Profile Photo

রুপকথাOffline

  • RupKaTha
  • Profile picture of রুপকথা

    রুপকথা

    • 5 years, 4 months ago

    গল্প- “ভালোবাসি আজীবন”
    পর্ব ১
    ——————————-
    বুকের বাম পাশটা দুপুর থেকে ব্যথা করছে। কারণটা বুঝতে পারছি না। নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে, কিছুই ভালো ঠেকছে না আমার কাছে। শুধু ব্যথা না আবার, একটু অন্যরকম লাগছে আবার। বুকের ভেতরটা খুব ফাঁকা লাগছে, কিসের একটা শূন্যতা অনুভব করছি। হয়তো স্বাভাবিক, আপন মানুষের মাঝে থেকেও যখন একা থাকি তখন এরকম তো লাগবেই। প্রায়ই তো হয় এরকম, চলে যাবে কিছুক্ষণ পরে। বুকটা আবার ভারও হয়ে আছে। তবে একটু ঘুমালে হয়তো ঠিক লাগতে পারে।

    ব্যথাটা বেরেই চলছে, উঠে গিয়ে মাকে বললাম অবশেষে। এরকম যন্ত্রণা হয়নি আগে কখনো, এ শুধু একাকিত্তের জন্য না। মা পরে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে। ইসিজি করালাম, রিপোর্টের অপেক্ষায় এখন।

    রিপোর্ট রাতেই চলে আসলো, গিয়ে আনতে হবে কালকে সকালে। আমি দেখিনি, মাকে বললাম দেখে নিতে। আমার ব্যথার জন্য উঠতেই পারছি না শোয়া থেকে।

    মা হঠাৎ কেমন যেন চিৎকার করে উঠলো। কি হয়েছে? আমি উঠে যাওয়ার আগেই মা দৌঁড়ে ঘরে আসলো আমার কাছে।

    — কি হয়েছে মা? এতো চেচাচ্ছো কেন?

    — মা রে তোর এ কি হলো? কেন….

    — মা, তোমার ঢং দেখার একদম ইচ্ছা আর শক্তি নাই আমার। এমনেই প্রচণ্ড ব্যথা করছে, প্রতি মুহূর্ত যেন বাড়ছে..ওহ, ভালো কথা, ভুলেই তো গেলাম আমি। রিপোর্ট দেখেছো? নাকি এই ফাউ কান্নাকাটির জন্য সেটাও ভুলে গিয়েছো?

    — ওই টা নিয়েই তো কথা বলতে আসলাম..

    — তো বলো, কিসের জন্য অপেক্ষা করছো?

    — নীলা, তুই সকালের দিকে হার্ট এটাক করেছিলে, সে জন্যেই তোর ব্যথা হচ্ছে।

    — মা, কি বলছো এসব? দেখি আমি দেখে আসি তো। ল্যাপ্টপ কোথায়? তোমার মাথা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কি যে বলছো, নিজেই জানো না..

    বলতে বলতে বাইরে গিয়ে নিজেই মেইল খুলে দেখলাম। রিপোর্ট দেখে আমার পায়ের নিচের মাটিই যেন সরে গেল। একিউট হার্ট এটাক? কিভাবে সম্ভব? কিন্তু আমার তো কখনো হার্টে সমস্যা ছিল না, স্পোর্টসেও সবসময় ভালো ছিলাম। আমার তো কোন রকম স্বাস্থও নেই, সবসময় নিজেকে নিয়ে সচেতন থেকেছি তাও আজকে এটা কি দেখছি! মাথা কাজ করছে না।

    — আরে মা, এতে কান্নার কি আছে বলো তো? আমি তো আর মরে যাই নি। হয়েছিল আর কি, ডাক্তারের সাথে কথা বলে দেখবো নে কাহিনী আসলে কি। তোমার এতো চিন্তা করতে হবে না।

    — তুই কি বলছিস এসব? তোর এই অবস্থা আর আমি চিন্তা করবো না? তোর কি হয়েছে বলতো মা সত্যি করে?

    — মা আমার কিচ্ছু হয় নি। হয়তো ইদানিং ভারসিটির টেনশন করছি তাই এমন হতে পারে..

    — তুই চুপ থাক। সবসময় হেয়ালি করিস তুই। তোর কিছু হলে আমার কি হবে ভেবেছিস কখনো? তোর বাবা নেই এখন, তুই না থাকলে আমি…

    — উফফ, মা কি শুরু করলে? আমার কিচ্ছু হবে না, চিন্তা করো না তো। ঝামেলা যেটাই হয়েছে ডাক্তার বুঝবে, আর আমি তোমাকে জানাবো। এখন যাও তো, হাত মুখ ধুয়ে নাও আর খেতে দাও। হার্টে সমস্যা কিন্তু তাও খাবার বন্ধ করতে পারবো না। হাহা

    — যাচ্ছি, সবসময় হাসি ঠাট্টা। এই মেয়েটাকে নিয়ে যে আমি কোথায় যাবো..

    বলতে বলতে মা বের হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিতে হলো, আমি ভেঙ্গে পরলে মায়ের অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু তাও মাথায় কিছু ঢুকছে না। এসব কি করে… ক্রিং ক্রিং…

    কে ফোন দিল এই অসময়! হৃদয়! হৃদয়কে কি বলবো আমি। কয়েক দিন পরে আমাদের বিয়ে, কথা সব পাকা হয়ে আছে। যে কোন সময় বিয়ে হয়ে যাবে কিন্তু এখন আমার এই অবস্থা।

    — হ্যালো হৃদয়।

    — তারপর বলুন, আমাকে ছাড়া আর কার কথা ভাবা হয়? হুম?

    — হবু স্বামী।

    — ওহ আচ্ছা, তাই নাকি? তো তার কথা ভাবতে ভালো লাগে নাকি আমার কথা?

    — তার কথা.. আচ্ছা শুনো একটা কথা বলার ছিল।

    — বলো শুনছি।

    — আমার আজকে সকালে মাইল্ড হার্ট এটাক হয়েছিল। আমি বুঝতে পারি নি, বুকে ব্যথা করছিল পরে ডাক্তারের কাছে গেলাম। তারপর জানতে পারলাম।

    — তাই নাকি? তো বেঁচে ফিরলে কিভাবে?

    — হৃদয় আমি বেঁচে আছি তুমি সেটাতে খুশি না?

    — তুমি কি সত্যি বলছো?

    — তো? এসব বিষয় নিয়ে কি কেউ ইয়ার্কি করে?

    — নীলা, তুমি আমাকে বলবে আমাকে তোমার আর কত কিছু মেনে নিতে হবে?

    — হৃদয়..

    — না না তুমি বলো আমাকে। তুমি কখনো মা হতে পারবে না, আমি সেটা মেনে নিয়েছি। তুমি আমার সাথে ফ্রান্সে বিয়ের পরে থাকবে না, আমি সেটাও মেনে নিয়েছি। তোমার জন্য আমি আমার সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে আসছি। কথা সব পাকা হয়ে আছে, কাল বাদে পর্শু আমাদের বিয়ে আর আজকে তুমি আমাকে এটা শুনালে? তোমার আর কত সমস্যা আছে আমাকে বলবে? তুমি এখন স্বাস্থের দিক দিয়েও ঠিক নেই, তোমার মত অসুস্থ একজনকে কিভাবে মেনে নিবে আমার পরিবার? আমার ভালোবাসার কি ফায়দা উঠাচ্ছো তুমি? তোমাকে ভালোবাসি বলে আর কত ত্যাগ স্বীকার করতে হবে আমাকে? এমনেই তারা জানে না তোমার মা না হতে পারার কথা তার উপর.

    — কি? ফায়দা উঠাচ্ছি? এ কথা তুমি বলতে পারলে? আর তুমি তাদেরকে জানাও নি কিছু?

    — নাহ, বিয়ের পরে জানাবো। বলবো যে আমিও জানতাম না আর যেহেতু বিয়ে হয়েই গিয়েছে তাই এখন কিছু করার নেই। পালক নিবো অথবা টেস্ট টিউব বেবীতে যাবো।

    — হৃদয়, তুমি তোমার পরিবারের কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করবে আর পরে বলবে তুমি জানতে না? তার মানে তো সব দোষ আমার উপর আসবে, সারা জীবন এর দায় ভার আমাকে নিতে হবে কিন্তু আমার তো কোন দোষ নেই। আমি তোমাকে আমাদের সম্পর্ক হওয়ার আগেই সব জানিয়েছি আর তুমি মেনে নিয়েছিলে তাহলে কেন..

    — আহহা, আমি তো বলছি না আমি মেনে নেই নি। আমি তো নিয়েছি, এখন তাদেরকে তো কিছু একটা বলতে হবে, তার উপর আমি তোমাকে হারাতে চাই না।

    — লোকে ঠিকই বলে, বিপদের সময়েই মানুষের আসল চেহারা দেখা যায়। তুমি কে হৃদয়? আমি তোমাকে চিনতে পারছি না, তুমি সে নও যাকে আমি ভালবেসেছিলাম..

    — আচ্ছা আর ঢং করতে হবে না, মা ফোন দিয়েছে, পরে কথা বলছি। রাখি এখন।

    ফোনটা রেখে দিল।

    সত্যিই আজকে আমি এইসব কি শুনছি। প্রথমে হার্ট এটাক তারপর হৃদয়ের এসব কথা, আমার এই হার্ট এটাকের মাধ্যমে কি আল্লাহ আমাকে কিছু বোঝাতে চাইছেন? আবার হৃদয়ের ফোন।

    — হ্যালো নীলা।

    — এত তাড়াতাড়ি কথা শেষ?

    — নীলা আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না। আমার পক্ষে সম্ভব না। এমনেও মা তোমাকে তেমন একটা পছন্দ করে না তোমার গায়ের রঙের কারণে, এখন এসব শুনলে সে কখনোই মেনে নেবে না। আমি তোমার মা কে জানিয়ে দিবো, আমাদের এক হওয়া ভাগ্যে নেই। ভালো থেকো।

    বলেই ফোনটা রেখে দিল হৃদয়।

    আমি কিছুই বলতে পারলাম না। হয়তো আসলেই এটাই ভাগ্যে লিখা ছিল। আমার গায়ের রঙ নিয়ে যে একদিন হৃদয়ের কথাও শুনতে হবে জানতাম না। আশ্চর্য বুকের ব্যথাটা এখন নেই কেন? মাথাটা শুধু ঘুরাচ্ছে হালকা।

    — নীলা, এই নীলা। আর কতক্ষণ ঘুমাবি? উঠ এইবার, দেখ কটা বাজে। ক্লাসে যাবি না আজকে? ১১টা বেজে গেল তো, উঠ না মা।

    (চলবে)

Skip to toolbar