-
পরী
প্রীতম বিশ্বাসরাতের আকাশে চাঁদ যেনো একটা বিশাল সাদা গোলাপের মতো ঝুলে আছে, চারপাশে ঘন বনের মধ্যে দিয়ে হালকা বাতাস বইছে। প্রীতম হাঁটছে গভীর বনের পথ ধরে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, তার এই পুরনো ছোট্ট কুটিরে আসা—এ যেনো এক অদ্ভুত টান। যদিও এখানে কোনো মানুষের বসবাস নেই, তবুও তার মন সবসময় এখানে আসতে বাধ্য করে। আজও সেই অজানা আকর্ষণে প্রীতম গভীর রাতে এখানে এসেছে।
বনের ভেতর পা ফেলতেই সে হঠাৎ শুনতে পেলো মৃদু হাসির আওয়াজ, যেনো কেউ তার পেছন থেকে তাকিয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে পিছনে ফিরলো, কিন্তু কিছুই দেখতে পেলো না। তার মনেই হলো, এই বনটা অদ্ভুত, যেনো কিছু লুকিয়ে আছে, চোখের সামনেই কিন্তু ধরা দেয় না। এই বনে কিছু একটা আছে, এমন কিছু যা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না।
প্রীতম এগিয়ে চলল। আচমকা, তার সামনে দিয়ে যেনো এক ঝলক আলো ছুটে গেল। আলোটা এত দ্রুত চলল যে সে কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। একসময় সামনে এসে দাঁড়ালো একটি মায়াবী রূপসী মেয়ে। প্রীতম হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটির গায়ের রং ছিলো চাঁদের মতো ফ্যাকাশে, আর চোখ দুটো যেনো কোনো পুরোনো গোপন রহস্য লুকিয়ে রেখেছে।
মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বলল, “তুমি কে? এখানে কী খুঁজতে এসেছো?”
প্রীতম কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। “আমি প্রীতম। এই বন আমাকে সবসময় টানে। তুমি কে?”
মেয়েটি হাসল। “আমি লীলা। এই বন আমার বাড়ি। আমি এখানে থাকি, যেখান থেকে কেউ আমাকে দেখতে পায় না। কিন্তু আজ তোমার পথের ধারে এসেছি, কারণ তুমি একমাত্র মানুষ, যাকে আমি দেখতে চেয়েছি।”
প্রীতম তার কথা শুনে অবাক হল। “তুমি কি মানুষ নও?”
লীলা আবারও মৃদু হাসল। “মানুষ নয়, তবে মানুষের মতোই। আমি এই বন, এই চাঁদ, এই বাতাসের অংশ। মানুষ আমাকে দেখতে পায় না, কারণ আমি বাস্তবের বাইরের এক জগতের বাসিন্দা।”
প্রীতম যেনো এক মায়াবী স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। লীলা সত্যিই এক পরী, কিন্তু মানুষের মতোই রক্ত-মাংসের। তবে তার মধ্যে এমন কিছু আছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নেই—এক রহস্যময় আকর্ষণ, যা প্রীতমকে এক মুহূর্তের জন্যও তার থেকে চোখ সরাতে দিচ্ছে না।
প্রতিদিন রাতেই প্রীতম এবং লীলার দেখা হতে লাগলো। গভীর রাতে তারা বনের গহীন পথে হাঁটতো, চাঁদের আলোয় আলোকিত সেই পথে যেনো সময় থমকে থাকত। প্রীতম লীলার সাথে কথা বলতে বলতে উপলব্ধি করল, লীলা কেবল পরী নয়, সে এক অমর আত্মা, যাকে প্রকৃতি ও কল্পনার মাঝখানে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার জীবন মানুষের মতো নয়—সময়ের কোনো সীমা তাকে স্পর্শ করে না।
কিন্তু সময় যত এগিয়ে চলল, প্রীতম বুঝতে পারল, লীলার সাথে তার সম্পর্ক কেবল দৈহিক নয়, বরং আত্মিক। লীলা তার মনের এমন এক অংশ জাগিয়ে তুলেছে, যা এতদিন গভীরে ঘুমিয়ে ছিল। তাদের এই সম্পর্ক এক গভীর রহস্যের মতো—যেখানে বাস্তব এবং কল্পনা মিলে একাকার হয়ে গেছে।
এক রাতে প্রীতম লীলাকে বলল, “তুমি কি চিরকাল এভাবে থাকবে? আমার কাছে? নাকি একদিন তুমি হারিয়ে যাবে?”
লীলা নীরবে প্রীতমের দিকে তাকালো। তার চোখে যেনো এক গভীর বিষাদ। “আমার অস্তিত্ব এই বনের সঙ্গে বাঁধা, এই চাঁদের আলো, এই বাতাসের সাথে জড়িত। আমি বাস্তবের বাইরে বাস করি। তুমি যদি আমাকে সত্যিই পেতে চাও, তবে তোমাকেও আমার মতো এই জগতের বাইরে যেতে হবে।”
প্রীতম চুপচাপ শুনল। সে জানত, তার জন্য এই সম্পর্কের অর্থ অনেক গভীর। লীলা শুধু এক মায়াবী নারী নয়, বরং তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু সে জানে না, কিভাবে এই দুটো জগতের মাঝের সীমারেখা অতিক্রম করবে।
এক রাতে, তারা যখন বনের গহীনে দাঁড়িয়েছিল, হঠাৎ করে লীলা বলল, “আজ তুমি আমাকে চিরকালের জন্য পেতে পারো, কিন্তু এর জন্য তোমাকে সবকিছু ছেড়ে আসতে হবে। এই বাস্তবতা, এই পৃথিবী, তোমার পরিচিত জীবন—সব।”
প্রীতম লীলার চোখের দিকে তাকাল। তার মনে হল, এই সিদ্ধান্ত নিতে হলে তাকে নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে ভাবতে হবে। সে জানে, একবার লীলার জগতে প্রবেশ করলে আর ফিরতে পারবে না।
কিন্তু তার ভালোবাসা এত গভীর যে সে সিদ্ধান্ত নিল, লীলার সঙ্গেই থাকবে।
প্রীতম লীলার হাত ধরল। তার শরীর শীতল, যেনো চাঁদের আলোতে তৈরি। ঠিক তখনই চারপাশের বন, বাতাস, আর চাঁদের আলো এক এক করে মুছে যেতে শুরু করল, যেনো বাস্তবতার পর্দা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। লীলা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “তুমি আমার সঙ্গেই থাকবে, চিরকালের জন্য।”
হঠাৎ করেই লীলার পিঠ থেকে দুটি সাদা, বিশাল ডানা বেরিয়ে এল, যা চাঁদের আলোতে চকচক করছে। ডানাগুলো এত বড় এবং এত মসৃণ যে, প্রীতম মুগ্ধ হয়ে গেল। লীলা ধীরে ধীরে ডানা মেলে আকাশের দিকে উড়তে শুরু করল, তার চারপাশে ভেসে আসছে এক মিষ্টি সুগন্ধ। সেই সুগন্ধে প্রীতমের মাথা ঘুরে উঠল, যেনো তার সমস্ত শরীর শান্তিতে ভরে গেছে।
লীলা প্রীতমকে ধীরে ধীরে উপরে তুলে নিলো, আকাশের দিকে। চারদিকে শুধুই অন্ধকার আর তারার আলো, আর তাদেরকে ঘিরে সেই রহস্যময় বাতাসের স্পর্শ। তারা দু’জনই ভাসছে আকাশের অসীম নীলিমায়, যেখানে কোনো সীমা নেই, সময় নেই। লীলার চোখে সেই চিরন্তন রহস্যের হাসি, আর প্রীতম অনুভব করল যে সে আর এই পৃথিবীর অংশ নয়, বরং লীলার জগতে চিরকালীন ভালোবাসার মধ্যে মিশে গেছে।
নীচের পৃথিবী ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, তাদের চারপাশে শুধু ছিল আকাশের মিষ্টি বাতাস আর আলোর সুরেলা প্রতিধ্বনি। লীলার ডানার ঝাপটায় পৃথিবীর সব সীমা মুছে গেল, প্রীতম জানত, এই মুহূর্ত থেকেই সে চিরকালের জন্য লীলার সঙ্গে, এক অনন্ত প্রেমের গভীরে, যার কোনো শেষ নেই, কোনো প্রান্ত নেই।
Friends
সুশোভন ইফতেখার শাওন
@shosovon
Prithula Zaman
@prithula
এস এম সজিবুল ইসলাম
@shojib-rumman
Md-Shajib-Sikder
@md-shajib-sikder
Queen Ritu
@smilee88
ইয়াসিন আরাফাত
@easir-arafat
মো: কামরুল হাসান (অপু)
@kamrul-hasan
চিন্তাতরঙ্গিনী
@thoughtwaves
Ikram Akbar
@ikram-akbar
