Profile Photo

Hasan Zahid হাসান জাহিদOffline

  • HZWriter
  • অভিনয়
    -হাসান জাহিদ

    ‘আপনাকে যেই জন্য বুলাইছি…আরে, আপনি নিচে বইলেন কেলা? সোফায় বহেন।’
    ‘আমার কাছে সোফা আর নিচ কোনো পার্থক্য বহন করে না।’
    ‘কথা তো ভালোই কন, আচ্ছা নিচে বইয়া যদি দিলখুশ হয় তো বইয়া থাকেন।’
    ‘আমাকে ডেকেছেন কেন?’
    ‘মাফ চাইতে…।’
    ‘আপামনি আমাকে মাফ করেন…।’
    ‘আরে, মর জ্বালা। আপনে না, আমি মাফি মাংবো। মানে, আমারে ক্ষমা করেন। আই অ্যাপলোজাইজ ফর হোয়াট আই হ্যাভ ডান… প্লিজ মাফ কইরা দেন।’
    ‘এই জগতের মার-মার কাট-কাট খেলায় একজন মার খাবে, অন্যজন মার দিবে। এখানে মাফ চাওয়া-চাওয়ির কিছু নেই। জগতের নিয়ম আমি ভাঙতে পারব না।’
    নীলু কথা খুঁজতে লাগল। সে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল–তার সামনে বসালোকটাকে সিনেমার দুঃখী চরিত্রের মতো লাগছে।
    তার চেহারাটা দর্শকের মধ্যে করুণার সঞ্চার করবে। কোনো ভাবুক দর্শক সিনেমা দেখে রাতে বিছানায় শুয়ে এই লোকটার চরিত্রে অভিনয় করবে। আর নায়িকার হাতে মার খেয়ে বঞ্চনা ও না পাওয়ার বেদনার মধ্যে সূখ আনন্দ খুঁজে নেবে।
    নীলু সিলিং থেকে চোখ নামিয়ে হেসে উঠল। নীলুর হাসি দেখে লোকটা কিঞ্চিৎ অবাক চোখে তাকাল।
    ‘আপনিও কি সেরকম নাকি?’ নীলু বলল।
    ‘ম্যাডাম, আপনার কথা বুঝতে পারছি না।’ এবার সত্যিই বিস্মিত হয়ে বলল লোকটা।
    ‘ব্যস, এবার আপনি সোফায় বসুন।’
    ‘না।’
    ‘তবে চলে যান।’
    লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে যেতে উদ্যত হলে নীলু বলল, ‘উঠবেন না। কথা শেষ হয়নি আমার।’
    ‘আপনি দুইরকম ভাষায় কথা বলছেন।’
    ‘তা বলছি, আপনাকে দেখে আমার মেয়েবেলার এক হারিয়ে যাওয়া বন্ধু’র কথা মনে পড়ছে, তার সাথে আমি আমাদের পারিবারিক ভাষায় কথা বলতাম। আপনি দেখতে আমার ছোটোবেলার বন্ধুর মতো। সে আমার সাথে আমাদের পারিবারিক ভাষায় কথা বলত। আমাদের প্রতিবেশী ছিল–মানে একটা কমন বাউন্ডারি দেয়ালের এপাশে-ওপাশে থাকতাম আমরা। সে মারা গেছে। কীভাবে মারা গেছে শুনতে চান?’
    ‘না।’
    ‘কেন?’
    ‘মারা যাবার কথা আমার শুনতে ভালো লাগে না। এমনকি জন্মের কথাও শুনতে ইচ্ছা করে না; দুইটাই বিচ্ছিরি ব্যাপার।’
    ‘তবু বলি, আমার বন্ধু মারা যায় গাছ থেকে পড়ে। বড় একটি আমগাছ থেকে পড়ে। এবার বুঝলেন তার মৃত্যুর কারণ?’
    ‘গাছ থেকে পড়ে সে মারা যায়Ñএটা তার মৃত্যুর কারণ।’
    ‘কিন্তু তাকে গাছে উঠিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আর তাকে গাছে উঠিয়েছিলাম আমি। সুতরাং হত্যাকারী আমি, অথচ এই হত্যার কোনো বিচার হয়নি।’
    ‘আপনি সূত্রের ভেতরেই আছেন, ম্যাডাম।’
    ‘মানে কী?’
    ‘ওই যে বললাম, এই জগতে একজন মারে, অন্যজন মরে।’
    ‘গল্পটা বলব? মানে বন্ধু মরে যাবার ঘটনা। আসলে বন্ধুকে হত্যা করার গল্পটা?’
    ‘আপনি কি গল্প শুনানোর জন্য আমাকে ডেকেছেন?’
    ‘না, আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে ডেকেছিলাম, অবশ্য একটা ব্লান্ডার হয়ে গেছে। কাউকে ডাকিয়ে এনে তার কাছে ক্ষমা চাওয়াটা শোভনীয় না; তার কাছে গিয়ে মাফ চাইতে হয়। এই জন্য হয়তো আপনি আমাকে মাফ করছেন না। তাই না?’
    নীলু আবার পরখ করল সামনে বসা লোকটিকে। সে দরজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। ‘আপনি কি চলে যেতে চাচ্ছেন?’
    ‘জ্বি।’
    ‘ ‘গল্পটা শুনবেন না?’
    নীলু ও কার্পেটে বসা লোকটার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হলো। তারা ‘নীলু, নীলু’ ডাক শুনে দরজার দিকে তাকাল। এক দশাসই মহিলা ঢুকে বললেন, ‘তুই এহানে। তরে বিচরাইতাছি। নাহাইবি না? গরম পানি দিছে ইসুফের মা।’
    ‘অহন যাও মা, পরে নাহামু।’
    ‘ক্যাঠা?’ তাঁর চোখ গেল কার্পেটে বসা লোকটার দিকে। ‘আমাগো বাড়িতে নয়া আইছে সেই লোক?’
    নীলু ঘাড় নাড়ল। সেদিকে তাকিয়ে মহিলা বললেন, ‘দুপুরে খাইয়া যাইবার কইস। আউজকা পোলাও পাকাইছি।’
    নীলু লজ্জা পেল। বলল, ‘তুমি যাও মা, পরে নাহামু ।’ মহিলা চলে গেলে নীলু হাসল। তারপর বলল, ‘আমার মা। বহুত পুরানা লোক।’
    লোকটার মুখে কোনো ভাবান্তর হলো না। সে ফের দরজার দিকে তাকাল। নীলু বলল, ‘শুনুন গল্পটা।’
    ‘শুনতে চাচ্ছি না।’
    ‘কেন শুনাতে চাচ্ছি জানেন? আজ থেতে কুড়ি বছর আগের ঘটনা। আজ পর্যন্ত কাউকে আমি প্রকৃত গল্পটা বলিনি; আপনিই প্রথম শুনবেন।’
    ‘আচ্ছা বলুন।’ লোকটা এবার জানালার বদলে দরজার দিকে তাকাল।
    ‘আমার একটা পোষা টিয়া পাখি ছিল। সে কথা বলতে পারত। কিন্তু সে ভিতরে ভিতরে খুব পাজি ছিল। বহুদিন যাবৎ সে ব্লেডের মতো ধারালো ঠোঁট দিয়ে তার কেটে একদিন খাঁচা থেকে বের হয়ে যায়। প্রথমে সে উড়তে পারল না, লাট খেল। তারপর সে উড়ে গিয়ে আমাদের পুরনো আমগাছটায় গিয়ে বসে। আমি পাখির দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলাম, এমন সময় আরমান এলো।’
    ‘আপনাদের পুরনো আমগাছ তো দেখলাম না।’
    ‘সেটা আমাদের আগের বাসার কথা। পুরনো বাসা, দরদালান। বহু ইতিহাসের সাক্ষী। সেই বাসা ছেড়ে আমরা চলে এসেছি এই বাসায়। পুরনো বাড়িটা দুই বিঘা জমির ওপর ছিল, এখন সেটা মার্কেট।’
    লোকটা ঘনঘন জানালার দিকে তাকাচ্ছিল, সেদিকে তাকিয়ে নীলু বলল, ‘কী দেখছেন!’
    ‘না, তেমন কিছু না। আপনি গল্পটা বলুন।’
    ‘আমি আরমানকে বললাম, যে করেই হোক পাখিটা ধরে দিতে। আরমান ছিল আমাদের মহল্লার সেরা গেছো মানব। কিন্তু সেদিন সে ইতস্তত করছিল–আগের রাতে খুব বর্ষণ হয়েছিল। আমি তাকে জোর করে গাছে উঠালাম। সে ধীর ভঙ্গিতে গাছে উঠল। টিয়া তার দিকে পেছন ফিরে বসে ছিল। সে একহাতে একটা ডাল ধরে অন্য হাতে টিয়া পাখিটা ধরতে যাবে, এমন সময় পা পিছলে যায় তার। প্রথমে সে পড়ল আমাদের গোসলখানার টালির ছাদে, সেখান থেকে গড়িয়ে মাটিতে পড়ল। তার পড়ার সেই ভোঁতা আওয়াজ এখনও আমার কানে লেগে আছে। হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল তাকে, কিন্তু পরদিন সে মারা যায়।’

    নীলু মাথা নিচু করে বিষণ্ন ভাবালুতায় ছেয়ে যায়। লোকটা উঠে দাঁড়াল, তারপর দরজার দিকে অগ্রসর হলো।
    ‘দাঁড়ান,’ নীলু বলল, ‘আমারই গাফিলতি হয়েছে। আমি আপনার ঘরে গিয়ে আপনার কাছে মাফ চেয়ে আসব।’
    লোকটা কিছু না বলে বেরিয়ে গেলে নীলু বিড়বিড় করে বলল, ‘মাফি মাঙতেও এতো পেরেশানি! না, আর মাফ চাইতে যামু না। দেখি হালায় কী করে।’
    ‘ও আফা, পানি তো জুড়াইতাছে। নাহাইবেন না?’ ইউসুফের মায়ের চিৎকারে ঝট করে ঘাড় ঘুরাল নীলু–ইচ্ছে হলো মেয়েলোকটাকে কষে একটা ঠাপ্পড় লাগাতে।

    সন্ধ্যায় নীলু হাজির হলো লোকটার গ্যারাজের মাথায় ঘরটায়। লোকটা উদাসীন দৃষ্টিতে জানালা গলিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
    ‘আমি এখন আপনার দরজায়, আমার জানালার পাশে না। এদিকে তাকান।’
    লোকটা আমতা-আমতা করে বলল, ‘আপনি!’
    ‘এতো অবাক হবার কী আছে। বলেছিলাম না আমি আসব?’
    লোকটা হা করে আছে। নীলু মেঝেতে বসে পড়ল। লোকটা বিছানার কিনারা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাহাকার করে উঠল, ‘এ কী করছেন। মেঝেতে কেন? ওই চেয়ারটায় বসুন,’ বলে সে দেয়ালে টানানো একটা শার্ট টেনে সেটা দিয়ে চেয়ার ঝেড়ে দিল।’
    ‘ব্যস্ত হবেন না। আপনিও তো আমার বাসায় গিয়ে নিচে বসেছিলেন।’
    ‘সেটা কার্পেট ছিল, আর এটা নোংরা মেঝে। আপনার অ্যালার্জি হবে।’
    ‘হোক, আমি এখানেই বসব।’ সামান্য ইতস্তত করে নীলু বলল, ‘মাফ পাব না?’
    ‘কিন্তু আমি আজও বুঝতে পারছি না, সেদিন আপনি আমাকে মেরেছিলেন কেন?’
    নীলু অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘মারিনি, আমি কি গুন্ডা নাকি যে আপনাকে মারব? বলতে লজ্জা লাগছে, একটা থাপ্পড়…।’
    ‘সেটাই বা কেন করলেন?’ লোকটা চট করে একবার জানালার দিকে তাকাল।
    ‘আমি তো এখানে, আবার আমার জানালার দিকে তাকাচ্ছেন কেন! আপনার বাসায় চা আছে?’
    ‘না।’
    ‘চা নেই! চা খান না আপনি?’
    ‘না। কফি খাই।’
    ‘কফি আছে?’
    ‘জ্বি।’
    ‘কফি দেন।’
    ‘চিনি ছাড়া কালো কফি খাই আমি, খাবেন?’
    ‘না। তিতা লাগবে, চা খান না কেন?’
    ‘এমনি। তিতা কফি এনে দেব?’
    ‘দিন।’
    লোকটা চলে গেল কফি আনতে আরেকটা খোপে।
    তিতা কফি আনবে সে? নীলুর চোখে ভাসল ফেনা ওঠা ক্রিম মেশানো কফি। মাঝেমধ্যে কাপ উপচে ওঠা ওইরকম কফি খেতে ভালোই লাগে। কিন্তু বাসায় কেউ সেই কফি বানাতে পারে না; সে নিজেও চেষ্টা করেছিল; দোকানের মতো হয়নি।
    ‘এই যে, কফি।’
    নীলু কফিতে চুমুক দিয়ে মুখ কুঁচকাল। লোকটা আগ্রহভরে নিচু হয়ে নীলুর দিকে তাকিয়ে ছিল–যেন অদ্ভুত কোনো জন্তু দেখছে। নীলু তার দিকে তাকালে তড়াক করে সোজা হয়ে দাঁড়াল লোকটা।
    ‘এতো বিটার কেন? এই কফি খান আপনি?’
    ‘চড়ের মতো তিতা, তাই না?’
    ‘লজ্জা দিচ্ছেন কেন?’ নীলু অভিমান ভরে বলল, ‘আমি তো মাফ চাইতেই এসেছি।’
    ‘আপনি চেয়ারে বসুন, মেঝেতে অনেক ধুলা।’
    ‘এক কথা বারবার বলছেন কেন? বিরক্ত হচ্ছি। এমন বিরক্ত করলে আর আসব না। আমি এসেছিলাম…।’
    ‘মাফ চাইতে।’
    ‘ঠিক, কিন্তু আপনি বাধাগ্রস্ত করছেন।’
    ‘কফিটা বোধহয় ভালো লাগেনি আপনার, তাই না?’
    ‘আপনাকে খুশি করার জন্য বলা উচিৎ ভালো লেগেছে, কিন্তু মিথ্যা আমি বলতে পারি না। কী জানেন, এরচেয়ে চিরতার পানি খাওয়া অনেক বেটার হতো।’
    ‘দুঃখিত। এখন বলুন চড় খাওয়ার মতো কী কাজ আমি করেছিলাম।’
    ‘আপনি আমার জানালার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন সেদিন, তাই।’
    ‘চোখ, এবং আরো দুয়েকটি ইন্দ্রিয় মানুষের বশে থাকে না। চোখ অনেকসময় নিজের অজান্তেই সিসি ক্যামেরার মতো তাকায়।’
    ‘ডোউন্ট অ্যাক্ট ওভারস্মার্ট। মেয়েদের জানালার দিকে তাকিয়ে থাকাটা অভদ্রতা। তবুও আমি এসেছি মাফ চাইতে, চড়টা চার কেজি ওজনের সমান ছিল বলে। জানেন, আপনাকে যে ওজনে চড়টা বসিয়েছিলাম, সেই অনুপাতে ওয়েয়িং স্কেলে থাবড়া মেরে দেখলাম সেটা চার কেজি।’
    ‘কী মিন করছেন?’
    ‘আই মিন, আপনার অপরাধের তুলনায় চার কেজির থাপ্পরটা দুই কেজির হওয়া উচিৎ ছিল। তাই মাফ চাইতে এসেছি।’
    ‘কষ্ট করে মাফ চাইতে আসার দরকার কী? আপনাকে দুই কেজি ফেরৎ দিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।’
    ‘না থাক, মাফই বরং চাই। আপনি যদি চড়ের ওজন আন্দাজ করতে না পারেন।’
    ‘মিস নীলু, আপনি দয়া করে মেঝে থেকে উঠুন আর চড়ের বিষয়টা মাথা থেকে গায়েব করে দিন।’
    ‘আপনিই না বললেন মানুষের ইন্দ্রিয় বশে থাকে না; আমি চড় দেবার বিষয়টি মাথা থেকে দূর করতে পারছি না।’
    লোকটা ঘরজুড়ে পায়চারি করল, দার্শনিকের মতো তার দুইহাত পেছনে। নীলু টেবিল ফ্যানের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লোকটার অদ্ভুত পায়চারি দেখল। লোকটা আচানক পায়চারি থামালে, হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাবার মতো নীলুও থেমে গেল।
    লোকটার মুখজুড়ে হাসি–সেই হাসি সংক্রমিত হলো মেঝেতে বসে থাকা নীলুর মুখে। নীলু বলল, ‘কী হলো?’
    লোকটা বারকয়েক জানালার দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল, ‘একটা আইডিয়া এসেছে মাথায়।’
    ‘কী আইডিয়া?’ কপট খুশিতে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল নীলু।
    ‘বুঝতে পারছি, আপনি মাফ চাইতে পারছেন না। তারচেয়ে এক কাজ করি, যে কাজের জন্য আমি চড় খেয়েছিলাম, সেই কাজটাই আমি ফের বারকয়েক করে ফেললে শোধবোধ হয়ে যায়।’
    ‘মানে, আমার জানালায় তাকিয়ে থাকা?’
    ‘হ্যাঁ, তবে এখন তাকাব না। আপনি চলে গেলে।’
    ‘ওকে, ডান। তবে একটা কথা, টাংকি মারতে পারবেন না কিন্তু। শুধু তাকাবেন।’
    ‘ঠিক আছে।’
    তড়াক করে উঠে দাঁড়াল নীলু। দুলে দুলে হাসতে লাগল। বলল, ‘আপনি খুব ভালো লোক। এখন আসি আমি?’
    ‘আসুন।’

    একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজকে বারদুয়েক ভেংচি কাটল লোকটা। নিজকে বলল, ‘দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে নিজেকে লুকিয়ে রেখে ভেক ধরেছ। কাপুরুষ, বাস্তবের মুখোমুখি হবার সাহস হলো না কোনোদিন?’
    আয়না জবাব দিল, ‘নতুন কেনা রেজর-কাঁচি চালাও গালে, বেশি বাক্য প্রয়োগের দরকার নেই। বোকারা বেশি কথা বলে।’
    লোকটা রেজরের দিকে তাকাল, কাঁচিটা নেড়েচেড়ে দেখল। তারপর কাঁচি হাতে নিয়ে প্রায় জটা ধরা দাড়ির একাংশ ঘ্যাঁচ করে কেটে হো-হো করে হেসে উঠল। তার ছাত্রছাত্রীরা তাকে দেখে আকাশ থেকে পড়বে।
    সে শেভিং ফোম মাখল গালজুড়ে। রেজর চালাল, কাজ শেষ করে মসৃণ গালে হাত বুলোতে বুলোতে আরেকবার হাসল।
    দৃশ্যটা কল্পনা করল সে: নাজমা জিজ্ঞেস করবে, ‘স্যার চাকরি পেয়েছেন? আমাকে আর পড়াতে আসবেন না?’ সুজন বলবে, ‘স্যারকে খুব হ্যান্ডসাম লাগছে।’ রাবেয়া বলবে, ‘স্যারের কি বিয়ে ঠিক হয়েছে?’
    সবার প্রশ্নের উত্তর হবে, ‘না।’
    সবাই অবাক হবে। হোক, এখন মানুষ কোনোকিছুতে সহজে অবাক হতে পারে না। সামান্য কারসাজি করে মানুষকে অবাক করে দেবার মধ্যে বাহাদুরি থাকবে নিশ্চয়ই।
    আচ্ছা, নীলু কি খুব অবাক হবে? কতটা? ভিড়মি খাবে?

    ‘তুমি নীলুর কথা ভাবছ কেন? কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?’
    ‘না।’
    ‘তবে?’
    আয়নার প্রশ্নের উত্তরে সে বলল, ‘জগতে সব তবে’র উত্তর নেই। আমার মাথায় ভাবনা উদিত হতে পারে, ভাবনারা তো ডায়াবেটিসের রোগী না যে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলবে। নীলুর কথাও তাই ভাবলাম।’
    শেভ-গোসল সেরে সে টেবিলে বসল, সুজনের জন্য নোট তৈরি করতে হবে। পাঠ্যপুস্তক, গীতবিতান, গড অভ স্মল থিংস, নোটবই, খাতা, কাগজ-কলম, প্রোফাইল ফোল্ডার–প্রত্যেকেই জানান দিল–এই টেবিলে কেউ এসেছিল, তার স্পর্শ বই-খাতায়। কখন এলো!

    কেউ অবাক হয়নি; তবে মামুলি দুয়েকটা প্রশ্ন করেছে। যেমন, আপনার কি ইন্টারভিউ ছিল? একজন বলল–দাড়িগোঁফই তো ভালো ছিল। সবচেয়ে কম অবাক হলো নীলু। কিংবা এতো বেশি অবাক হয়েছে যে, বিস্ময় প্রকাশ করতে ভুলে গেছে।
    পরদিন দুপুরে নীলুকে ওর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। নীলু বলল, ‘ভেতরে আসতে পারি?’
    ‘পারেন, তবে নিচে বসবেন না। বিছানায়, না হয় চেয়ারে বসবেন।’
    ‘নিচেও বসব না, বিছানায় বা চেয়ারেও বসব না।’
    ‘তবে কোথায় বসবেন?’
    ‘বসব না, দাঁড়িয়ে থাকব।’
    ‘আচ্ছা।’
    নীলু ভেতরে এসে বলল, ‘কাল আপনি খাননি, আজ মা খেতে ডেকেছে। মা মানুষকে খাওয়াতে ভালোবাসে। আসবেন না?’
    ‘আসব, মুরুব্বি মানুষ ডেকেছেন।’
    নীলু সরু চোখে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার চোখে অনেক প্রশ্ন, মানে আপনি ভাবছেন আমি কেন জিজ্ঞেস করছি না দাড়িগোঁফ কাটার পর আপনাকে কেমন লাগছে।’
    ‘ভাবছিলাম বৈকি।’
    ‘আমি বিস্মিত হইনি কারণ আমি জানতাম আপনি এই কাজটি একদিন করবেন।’
    ‘কীভাবে জানতেন?’
    ‘জানতাম। কিন্তু কীভাবে, তা আপনাকে বলব না।’ নীলু রহস্যময় হাসি দিল। তারপর বলল, ‘দুপুরে আসবেন কিন্তু।’

    বিশাল ডাইনিং টেবিলে বিরাট এক লোক বসে আছে। চোখে চশমা, গালে খোঁচা সাদাকালো দাড়ি। মুখটা মাংসল-তেলতেলে। টেবিলে সাজানো অনেক রকমের খাবার–পোলাও-মাংস-সব্জি, ভাত-তরকারি, মাছভাজা, আলুভর্তা, আর চটপটি।
    ‘বসুন।’ নীলু বলল।
    ‘উনি ক্যাঠায় রে?’
    ‘উনি আমাদের এখানে নতুন এসেছেন ‘ নীলু তাকাল তার দিকে, বলল, ‘আমার বড়ভাই, জুয়েলারির দোকান আছে।’
    ‘আমার নাম জহির আহমেদ। শিক্ষকতা করি।’ সে নিজের পরিচয় দিল।
    ‘বহেন ভাই, একটু খানাপিনা করেন। দোকান নিয়া ব্যস্ত থাকি, আপনার সাথে তাই দেখা হয় নাইক্কা। আউজকা দোকান বন রাখছি।’
    সে বসল খাবার টেবিলে, সংকোচ ও লজ্জায় নীলুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনিও বসুন না আমাদের সাথে।’
    ‘হ বইন, একলগে বহ, উনি শিক্ষক মানুষ, শরম কীসের।’
    ‘আপনি সোনার ব্যবসা করেন?’
    ‘হ্। তেরো বচ্ছর চলতাছে। আমাগো এই বাড়িতে আহনের পর। আগের বাড়ি বাবায় কিনছিল পাকিস্তান আমলে। নতুন ঢাকায়। সেই সময়ের নতুন ঢাকা আছিল বন-জঙ্গল। ৯৩ সালে ওই বাড়ি ডেভেলপারদের দিয়া আমরা আমাগো দাদার পুরান ঢাকার এই বাড়িতে উঠি। আগে আমার চম্পাতলিতে ঘড়ির কারবার আছিল।’
    ‘বড়ভাই কিন্তু ভালো কাওয়ালি গায়ক।’ নীলু মৃদুস্বরে বলল।
    ‘তাই নাকি! একদিন ভাইসাহেবের কাওয়ালি শুনব।’
    হা-হা করে হেসে উঠলেন তিনি–এহন আগের মতো দম নাই। আর কাওয়ালি করতে দল লাগে, দলটা ভাইঙা গেছে। মাগার আশুরা আর রমজানের সময় হ্যারা আহে, তখন করি।’
    এই সময় নীলুর মা এলেন। তিনি টেবিলের একপাশে বসে বললেন, ‘বাবা, খানা ভালো হইছে?’
    ‘জ্বি চাচি।’
    ‘আপনেরা গল্প করেন, আমি একটু বিশ্রাম নেই উপরে গিয়া, সপ্তাহে একদিনের ছুটিতে ওয়াইফ ছেলেমেয়ে গো সময় দেই।’
    ‘জ্বি ভাইসাহেব, আপনি রেস্ট করুন।’
    নীলুর বড়ভাই উঠে গেলে নীলু বলল, ‘একটু চটপটি দিব?’
    ‘দিন, একটুই দেবেন।’
    সে চটপটির বাটি নিয়ে আড়চোখে তাকাল নীলুর দিকে–নীলু একটা হাড্ডি নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। মুখে স্মিত হাসি।
    সে এবার তাকাল নীলুর মা’র দিকে। তিনি একদৃষ্টে তার খাওয়া দেখছিলেন। সে বলল, ‘চাচি, খাবার খুব ভালো হয়েছে।’
    ‘মাঝেমধ্যে আইসা খাইবা।’
    ‘আচ্ছা।’

    ***
    নীলু। এই নামটি ও এই বাড়ির পরিবেশ নতুন মাত্রা যোগ করল তার একঘেয়ে জীবনে। তার প্রায় ভবঘুরে জীবনে কয়েকটি ভাড়া বাড়িতে ও ব্যাচেলরদের সাথে থেকে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে, তার কয়েকগুণ বেশি অভিজ্ঞতা হলো মাত্র তিনমাস এই বাড়িতে অবস্থান করে।
    বাড়িটা গথিক ধাঁচের। অনেক জায়গা জুড়ে আছে। সে জানতে পারল নীলুরা তিনভাই, একজন মারা গেছে ছোটোকালে। অন্য ভাই সুইজারল্যান্ডে থাকে–সুইস মেয়ে বিয়ে করেছে। সোনা ব্যবসায়ী ভাই সবচেয়ে বড়, আর সবার ছোটো নীলু।
    ভেতরে এখনও কিছু গাছপালা রয়ে গেছে। গ্যারেজটা নির্মিত হয়েছিল আশির দশকে, যখন নীলুর বড়ভাই ও সুইজারল্যান্ডপ্রবাসী মেজোভাই সাইদ দুটি টয়োটা গাড়ি কিনেছিলেন। দারোয়ান বা গেস্ট থাকার জন্য গ্যারেজের ওপর কোঠা বানানো হয়। প্রথম কিছুদিন নীলুর মায়ের দিকের আত্মীয় এক হস্তরেখাবিদ অকৃতদার ভদ্রলোক থাকতেন, সেই ভদ্রলোক একদিন নিখোঁজ হয়ে যান, তার আর সন্ধান মেলেনি। সেই থেকে কোঠাটা শূন্য পড়ে ছিল। নীলুর স্কুল জীবনের এক সহাঠিনী লুৎফা তার ছাত্রী। সে-ই সন্ধান দেয় নীলুদের এই কোঠার।
    নীলুর মা জানালেন, তাঁর হস্তরেখাবিদ চাচাতো ভাইয়ের স্কিটসোফ্রেনিয়া রোগ ছিল। সে নাকি দেখত নীলুর দাদার রেসের ঘোড়া রাতে এই ভাঙাচুরা শেডে এসে হ্রেষারব করছে।

    বাড়িটাতে চোর-ডাকাত ভুলেও ঢোকে না, আর প্রতিবেশীরা এই বাড়ির একজন সদস্য রূপে তাকে সম্মান করে। এর কারণ, নীলুর দাদার প্রতিপত্তির চিহ্ন এখনও বাড়ির সর্বত্র ও মহল্লায় বিদ্যমান। তিনি নিজ খরচে একটি এতিমখানা, দুটি মসজিদ ও একটি দুঃস্থ বোর্ডিং স্থাপন করেছিলেন।
    নীলুর মা সেদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, এই বাড়িটার ভেতর ঘোড়া ও ঠিকাগাড়ি দুইটিই অস্তিত্বমান ছিল। নীলুর দাদার দুটি কারাবাখ ঘোড়া ছিল, যা রেসের কাজে ব্যবহার করতেন তিনি, রেসকোর্সে ঘোড়ার বাজিতে প্রচুর আয় করতেন। আর ছিল চারটা দেশি প্রজাতির ঘোড়া। ঘোড়া ও ঠিকাগাড়ির চিহ্ন এখনও এই বাড়ির বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁষা বহু পুরনো শেড বহন করছে।
    শুধু একটা ব্যাপারে তার করোটিতে অস্বস্তির ঢেউ খেলে যায়। একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা যায়, সেইসাথে ধাতব ঝনঝনানির শব্দ। কখনও গভীররাতে, কখনও ভরদুপুরে, কখনও বা সাঁঝের বেলায়। শব্দটা আসে বাড়ির দোতলা থেকে।
    সেদিন দুপুরে সে চিৎকারটা শুনল তার সিঁড়ির গোড়ায়। অমানবিক চিৎকার। তাকে লক্ষ্য করেই কেউ বলছে, ‘আমি কইছিলাম না আমার ভাইয়ে থাকব এই কোঠায়। তুই কোন জাওড়া এইহানে আইছস।’
    ‘জহির ভাই দরজা খুলবেন না।’ নীলু তার জানালা দিয়ে বলল, ‘খবরদার, দরজা খুলবেন না।’
    দরজা না খুললে সিঁড়ির গোড়ায় কে শাসাচ্ছে তাকে, তা দেখা যাচ্ছেনা; তবে সেটা যে ভয়ংকর কিছু তা মালুম হলো।
    সে জানালার কাছে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পরে বাড়ির ফটক দিয়ে তিনজন দজ্জাল মহিলাকে ঢুকতে দেখল।
    তার সিঁড়ির গোড়ায় ধ্বস্তাধ্বস্তির শব্দ হলো। খানিক বাদে দেখতে পেল শেকল বাঁধা এক উন্মাদিনীকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাচ্ছে সেই বৃহদাকার তিন মহিলা।
    সন্ধ্যেয় নীলু এলো। কোঠায় ঢুকে তার বিছানায় ধপাস করে বসল। ‘কী হয়েছে? ওই মহিলা কে?’ সে জিজ্ঞেস করে।
    ‘ভাবি। বড় ভাইয়ের বউ। উন্মাদ। কেমন করে জানি আজকে ছাড়া পেয়ে যায়। মাকে কামড়ে রক্তাক্ত করে ফেলেছে। বড়ভাই মাকে ক্লিনিকে নিয়ে গেছে।’
    ‘উনাকে বিদেশে চিকিৎসা করানো হয়েছে?’
    ‘কয়েকবার, কাজ হয়নি। আমরা জানতাম না যে, উনারা বংশগতভাবে পাগল। এমনিতে ভালোই থাকে, বড়ভাইয়ের সাথে কোনোদিন খারাপ ব্যবহার করেনি; কিন্তু হঠাৎ কেমন সব তান্ডব শুরু করেন উনি।’
    নীলু উদাস দৃষ্টি মেলে বলল, ‘আমার বড়ভাই খুব ভালোমানুষ। এই মানুষটার কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না।’
    ‘একটা কথা বলব?’
    ‘বলুন।’
    ‘আমি কি এই কোঠায় থাকব না চলে যাব?’
    ‘কেন বলুন তো, চলে যাবার প্রশ্ন এলো কেন!’
    ‘না, বলছিলাম আপনার ভাবি…।’
    ‘ও কিছু না। ভাবির পাগলামি বেড়ে গেলে একেক সময় একেকটা ইস্যূ তুলে ধরে।’
    ‘বলছিলেন উনার ভাইকে নাকি এখানে রাখবেন উনি।’
    ‘কীভাবে? তার ভাই তো কবেই মরে গেছেন–উনিও উন্মাদ ছিলেন।’
    ‘তাই নাকি?’
    ‘আমি যাই, মাকে ক্লিনিক থেকে আনার কথা। দেখি গিয়ে, বুড়ো মানুষ। শেষে কি কুকুরের কামড় খেয়ে মরে যাবে নাকি।’ বিড়বিড় করতে করতে নীলু চলে গেল।

    ***
    নীলু অনেকদিন আসে না। বিদেশ চলে যাবে–এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মাঝখানে একদিন এসেছিল, আইইএলটিএস লেসন বুঝতে। একদিনই এসেছিল, আর আসেনি। হয়তো নীলু এখন পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত, সে অনুমান করল।
    শূন্যতা গ্রাস করে তাকে। নীলু আসছে না বলেই কি! কিন্তু তা কী করে হয়। নীলু তো তার কেউ নয়। তবু বুকটা এতো ভারী লাগছে কেন! সামান্য শব্দেই সে চমকে ওঠে–এই বুঝি নীলু এলো।

    তার সাথে নীলুর আচরণ অদ্ভুত ঠেকলেও, মনে হয়েছিল, কোথায় যেন একটা ছন্দ লুকিয়ে আছে। হঠাৎ কেন ছন্দপতন হলো, নীলু কি ওকে নিয়ে খেলেছে? ওর মাঝে কোনো প্রত্যাশা জাগিয়ে তারপর নিজকে গুটিয়ে নিয়েছে?
    সে নিজে কি নীলুকে নিয়ে কোনো স্বপ্নের জাল বুনেছিল? তার অবচেতন মন কোনো মায়াজাল বুনেছে?
    মনে হলো নীলুর সাথে কথা হওয়া দরকার। কিন্তু কেন মনে হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা সে খুঁজে পেল না।
    অস্থিরতার সাথে সে তার কক্ষে পায়চারি করে। সহসাই উত্তরটা মিলল। গোটা পর্বটা একটা অভিনয় ছিল। নীলুর বারবার তার কাছে ক্ষমা ভিক্ষার বিষয়টা জলবৎ তরলং। নীলু খেলেছে তাকে নিয়ে–ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে একধরনের রসিকতা ছিল। কিন্তু এমন নির্মম রসিকতা নীলু তার সাথে করতে পারল!

    উত্তরটা পেয়ে গেল সে: নীলুকে ঘিরে তার অবচেতন মন একটা আশার জাল বুনেছে। নীলুর সঙ্গ, এই বাড়ির পরিবেশ, একটি নিরালা বাসস্থান, আর নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপন তাকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল।
    স্বপ্ন যে সত্যি হয় না–সে ভুলে গিয়েছিল। একটা কমনীয় ও রূপসী মেয়ে, অগাঢ অর্থের মালিক, যুবতী-চপলা মেয়ে, তার ঢাকাই লেবাস বদলাতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছে, এমএ পাস করেছে ইংরেজি সাহিত্যে। সেই মেয়ে কি একটা টিউশ্যনি করে জীবিকা নির্বাহকারী বিগতযৌবন পুরুষকে তার সত্তায় মিশিয়ে একাকার করে ফেলবে?
    দরজায় টোকা পড়ার শব্দে আশার সলতে দপ করে জ্বলে উঠল। সে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আসছি নীলু।’
    সে ছুটে গিয়ে দরজা খুলে নীলুর বড়ভাইকে দেখতে পেল।
    ‘একটা জরুরি বিষয়ে আইলাম।’
    ‘জ্বি বলুন ভাইসাহেব।’
    ‘আপনি শিক্ষিত ও শিক্ষক মানুষ। আপনি ভালো লোক। কিন্তু একটু অসুবিধা হইয়া গেছে। আপনাকে এই কোঠা ছাড়তে হইব। আমার স্ত্রী আপনারে দেইখা চেইতা গেছে। ডাক্তার কইছে, স্ত্রী যখন যা বলে তা করতে। জানেন তো সে অসুস্থ।’
    ‘জ্বি, জানি।’
    ‘তাইলে ওই কথাই রইল।’
    সে আনমনা ভঙ্গিতে ঘাড় নেড়ে সায় দেয়।

    তারপর…।

    আবার সেই পুরনো গণ্ডিতে প্রত্যাবর্তন। একটা রান্নাঘর ও একটা বাথরুম চারজন শেয়ার করে আশাহীন ও বোধহীন জীবন যাপন। একজন অবসরপ্রাপ্ত কেরানি বাবার পুত্রের জীবন এরকমই হবার কথা।
    মাঝখানের তিনটি মাস ছিল অভিনয়ের পালা। জীবনে সুখ না মিললেও সুখের অভিনয় তো সুলভ। এরকম সুলভ, জাদুবাস্তবতাময় জীবনে আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় বিচরণ করি।

Skip to toolbar