Profile Photo

mahamuda khaunOffline

  • mahamuda
  • Profile picture of mahamuda khaun

    mahamuda khaun

    3 years, 8 months ago

    পোড়োবাড়ির_রহস্য
    পর্ব_ছাব্বিশ +সাতাশ

    ছেলেটি উপর থেকে মৃদু চিৎকার করে দারোয়ানকে বলল, আসগর চাচা! আংকেলটাকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছেন না কেন?
    বড় সাবের বারণ আছে। আসগর চেহারায় গম্ভীর ভাব রেখে উত্তরটা দিলো।
    উনিতো বাবার কাছে এসেছে। বাবা উনাকে আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলেছে। তাহলে কি উনি রাস্তায় বসে অপেক্ষা করবেন? কথাটা বলেই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত গতিতে নিচে নেমে আসলো ছেলেটা। আজাদ চৌধুরীর কাছে এসে তাকে সালাম দিয়ে বলল, আংকেল আপনি আমার সাথে ভেতরে চলেন।
    আজাদ চৌধুরী কোমলতার সাথে ছেলেটার সালামের উত্তর দিলো এবং ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, আমি একটু আসছি। গাড়িতে আমার সহকারী বসে আছে। ওর সাথে একটা প্রয়োজনীয় কথা বলা দরকার।
    অয়ন মুচকি হেসে বলল, ঠিক আছে আংকেল, আপনি কথা বলে আসেন, আমি আপনার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি। আজাদ চৌধুরী একটা বিনিময় হাসি দিয়ে গাড়ির কাছে চলে গেলেন। লিটনকে কিছু একটা বলে গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে বলল, চল যাওয়া যাক। তার আগে আমাদের নিজেদের মধ্যে পরিচিত হওয়া দরকার, কি বল? আজাদ চৌধুরী আসার সময় ক্যাটবেরী চকলেট আর আইস্ক্রিম আনতে ভোলেনি। ছেলেটার দিকে চকলেটের বক্সটা এগিয়ে দিয়ে বললো আমি আজাদ চৌধুরী। তোমার নামটা কি বাবা? এই নাও এটা তোমার জন্য।
    চকলেটের বক্স হাতে নিয়ে গাল ভরে হেসে দিলো ছেলেটা। হাসিটা ধরে রেখেই বলল, আমার নাম অয়ন শেখ।
    আজাদ চৌধুরী সবটাই জানে, তবুও জিজ্ঞাসা করলো তুমি কি একা নাকি আরও ভাইবোন আছে?
    অয়নের আজাদ চৌধুরীকে খুব পছন্দ হয়েছে। উচ্ছ্বাসের সাথে বলল, আমরা তিন ভাইবোন। সবার বড় ভাইয়া আয়মান শেখ, আপু অরিন মেহজাবিন আর আমি অয়ন শেখ।
    কথা বলতে বলতে তারা বসার ঘরে ঢুকলো। বসার ঘরের পাশেই ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা আছে। বসার ঘরে কিছুক্ষণ বসে অয়ন, আজাদ চৌধুরীকে সেখানে নিয়ে গিয়ে বলল, আংকেল আসেন টি টি খেলি। বেশ কিছু সময় ধরে অয়নের খেলার পর আজাদ চৌধুরী ওকে জিজ্ঞাসা করলো, অয়ন তোমার আজকে স্কুল নেই?
    হ্যা আছেতো!
    তবে তুমি এখন বাসায় কেন? আজকে স্কুলে যাওনি?
    না যাইনি। আপুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ তাই আমারও স্কুলে যাওয়া বন্ধ।
    কেন তোমার আপুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ কেন?
    আপুকে অপহরণকারীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। তারপর কারা যেন উদ্ধার করে বাসায় দিয়ে গেছে আমি জানিনা। আব্বুকে বলে গিয়েছে আপু যেন একদমই বাইরে না বের হয় এবং আপুর ফিরে আসার কথা যেন কেউ জানতে না পারে। জানেন সেদিন আমি স্কুলে গেলে আমাকেও ধরে নিয়ে যেতো। কিন্তু আমার জ্বর ছিলো তাই আমি সেদিন স্কুলে যাইনি। আপুকে না পেয়ে আব্বু আম্মু সে কি কান্না!
    তোমার আব্বুও জানেনা কারা উদ্ধার করলো বা কারা ধরে নিয়ে গিয়েছিলো?
    না তা জানেনা। তবে সবার ধারণা আব্বু অনেক বড় ব্যবসায়িতো! তাই হয়তো কেউ মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবী করার জন্য ধরে নিয়ে গিয়েছিলো।
    তাও হতে পারে। আচ্ছা তোমার বাবা বলেছিলো আধঘণ্টার মধ্যেই চলে আসবে। কিন্তু এখনও আসলোনা।
    বাবা খুব ব্যস্ত মানুষ। রাত দশটার আগে বড় ভাইয়া আর বাবাকে দেখাই যায়না।
    আর মা? তোমার মা নিশ্চয় তোমাদের সাথে থাকেন?
    না, মাওতো চাকরি করে। তবে মা সন্ধ্যার আগেই চলে আসে। তবে আজকে মামনিরও দেরি হবে।
    তাহলে তোমাদের কে দেখাশোনা করে?
    রিমা খালা, পুতুল আপু আর নানুমনি এই তিনজন আমাদের দেখাশোনা করে।
    ও আচ্ছা। কথা বলতে বলতে আজাদ চৌধুরি সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। বসার ঘরের সাথে একটা গোল বারান্দা আছে। আজাদ চৌধুরী সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, বাড়িটার নকশাটা খুব সুন্দর!
    নিচের থেকে উপরটা বেশি সুন্দর। উপরে যাবেন?
    না সেটা ঠিক হবেনা।
    কিছু হবেনা আংকেল। কথাটা বলে আজাদ চৌধুরীকে একপ্রকার টেনেই উপরের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। বাড়িটা ঠিক ডুপ্লেক্স না, আবার ডুপ্লেক্স। দোতলায় উঠার সিঁড়িটা বসার ঘরের সাথে যে করিডোরটা আছে সেখানকার দেয়াল ঘেঁষে বানানো হয়েছে। আজাদ চৌধুরী অয়নের সাথে সিঁড়ির ধাপগুলো পেরিয়ে উপরে চলে আসে। উপরে ডাইনিং রুমের সাথে একটা ছোট বসার ঘর আছে। অয়ন তাকে নিয়ে সরাসরি খাওয়ার ঘরে গিয়ে বসালো। রিমা খালাকে ডেকে বললো এই আংকেলটা আব্বুর সাথে দেখা করতে এসেছে। আব্বু অপেক্ষা করতে বলেছে। তাই আমি উপরে নিয়ে আসলাম। কিছুক্ষণ পর অরিনকে ডেকে নিয়ে এসে বলল আংকেল এই যে আমার আপু। আজাদ চৌধুরী অয়ন এবং অরিনের সাথে অনেকক্ষণ ধরে নানারকম গল্প করলো। গল্পের এক পর্যায়ে ওদেরকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমারা নলডাংগার রাজবাড়িটা দেখেছো?
    ওরা দুজনেই বললো, নাতো! আসলে আব্বু আম্মু এতোটাই ব্যস্ত থাকে আমাদের তেমন সময় দিতে পারেনা। তবে ঘুরতে নিয়ে যায়না তা কিন্তু না। প্রতি বছরই আমরা ঘুরতে যাই। তবে সেটা কাছের কোন জায়গা না, দূরে কোথাও। যেমিন গত বছর আমরা দার্জিলিং গিয়েছিলাম। একটানে কথাগুলো থামলো অয়ন।
    আজাদ চৌধুরী খেয়াল করল অরিন কোন কথাই বলছেনা। ওকে উদ্দেশ্য করেই বলল, অরিন তোমার কি মন খারাপ?
    ও মুচকি হেসে বলল, না তেমন কিছুনা।
    আমার তোমার মত একটা মেয়ে আছে। তবে ওর বয়স মাত্র দশ। কথা বলার ফাঁকে লিটনকে মেসেজ পাঠিয়ে বলল; ‘ আমাকে ফোন কর।’
    কিছুক্ষণের মধ্যেই বিরস শব্দ করে আজাদ সাহেবের ফোনটা বেজে উঠলো। ‘এক্সকিউজ মি’, অরিন এবং অয়নের উদ্দেশ্যে কথাটা বলে আজাদ চৌধুরী ফোনটা রিসিভ করে বলল, হ্যালো কে বলছেন? ও স্যার! এটা কার নাম্বার? ও আপনি সিঙ্গাপুরে চলে গেছে। এই সপ্তাহটা ওখানেই থাকবেন? তাহলেতো আজকে আর দেখা হবেনা। আমি কি করছিলাম এতক্ষণ? অয়ন আর অরিনের সাথে কথা বলছিলাম। স্যার আপনার বাচ্চা দুইটা না খুব মিষ্টি। কথাগুলো বলে আজাদ চৌধুরী কিছুক্ষণের জন্য থামলেন। মনে হচ্ছে ওপাশের কথা শুনছেন মনোযোগ দিয়ে। প্রায় মিনিট তিনেক চুপ থাকার পর আবার কথা বলা শুরু করলেন। স্যার, আপনি একদমই চিন্তা করবেননা। আমি ওদেরকে বুঝিয়ে বলে মিটিংটা পরের মাসে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবো। ধন্যবাদ স্যার বলে ফোনটা রেখে দিলো আজাদ চৌধুরী।
    সরি, তোমরা কি খুব বিরক্ত বোধ করছিলে? আজাদ চৌধুরী ফোনটা রেখে অরিন ও অয়নকে জিজ্ঞাসা করলো।
    নাতো! বিরক্ত হবো কেন? আপনি কি বাবার সাথে কথা বলছিলেন? এতক্ষণ পর নিজে থেকে এতো বড় বাক্য উচ্চারণ করলো অরিন।
    হ্যা, স্যারের সাথে কথা বলছিলাম।
    বাবা সিঙ্গাপুর গেছে, আপনি জানতেননা?
    নাহ্‌। উনিইতো সকালে আমি যখন ফোন করে জানালাম আজকে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে, সেজন্য আমি এখন আপনার বাসায়, তখন উনি আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন। বললেন, ‘আধঘণ্টার মধ্যে আমি চলে আসবো’
    অরিনের এতক্ষণ লোকটাকে সন্দেহ হচ্ছিলো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আব্বু যে সিংগাপুর গেছে এটাতো ঠিক কথা। যদি লোকটাকে নাই জানাতো তবে জানলো কীভাবে?
    তাহলে আমি এখন আসি। লোকটার কথা শুনে অরিনের ভাবনায় ছেদ পড়লো। হাসি দিয়ে বলল, ঠিক আছে আসুন। ঘর থেকে বের হয়েই যাচ্ছিলো আজাদ চৌধুরী। যাওয়া থামিয়ে বলল, আজকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার হাতে সময় আছে। তোমরা যদি নলডাংগা রাজবাড়ি দেখতে চাও আমি তোমাদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে পারি। আমার সাথে গাড়ি আছে।
    তাহলেতো খুব ভালো হয়। আপু তুই যাবি? সোৎসাহে কথাটা বলল অয়ন।
    অরিনের লোকটাকে আবার সন্দেহ হতে লাগলো। অপহৃত হওয়ার পর ওর অচেনা মানুষ দেখলেই সন্দেহ হয়। আর তাছাড়া যতই আব্বুর পরিচিত হোকনা কেন, একজন স্বল্প পরিচিত মানুষের সাথে কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। অয়নের স্বভাবটাই এমন। সহজে মানুষের সাথে মিশে যাবে। অয়নকে মৃদু ধমক দিয়ে বলল, না অয়ন, আমরা কোথাও যাচ্ছিনা। আংকেল আপনি মন খারাপ করবেন না।
    কেন আপু আম্মুকে ফোন করে অনুমতি নিয়ে নিলেইতো হয়। কথাটা বলতে দেরি কিন্তু কর্ডলেসটা হাতে নিয়ে মাকে ফোন করতে দেরি হয়না অয়নের। দুই তিনবার ফোন করার পর মায়ের ফোন বন্ধ পেয়ে হতাশ হয়ে বলল, ফোন বন্ধ আপু!
    অরিন আজাদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল, আংকেল আজ থাক। আপনি অন্যদিন আসেন, আমরা সবাই মিলে আপনার সাথে রাজবাড়ি দেখার জন্য যাবো।
    আজাদ চৌধুরী স্মিত হেসে বললেন, ঠিক আছে , অন্যদিন নিয়ে যাবো। মনে মনে খুব হতাশ হলো। এই পদ্ধতিতে কাজ হলোনা তাতে কি? ব্যাগ থেকে একটা ক্যাটবেরির বক্স বের করে অরিনকে দিয়ে বলল, এটা তোমার জন্য। দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। স্পেশাল করে বানানো। মুখে নিলে একদম গলে যায়। একটা খেয়ে দেখো।
    চকলেট অরিনের খুবই প্রিয়। চকলেট পেলে আর মাথা ঠিক থাকেনা। বক্স থেকে একটা চকলেট নিয়ে মুখের মধ্যে পুরে চোখ বন্ধ করে ফেললো। অরিন চকলেটটা শেষ করে বলল, আংকেল ধন্যবাদ।
    আজাদ চৌধুরী পাল্টা ধন্যবাদ দিয়ে বলল, তাহলে আমি এখন আসি। অরিন এবং অয়ন তাকে বিদায় দেওয়ার জন্য নিচ পর্যন্ত আসলো। গেট দিয়ে ঢুকে একটা লন পেরিয়ে একটা করিডোর। লম্বা করিডোরের পরেই বসার ঘর। করিডোরে ঢোকার মুখে একটা কেচি গেট লাগানো। অরিন এবং অয়ন আজাদ চৌধুরীকে বিদায় দেওয়ার জন্য লন পর্যন্ত চলে আসলো। হঠাৎ আজাদ চৌধুরী পকেটে হাত দিয়ে বলল, অয়ন আমার মোবাইলটা বোধহয় উপরে রেখে এসেছি। পকেটেতো পাচ্ছিনা।
    আপনি দাঁড়ান আমি নিয়ে আসছি বলে অয়ন দৌড়ে উপরে চলে গেলো। ঠিক তখনই চারজন লোক এসে দুইজন দারোয়ানকে ধরে রাখলো এবং দুইজন মুখে রুমাল চেপে অরিনকে ধরে নিয়ে গেলো। আজাদ চৌধুরী কেচি গেটে তালা লাগিয়ে অয়ন আসার আগেই সেখান থেকে চলে গেল। সব কাজ মুহূর্তের মধ্যে করে ফেললো তারা। অয়ন উপরে গিয়ে কিছুক্ষণ ফোনটা খুঁজতে থাকে। সেই সময়টাতেই কাজটা সম্পন্ন করে অপহরণকারীরা। অয়ন যখন ফোন পাচ্ছেনা এই কথাটা বলার জন্য নিচে নামলো তখন ও দেখলো সেখানে আজাদ চৌধুরী বা তার আপু কেউই নেই। আর গেটের সামনে চেতনাহীন অবস্থায় দারোয়ান আংকেল পড়ে আছে। ও চিৎকার করে বলতে থাকলো, আপু আপু………।

    পর্ব_সাতাশ
    #পোড়োবাড়ির_রহস্য
    #মাহামুদা_খাতুন
    #পর্ব_সাতাশ
    তালহার হিশাব অনুযায়ী বিকাল চারটায় নলডাংগা বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছানোর কথা থাকলেও তালহাদের বাস যখন বাস স্ট্যান্ডে এসে থামলো তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটা বাজে। বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করে একটা অটো নিয়ে কাজিপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হল ওরা। নামজ পড়া শেষ করে অটো খুঁজতে গিয়ে আরও আধঘণ্টা ব্যয় হলো। তালহা ড্রাইভারকে জোরে চালাতে বলে দিলো। কাজিপাড়া এসে ‘ আপন নীর’ এর সামনে যখন পৌছালো তখন প্রকৃতিতে সন্ধ্যার ঘণ্টা বেজে গেছে। তালহা অটোটা ছেড়ে দিয়ে দারোয়ানের সাথে কথা বলার জন্য গেটের কাছে গেলো। গিয়ে দেখলো দারোয়ান কাঁচুমাচু ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে আর তার সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে তাকে উত্তেজিতভাবে বকে যাচ্ছে।
    ওরা একটু ভেতরের দিকেই ছিলো। তালহা গেটটা খোলাই পেলো। আরও সামান্য ফাঁকা করে ভেতরে ঢুকে পড়লো তালহা। কি হয়েছে বিনয়ের সাথে লোকটার কাছে জানতে চাইলো।
    তাদের কথার মধ্যে অযাচিতভাবে তালহার অনুপ্রবেশ একদমই পছন্দ হয়নি লোকটার। আসগরের সাথে তালহাকেও ধমক দিয়ে বললেন, এই ছেলে কে তুমি? এমন করে মানুষের বাসায় ঢুকে পড়তে হয় নাকি? ঢোকার আগে অনুমতি নিতে হতে সেটা জানা নেই তোমার।
    তালহা ওর আচরণের কারণে লজ্জিত হলো। ক্ষমা চেয়ে বিনয়ের সাথে বলল, আমি তালহা, অরিনকে আমিই উদ্ধার করে এনেছিলাম। অপহরণকারিদের আজকে ওকে নিয়ে বিদেশী ডেলিগেটসদের কাছে হস্তান্তরের কথা ছিলো। ওরা যখন অরিনকে পাবেনা তখন ওরা ওকে আবার অপহরণ করতে চাইতে পারে। সেই কারণে সতর্ক করার জন্য আমি আংকেলকে অনেকবার ফোন করেছিলাম। কিন্তু প্রতিবারই উনার ফোন বন্ধ পাই। তাই ছুটে আসলাম। অরিন ঠিক আছেতো! কোন ভণিতা না করে এক নিঃশ্বাসে দরকারী কথাটা বলে ফেললো।
    লোকটা তার ভুল বুঝতে পেরে তালহার দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে বলল, আমি রাজন চৌধুরী, অরিনের মামা। পরিচয় দেওয়ার পর সকাল থেকে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা তালহাকে খুলে বলল।
    ঘটনাটা শুনে তালহার মনে হলো আর এক মুহূর্ত এখানে দাঁড়ানো উচিৎ হবেনা। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল, আমাদের তাহলে এখুনি যেতে হবে। কাজটা সফলভাবে শেষ করে আসবো ইনশাআল্লাহ্‌। তখন নিশ্চয় আপনার সাথে আবার দেখা হবে?
    ইনশাআল্লাহ্‌ আআমদের আবার দেখা হবে খুদে গোয়েন্দা! তখন তোমাদের সাথে খোশ আমেজে গল্প করা যাবে। এখনকার জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ অরিনকে উদ্ধার করা। আমিও তোমাদের সাথে যেতে চাই। আর পুলিশেও খবর দেওয়া উচিৎ।
    কিন্তু মামা, আমরা যেখানে যাচ্ছি তাদের বিরুদ্ধে আমাদের কোন প্রমাণ নেই। তাই পুলিশ দেখলে ওরা সতর্ক হয়ে অরিনকে লুকিয়ে ফেলবে। তখন আমাদের আর কিছুই করার থাকবেনা। তাছাড়া এসব পুলিশ টুলিশে কোন কাজ হবেনা। ওদের আরও উঁচু দরের মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক আছে। আমি আপনাকে জানাবো। আর তাছাড়া এখানকার পুলিশ সুপার আর অসির সাথে আমার কথা হয়েছে। উনারা আমাদের যেকোন প্রয়োজনে পাশে থাকবেন বলে কথা দিয়েছেন। দুজনই খুব সৎ। এই প্রফেশনে এমন সৎ ও বিনয়ী মানুষ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
    তাহলে তোমার উপর ভরসা করতে পারি?
    জ্বি, আল্লাহ্‌র রহমতে আপনি আমাদের উপর ভরসা করতে পারেন। মামা আমি এবার আসি। বাইরে আমার বন্ধুরা অপেক্ষা করছে। এই যে আমাদের কার্ড, পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে রাজন চৌধুরীকে দিয়ে কথাটা বলল তালহা।
    এই যে আমার কার্ড। নিজের কার্ডটা তালহাকে দিলো রাজন চৌধুরী।
    তালহা কার্ডটার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি সাইন্টিস্ট!
    হ্যা।
    আপনার সাথে আমার আবার দেখা করতেই হবে। এখন তবে আসি বলে তালহা রাজন চৌধুরীর কাছ থেকে বিদায় নিলো।
    ঠিক আছে এসো। আল্লাহ্‌ তোমাদের সহায় হোক। পেছন থেকে চিৎকার করে কথাটা বলল রাজন চৌধুরী।
    কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে আসলো তালহা। দারোয়ানের সাথে কথা বলা দরকার। মুখটা পাংশু করে বসে লোকটা। একটু আগে রাজন মামার কাছ থেকে খাওয়া ধমকটা এখনও হজম করতে পারেনি। এখনও চোখে-মুখে তার রেশ রয়ে গেছে। বসে বসে ঝিমাচ্ছে। এসব বসা কাজে ঘুমানো ছাড়া আর কোন কাজ থাকেনা। তালহা আসগর চাচা বলে ডাক দিতেই লোকটা ধড়ফড় করে উঠলো। তালহার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে বলল, আমাকে কিছু বলছো বাবা?
    তালহার মনে হলো লোকটা এখনও ঘোরের মধ্যে আছে। লোকটা ওর দিকে তাকিয়ে থাকলেও মনে হচ্ছে মনযোগটা নেই। তালহা তুড়ি বাজিয়ে বলল, চাচা আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
    বল বাবা কি কথা?
    তালহা মোবাইল থেকে আযাদ চৌধুরীর ছবিটা দেখিয়ে বলল, চাচা দেখনতো এই লোকটাকে চিনেন নাকি? এই লোকটাইতো এসেছিলো, তাইনা?
    হ্যা এই লোকটাই আমাগো অরিনরে ধইরা নিয়ে গেছে।
    ধন্যবাদ চাচা, আমার এটাই জানার দরকার ছিলো। একটা হাসি দিয়ে তালহা গাড়িতে গিয়ে বসলো। ওদেরকে এখন ‘অরণি ফাইভ স্টার হোটেলে’ যেতে হবে। গুগলে সার্চ করে আগেই ঠিকানাটা যোগাড় করে রেখেছে তালহা। তাদের গাড়িটা নিয়েই যাওয়ার ইচ্ছা। ড্রাইভারকে গাড়িটা নিয়ে নলডাংগা তিন রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। অটোর ড্রাইভারকে তিন রাস্তার মোড়ে যেতে বলে দিলো।
    এতক্ষণ পর্যন্ত উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলো যায়িদ আর মুসায়েব। তালহা কিছু বলছেনা দেখে মুসা ওর হাত ধরে ঝাঁকি দিয়ে বললো কিরে ওদিকটার কি খবর বললিনাতো। অরিন ঠিক আছে?
    একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তালহা বলল, নাহ্‌ ঠিক নেই। যায়িদের কথাই ঠিক হয়েছে। ওরা অরিনকে আবার অপহরণ করে নিয়ে গেছে।
    তাহলে আমরা এখন কোথায় যাবো? মুসা আবারও জিজ্ঞাসা করলো।
    এখন অরণি ফাইভ স্টার হোটেলে যাবো। তিন রাস্তার মোড় থেকে নানু বাড়ির গাড়িতে উঠবো। এইসময় নিজেদের গাড়ি থাকার দরকার। এসব ভাড়া গাড়ি দিয়ে কাজ হবেনা। ড্রাইভারকে গাড়ি নিয়ে আসতে বলেছি। উনি বলেছে উনি আশেপাশেই আছেন। গাড়ির চাকা পাল্টানো ছাড়াও গাড়ির আরও কিছু সার্ভিসিং করানো হয়েছে। তাই এতো সময় লেগেছে। আমাদেরকে ওখানে ছদ্মবেশে যেতে হবে। বন্ধু দুজনকে দুইটা মাস্ক দিয়ে পরে নিতে বললো এবং নিজেও একটা পরে নিলো। মাস্ক, মাথায় ক্যাপ দিয়ে মোটামোটি মুখটাকে ভালো করে ঢেকে রাখার চেষ্টা করলো যাতে চট করে কারোর নজরে না পড়তে না হয়। চল্লিশ মিনিট লাগলো তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছাতে। গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার আংকেল আগেই থেকেই ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলো।
    গাড়িটাকে নিয়ে ওরা প্রথমে একটা জেন্স সেলুনে ঢুকে সামান্য মেকআপ করে হোটেলের উদ্দেশে রওনা দিলো।
    গাড়িতে বসেই হোটেলে ঢুকে কি করবে সেই পরিকল্পনা করে ফেললো তালহা। বন্ধুদেরকে তার পরিকল্পনার কথা জানালো। নলডাংগা বাসস্ট্যান্ড থেকে তিন কি মি বামে গিয়েই হোটেলটার সন্ধান মিললো। ভেতরে নিশ্চয় অনেক মানুষের ভিড় থাকবে। এসব হোটেলগুলোতে দেশি বিদেশী ব্যবসায়ীদের মিলনমেলা ঘটে।
    গটগট করে হোটেলের মধ্যে ঢুকতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হলো ওরা। গেটে থাকা লোকটার গুরুগম্ভীর স্বরে বলল, কোথায় যাচ্ছেন?
    দোতলায় যে অফিসিয়াল অনুষ্ঠানটা হচ্ছে সেখানে যাবো।
    দাওয়াত পত্র দেখান।
    কথাটা শুনে থমকে গেলো তালহা। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিলো। অবশ্য ঐ বা কীভাবে জানবে যে এসব জায়গায় ঢুকতে দাওয়াত পত্র লাগে। মুখে খানিকটা গাম্ভীর্জ টেনে বলল, আমরা গোয়েন্দা, একটা ইনভেস্টিগেশান এসেছি। এই যে দেখেন আমাদের কার্ড।
    লোকটা কার্ডটা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে বলল, সেতো বুঝলাম। কিন্তু আমার উপর কড়া আদেশ আছে দাওয়াত পত্র ছাড়া যেন কাউকে যেন ঢুকতে না দেই। আর তাছাড়া যার অনুষ্ঠান এই হোটেলটাও উনার।
    হ্যা সেটা ঠিক আছে। উনাদের অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে হওয়ার জন্যইতো এই ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু উনি জানেনা যে উনার শত্রু উনার কাছের লোকরাই। পুলিশ দিয়ে কাজ হবেনা বিধায় উনি গোয়েন্দা লাগিয়েছে। আমাদের আসার কথা কাউকে জানাবেননা বলেই আপনাকেও বলে রাখতে পারেনি। আমাদেরকে খবর না দিলে আমরা জানবোই কোথা থেকে? আপনার নামটা চাচামিয়া?
    সাগর।
    কতদিন ধরে এখানে আছেন?
    ছয়মাস হয়ছে আইছি।
    আসলে এখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। যার ফলে এসব জায়গায় একজনের সাথে অন্যজনের শত্রুতা থাকা অমূলক নয়। ইদানিং আপনাদের বসের………কথাটা সম্পূর্ণ না করে তালহা জিজ্ঞাসা করলো আচ্ছা আপনাদের বসের নাম কি আপনি জানেন?
    না স্যার আমি কারোর নাম জানিনা।
    আমরাও জানিনা। আমরা একটা ফোন পেয়ে এসেছি এখানে। পুলিশে না জানিয়ে গোয়ান্দাকে জানিয়েছে কেন তাই মনে হচ্ছে আপনার?
    লোকটা কোন কথা না বলে মাথা নেড়ে ‘হ্যা’ বোঝালো।
    পুলিশ আসলেও ছদ্মবেশে আসতে হতো। কারণ পোশাক পরা দেখলেইতো সবাই সতর্ক হয়ে যাবে। ব্যাপারটা অনেক জটিল, মাথা খাটিয়ে বের করতে হবে। তাইতো উনি গোয়েন্দাদেরকেই বেছে নিয়েছেন।
    তালহার দীর্ঘ লেকচারে লোকটা কি বুঝলো বোঝা গেলোন। কিন্তু মাথা নেড়ে তালহাদের ঢুকতে দিলো, কারণ ছেলেগুলোকে তার খুব ভালো লেগেছে, সৎ মনে হয়েছে, ধান্দাবাজ মনে হয়নি।
    অনুমতি পেয়ে খুশি হয়ে গেলো তালহারা। দোতলায় যাবে বিধায় লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। তাছাড়া সিঁড়ি ব্যবহার করে যাওয়ার অন্যতম কারণ সিঁড়িটা পেছেনের দিকে হওয়ায় ওরা সহজে কারোর চোখে পড়বেনা। পেছনের দিকের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লো ওরা। যেখানে ঢুকলো সেটা একটা ঘরের বর্ধিতাংশ। থাই কাঁচ দিয়ে আলাদা করে রাখা হয়েছে। একটা বড় টেবিল জুড়ে নানারকম বিদেশী ব্র্যান্ডের মদ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর বাম পাশেই রান্নাঘরে বাবুর্চিদের বারবিকিউ বানানোর ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে। তালহা চারপাশটা ভালো করে দেখে নিচ্ছে। ডানপাশে একটা দরজা বন্ধ ঘর দেখতে পেয়ে সেখানে গেলো। দরজায় কোন তালা নেই। হ্যাজবল ধরে ঘুরাতেই দরজাটা খুলে গেলো। ভেতরটা অন্ধকার। একটা গুমোট গন্ধ নাকে এসে বিঁধল। দেওয়াল হাতড়ে সুইচবোর্ডটা খুঁজে আলো জ্বেলে দিলো। খুব ছোটও নয় ঘরটা। ঘরটা খোলা অবস্থায় রেখে রান্নাঘরের দিকে গেলো তালহা। যাওয়ার সময় বন্ধুদেরকে ওকে অনুসরণ করতে বলে দিলো। চারজন বাবুর্চি রান্নাঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত। ওয়েটাররা এসে এসে খাবার নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন টেবিলে পরিবেশন করছে। তালহারা রান্নাঘরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। একটা ওয়েটারকে রান্নাঘরের দিকে আসতে দেখে মুসায়েব এবং যায়িদকে আড়ালে চলে যেতে বলল। ওয়েটারটা রান্নাঘরে ঢুকতে গেলে তালহা ওর নাকে মুখে রুমাল চেপে ধরে ওকে নিয়ে স্টোর রুমটাতে ঢুকে গেলো। কিছুক্ষণ পরে যখন লোকটার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসলো তখন ওকে স্টোর রুমে শুইয়ে রেখে দিলো। যায়িদকে দ্রুত লোকটার পোশাক, এবং গলায় ঝুলানো পরিচয়পত্রটা পরে নিতে বলে তালহা আবারও রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো। তিনজন ওয়েটারের সাথে তিনজন পোশাক পরিবর্তন করে নিলো ওরা। এক্ষেত্রে ওয়েটারদে সাথে ওদের উচ্চতা মিলিয়ে রাখতে গিয়ে ভীষণভাবে হিমশিম খেতে হয়েছে ওদের। অন্য ওয়েটারদের সাথে ওরা তিনজনও ফুট-ফরমায়েশ খাটতে লাগলো। খাবার পরিবেশনের ফাঁকে তালহারা সতর্ক দৃষ্টি রেখে চারিদিকে দেখে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আজাদ বা লিটনের ছায়াটাও চোখে পড়েনি। তাহলে কি ওরা ভুল জায়গায় এসে পড়েছে?
    চলবে

Skip to toolbar