-
সে কাল আর এ কাল
আনিছুর রহমান
আমরা যখন খুব ছোট ছিলাম অল্প অল্প বুঝতে শিখেছি তখন আমাদের দেশের ইসলাম প্রিয় বিশিষ্ট আলেম ওলামাদের মুখে বয়ান শুনেছি ছবি (ফটো) উঠা নাজায়েজ। ক্যামেরায় ছবি উঠা ‘নাজায়েজ’ কথা টার অর্থ তখন আমরা ভালো ভাবে বুঝতাম না।কারন ক্যামেরা কি সেটাই আমরা গাঁয়ের মানুষ জানতাম না। তখন দুই একটি পরি বারে বাঁধাই করা ঝুলন্ত ছবি ঘরের মধ্যে দেওয়ালে দেখতে পেতাম৷। আর হাজিগণ যারা পানি পথে হজ্জ করতে যেতেন তারা ছবি উঠতেন। আমি ষাটের দশকের কথা বলছি ঐ সময় পাকিস্তান আমল ছিল এবং সে সময় মানুষ ঢিলেঢালা পোষাক আর ইসলামী ভাব গাম্ভীর্যের মধ্যে বাবা মায়ের কড়া শাসনে ছেলে মেয়েরা বেড়ে উঠত।
বাবার একটি শখের রেডীও ছিল বাড়িতে। সেই রেডীও তে তিনি নিয়মিত দেশ বিদেশের খবর শিল্পী আব্দুল আলিম, আব্বাস উদ্দিন,ফেরদৌসী রহমান,নীনা হামিদের কণ্ঠে গাওয়া পল্লী গীতি, ভাওয়াইয়া,মুর্শীদি গান শুনতেন।
আমার বড় জেঠা মশাইয়ের কাছে শুনেছি ছোট বেলা বাবা দীলিপ কুমারের হিন্দি ছবি,পাকিস্তানের উর্দু সিনেমা,কমলা সার্কাস,যাত্রা পালা, নাটক এবং মাঝে মধ্যে নায়ক রাজ্জাকের ভালো রোমান্টিক সিনেমা দেখতেন। আমার বাবা মা ভাই সবাই বাড়ীতে নিয়মিত রেডিও শুনে বড় হয়েছি। দেশ স্বাধীনের পরে প্রতি মাসে নাটক মধু মালা,সুজন বাইদার ঘাট,যাত্রার পালা,দুর্বার, অনুরোধের আসর,আবাহনী মোহামেডান চিরো প্রতিদ্বন্দ্বি দুই দলের ফুটবল খেলার ধারা বিবরনী রেডীও তে নিয়মিত প্রচার হত এবং বিনোদন মুলক যে কোন অনুষ্ঠান আমরা শুনতাম।
আমার নানা বলতেন,রেডীও হল শয়তানের বাক্স। এগুলো শোনা হারাম কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ মানুষের বাড়িতে রেডীও ছিল। তাই সবাই নিয়মিত না হলেও মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পরে ও রাত্রে রেডিও শুনতেন।
অন্যদিকে কিছু অভিজাত ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন পরিবার গুলো নিজ বাসায় কলের গান শুনতেন। এক সময় গ্রামো ফোন আবিস্কার হলো এ গুলো যারা ধনীক শ্রেণির লোক তারা রেকর্ড বাজিয়ে বাড়িতে আসর বসিয়ে গান বাজনা শুনতেন।
মৌলানা,আলেমগণ নিয়মিত মসজিদ, মাদ্রাসায় ফতোয়া প্রচার করতেন ও আমরা মুরব্বী দের কাছে শুনতাম গান বাজনা হারাম। সকল ধর্মীয় প্রান আলেম,উলামা, মোল্লা,মসজিদের ইমাম সবাই একই ধরনের ফতোয়া দিতেন এবং বুঝানোর চেষ্টা করতেন বাদ্য যন্ত্র, তবলা, ঢোল বাজিয়ে গান শুনা হারাম। শুধু মাত্র হামদ, নাত, ইসলামী গান শোনা হাদিসে জায়েজ আছে।
আমরা যখন ছোট বেলা নানা বাড়িতে যেতাম তখন খুব হিসেব করে পা ফেলতাম ও ভয়ে ভয়ে কথা বার্তা বলতাম পিছে নানা কিছু বলে বা কোনো প্রকার বেয়াদবি নানার চোখে ধরা পড়ে। নানা মেয়েদের শ্যালোয়ার কামিজ পড়া পছন্দ করতেন না। তিনি সব সময় শাড়ি ও ঢিলে ঢালা কাপড় চোপড় পরিধান করার পক্ষে ছিলেন।
যারা লেখা পড়া করত না,পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকত না তাদেরকে তিনি পছন্দ করতেন না। বাড়ীতে উচ্চ স্বরে কথা বলা,হৈ হুল্লোর করা এগুলো নিষিদ্ধ ছিল। তিনি এগুলো ভালো চোখে দেখতেন না। অর্থাৎ তিনি ছিলেন কনজার্ভেটিভ ভাব ধারার একজন মানুষ।
পুকুড়ে গোসল করার সময় লাফা লাফি পছন্দ করতেন না। মহিলাদের জন্য আলাদা ঘাট ছিল সে ঘাটে পুরুষ কে এলাও করা হত না। যেহুতু আমরা ছোট ছিলাম তাই মা খালা,নানীর সাথে মহিলাদের ঘাটে গোসল করতে কোনো অসুবিধে হত না। তিনি জুয়া খেলা, মার্বেল খেলা,নাচ, গান, মেলা, যাত্রা পালা, নাটক এগুলো মোটেই পছন্দ করতেন না।
আমার বড় মামার ফিলিপ্সের ছোট একটি রেডীও ছিল চামড়া দিয়ে মোড়ানো- মামা যেহুতু প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন ছুটির পর বাসায় আসলে সন্ধ্যা পর খুব সঙ্গোপনে রেডীও শুনতেন। আর মামা যখন থাকত না তখন আমরা মামীর অনু মতি নিয়ে গোপনে গান শুনতাম। বড় মামা ছোট মামা নানার অগোচরে টিভিতে সিনেমা, মঞ্চ নাটক,গান বাজনা বছরে দু’ একবার পালিয়ে গোপনে রাত্রের বেলা দেখতে যেতেন।
সে আমলে শীতকালে গ্রামে গ্রামে ওয়াজ মাহফিল হত পুরো শীতকাল ধরে। তখন গ্রামের সবাই কমবেশী ইসলামী জালসা, ওয়াজ মাহফিল গ্রামের মানুষ রাত জেগে মধ্যরাত পর্যন্ত শুনতেন। তখন আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি ছিল এক ধরনের জুজু বুড়ির ভয়ের মত।
বাড়ীতে বা ক্ষেতে নতুন কোনো শস্য এলে মোল্লা বা ইমাম সাহেবকে না খাওয়ানো পর্যন্ত তা কাউকে আগে খেতে দেওয়া হত না। ধর্মীয় কুসংস্কার গুলি ছিল এ রকম যে কারো কবরকে আঙ্গুল দিয়ে দেখালে আঙ্গুলে কামড় দিয়ে ক্ষমা চাওয়া হত।
দেশ স্বাধীনতার পরে আমাদের দেশে এলো মুভি ক্যমেরা, বাইস্কোপ,টিভি, ও ভিসি আর। যারা একটু সৌখিণ শেণির লোক ছিল তারা টিভি, ভিডিও ক্যামেরা সখ করে ব্যবহার করতেন।
যুগের চাহিদা পুরনে ক্রমে ক্রমে মাইক, ক্যামেরা,ভিডিও ক্যামেরা,ক্যাসেট,টেপ রেকর্ডার,ভিসিপি,সবই এক সময় আমাদের সমাজে চালু হয়ে গেল ও হাতের নাগালে এসে পড়ল। এমুন কি ইসলামী গান বাজনা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান রেকর্ড করে আলেম উলামা সবাই নিয়মিত বাজিয়ে ও শ্রোতাদের শোনাতেন। কেহ কেহ ভাড়া করে ওগোলো এনে বাড়িতে পরিবারের সাথে দেখতেন শুনতেন।
গ্রামের খুব অল্প সংখ্যক লোকের বাড়িতে টিভি ছিল। গ্রামের সবাই মাঝে মধ্যে তাদের বাড়িতে টিভি দেখতে যেতেন। মাঝে মধ্যে টিভির মালিকগণ বিরক্তি বোধ করতেন।
এখনো এ ধরনের ফতোয়া বিদ্যমান ও নিয়মিত শুনা যায়। কিন্তু সমাজের সবাই তা ফলো করে না। আবার অনেক পরিবার অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করে।এখন মানুষের ভিতরে ধর্মীয় বিষয়ে পড়া শোনা, হাদিছ,কোরআন শিক্ষা,কোরআন বিষয়ে বাংলায় তরজমা হাফেজী পড়াসহ এখন দেশে আধুনিক মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নতি ও চরম প্রসার ঘটেছে ঘটছে।
সবাই এখন ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। টিভি মিডিয়া, সংবাদ, বিনোদন, খেলাধুলা, মোবাইল, এনড্রোয়েট স্মার্ট ফোন, ক্যামেরা, সবই এখন মানুষের হাতের নাগালে। এগুলো ছাড়া দেশের নারী পুরুষ সব শ্রেণির মানুষ এমুন কি সারা দুনিয়া একে বাড়ে অচল।
মানুষের হাতে হাতে এখন মুঠোফোন রয়েছে। এই মুঠো ফোন সারা বিশ্বকে হাতের নাগালে নিয়ে এসেছে ঠিক তেমনি কিছু স্মার্ট ফোনের কারনে সমাজে অশান্তি বেড়ে গেছে।
আমাদের দেশের শতকরা ৯০% লোক মুসলমান। সবাই ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলবে এটাই স্বাভাবিক। স্বাধীনতা মানে এই নয় যে যা ইচ্ছা তাই করবে সবাই। রাষ্ট্রে ধর্মের প্রয়োজন আছে। ধর্ম ছাড়া মানুষ বিপথে চলে যায় সমাজে অশান্তি বেড়ে যায়। তাছাড়া মানুষ অসামাজিক কর্ম কান্ডে লিপ্ত হয় এবং সমাজে হানাহানি বেড়ে যায়।
তাই রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে বেহায়াপনা নগ্নতা নয়। স্বাধীনতা মানে উশৃংখলতা নয়, যা খুশি তাই করা নয়। অন্যকে সম্মান দেওয়া নিজের সম্মান বাজায় রাখার নাম স্বাধীনতা।
১১/০৯/২০২২.
Friends
Shubha-Jit-Datta
@shubha-jit-datta
Raju Barua
@raju-barua
রিফাত মাহমুদ
@rifat-mahmud
ফারুক আব্দুল্লাহ - Faruq Abdullah
@faruq-abdullah
সাকিব-উন-নবী দীপ্ত (নির্বাক)
@sakib-un-nabi-dipto
Kazi Adam
@kaziadam
এম.আর মুহাম্মাদ ইস্রাফীল
@misrafil420
মোঃ আরিফুল ইসলাম
@ammouriful
শাহাদাতুর রহমান সোহেল
@sr-sohel

