Profile Photo

আবু হুরাইরাOffline

  • Ibnenazzar824
  • Profile picture of আবু হুরাইরা

    আবু হুরাইরা

    3 years, 10 months ago

    জেল থেকে চিঠি!

    গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর রোজ মঙ্গলবার ভারতের সন্ত্রাস দমন কমিশন বিশেষ বাহিনী ‘এটিএস’ হজরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকি সাহেবকে গ্রেফতার করে। তারপর ধর্মান্তর সহ আরো কয়েকটি মামলা করা হয় তার নামে। সাথে সাথে রিমান্ডে নেওয়া অনেক দিনের। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে যায় ভারতের মুসলমানরা। জামিনের চেষ্টা চালাতে থাকে বিভিন্ন মাধ্যমে। কিন্তু আজও পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি। গত কিছুদিন পূর্বে তার ছেলে তার কাছে একটি চিঠি লিখেছিল। মাওলানা তার জবাবে একটি চিঠি লিখেছেন; যা ‌প্রত্যেক মুসলমানের জন্য খুবই দরকারি—প্রত্যেক পাঠকের জন্য যাতে রয়েছে উপদেশ ও জ্ঞানের ভাণ্ডার—মহান রবের একজন খাঁটি শোকরগুজার বান্দার অতুলনীয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর যে দয়াবান, মেহেরবান ও অনুগ্রহকারী তার সুস্পষ্ট প্রমাণ—মানবজীবনে বিপদ-মছিবতের তুলনায় মে আরাম-আয়েশ আর সুখ-শান্তির পরিমাণ অনেক বেশি, সেটার জ্বলন্ত উদাহরণ—প্রকৃত মুমিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কীভাবে রবের কৃতজ্ঞতায় নত থাকবে, তার অতুলনীয় এক প্রশিক্ষণ—দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে বাঁধা আসবেই, তবে জীবন বাজি রেখে সব কিছুর মোকাবেলা করার প্রকাশ্য নমুনা—জীবনের লক্ষ্য পূরণে হোঁচট খেতেই হবে, তবে হার মেনে বসে না থেকে শক্ত মনোবল আর নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।

    তাই
    মুসলিম উম্মাহর জন্য নিম্নে তার অনুবাদ তুলে ধরা হলো।

    চিঠির শুরুতে তিনি লেখেন,

    আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

    প্রিয় পুত্র আমার!
    আমি তোমার লেখা পত্রটি হাতে পেয়েছি, যার শব্দে শব্দে ছিল নিঃস্বার্থ ভালবাসা, আন্তরিকতা ও মনের আবেগ। এটি পড়ে স্বীয় রবের কাছে কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে গিয়েছিলাম এবং মনে মনে গর্বিতও হয়েছিলাম যে, মহান রব আমাকে তোমার মতো একজন ভালো বন্ধু দিয়েছেন, তবে আপনার উদ্বিগ্নতা ও অস্থিরতা দেখে কিছুটা চিন্তিতও ছিলাম।

    প্রিয়,
    অনেকদিন আগে কোথাও পড়েছিলাম একটা পাখি আরেকটা পাখিকে জিজ্ঞেস করেছিল, মানুষ চিন্তিত ও পেরেশান হয় কেন? অন্য পাখিটি একেবারে সাধাসিধে উত্তর দিয়েছিল, মনে হয় তাদের আল্লাহ নেই।

    আমার প্রিয়,
    তুমি চিন্তিত কেন? আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের তো আল্লাহ আছেন, যিনি পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু। যিনি সকল মায়ের অন্তরে মায়া মমতা ঢেলে দিয়েছেন। যার রহমতের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস। যিনি সমস্ত হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া ও হারাম ভক্ষণ করা সত্ত্বেও সর্বদা ক্ষমার চাদরে জড়িয়ে রেখেছেন। যিনি আমাদেরকে জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি মুহুর্তে কৃতজ্ঞতার জীবন দান করেছেন আবার বিপদে ফেলে ধৈর্যের পরীক্ষাও নেননি। যিনি কোনো অধিকার ও চাওয়া ছাড়াই সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে আমাদেরকে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং অধিষ্ঠিত করেছেন আশরাফুল মাখলুকাত তথা সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণির বিশাল মর্যাদায়। মহামহিয়ান ঐ পরম সত্তার জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করা দরকার।

    এরপর
    তিনি আমাদেরকে ইসলাম ও ইমানের মতো মহান নেয়ামতও দান করেছেন বিনা অধিকারে একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে। আবার কোনো রকম যোগ্যতা ছাড়াই আমাদেরকে মুহাম্মাদী উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত করে শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। সকল নবিদের নেতা ও তাঁর প্রিয় রাসুল হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের নবি ও পথপ্রদর্শক বানিয়ে আমাদেরকে প্রথম স্থানে রেখেছেন। সকল আসমানি কিতাবের মধ্যে থেকে কুরআনের মত শ্রেষ্ঠ ঐশী গ্রন্থ দান করেও আমাদেরকে এক নম্বরে রেখেছেন।

    তাছাড়া,
    জলবায়ু ও ভৌগলিক দিক দিয়ে সমগ্র বিশ্বের সেরা সুন্দর ও কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনকারি একটি প্রিয় দেশে তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আবার ভারতের মধ্যে ধর্ম ও পার্থিব জীবনের সকল দিক দিয়ে সবচেয়ে উর্বর একটি অঞ্চলে সৃষ্টি করেছেন। সাথে সাথে চার ইমামের মধ্যে থেকে সবচেয়ে সহজ, সরল ও মধ্যমপন্থা অবলম্বনকারি হানাফি মাযহাবের অনুসারি বানিয়েছেন।

    আমি
    সারা বিশ্বের বহু সংখ্যক আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করে কথাবার্তা বলে ও তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে অত্যন্ত দায়িত্ব ও গুরুত্বের সাথে জানাচ্ছি যে, সমগ্র বিশ্বের উলামায়ে কেরামের মাঝে বিশেষ মর্যাদার অধিকারি, নবি রাসুলের প্রকৃত উত্তরাধিকারি, শাহ্ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ. এর আদর্শে অনুপ্রাণিত, কিতাব ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণ করার চিন্তা ফিকির, ইলম ও আমলের ময়দানে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা, ধর্মীয় জ্ঞানে গভীর পাণ্ডিত্য, ব্যাপক তাকওয়া, দুনিয়াবিমুখতা, আত্মসংযম, আত্মমর্যাদা, স্বনির্ভরতা আর আল্লাহ তাআলার সাথে নিবিড় সম্পর্কের অধিকারি ‘উলামায়ে দেওবন্দের’ সাথে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সম্পৃক্ত করেছেন।

    উপরন্তু,
    সারা বিশ্বের মুসলিম দরদি মহান নেতা, বিশ্বের বড় বড় আকাবির ও মাশায়েখদের মুরুব্বি, মুর্শিদ হযরত মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলি মিঁয়া নদবি রহ. এর সাথে সম্পর্ক করিয়েছেন।

    শুধু এটুকুই নয়,
    বরং আমার মতো এমন নির্বোধ, আহাম্মক, অযোগ্য, যাদের ঘাস কাটারও যোগ্যতা নেই; এমন লোককে শুধুমাত্র নিজের দয়া ও অনুগ্রহে বর্তমান বিশ্বের স্বাভাবিক পরিস্থিতির বিপরীত, সমগ্র দ্বীনের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ এবং আমার নবি সা. এর সার্বক্ষণিক দায়িত্ব ও ব্যস্ততা “দাওয়াত” এর জন্য নির্বাচন করেছেন অথচ আমরা তো দাওয়াতের ‘দ’ পর্যন্ত জানি না।

    একবার
    বুকে হাত রেখে ভেবে দেখো তো; এত সব নেয়ামতে যে আমরা ডুবে রয়েছি, আমাদের চাওয়া-পাওয়া তো দূরের থাক‌ কখনো কি আমরা এসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছিলাম বা স্বপ্ন দেখেছিলাম? তাছাড়া মহান আল্লাহ যদি আমাদের সঠিক জ্ঞান দান করেন, শুভ বুদ্ধির উদয় হয় মন-মস্তিষ্কে, আবেগ-অনুভূতি জেগে ওঠে হৃদ মাঝারে; তাহলে তিনি আমাদের উপর যে পরিমাণ দয়া-অনুগ্রহ করেছেন ও আমাদেরকে যেই ভিভিভিআইপি স্থানে রেখেছেন, সেগুলোর শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা তো থাক শুধু গণনা করতে করতেই জীবন কেটে যাবে।

    মনে রেখো,
    আল্লাহ আমাদের প্রতিপালক। তিনিই সর্বদা আমাদের সকল গুনাহ লুকাতে থাকেন। তিনি যা চান তাই করেন। তিনি সকল শক্তি ও ক্ষমতার মালিক। তার ইচ্ছা ও মহিমা ছাড়া এই পৃথিবীতে একটি পাতাও নড়ে না। তিনি কোনো কিছু করার ইচ্ছা করে ‘হও’ বলতেই সেটা হয়ে যায়। তিনি যদি সকল নবি-রাসুল বিশেষ করে আমাদের নবির সুন্নাতে মাকসুদা ‘দাওয়াত ইলাল্লাহ’র মতো মৌলিক দায়িত্বের কারণে নিজের বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহের ভিন্ন রং দেখাতে কয়েক দিনের জন্য এখানে পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে তো শুকরিয়া আদায় করার পরিবর্তে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা নয়।

    এজন্য
    আমার প্রিয় ছেলে, পেরেশান হয়ো না। আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রাখো। কৃতজ্ঞতায় নত হও। সময় অতিবাহিত হলে বুঝতে পারবে এই সময়গুলো কত রহমত-বরকত ও পুরস্কারে ভরপুর। এখন হয়তো তুমি বুঝতে পারছ না, তবে একদিন অবশ্যই বুঝতে পারবে ইনশাআল্লাহ। যদি বুঝে না আসে, তাহলে দয়াময় রব আমাদেরকে ভিভিভিআইপি বানিয়ে জীবনভর অযাচিত ও অপ্রার্থিত যত নেয়ামত দান করেছেন, সেগুলো ভেবে দেখো। ‘ইমান বিল গায়েব’ তথা অদৃশ্যের বিশ্বাস হিসেবে গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বেশি বেশি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ জিকির করো। জোরে জোরে জিকির করো। খুশিতে থাকো। আনন্দ উপভোগ করতে থাকো। এই চিঠি আমার পরিবারের সদস্য বা অন্তরঙ্গ বন্ধুদের যে কাউকে দিয়ে পড়াতে পারো।

    আচ্ছা,
    আপন হৃদয়ে হাত রেখে একবার ভাবো তো; কোনো আর্জি-আকুতি, স্বত্ব, দাবি, যোগ্যতা, চেষ্টা ও কোনো প্রকার ব্যবস্থাপনা ছাড়াই অর্থ ও জনশক্তির তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও আমাদের মতো ভিতর ও বাহির নোংরা গুনাহে ভরপুর ভাবাবেগবর্জিত মানুষ দ্বারা রাব্বে কারিম ‘দাওয়াতের’ মতো গুরুত্বপূর্ণ এক মহান কাজ—যেটা নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব আর আমাদের নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রধান মিশন, যার নামটাও মানুষের কাছে এক অপরিচিত শব্দ মনে হতো—সেই দাওয়াতের আন্দোলন পৃথিবীর কোনায় কোনায় পৌঁছে দিয়ে একটি বিপ্লব ঘটিয়ে আমাদের মতো নাপাক অধম বান্দাদের একটা সুনাম সুখ্যাতি দান করেছেন। সুতরাং মহান রব আমাদেরকে ভিভিভিআইপি বানিয়ে এক নম্বর স্থানে রেখে এতো বড়, দামি ও শ্রেষ্ঠ নেয়ামত দান করার পর তো উদ্বিগ্ন হওয়ার কী অর্থ?

    প্রিয় পুত্র,
    এটা আমার প্রভুর অনেক বড়ো অনুগ্রহ যে, তিনি আমাদেরকে সর্বদিক দিয়ে প্রথম স্থানে রেখেছেন। ইমান ও ইসলাম সহ অনেক দামি দামি নেয়ামত দান করেছেন। তাছাড়া মুসলমান হওয়া মানেই তো নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করা। আর মুসলিম হওয়ার মজাই তো স্বীয় রবের ইচ্ছার সামনে নিজ ইচ্ছাকে বিসর্জন দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।

    প্রসিদ্ধ বুজুর্গ
    হজরত বাহলুল রহ. কে কেউ জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার অবস্থা কী?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘আপনি কি ঐ ব্যক্তির অবস্থা জিজ্ঞেস করছেন, পৃথিবী ও আকাশ-বাতাস পরিচালনার দায়িত্ব যার হাতে? প্রশ্নকারি লজ্জায় হাত দিয়ে মুখ ঢাকল। বাহলুল রহ. কে বলল, অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করেন। আপনি তো নিজেকে খোদা দাবি করছেন। বাহলুল রহ. উত্তর দিলেন, ‘আমি নিজেকে খোদা বলে দাবি করছি না, বরং আমি দাসত্ব স্বীকার করছি। আমি আমার রবের ইচ্ছার সামনে আমার ইচ্ছাকে ধ্বংস করে দিয়েছি। তার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। তাই এখন মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটছে, এটা আমার ইচ্ছায় ঘটছে।

    ঐ মহান আল্লাহ,
    যিনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতি করুণাময় ও উদার, আমাদের প্রতি রয়েছে যার বিশেষ রহমত; সেই রবের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য যা ফয়সালা হবে, সেটা অবশ্যই আমাদের জন্য সুস্পষ্ট দয়া, অনুগ্রহ আর বিশাল নেয়ামত। সুতরাং অস্থির হওয়া ও পেরেশানি করা একদম ঠিক নয়।

    শোনো,
    এই মামলার সবকিছুই তার ইচ্ছা অনুযায়ী চলছে। তাই আনন্দ-খুশিতে থাকো, জীবনকে উপভোগ করো আর সবকিছু আল্লাহর উপর সোপর্দ করার মজা নিতে থাকো।

    আচ্ছা,
    আশরাফুল মুখালুকাত হওয়া স্বত্বেও কি আমাদের আকিদা ও বিশ্বাস বনের ঐ নিষ্পাপ পাখি থেকে নিচে নেমে গেছে?

    সুতরাং
    উচ্চস্বরে বলতে থাকো,
    যাতেই তুমি রাজি, তাতেই আমি রাজি
    আমার খুশি সেটাই, যেটা তোমার খুশি।

    সালাম।

    ইতি
    আপনার মুহাম্মাদ কালিম।

    তাই আসুন,
    বিপদে ঘেরা এই পৃথিবীতে মহান রবের অগণিত নেয়ামতের কৃতজ্ঞতায় ডুবে গিয়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য কিছু করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শক্ত মনোবল তৈরি করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তার কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে কবুল করুন।

    ………ইবনে নাজ্জার

Skip to toolbar