজ্ঞেস করল,

—“স্যার, কী হলো?”

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“যোগ্যতা দিয়ে চাকরি পেয়েছিলাম। পরিচয় না থাকায় হারালাম।”

তারপর চলে গেলেন।

আরিফ অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

সেদিন প্রথমবার নিজের নীরবতাটা তার কাছে খুব ভারী মনে হলো।


---

এক বিকেলে আরিফ শহরের পুরোনো নদীর পাড়ে গেল।

ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এখানে আসত সে।

তখন নদী এত প্রশস্ত ছিল যে ওপারের বাড়িগুলোকে খেলনার মতো দেখাত।

এখন নদীর বুক সরু।

পানি কালো।

পাড়ে প্লাস্টিকের স্তূপ।

আর নদীর জায়গা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি দালান।

একজন মাঝবয়সী মাঝি নৌকা বাঁধছিল।

আরিফ জিজ্ঞেস করল,

—“চাচা, নদীটা এত ছোট হয়ে গেল কীভাবে?”

লোকটি নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—“নদী নিজে ছোট হয় নাই বাবা।”

একটু থেমে যোগ করল,

—“আমরাই ছোট করছি।”

আরিফ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

কিছু প্রশ্নের উত্তর শুনলে পরের প্রশ্নটা নিজের কাছেই করতে হয়।


---

কয়েকদিন পর শহরে নির্বাচন এলো।

দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার।

মাইকে স্লোগান।

“নিরাপদ শহর।”

“নদী রক্ষা।”

“দুর্নীতিমুক্ত সমাজ।”

“সবার জন্য উন্নত জীবন।”

আরিফ পোস্টারগুলোর দিকে তাকিয়ে হাঁটত।

কথাগুলো সুন্দর।

এত সুন্দর যে বাস্তব শহরটার সঙ্গে তাদের কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যায় না।

একদিন বন্ধু সাকিব বলল,

—“তুই এত কিছু নিয়ে ভাবিস কেন?”

আরিফ বলল,

—“কারণ এই শহরেই তো থাকতে হবে।”

সাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর নিচু গলায় বলল,

—“তাহলে চুপচাপ থাক।”

—“কেন?”

সাকিব চারপাশে তাকাল।

—“সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া নিরাপদ না।”

আরিফ হেসে বলল,

—“উত্তর না পেলেও প্রশ্নটা তো থেকেই যায়।”

সাকিব এবার আর কিছু বলল না।


---

সেদিন রাতেই আবার বৃষ্টি হলো।

সকালে অফিসে যাওয়ার পথে আরিফ দেখল, রাস্তার পাশে একটি বস্তির ঘর ভেঙে পড়ে আছে।

একটি ছোট মেয়ে ভাঙা টিনের পাশে দাঁড়িয়ে।

বুকের সঙ্গে ভেজা স্কুলব্যাগ।

আরিফ কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—“তোমার বাড়ি কোথায়?”

মেয়েটি ভাঙা ঘরটার দিকে আঙুল তুলল।

—“ওখানে।”

—“তোমার মা?”

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“মা পানি কমার অপেক্ষা করছে।”

আরিফ কিছু বলতে পারল না।

তার চোখ চলে গেল সামনের বিশাল বিলবোর্ডে।

“সবার জন্য উন্নত জীবন।”

বৃষ্টির পানিতে বিলবোর্ডের নিচের অংশ ভিজে গিয়েছিল।

মেয়েটার স্কুলব্যাগটাও।

কিন্তু দুটোর মধ্যে পার্থক্য ছিল—

একটাকে শুকিয়ে আবার টাঙানো যাবে।

অন্যটাকে হয়তো আর কোনোদিন স্কুলে নেওয়া হবে না।


---

সেদিন রাতে আরিফ ঘুমাতে পারল না।

জানালার বাইরে শহর তখন অন্ধকার।

তার মাথার ভেতর একে একে ফিরে আসছিল—

ভাঙা দোকান।

কালো নদী।

চাকরি হারানো মানুষ।

সাকিবের ভয় পাওয়া চোখ।

ভেজা স্কুলব্যাগ।

আর দেয়ালে ঝুলে থাকা প্রতিশ্রুতিগুলো।

হঠাৎ তার মনে হলো—

এসব আলাদা কোনো ঘটনা নয়।

একটা জায়গায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ছায়া অন্য একটা জায়গায় গিয়ে পড়ে।

কেউ নদী দখল করে।

কেউ ঘর হারায়।

কেউ চাকরি হারায়।

কেউ প্রতিবাদ করার আগেই চুপ হয়ে যায়।

আর কেউ সবকিছু দেখে নিজের দরজাটা বন্ধ করে দেয়।

আরিফ উঠে বসল।

টেবিলের ওপর একটা সাদা কাগজ ছিল।

অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়ে বসে থাকার পর সে শুধু একটি বাক্য লিখল—

“এই শহরটা কার?”


---

পরদিন সকালে সে কাগজটা নিয়ে বের হলো।

শহরের পুরোনো এক দেয়ালে পোস্টারটা লাগিয়ে দিল।

কেউ থামল।

কেউ হাসল।

কেউ বলল,

—“এসব করে কী হবে?”

আরিফ কোনো উত্তর দিল না।

সে হাঁটতে লাগল।

কিছুদূর গিয়ে পেছনে তাকাল।

একজন বৃদ্ধ পোস্টারটার সামনে দাঁড়িয়ে।

তারপর একজন রিকশাচালক।

তারপর স্কুলের পোশাক পরা একটি ছেলে।

কেউ কিছু বলছে না।

শুধু পড়ছে।


---

সন্ধ্যার দিকে পোস্টারের নিচে কেউ লিখে গেল—

“শহরটা আমাদের।”

পরদিন তার নিচে আরেকটি লাইন—

“তাহলে অন্যায়টা কার?”

তারও পরদিন—

“চুপ করে থাকা মানুষেরও কি দায় নেই?”

কে লিখছে, কেউ জানল না।

শুধু দেয়ালটা ধীরে ধীরে প্রশ্নে ভরে উঠল।

শহর অবশ্য বদলাল না।

নদী তখনও কালো।

রাস্তা তখনও ভাঙা।

দুর্নীতি তখনও আছে।

ভয়ও আছে।

ক্ষমতার লড়াইও আছে।

তবু কিছু একটা বদলেছিল।

মানুষ আর শুধু পোস্টার পড়ছিল না।

কেউ থামছিল।

কেউ প্রশ্ন করছিল।

কেউ অন্য কাউকে প্রশ্নটা পড়ে শোনাচ্ছিল।

এক বিকেলে আরিফ সেই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটি ছোট ছেলের দিকে।

সেই মেয়েটির মতোই বয়স হবে।

ছেলেটি স্কুলব্যাগ নামিয়ে দেয়ালের সামনে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর খাতা বের করল।

খাতার শেষ পাতাটা ছিঁড়ে দেয়ালের নিচে লিখে দিল—

“শহরটা যদি আমাদের হয়,
তাহলে শহরের দায়ও কি আমাদের নয়?”

আরিফ অনেকক্ষণ লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

কিছু বলল না।

দূরে তখন মাইকে আবার নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি ভেসে আসছিল।

আর তার নিচে, পুরোনো দেয়ালে, ছোট ছোট অক্ষরে জন্ম নিচ্ছিল আরও কিছু প্রশ্ন।

দেয়ালের একেবারে ওপরে তখনও সেই প্রথম প্রশ্নটা লেখা—

“শহরটা কার?”

আর তার নিচে, দিনের পর দিন, অচেনা হাতের লেখা বাড়তেই থাকল।

কেউ উত্তর লিখল না।

শুধু প্রশ্নগুলো একটু একটু করে বড় হতে লাগল।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/276019/</link>
				<pubDate>Sun, 20 Sep 2026 04:03:41 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>শহরটা কার?</p>
<p>সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা অদ্ভুত রকম ভারী।</p>
<p>বৃষ্টি হবে কি হবে না—বোঝার উপায় নেই। সেপ্টেম্বরের সকাল অথচ গরমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে ক্লান্তির ছাপ।</p>
<p>আরিফ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল।</p>
<p>পাশের চায়ের দোকানের পুরোনো টেলিভিশনে খবর ভেসে উঠল—</p>
<p>“আগামী কয়েক ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। নগরবাসীকে সতর্ক থাক&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-276019"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/276019/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">8741cee894de61ecaabd23b43c765fcd</guid>
				<title></title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/274082/</link>
				<pubDate>Mon, 14 Sep 2026 17:28:38 +0600</pubDate>

				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">efeb03433247ed0f764b1f23ef62b53d</guid>
				<title>সাল ২০৭০।

সকালটা অন্য সব সকালের মতোই ছিল।

আকাশে সূর্য উঠেছে। কাঁচের তৈরি উঁচু ভবনগুলোতে সকালের আলো ঝিলমিল করছে। আকাশপথে ছুটে যাচ্ছে চালকবিহীন যান। 

রায়হান জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতে বলল,

—“মা, আমি বের হচ্ছি।”

রান্নাঘর থেকে মা বেরিয়ে এলেন।

—“আচ্ছা বাবা, সাবধানে যাস।”

—“হুম।”

—“পৌঁছে আমাকে একটা কল দিস।”

রায়হান হেসে বলল,

—“আচ্ছা মা।”

সে দরজা খুলে বাইরে পা বাড়াতেই মা আবার ডাকলেন,

—“বাবা!”

রায়হান ফিরে তাকাল।

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—“একটা কথা ছিল…”

রায়হান মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“কী বলো? এত সংকোচ করছ কেন?”

মা আস্তে করে বললেন,

—“ঘরের অক্সিজেনটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ফেরার সময় একটা সিলিন্ডার নিয়ে আসিস বাবা।”

রায়হান হেসে বলল,

—“ওহ, এই ব্যাপার! ঠিক আছে। আসার সময় নিয়ে আসব।”

—“মনে করে আনিস কিন্তু।”

—“আচ্ছা, মনে করে আনব।”

মা এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে একটু বিষণ্ণ হয়ে বললেন,

—“তুই এই পরিবারের জন্য কত খাটিস, বাবা। নিজের জন্যও তো কিছু জমাতে হয়।”

রায়হান মায়ের কাছে গিয়ে বলল,

—“এসব ভেবে মন খারাপ করো না। তোমাদের জন্য করতে পারলেই তো আমার খুশি।”

মা কিছু বললেন না।

শুধু ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক।”

রায়হান বেরিয়ে গেল।

---

অফিসে পৌঁছানোর পর প্রথমেই সে মাকে ফোন করল।

—“মা, আমি পৌঁছে গেছি।”

—“আলহামদুলিল্লাহ। খেয়াল করে কাজ করিস।”

—“হুম।”

একটু থেমে মা বললেন,

—“আর…”

রায়হান হেসে বলল,

—“জানি। অক্সিজেন।”

মাও হেসে ফেললেন।

—“ভুলে যাস না।”

—“ভুলব না।”

ফোন কেটে গেল।

রায়হান কাজে বসে পড়ল।

তার ডেস্কের সামনে বিশাল কাচের জানালা। ওপাশে ২০৭০ সালের শহর।

কোথাও গাছ নেই।

তবু শহরটা সবুজের অভাব অনুভব করছে বলে মনে হয় না। ভবনের দেয়ালে কৃত্রিম সবুজ আলো, ছাদে কৃত্রিম বাগান, রাস্তার পাশে ডিজিটাল গাছের বিজ্ঞাপন।

একটা বিজ্ঞাপনে লেখা—

“আপনার ঘরের জন্য নতুন প্রজন্মের অক্সিজেন জেনারেটর।”

রায়হান একবার তাকিয়ে আবার কাজে মন দিল।

---

দুপুরে বন্ধু সামির এসে তার পাশে বসল।

—“চল, নিচে যাই।”

—“কোথায়?”

—“চা।”

দুজন নিচে নামল।

অফিসের সামনে অক্সিজেনের দোকানগুলোর লম্বা সারি।

সামির বলল,

—“আজ দাম আবার বেড়েছে।”

রায়হান বলল,

—“কত?”

—“প্রায় দশ শতাংশ।”

রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“মায়ের সিলিন্ডারটা আজ নিতেই হবে।”

সামির কিছু বলল না।

ঠিক তখনই রাস্তার ওপাশে একটা ছোট কাচের দোকানের সামনে রায়হানের চোখ আটকে গেল।

কাচের ভেতরে রাখা একটি ছোট্ট গাছ।

মাত্র কয়েকটি পাতা।

গাছটির নিচে লেখা—

“প্রাকৃতিক বৃক্ষ। জীবন্ত নমুনা।”

রায়হান দোকানে ঢুকে পড়ল।

—“এটা কত?”

দোকানদার দাম বললেন।

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

একটি ছোট গাছের দাম তার কয়েক মাসের সঞ্চয়ের সমান।

—“এত দাম?”

বৃদ্ধ দোকানদার শান্তভাবে বললেন,

—“এখন তো ছোট।”

রায়হান অবাক হয়ে তাকাল।

বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।

রায়হান বেরিয়ে এল।

---

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে সে মায়ের অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনল।

সিলিন্ডার হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আবার সেই গাছটার কথা মনে পড়ল।

তারপর মায়ার কথা।

মায়া গাছ ভালোবাসে—এ কথা সে জানত।

কিন্তু মায়ার জন্য একটা সত্যিকারের গাছ কিনে দেওয়া তার কাছে অসম্ভবের মতো ছিল।

তবু সেদিন থেকে সে টাকা জমাতে শুরু করল।

প্রতিদিন অল্প অল্প করে।

নিজের চা কমিয়ে।

অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দিয়ে।

কখনো পঞ্চাশ ক্রেডিট।

কখনো একশো।

কখনো মাত্র দশ।

মাসের পর মাস।

---

অবশেষে একদিন সে গাছটি কিনল।

ছোট।

সুন্দর।

জীবন্ত।

মায়ার সামনে গাছটি নিয়ে দাঁড়িয়ে রায়হান বলল,

—“তোমার জন্য।”

মায়া অবাক হয়ে গাছটির দিকে তাকাল।

—“এটা… সত্যি?”

—“হ্যাঁ।”

—“কোথায় পেলে?”

রায়হান হেসে বলল,

—“অনেকদিন ধরে টাকা জমিয়েছি।”

মায়া কিছু বলার আগেই একটি বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামল।

গাড়ি থেকে নামল এক যুবক।

তার সঙ্গে দুজন কর্মচারী।

তারা গাড়ি থেকে নামাল একটি বিশাল গাছ।

গাছটি স্বচ্ছ সুরক্ষাকবচের ভেতরে রাখা।

ঘন পাতা।

বড় ডাল।

পুরো একটা ছোট্ট গাছ।

যুবকটি মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“তোমার জন্য।”

তারপর রায়হানের হাতে থাকা গাছটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

—“এত ছোট?”

রায়হান চুপ।

যুবকটি বলল,

—“আমাদের বাড়িতে এর চেয়েও বড় কয়েকটা আছে।”

মায়া কিছুক্ষণ রায়হানের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর সেই যুবকের সঙ্গে চলে গেল।

রায়হান দাঁড়িয়ে রইল।

তার হাতে ছোট্ট গাছটি।

কিছুক্ষণ পর সে নিচু গলায় বলল,

—“আজকাল মানুষও বুঝি গাছের ছায়ায় ভালোবাসা খোঁজে।”

তারপর সে একা হাঁটতে শুরু করল।

---

সেদিন রাতে রায়হান সামিরের কাছে গেল।

সামির কিছুক্ষণ তার কথা শুনে বলল,

—“তুই নিজেকে এত ছোট ভাবছিস কেন?”

রায়হান মাথা নিচু করে বলল,

—“আমি চেষ্টা করেও কাউকে ধরে রাখতে পারলাম না।”

—“সবকিছু টাকা দিয়ে ধরে রাখা যায় না।”

রায়হান চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“মায়ের জন্য অক্সিজেন কিনতেই মাসের অর্ধেক টাকা চলে যায়। নিজের জন্য কী-ই বা রাখি?”

সামির তার কাঁধে হাত রাখল।

—“চল, বাড়ি যাস।”

রায়হান বলল,

—“মা অপেক্ষা করছে।”

—“তাহলে আরও তাড়াতাড়ি চল।”

---

বাড়িতে পৌঁছে রায়হান সিলিন্ডারটা মায়ের হাতে দিল।

—“নিয়ে এসেছি।”

মা হাসলেন।

—“খেয়েছিস?”

রায়হান মাথা নাড়ল।

—“না।”

—“বস। খাবার দিচ্ছি।”

রায়হান বসার ঘরে এসে পুরোনো একটা কাঠের বাক্স দেখতে পেল।

বাক্স খুলতেই কিছু পুরোনো ছবি বেরিয়ে এল।

একটা ছবিতে তার মা অনেক ছোট।

তার পাশে একজন পুরুষ।

আর তাদের মাথার ওপর—

একটা বিশাল গাছ।

রায়হান ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,

—“মা, এটা কী?”

মা ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—“গাছ।”

—“এত বড়?”

—“এর থেকেও বড় ছিল।”

রায়হান অবাক হয়ে বলল,

—“তখন এর দাম কত ছিল?”

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“দাম?”

রায়হান মাথা নাড়ল।

মা মৃদু হেসে বললেন,

—“তখন গাছের দাম দিয়ে গাছ কেনা হতো না বাবা।”

রায়হান কিছু বুঝল না।

---

কয়েকদিন পর।

সকাল।

রায়হান অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

মা রান্নাঘর থেকে ডাকলেন,

—“বাবা…”

কোনো উত্তর নেই।

—“রায়হান?”

সে দৌড়ে ঘরে এল।

মা চেয়ারে বসে আছেন।

মুখটা কেমন ফ্যাকাশে।

রায়হান দ্রুত মায়ের অক্সিজেন মাস্ক ঠিক করে দিল।

যন্ত্রের স্ক্রিনে লাল আলো জ্বলছে।

O₂ RESERVE: 03%

রায়হানের বুক কেঁপে উঠল।

—“মা, একটু অপেক্ষা করো। আমি এখনই নতুন সিলিন্ডার নিয়ে আসছি।”

মা দুর্বলভাবে বললেন,

—“অফিসে দেরি হবে না?”

—“অফিস পরে হবে।”

সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।

---

অক্সিজেন স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রায়হানের শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল।

কাউন্টারের সামনে লাইন।

সে টাকা বাড়িয়ে বলল,

—“একটা সিলিন্ডার দিন। জরুরি।”

কর্মচারী স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“পেমেন্ট করুন।”

রায়হান তার অ্যাকাউন্টের সব টাকা দিল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

INSUFFICIENT BALANCE

রায়হান স্তব্ধ।

—“আর একটু কমানো যায় না?”

—“দুঃখিত।”

—“আমি পরে বাকি টাকা দিয়ে দেব।”

—“সিস্টেমে ক্রেডিট নেই।”

রায়হান পকেট হাতড়াল।

কিছু নোট।

কিছু কয়েন।

কিছুই যথেষ্ট নয়।

ঠিক তখন পাশের দোকানের কাচের ভেতর তার চোখ পড়ল।

সেই একই ছোট গাছ।

পাতাগুলো রোদে ঝলমল করছে।

রায়হান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজের পকেটের শেষ টাকাগুলো গুনল।

গাছটার দাম এখনও তার সাধ্যের বাইরে।

সে ফিরে গেল।

---

বাড়ির দরজা খুলতেই ঘরটা অস্বাভাবিক নীরব।

—“মা?”

কোনো উত্তর নেই।

রায়হান দৌড়ে মায়ের ঘরে গেল।

মা বিছানায় শুয়ে আছেন।

অক্সিজেন যন্ত্রটা নীরব।

রায়হান কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর মায়ের হাত ধরে বসে পড়ল।

ঘরের কোণে রাখা পুরোনো ছবিটা বাতাসে একটু নড়ছিল।

ছবির গাছটার পাতা যেন নড়ছে।

কিন্তু ঘরের ভেতর কোনো বাতাস নেই।

---

কয়েক মাস পর।

শহরের এক বিশাল প্রদর্শনী কেন্দ্রে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে।

কেন্দ্রে রাখা হয়েছে পৃথিবীর শেষ জীবন্ত প্রাকৃতিক বৃক্ষগুলোর একটি।

স্বচ্ছ কাচের ঘরের ভেতরে।

চারপাশে নিরাপত্তারক্ষী।

সামনে বিশাল অঙ্কের মূল্য।

মানুষ দূর থেকে দাঁড়িয়ে গাছটির ছবি তুলছে।

রায়হানও ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার হাতে একটি পুরোনো ছবি।

ছবিতে তার মা।

আর তার মাথার ওপর—

এক বিশাল গাছ।

একটি শিশু গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে হাসছে।

রায়হান ছবিটার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,

—“মা…”

তারপর সে কাচের ভেতরের গাছটির দিকে তাকাল।

গাছটি নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার পাতার ফাঁক দিয়ে আলো পড়ছিল।

রায়হান হাত বাড়িয়ে কাচ ছুঁয়ে দিল।

কাচের ওপাশে গাছ।

এপাশে মানুষ।

মাঝখানে শুধু স্বচ্ছ একটা দেয়াল।

আর নিচে—

একটি দামের ট্যাগ।

রায়হান চোখ নামিয়ে নিজের হাতে থাকা পুরোনো ছবিটার দিকে তাকাল।

ছবির গাছটির নিচে কোনো দামের ট্যাগ ছিল না।

কোনো কাচ ছিল না।

কোনো অক্সিজেন মাস্কও ছিল না।

শুধু মানুষ ছিল।

আর ছিল—

একটা গাছ।

রায়হান ছবিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

তারপর ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।

কাচের ঘরের ভেতর গাছটি রয়ে গেল।

নিঃশব্দে।

একটু বাতাসে তার একটি পাতা কেঁপে উঠল।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/274081/</link>
				<pubDate>Mon, 14 Sep 2026 17:18:43 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সাল ২০৭০।</p>
<p>সকালটা অন্য সব সকালের মতোই ছিল।</p>
<p>আকাশে সূর্য উঠেছে। কাঁচের তৈরি উঁচু ভবনগুলোতে সকালের আলো ঝিলমিল করছে। আকাশপথে ছুটে যাচ্ছে চালকবিহীন যান। </p>
<p>রায়হান জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতে বলল,</p>
<p>—“মা, আমি বের হচ্ছি।”</p>
<p>রান্নাঘর থেকে মা বেরিয়ে এলেন।</p>
<p>—“আচ্ছা বাবা, সাবধানে যাস।”</p>
<p>—“হুম।”</p>
<p>—“পৌঁছে আমাকে একটা কল দিস।”</p>
<p>রায়হান হেসে বলল,</p>
<p>—“আ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-274081"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/274081/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>7</slash:comments>
				
							</item>
		
	</channel>
</rss>