Profile Photo

Hasan Zahid হাসান জাহিদOffline

  • HZWriter
  • ভালোবাসার রকমফের
    -হাসান জাহিদ

    লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে রেখা দেখল বারান্দায় শাহান বসে আছে। রেখা চলে যাচ্ছিল, ওকে থামিয়ে শাহান বলল, ‘এই যে রেখা একটা ব্যাপার আছে।’ রেখা কিছুটা কৌতুহল আর খানিকটা তাড়াহুড়োয় বলল, ‘তুমি আজ ক্লাস করলে না যে বড়?’
    ‘আজ আমার মন ভালো তাই।’
    ‘তাহলে তো ক্লাস করার কথা।’ রেখা বলল।
    ‘না, কথা না। আমরা ঘুরে বেড়াব আজ।’
    ‘আমরা মানে!’ রেখা অবাক চোখে তাকাল।
    ‘মানে-টানে আবার কী! তুমি আর আমি।’ শাহান দিল খোলা মুচকি হেসে বলল।
    ‘না বাবা। ওসব আমি-তুমির মধ্যে আমি নেই।’ রেখা চলে যেতে উদ্যত হলো।
    ‘আরে দাঁড়াও না।’
    লাইব্রেরির বিশাল বারান্দার কোণে বসে ছিল শাহান। সে এবার বারান্দায় বসে থেকেই দুই পা ছড়িয়ে দিল নিচে ঘাসের ওপর। তারপর বলল, ‘আমার আজ জন্মদিন।’
    ‘তাই নাকি! হ্যাপি বার্থডে।’ রেখা এবার বসল শাহানের পাশে।
    ‘যাক, সহজে পাওয়া গেল। জানো, রাত তিনটায় ছোটোবোন বাঁধনকে জাগিয়ে উইশ করতে বললাম। বেচারি কেঁদেকেটে সারা।’
    ‘রাত তিনটায় কেন? বারোটা এক মিনিটে…।’ রেখা পুরোটা শেষ করল না।
    ‘মনে পড়লে তো, তিনটায় মনে পড়ল।’ শাহান ক্লাউনের মতো মাথা নেড়ে, শব্দ করে হাসল। রেখা শাহানের এরকম হাসির কোনো কারণ খুঁজে না পেয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকাল রহস্যময় সহপাঠীর দিকে। সেদিকে তাকিয়ে শাহান বলল:
    ‘আমাদের বাসাটা একদম ভূতের মতো বেরসিক। মনে পড়ার মতো পরিবেশে আমি থাকি না,’ শাহান বলে চলল, ‘মা বলেন, আমি নাকি কুক্ষণে জন্মেছি। আর বাবা একেবারে খাঁটি জল্লাদ। তাঁর চোখ দেখলে বুক কাঁপে।’
    মুখে ওড়না চাপা দিয়ে হাসছে রেখা। হাসতে হাসতে বলল, ‘বুঝা যাচ্ছে বাবা-মাকে খুব জ্বালাও। এসব জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতি ছেড়ে ক্লাসটাস একটু করো।’
    ‘আমাকে ভুলাতে চাচ্ছ, তাই না? বলছিলাম আমরা আজ ঘুরব।’ শাহান রেখার কাঁধে আলতো খোঁচা দেয়।

    রেখার ভেতরে চনমনে ভাব জাগল। ঘাড় নিচু করে কী যেন ভাবল। তারপর মিনমিনিয়ে বলল, ‘ভাবছি এবিষয়ে আরো ভাবব আমি।’
    ‘লে হালুয়া। এতে ভাবাভাবির কী আছে?’ শাহান অবাক হয়ে তাকায় মাথা নিচু করে থাকা মেয়েটার দিকে।
    রেখা উঠে দাঁড়ায়।
    শাহানকে বিমূঢ় করে দিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল রেখা। বাসায় চলে এলো সে সটান। বাসার সবাই খেতে বসেছে তখন। রেখা সেদিকে গেল না। শিখার সাথে জরুরি বৈঠক দরকার। প্রথম খাওয়া শেষ করল আরিফ। ছোটোখালার বড় ছেলে। এই বাড়িতে থাকে। অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে। আরিফ বলল, ‘ভগ্নি তোমাকে টেন্‌স মনে হইতেছে। এনিথিং রং?’
    ‘না।’
    ‘তবে সামথিং গ্র্যান্ড?’
    ‘না, তাও না।’
    ‘তাও না। মানুষ সাধারণত দুঃখ-আনন্দ দুই কারণেই উত্তেজিত হয়। দুটোর কোনোটি না তবে রহস্যটা কোথায়?’
    রেখা তিতিবিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি যাবে আরিফ ভাই? এবাড়িতে প্রাইভেসি বলে কিছু নেই। এক দঙ্গল লোক এসে বলবে-কী হলো, কেন হলো। যত্তোসব।’
    রেখার বাবা হাকিম সাহেব বারান্দায় ওৎ পেতে থাকেন বরাবর। তিনি চেঁচিয়ে বললেন‒‘প্রাইভেসি থাকবে না কেন? প্রাইভেসির তুই কী বুঝিস? সবসময় প্রাইভেসি/পার্সোনাল। কী সাংঘাতিক পার্সোনালিটি তোর হয়েছে, এ্যাঁ!’

    ***
    শিখা ও রেখা দুইবোন ফিসফিসিয়ে কীসব আলোচনা করল। শিখা বলল, ‘বুঝতে পারছি না। তোকে না করি কীভাবে। প্রেম মনের ব্যাপার। মন চাইলে প্রেম হয়। সিদ্ধান্ত তোর হওয়া উচিত।’
    ‘প্রেম করে তুই তো ঠকেছিস আপা।’
    ‘হুম, ভুল করেছি। সম্ভবত একই ভুল দ্বিতীয়বার করতে যাচ্ছি।’
    ‘তুই কি আলম সাহেবকে নিয়ে ভাবছিস আপা? উনি খুব বড়লোক?’
    ‘খুব। গোটাতিনেক গার্মেন্টস। একটা ট্রাভেল এজেন্সি। দুইখানা আলিশান বাড়ি। প্রতি হপ্তায় ইয়োরোপ-অ্যামেরিকা যাচ্ছে।’
    ‘তবে এক কাজ কর্‌ আপা, আমার কাছে রেফার করে দে। আমিই ঝুলে পড়ি।’
    ‘ইয়ার্কি করছিস আমার সাথে!’

    শিখার সামনে দাঁড়ানোটা আর যুক্তিসঙ্গত মনে করল না রেখা। শিখার আঁতে ঘা দিয়েছে সে এইমাত্র।
    বিরসমুখে বারান্দায় এলো রেখা। বাবা ডায়েরিতে কী যেন লিখছেন। রেখার হাসি পায়−শিম্পাঞ্জির ল্যাজ নেই কেন এবিষয়টি নিয়ে ক’দিন ধরে দুর্ভাবনায় আছেন বাবা।
    ‘পেছনে কী, এ্যাঁ! সামনে আয়।’ হাকিম সাহেব বাজখাঁই গলায় বললেন, ‘গোরিলাদের নিয়ে লিখছি আজ। শুনবি?’
    ‘আমার মাথা ধরেছে।’
    ‘তোর মাথা কখন ধরে না?’
    ‘সবসময় ধরে। ইদানিং এমন হচ্ছে।’ রেখা কাতর স্বরে বলল।
    ‘তাতে কোনো অসুবিধে নেই। মাথা ধরাটা উর্বর মস্তিষ্কের লক্ষণ। মাথা যাদের ধরে না, তাদের মাথায় শুধু গোবর।’

    বসল রেখা। সেদিকে তাকিয়ে উদার একখানা হাসি দিলেন হাকিম সাহেব। তারপর হাঁক ছাড়লেন-‘শুনছো, আমাকে এককাপ চা দিয়ে যাও। রেখাটাকেও দিয়ো। সাথে একটা নাপা এক্সট্রা।’
    ‘তুমি যখন-তখন নাপা খাচ্ছ বাবা।’

    তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে মধুর ভঙ্গিতে হাসলেন-‘আমার জন্য না। তোকে দিতে বললাম।’ খুক খুক করে কেশে রেখা বলল-‘না বাবা, মানে অল্প মাথাব্যথা।’
    ‘অল্প বলেই তো খেতে বলছি বেড়ে যাবার আগে।’ তিনি আবার হাসলেন।
    ‘তোমার গোরিলার গল্প বলো।’

    দুইঘন্টা গল্প করলেন হাকিম সাহেব। তিনবার চা খেলেন। রেখা এককাপ চা আর একটা ট্যাবলেট খেল। গল্প শুনতে শুনতে সত্যিই মাথা ধরে গিয়েছিলো রেখার।
    ‘মাথা ব্যথা বাবা। আমি আরেকটা ট্যাবলেট নিয়ে আসি।’
    ‘তুই বড্ড ফাঁকিবাজ হয়েছিস। এখন আর ট্যাবলেট খেতে হবে না। বেশি পেইনকিলার খেলে শরীরের ক্ষতি হয়। চুপচাপ শুনে যা।’
    রেখা সাংঘাতিক মাথাব্যাথা নিয়ে শুনতে লাগল গোরিলার গল্প। হাকিম সাহেব ডায়েরি থেকে পড়ে যাচ্ছেন‒‘বৃহত্তম বনমানুষ আফ্রিকার জায়ারের গোরিলা। তাহাদের ওজন ২৯২ কেজি হইতে ৩০০ কেজি। বৃহত্তম উটপাখির আবাসস্থল উত্তর আফ্রিকার আপার সেনেগাল, নাইজার, সুদান…।’

    ***
    রেখাকে ভালো না লেগে উপায় নেই। অথৈ রেশমী কালো জলে ভেসে আছে যেন লাল পদ্ম। ভর বিকেলে শাহান বিছানায় শুয়ে রেখার কথা ভাবছে। কানের কাছে স্টেরিও সেটে লো ভল্যূমে বাজছে-‘ও আমার মন যমুনার অঙ্গে অঙ্গে ভাব তরঙ্গে কতোই খেলা, বধূ কি তীরে বসে মধুর হেসে দেখবে শুধু সারাবেলা।’

    অন্যদিকে শাহানদের বাসায় নিভৃত কক্ষে বসে ভাবালুতায় ছেয়ে যায় নাদিয়ার মন। ওর বেডের কাছে সাইড ডেস্কে টেবিল ল্যাম্প‒তার নিচে ওর মা’র ছবি। নাদিয়া হওয়ার পর তোলা। মায়াবী। ঠোঁটের কোণে মন কেমন করা হাসি। মা’র অনেক কিছু নাদিয়ার মনে আছে। তবে মায়ের চলে যাবার মুহূর্তটুকু সে দেখেনি। শুধু আবছাভাবে মনে পড়ে: আতর-লোবানের গন্ধে মা সাদা কাপড় পরে শুয়ে ছিলেন দেখতে অন্যরকম একটা খাটে। সেটা যে মৃত্যু তা বোঝেনি ছোট্ট নাদিয়া।
    এই কক্ষ আগে শাহানের ছিল। শাহানের বাবা-মা কক্ষটা সম্প্রতি নাদিয়াকে বরাদ্দ দিয়েছেন। লাগোয়া রুমটা ওঁদের হওয়ায় শাহানের হল্লায় অতিষ্ঠ হয়ে থাকতেন তাঁরা। আলফাজউদ্দিন খান আর মরিয়ম খান বিজনেস ও পার্টি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। একমাত্র ছেলে শাহান অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে আর ছোটো মেয়ে বাঁধন ইন্টারমিডিয়েট দেবে।
    নাদিয়া ইংরেজিতে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি বাসার দেখাশোনার কাজ সে-ই চালিয়ে যায়। ছোটোবেলা থেকে এবাড়িতে আছে সে। নাদিয়ার ছয়বছর বয়সে ওর মা কোনো এক অজ্ঞাত রোগে মারা যান। ওর বাবা বিদেশিনী বিয়ে করে এখন লন্ডন না অ্যামস্টারডাম, নাকি টেক্সাস‒কোথায় যেন আছে। মেয়ের খোঁজখবর রাখে না। শাহানের বাবা-মা মেয়েটাকে এখানে এনে রেখেছেন। নাদিয়া উনাদের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়।
    নিজের কক্ষ মনের মতো করে সাজিয়েছে নাদিয়া। সব ঝকঝকে, তকতকে। ওর রুমে আছে একটা পড়ার ডেস্ক, মিনি ড্রেসিং টেবিল আর একটা সিঙ্গল বেড। দেয়ালে পেইন্টিং, মেঝেতে সেন্ট্রাল কার্পেট। লাইলাক মিস্ট-এর প্লাস্টিক পেইন্টে রুমের সর্বত্র রহস্যের লুকোচুরি।

    পড়ায় মন বসছে না তার। শাহান ভাই পুরোপুরি মজে গেছে। নাদিয়া স্বগত সংলাপে লিপ্ত হয়:
    ‘তুমি যাকে প্রেম ভাবছো, তা হলো মোহ। কারণ তোমার চোখের পাতায় আমি প্রেমের ছায়ার কম্পন দেখিনি। দেখছি ক্ষণিকের উন্মাদনা। কপটতার আবরণে ঢেকে গেছে তোমার সত্তা।
    সেদিন বান্ধবীরা ঘিরে ধরল আমাকে। তারা বলল, তোর হাঁদা ভাইটা একটা ফচকে মেয়ের পাল্লায় পড়েছে। চিনিস না? সোসিওলোজির রেখা। রেখাকে নিয়ে বড্ড বেশি তড়পাচ্ছে তোর গাধামার্কা ভাই।’
    নাদিয়া অস্থির হয়ে কক্ষজুড়ে পায়চারি করে।
    আমি তোমাকে সেদিন বললাম‒বড্ড হেঁয়ালি করছো। তুমি কি সত্যিই রেখাকে ভালোবাসো? রেখা কি তোমাকে ভালোবাসে? তুমি থমকে গিয়েছিলে শাহান ভাই। যার মানে দাঁড়ায়-তোমরা দু’জনই কেউ কাউকে জানো না, ভালোবাসা কাকে বলে তাও বোঝো না।

    নাদিয়ার চোখ বেয়ে অশ্রু নামে‒মনে পড়ে শাহান ভাই, একদিন তুমি কেমন আনমনা হয়েছিলে? তুমি বলেছিলে‒আমার কিছু ভালো লাগে না নাদিয়া।
    জানো শাহান ভাই, আমার ভেতরটা সেদিন উথলে উঠেছিল। কী এক অব্যক্ত ভালোলাগায় এ পৃথিবীকে বড় মধুর লেগেছিল। আমি বলেছিলাম, চলো শাহান ভাই আমাদের প্রিয় রাস্তাটায় ঘুরে আসি। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি রাধাচুড়া আর তাদের নিচে মে ফ্লাওয়ার গাছের বাগান। সন্ধ্যায় স্ট্রিটলাইট জ্বলে উঠলে পেভমেন্টের ওপর চিকরিকাটা আলপনা সৃষ্টি করে। সেই সুখকর রহস্যময় আলোছায়ায় দু’জন হাত ধরাধরি করে হেঁটেছিলাম। কোথাও থেকে ফুলের সুবাস বয়ে আনছিল এলোমেলো হাওয়া।
    তোমার জন্মদিনে কাল একটা রঙিন প্যাকেট নিয়ে তোমার কাছে গিয়েছিলাম। তুমি বললে‒নাদিয়া এখন যাও, আমার মন ভালো নেই। এত অধঃপতন তোমার? তুমি শুধু হেয় করোনি আমাকে, অপমানও করেছো।
    কী যেন ভাবল সে। ডেস্কে বসল সে। নাদিয়ার অভিমানী হাত একটি ছত্র লিখে যায় নোটবুকে:
    ‘When lamps are pale in morning,
    Heart quits heart and hand quits hand
    Cold is that unlovely dawning,
    Loveless, ray less, joyless you shall stand!’

    আর লিখতে পারল না সে। কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে তার শরীর। কাঁদছে নাদিয়া। বালিশ ভিজে গেছে। বারান্দায় এক টুকরো বৈশাখী হাওয়া ঘুরপাক খেয়ে শ্যাওলাধরা পাঁচিলের কাছ থেকে হাসনোহানার সুবাস নিয়ে এলো।
    নাদিয়া কাঁদছে…।
    হঠাৎ জানালার কাচে একটা ছায়া যেন নড়েচড়ে উঠল। নাদিয়া ভয়ে চিৎকার করতে গিয়েও থেমে গেল একটা কন্ঠ শুনে।
    ‘চুপ। চিৎকার করার দরকার নেই। আমি ভূত নই। মানুষ। তবে পুরোপুরি মানুষ নই। ভেতরে আসব নাদিয়া?’
    ‘এসো।’
    ‘কী বলবে, বলে তাড়াতাড়ি চলে যাও। কাল আমার পরীক্ষা।’
    ‘কাল তোমার পরীক্ষা তাহলে কাঁদছিলে কেন? তোমার তো পড়ার কথা।’
    ‘আমি কাঁদি আর হাসি, সে আমার একান্ত, তুমি এখন যাও।’
    ‘সত্যিই চলে যাব, একটু গল্প করব না।’ শাহান বিটকেলে হাসি দিল।
    ‘এমন বিচ্ছিরি হাসি তুমি দেবে না। আর একটু বলে যাও তুমি পুরোপুরি মানুষ নও কেন।’
    ‘এটা বলতে গেলে তো কাহিনি হয়ে যাবে। তোমার পরীক্ষার পড়া হবে না।’
    ‘না হোক, তবু বলে যাও তুমি অর্ধেক মানুষ কেন।’
    ‘কারণ, আমি অর্ধেক পশু।’
    ‘এসব কী বলছো শাহান ভাই?’ নাদিয়া বিস্মিত চোখে তাকাল।
    ‘ঠিকই বলছি। আব্বা-আম্মার আদর-স্নেহ কী, তা তুমি যেমন পাওনি; আমিও পাইনি। তারা থাকে পার্টি আর ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। আমার মনে পড়ে না, তারা কোনোদিন আমাকে মানুষ হবার শিক্ষা দিয়েছে কিনা। তাদেরকে আমি কেন জ্বালাই জানো? তারা জীবনে টাকা আর সম্পদ ছাড়া কিছু বোঝেনি।’
    শাহান নাদিয়ার বিছানায় আধশোয়া হয়ে বলল, ‘তোমাকে তারা লালন করেছে মানবতা থেকে নয়। বাধ্য-বাধকতা থেকে।
    ‘মানে, কী বলছো শাহান ভাই!’
    ‘হুম, ঠিকই বলছি, তোমার মা মারা যাবার আগে সমস্ত সম্পদ আর টাকা-পয়সা আমার বাবা-মা’র হাতে তুলে দিয়ে যান। বাবা-মা তখন গরিব ছিল। বাবা কেরানির চাকরি করতেন। তোমার মায়ের টাকা দিয়েই তারা আজ ধনী। ক্লাব-পার্টি করে বেড়ান।’
    ‘কিন্তু তারা তো আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন।’
    ‘আশ্রয় দিয়েছে। তবে আদর স্নেহ দেয়নি। তারা তোমাকে সময় দিয়েছে? স্নেহের স্বরে ডেকেছে? তাদেরকে তো তুমি মাসে একবার কি দু’বার দেখ। তারা তোমাকে দেখা দেয় না। বাসার সব কাজ তোমাকে দিয়ে করায়। আর আমাকে বলে কুলাঙ্গার।’
    নাদিয়া মাথা নিচু করে সব শুনল।
    তারপর সে মুখোমুখি হলো শাহানের দিকে। বলল, ‘একটা প্রশ্নের জবাব দেবে?’
    ‘বলো।’
    ‘তুমি কি রেখাকে খুব ভালোবাসো?’
    ‘বিছানায় আধশোয়া থেকে উঠে বসল শাহান বলল, ‘উপায় কী?’
    ‘নাদিয়া আহত কন্ঠে বলল, ‘তোমার কোনো ‍উপায় নেই! রেখা জোর করে তোমার কাছ থেকে ভালোবাসা আদায় করে নিয়েছে?’
    সামান্য হাসল শাহান। বলল, ‘এক কাপ চা হলে জমিয়ে বলতে পারতাম।’
    নাদিয়া বিরস মুখে বলল ‘তুমি বোসো আমি বানিয়ে নিয়ে আসছি।’
    নাদিয়া চলে গেলে নোটবুকটা ডেস্ক থেকে টেনে নেয় শাহান। লেখাটা পড়ে আপনমনে মাথা দোলায় শাহান, ‘আরে বাবা, এই মেয়ে দেখি আমার মতো অর্ধ মানুষ। অভিশাপ দিয়ে দিল!
    নাদিয়া চা এনে দিলে তাতে চুমুক দিয়ে শাহান বলল, ‘ফার্স্ট ক্লাস হয়েছে। কিন্তু আমাকে অভিশাপ দিলে কেন?’
    ‘অভিশাপ! আমি দিয়েছি!’ নাদিয়া হা করে তাকাল।
    ‘ওই যে লিখেছ, Loveless, ray less, joyless you shall stand!’
    ‘ও, ওটা তো কবিতার ছত্র। আমার ইমোশন বলতে পারো। কারুর ঘাড়ে চাপাইনি।’
    ‘যাক, তবু ভালো।’
    ‘তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব দাওনি।’
    ‘রেখার বিষয়টা তো? না ভালোবেসে উপায় কী?’
    ‘একই কথা বারবার বলছো।’
    ‘হুম, বলছি। কেন বলছি জানো? শাহান ইতস্তত করে বলল, ‘আমি একদিন আড়ি পেতে শুনেছি। তোমার মামা এসেছিলেন। তোমার আমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। বাবা নাকচ করে দিয়ে বলল, ‘আমার ছেলেটা বাউন্ডুলে হলেও তোমার ভাগ্নীর মতো বাপ পরিচয়বিহীন মেয়ের সাথে তা বিয়ে হতে পারে না।’
    মামা ভীষণ অপমানিত হলেন। টাকার জোর নেই বলে তিনি মাথা হেঁট করে চলে গেলেন। আমি পেছন থেকে ডাকলাম। তিনি এতটাই অপ্রস্তুত হয়েছিলেন যে, তার মাথা নিচু করে চলে যাওয়া ছাড়া গতি ছিল না।
    ‘এতোকিছু, কই আমি তো কিছু জানি না।’
    ‘তুমি জানবে কেন? তুমি নিখাদ সরল একটা মেয়ে। ঘোর-প্যাঁচ নেই। তবে একটু থাকার দরকার ছিল।’
    ‘থাক সেসব কথা। তুমি রেখাকে নিয়েই সুখি হও। আমার কিছু বলার নেই।’
    ‘আবারও রেখা। তুমি যে জন্মদিনে আমাকে একটা গিফট দিয়েছিলে, আমি প্যাকেট খুলেও দেখিনি, সেই গিফট টা কোথায়?’
    ‘কেন, আছে তো। আমার ডেস্কে। রেখা ছুটে গিয়ে ডেস্ক ঘেঁটে প্যাকেট না পেয়ে বিমূঢ়ের মতো তাকাল। শাহান বাঁ হাত নাচিয়ে নাচিয়ে বলল, ‘হেঁ হেঁ, ওটা আমার হাতে। কিন্তু এতো দামি ঘড়ি কিনতে গেলে কেন?’
    ‘তুমি আমার গিফটি নিয়েছ, কখন নিলে?’
    ‘সে তুমি বুঝবে না।’
    ‘রেখা যদি জানতে চায়, কে দিয়েছে. কী বলবে?’
    ‘যে দিয়েছে, তার কথা বলব।’
    ‘যদি কিছু মনে করে?’
    ‘তাতে আমার কী? ও কী মনে করল, সে নিয়ে আমার সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই। তাছাড়া, তার সাথে আমার যোগাযোগ নেই।’
    ‘কেনো যোগাযোগ নেই?’
    ‘নেই, এটাই শেষ কথা। তার অনেক কদর্য দিক আছে। সে লোভী, আরেকটা ছেলের সাথে তার ভাব ভালোবাসা আছে। সেসব বাদ দাও নাদিয়া।’
    ‘বাদ দিব?’
    ‘হ্যাঁ’, শাহান হাই তুলে বলল, ‘কেলিনু শৈবাল দামে, ভুলি কমল কানন।’
    ‘হুম, মাইকেল মদুসূদনের কবিতা। এখানে তার কী সম্পর্ক?’
    ‘সম্পর্ক নেই?’ শাহান পাল্টা প্রশ্ন করল।
    ‘কী জানি, কী সম্পর্কের কথা তুমি বলছো।’
    ‘বলছি কি, তোমার ঘরে একটা সিগারেট খাওয়া যাবে?’
    ‘হুম। প্রথম এবং শেষ।’
    শাহান সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘তোমার মতো রত্ন থাকতে আমি কেন পচা শামুকে পা কাটতে যাই।’
    ‘তুমি আমাকে কেমন ঘোরের মধ্যে ফেলে দিলে।’ কম্পিত স্বরে নাদিয়া বলল।
    ‘কীসের ঘোর! আমি তোমাকে বরং ঘোরের জগত থেকে বাস্তবে নিয়ে যাব। এই পঙ্কিল আবহে তুমি আমি থাকব না। আমরা অন্য কোথাও চলে যাব । তোমার আমার পরীক্ষা শেষ হোক। আমরা অন্য কোথাও চলে যাব।
    ‘সত্যি! সত্যি বলছো শাহান ভাই!!’
    শাহান নাদিয়ার মাথায় হাত রেখে বলল, ‘সত্যি। এটা বাস্তব, কোনো প্রহেলিকা নয়। আমি চিরদিন তোমাকে আগলে রাখব।
    নাদিয়ে দৌড়ে এসে শাহানের বুকে মাথা-মুখ ঘষতে লাগল, বলতে লাগল, ‘আজ আমার নারীজীবন সার্থক।’ ‘আর আজ থেকে আমি অর্ধ মানুষ নই। পূর্ণ মানব। যেখানে আমার প্রিয়া আছে, সেখানে আমি অসম্পূর্ণ নই।’
    ‘তোমার স্পর্শে, তোমার জাদুকরি প্রভায় আজ আমিও পূর্ণ মানবী।’
    ‘তবে চলো আমাদের প্রিয় রাস্তাটায় ঘুরে আসি। কিন্তু তোমার পরীক্ষা?’
    ‘ওটা কাল দিব না; টিচারকে বলে পরে দিব।’
    দুই মানব-মানবী পেভমেন্ট ধরে হাঁটতে থাকে। দূর থেকে তাদেরকে দেখে মনে হবে তোনো ইম্প্রেশনিষ্ট আর্টিস্টের আঁকা জাদুকরি ছবি যেন জলজ্যান্ত রূপ ধরে হাঁটছে।

Skip to toolbar