Profile Photo

Taufiq-Al-SadifOffline

  • Taufiq-Al-Sadif
  • Profile picture of Taufiq-Al-Sadif

    Taufiq-Al-Sadif

    3 years, 11 months ago

    আমি মারা গেছি আধ ঘন্টা আগে। এখন বসে আছি বাথরুমের কমোটের ওপরে। বসে আছি বলা ঠিক হচ্ছে না। এখন আমার কোনো শরীর নেই! আমার দেহটা পড়ে আছে বাথরুমের ফ্লোরে। এখনো বাথরুমে কেউ আসেনি। আসলে লাশটা দেখতে পেত।
    ভেবেছিলাম মৃত্যুটা খুব ভয়ংকর কিছু হবে। মৃত্যু আসলে তেমন কিছুই না। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ার মতো। একটা সময় সম্পূর্ণ শরীর নিস্তেজ হয়ে গেল। তারপর হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখি আমি আমার শরীরের বাইরে চলে এসেছি। দেহের মধ্যে ঢুকার চেষ্টা করলাম ঢোকা যাচ্ছে না।
    আমার মৃত্যুটা সম্মানজনক হয়নি! হারপিক খেয়ে মরে গেছি! হারপিক খেয়ে মরার কথা না। কেন জানি আমি মরে গেলাম! ঠিক বুঝতে পারছি না। এই সংবাদটা মানুষকে জানান ঠিক হবে না। হারপিকের দাম বেড়ে যাবে।
    ইচ্ছে করলে আমি এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারি। আমি এখন বাতাসের মতো হয়ে গেছি। এ অবস্থাটা খারাপ লাগছে না। আমি অপেক্ষায় আছি লাশটা কে আগে দেখবে। অবশ্য বাথরুমের দরজা লাগান আছে। এমনিতে আমি বাথরুমের দরজা লক করি না। এই জন্য আম্মুর অনেক বকা শুনেছি। একবার এমন বাথরুমের দরজা খোলা রেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুল স্পিডে পানি ছাড়ছি। এ সময় আমার খালাত বোন নিশি বাথরুমে হাজির!
    নিশি আমার দিকে তাকিয়ে আছে আমি ওর দিকে নীচে পানি পড়ছে! ত্রিশ সেকেন্ড এমনেই কেটে গেল। তারপর মেয়েটা বিকট চিৎকার করে উঠল। আওয়াজ শুনে পানি পড়া বন্ধ হয়ে গেল! দ্রুত দরজা বন্ধ করলাম। এরপর থেকে আমার খুব ইচ্ছেছিলো নিশির বাথরুমে এমন করে হাজির হওয়া। কিন্তু মেয়েটা আমার মতো না। সবসময় দরজা লাগিয়ে রাখে! এখন অবশ্য যাওয়া যাবে।
    কয়টা ভাজে জানতে পারলে ভালো হতো। সময় জেনেই বা কী করবো? আমার তো এখন কোনো তাড়া নেই।
    মা মনে হয় ঘুম থেকে এখনো উঠেনি। মা আমার ঘরে আসবে সকাল নয়টার সময়। বাবা দেশে নাই। আমেরিকা গেছে ব্যবসায়িক কাজে। বাড়িতে কাজের একটা মেয়ে আছে। নাম কুলসুম। বয়স বেশি না পনেরো ষোল হবে। কুলসুম আমার ঘরে প্রায়ই আসে। আমার বাথরুম ব্যবহার করে। একদিন ঘুমিয়ে আছি হঠাৎ হিস হিস শব্দে ঘুম ভেঙে গেল! আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সাপ চলে এসেছে মনে হয় ঘরের মধ্যে। ধরফর করে উঠে বসেছি। একটু পরে দেখি কুলসুম আমার বাথরুম থেকে বের হচ্ছে!
    বাথরুম থেকে বের হয়ে আসলাম। দরজার ফুটো দিয়ে চলে এসেছি। দরজাটা খোলার চেষ্টা করলাম পারলাম না! দরজাটা ভাঙতে হবে। একজন মিস্ত্রী খবর দিলে ভালো হয়। আমার মোবাইলে অবশ্য একজন মিস্ত্রীর নাম্বার আছে। একটা কল দিয়ে আসতে বললে হয়। কল দিতে পারব বলে মনে হয় না! আমার তো হাত পা কিছুই নাই!
    কুলসুম হাঁড়ি পাতিল ধুচ্ছে। আমি কুলসুমের কাছে গিয়ে ডাকলাম, “কুলসুম। ”
    কোনো জবাবা দিলো না! আমি ডাকলে দৌড়ে ছুটে আসে। এখন আ্মার ডাকে সাড়াই দিলো না!
    আমি আবার ডাকলাম, “কুলসুম। ”
    কুলসুম কোনো সাড়া দিচ্ছে না। আমার কথা মনে হয় ও শুনতে পাচ্ছে না!
    আমার মা ঘুম থেকে উঠেছে। মাকে খুব সুন্দর লাগছে! এতটা ভালো করে মাকে কখনো দেখা হয়নি। মা রান্নাঘরে এসে আটা মাখছে আমার জন্য পরোটা বানাবে মনে হয়। কড়া ভাজি পরোটা খেতে আমার ভালো লাগে!
    মা কুলসুম কে জিজ্ঞেস করল, “বাবু উঠছে? ”
    “জানি না খালাম্মা। ”
    “যা দেখে আয়।”
    কুলসুম আমার রুমের দিকে যাচ্ছে। মা একটা পাতিলে গরম পানি বসাল। গরম পানি দিয়ে ময়দা মাখবে।
    কুলসুম ফিরে এসেছে। ও কি আমার লাশটা দেখতে পেয়েছে? মনে হয় পায়নি। পেলে চিৎকার করত।
    “বাবু ভাই বাথরুমে। ”
    “আচ্ছা ঠিক আছে। ”
    আমার মা এখন পরোটা ভাচ্ছেন। মচমচে পরোটা। সাথে কী রাঁধবেন মা? মনে হয় আলু ভাজি। চিকন করে কাটা আলু সাথে গাজর দিবে অল্প করে। এই ভাজি দিয়ে পরেটো খেতে কী যে ভালো লাগে! আর মনে হয় খেতে পারব না! পরোটা ভাজা শেষ। মা এখন ভাজি বসাল চুলায়। ভাজি নারছে একটা খুন্তি দিয়ে আমি মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। মায়ের রান্না দেখতে খুব ভালো লাগছে! আগে কখনো দেখা হয়নি! জীবনের অনেক সুন্দর সুন্দর জিনিস আমাদের দেখাই হয় না!
    মা রান্না শেষ করে ফেলেছে। মা আমার রুমের দিকে যাচ্ছে। আমার রুমে ঢুকল মা। কেমন অবাক দৃষ্টিতে সারাঘরটা দেখছে! এতটা সময় আমার বাথরুমে থাকার কথা না। মা জানে আমার বাথরুম করতে খুব কম সময় লাগে। গোসলও করি অল্প সময়ে। বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মা ডাকল, “বাবু।”
    কোনো সাড়াশব্দ নেই। কে জবাব দিবে! আমি তো মায়ের পাশেই দাঁড়িয়ে আছি। মাকে চিন্তিত মনে হচ্ছে! মা আবার ডাকল,” বাবু।”
    মা দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে গেল। কুলসুমকে ডাকল, “কুলসুম তাড়াতাড়ি কেয়ারটেকারকে ডেকে নিয়ে আয়। আমার বাবুর জানি কী হয়েছে!” মায়ের গলা কেমন ভারি হয়ে গেছে!
    কেয়ারটেকার এসে দরজা ভেঙে ফেলল। আমার পড়ে থাকা লাশ দেখে আমার মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন! আমাকে এম্বুলেন্স করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। আমার মায়ের এখনো জ্ঞান ফেরেনি! আমি বাসাতেই আছি মায়ের সাথে। আমার বডি নিয়ে গেছে!
    মায়ের জ্ঞান ফিরেছে। মা মনে হয় হাসপাতালে যাবে। বাবাকে কল করে জানান হয়েছে। সব মিটিং বাতিল করে বাবা বাংলাদেশে রওয়ানা হয়েছেন।
    মা গাড়ি বের করেছে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য। আমি গাড়িতে না উঠে উড়ে উড়ে যাচ্ছি। বাঃ! দারুণ লাগছে!
    আকাশ পথে হাসপাতাল চিনতে পারছি না! মায়ের গাড়িটাও দেখা যাচ্ছে না। একজন বৃদ্ধ লোক এসে আমাকে বলল, “এই খোকা।”
    আমি ওনার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, উনিও আমার মতো বাতাসে উড়ছে। উনিও মনে হয় মারা গেছেন!
    আমি লোকটার সামনে গেলাম। উনি আমার কপালের দিকে তাকালেন। এটা মনে হয় ঠিক হলো না। আমার তো কোনো শরীর নেই! কপাল আসবে কোথা থেকে!
    “তোমার নাম কী? ”
    “রায়হান।”
    “তুমি এখানে কেন! তোমার তো এই জগতে আসার সময় হয়নি। কে তোমাকে এখানে এনেছে? ”
    “আমি কিছুই জানি না।”
    “চলো আমার সাথে।”
    “কোথায় যাব। আঃ কথা বলো না। তাড়াতাড়ি চলো না হলে বিপদে পড়ে যাবে।”
    “মৃত্যুর পরে আবার কী বিপদ!”
    “বোকা ছেলে বলেটা কি! মৃত্যুর পরেই তো বিপদ শুরু! মানুষ যদি একবার দেখতে পারত জীবনেও মরতে চাইত না।”
    “কী বলেন! আমার তো ভালোই লাগছে! কী সুন্দর আকাশে উড়তে পারছি।”
    “বেশিক্ষণ পারব না। ধরে নিয়ে সোজা মাটির নীচে পুতে রাখবে!”
    “আপনি বের হলেন কী করে?”
    “মাটিতে পঁচে ভুত হয়েছি। কত হাজার বছর মাটির মধ্যে ছিলাম তার ঠিক নেই!”
    “চলো সময় নষ্ট করো না। কী দরকার সময় থাকতে আগে আগে কষ্টের মধ্যে পড়ার!”
    আমরা উড়তে উড়তে হাসপাতালে চলে এসেছি। এ সময় বিশাল লম্বা একজন আসল। উনিও আমাদের মতো বাতাস। কী ভয়ংকর চেহেরা। আমাকে বলল,” এই ছেলে চল।”
    বয়স্ক লোকটা বললেন, “ওর এখনো সময় হয়নি!”
    “ও তো সেচ্ছায় এসেছে।”
    “বললেই হলো! হারপিক খেলে কেউ মরে নাকি! তুমি ওকে জোর করে নিয়ে এসেছ। এই ছেলে যাও শরীরে ঢুকে পড়।”
    আমি বৃদ্ধ লোকটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
    “কী হলো ঢোক তাড়াতাড়ি। ”
    “কী করে ঢুকব?”
    “নাকের ফুটা দিয়ে ঢুকে পড়।”
    ভয়ংকর লোকটা বলল, “খবরদার এ জগতের কথা কাউকে বলবে না।”
    বৃদ্ধ বলল,” নাক দিয়ে সোজা হার্টে চলে যাবা। এমন ভুল আর করবা না।”
    আমি নাকের ফুটো দিয়ে ঢুকে পড়লাম। ভিতরে ঢোকার সাথে আমি আবার দেহ হয়ে গেলাম। চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি।
    আমার বাবা মা কাঁচের মধ্যে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একজন ডাক্তার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার, ছেলেটা তো এখন বেঁচে আছে।”
    আমার হার্ট চলতে শুরু করেছে। এসময় দেখলাম মায়ের পাশে নিশি দাঁড়িয়ে আছে। আমার একটু দুঃখ হলো! নিশির প্রতিশোধটা নেয়া হলো না! এসুযোগ আর পাওয়া যাবে না! একবার ঢু মেরে আসলেই হতো। মেয়েটাকে খেপানো যেত। আমাকে সবসময় পঁচায়!

Skip to toolbar