Profile Photo

Rahman anisurOffline

  • anisur1969
  • Profile picture of Rahman anisur

    Rahman anisur

    3 years, 9 months ago

    বাবুদের তাল পুকুর।
    আনিছুর রহমান
    পাকিস্তান শাসন আমলের শেষের দিকে এবং আমাদের দেশ স্বাধীনতার গোড়ার দিকে কয়েকটি বড় বন্যায় সারা দেশে জানমাল ও ফসলের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই বন্যায় বহু মানুষ গৃহ হারা ও বন্যায় প্রচুর গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটে। ১৯৬৬, ৬৮, ৭০,৭৪ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছর কম বেশি বন্যায় সারা দেশের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল।

    এর পরে যে দুটি বড় বন্যা দেখা দিয়েছিল সেটি হল ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যা। এই বন্যায় সারা দেশের মানুষের দুঃখ কষ্টের সীমা ছিল না। রাজধানী ঢাকা সহ সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্হা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। তখন দেশে বন্যা হলে মানুষের দুঃখ দুর্দশা বেড়ে যেত আর দেশের নিম্নাঞ্চল ৫/৬ মাস পানির নিচে ডুবে থাকত।

    বর্ষাকালে চলাচলের প্রধান বাহক ছিল নৌকা,আর নদী পাড়াপাড়ের জন্য লঞ্চ, ষ্টিমার আর ছোট ছোট ফেরি ব্যবস্হা ছিল গাড়ি পড়াপাড়ের জন্য। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে কলা গাছের ভেলা, সাঁকো ছিল নিম্ন শ্রেণির লোকদের চলাফেরার মাধ্যম। বর্ষাকালে যেমন আনন্দ ছিল তেমনি দুঃখ কষ্ট ও ছিল। মানুষের দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহ খুব দুরূহ ছিল। চাল,ডাল,আটা ময়দা,মাছ পর্যাপ্ত পাওয়া যেত। কিন্তু মানুষের কর্ম সংস্হান থাকত না।

    তাই ঘরে টাকা পয়সার প্রচুর অভাব মানুষের মধ্যে দেখা দিত। সবাইকে ৩/৪ মাস ঘরে বসে বসে কর্মহীন সময় অতিবাহিত করতে হত। যারা ব্যবসা বাণিজ্য করত তারা নৌকা নিয়ে হাট বাজারে সওদা করত। গ্রামের মানুষ নৌকা ও কলা গাছের ভেলা নিয়ে হাট বাজার করে বাসায় ফিরতেন। অনেক কষ্টে মানুষ গরু বাছুর,ছাগল, হাস, মুরগী একত্রে নিয়ে অসহায় অবস্হায় গৃহস্হালির কাজ সম্পন্ন করতেন।
    অবস্হা সম্পন্ন লোকেরা একটু আরাম আয়েশের মধ্যে দিয়ে দিন কাটালেও গরীব মানুষের খুবই কষ্ট ছিল। সাধারণ মানুষ এবং জেলেরা জাল বুনে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করত। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বরষি ঠেলা জাল দিয়ে মাছ ধরে সারাদিন সাঁতার কেটে আনন্দে দিন পাড় করত। এছাড়া নৌকা বাইচ, পানিতে হ্যান্ডবল, লাটিম, লুডো, ষোল কড়ি, চার কড়ি, কুত কুত, চোর ডাকাত, বৌ ছি উঠানে ও ঘরে বসে খেলা ধুলা করে মানুষ সময় অতিবাহিত করত।

    বর্ষাকালে থইথই পানি আর শুষ্ক মৌসুমে খালে বিলে প্রচুর পানি থাকত। আগেকার দিনে গ্রাম অঞ্চলে খালে বিলে প্রচুর পানি থাকলেও সুপেয় পানির বড় অভাব ছিল। প্রত্যেক গ্রামে দুই একটি সরকারি টিউব ওয়েল অবস্হা সম্পন্ন লোকদের বাড়িতে দেখা যেত। আর মধ্য বিত্ত লোকদের বাড়িতে কুয়া, ইন্দিরা (বড়কুয়া) খনন করে পানির সমস্যা দুর করা হত। অনেক সময় দুর দুরান্তে রাস্তা ঘাটে সু হৃয়বান লোকেরা কুয়া কেটে রাস্তায় চলাচল কারী পথিকের জন্য পানির ব্যবস্হা করতেন।

    কালের বিবর্তনে সে গুলো এখন আর দেখা যায় না। শীতকালে গ্রামের খাল বিলে পানি কমে গেলে মানুষ বড় বড় পুকুরে অনেক দুর গিয়ে গোসল করতেন। ব্রিটিশ আমলে আমাদের দেশে হিন্দু ও মুসলিম জমিদার গণ প্রজা সাধারণের গোসল ও চাষ আবাদের জন্য গ্রামে এবং জমিদার বাড়ির আশে পাশে একাধিক পুকুর খনন করতেন।
    এই সব পুকুরে মানুষ গোসল, থালা বাসন ধোয়া সহ দৈনন্দিন গৃহস্হালি কাজে পানি ব্যবহার করতেন।

    যাদের বাড়ির আশে পাশে নদী খাল বিল জলাশয় ছিল তাদের পানির অভাব হত না।

    আমাদের কাশিনাথ পুর অঞ্চলে ব্রিটিশ আমলে কাশি বাবু ও বীরেন্দ্র বাবু নামে দুই হিন্দু জমিদার বসবাস করতেন। ব্রিটিশ সরকার কতৃক নিযুক্ত হিন্দু জমিদার ছিলেন তারা। কাশিনাথপুর বাবু পাড়া বেশ কয়েকটি তাল পুকুর ছিল। বাবু রা গরীব জনগণের কথা চিন্তা করে এবং প্রজা সাধারণের কথা মাথায় রেখে এবং নিজেদের জমিদার পাইক, পেয়াদা, দাসী বাদী দের জন্য শুনা যায় এই পুকুর গুলো খনন করেছিলেন।

    আমাদের আশে পাশের গ্রামের লোক জন শুষ্ক মৌসুম ও শীতকালে এই পুকুরে নিয়মিত গোসল করতেন। জমিদার বাড়ির চারদিকে কাঁচা রাস্তা ও পায়ে হাটার রাস্তাসহ ছিল জনগণের চলাচলের যাতায়াতের ব্যবস্হা। আমরা ছোট বেলায় এই পুকুরে গোসল করতাম। পুকুরের গভীরতা বেশি থাকায় বেশি দুর সাঁতার কাটার সাহস করতাম না। গ্রামের বৌ, ঝি, মহিলাদের জন্য ছিল পৃথক পুকুর ঘাট। বৌ, ঝিয়েরা থালা বাসন ধুয়ে গোসল করে এক হাড়ি পানি কাকে করে বাড়িতে ফিরতেন। এই পানি দিয়ে ডাল, ভাত রান্না করত। পুকুরের পানি আর নদীর পানিতে নাকি ডাল ভালো সিদ্ধ হয় দাদি নানিরা বলতেন। অনেকে আবার বৃষ্টির পানি ধরে রাখতেন রানরনা বান্না করার জন্য।
    এই পুকুর গুলো দেখা শুনা করার জন্য কিছু সর্দার নিয়োগ করা হত। তারা মাঝে মাঝে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হুমকি দিতেন তাড়াতাড়ি গোসল করে চলে যাওয়ার জন্যে।
    পুকুরের চার পাশে তাল, নারকেল, সুপারি ও আম, কাঁঠাল গাছে ভরা ছিল। আমরা ‘সাটিয়াকোলা’ ডাব তলা হতে পূর্ব দিকে রেল লাইনের পাশ দিয়ে নিচু জমির আইল ধরে সোজা বাবু পাড়া পুকুরে যেতাম। গোসল শেষে সোজা মাঠের মধ্য দিয়ে বাড়িতে আসতাম। গোসল করে আসার পথে জঙ্গলে গজে উঠা বড়ই গাছ হতে বড়ই সংগ্রহ করে বন্ধুরা মিলে সবাই খেতাম। আবার জমিতে চাষ করা ধুনে পাতা, ক্ষেত হতে পাকা ছোলা গাছ সহ তুলে এনে নারার আগুনে পুড়িয়ে খেতাম। এগুলো সবই ক্ষেতের মালিকের অগোচরে করা হত। জমির মালিকগণ মাঝে মাঝে দেখে ফেললেও তারা তেমন কিছু বলতেন না। আবার মাঝে মধ্যে বাবু পাড়া পুকুরের ডাব ও কাঁঠাল রাতের অন্ধাকারে আমাদের কিছু বন্ধু পেড়ে আনতেন। এ সব ঘটনা ঠিক চুরির মত হলেও আগেকার দিনের মুরব্বীগণ উচ্চ বাচ্চ করতেন না। তাদের কারো কারো মুখে বলতে শুনেছি ছোট বেলায় তারাও এ সব করেছে। বাবুদের তাল পুকুর পাড়ে তাদের কিছু জীর্ণশীর্ণ বিল্ডিংয়ের ভগ্ন অংশ দেখা যেত। সে গুলো জঙ্গলে ঘেরা থাকায় ভয়ে কেউ প্রবেশ করতে সাহস পেত না।
    বর্ষাকালে বন্ধুরা সবাই মিলে কাশিনাথপুর ফায়ার সার্ভিসের সন্নিকটে মহা সড়কের উপর একটি ব্রীজ ছিল। সেখানে ব্রীজের দুই পাশে নোদাই মন্ডল বাবুর আলির জমির উপর বাঁশের তৈরি যন্ত্র দিয়ে বর্ষাকালে তারা প্রতিদিন মাছ ধরতেন। গাঁয়ের দুষ্টু ছেলেরা নিশি রাতে আখের খেত হতে আখ চুরি করে সেগুলো খেয়ে আবার নোদাই মন্ডলের মাছ চুরি করতেন।

    বাড়িতে ফিরলে মা বাবা অনেক বকাঝকা করতেন। আমাদের লিডার ছিল আমার এক মামাতো ভাই মরহুম ফজলুল হক। খালাতো ভাই মরহুম হাবিল খুব সাহসি ছিলেন।

    আগেই উল্লেখ করেছি বাবু পাড়া বেশ কয়েকটি পুকুর ছিল। সে তাল পুকুর গুলো দেশ স্বাধীনের পরে কেউ কেউ ভূমি রেকর্ড করে নিজেদের নামে অনেকেই রেকর্ড (লিখে) নিয়েছেন। যারা আশে পাশে ছিলেন তাদের দখলে পুকুর গুলো খন্ড খন্ড হয়ে বদ্ধ কানা পুকুরে পরিণত হয়েছে। এক সময় জমির কোনো মুল্য ছিল না তাই প্রভাব শালীরা অনেকেই সে দিকে নজর দেন নাই। এখন ভুমির অনেক মুল্য হয়েছে তাই অনেকই জায়গা কিনে আধুনিক ইমারত নির্মান করেছেন। কাশিনাথপুর নতুন পাড়া ভাঙ্গা বিল্ডিং এর সামনের দিকে পূর্ব দিকে শাহা আলম, ছোরমান মেম্বর (সাবেক) দের বাড়ির দিকে যেতে ডান দিকে জনাব শহীদুল্লাহ ডাক্তার (হোমিওপ্যাথি) বাড়ির সামনে দিয়ে ৫০ গজ অগ্রসর হলে বাম দিকে সেই বড় তাল পুকুরটির অবস্হান। সান বাঁধা বড় দুইটি ঘাট একটি পূর্বদিকে আরেকটি পশ্চিম দিকে ছিল। আরেকটি পুকুর গাজী সেলিম ভাইদের বাড়ির পিছনে ছিল। তিন নম্বর পুকুরটি ছিল বর্তমান বাবু পাড়া মসজিদের বাম দিকে। চতুর্থ পুকুর টি মরহুম সওদগর মোল্লার বাড়ির পাশে অবস্হিত ছিল। পঞ্চম পুকুর টি কাশিনাথ পুর স্কুল ও কলেজের প্রথম কেরাণি মরহুম রিয়াজ উদ্দিনের বাড়ির পাশে। মরহুম রিয়াজ উদ্দিন ছিলেন কাশিনাথপুর স্কুলের সাবেক শিক্ষক ও কেরাণি মরহুম রেজাউল স্যারের বাবা। ঐ পুকুরটি বর্তমান ব্যবহারের উপযোগি আছে কিনা তা এখন জানা নাই। এই হল কাশিনাথপুর বাবু পাড়া তাল পুকুরের অতীত গল্প। এখন হয়ত আর সে তাল পুকুর গুলো নেই। সেখানে চারি পাশে বড় বড় বাড়ি নির্মান করে অতীত ইতিহাস মুছে ফেলা হয়েছে। সত্যি কথা হল ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাস কে অন্ধাকার দিয়ে ঢেকে ফেললেও সেই ইতিহাস অন্ধকার হতে আলোর দিকে মাঝে মাঝে উকি দেয়।

    যবনিকা
    ০৫/০৯/২০২২.

Skip to toolbar