Profile Photo

জাহিদুল ইসলামOffline

  • jahidnotes
  • Profile picture of জাহিদুল ইসলাম

    একানে চা সন্ধ্যা
    ​১. চিরচেনা মাটির ঘ্রাণ
    ​পাক্কা চার মাস পর মেঠোপথের বাঁকে যখন সিএনজিটা এসে থামল, তখন সকাল সাড়ে নয়টা। তপ্ত গাজীপুরের সেই যান্ত্রিক কোলাহল, কারখানার সাইরেন আর ধোঁয়াটে আকাশটাকে অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। তপ্ত লোহার গন্ধ আর কাপড়ের স্তূপের মাঝে কাটা দিনগুলোর পর, Sirajganj-এর Belkuchi Upazila-র এই Tamai গ্রামটাকে মনে হচ্ছিল একটা আস্ত শীতল জলের দিঘি।
    ​গাড়ির চাকা থামতেই বুকের ভেতর একটা চেনা উথালপাথাল শুরু হলো। দরজায় পা রাখতেই মা এক গাল হেসে জড়িয়ে ধরলেন। সেই চিরন্তন মায়ের হাতের ছোঁয়া। ঝটপট ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসতেই পাতে এল গরম ভাত আর নদী থেকে সদ্য ধরা টাটকা মাছের ঝোল। গ্রামীণ এই সাদামাটা স্বাদের কাছে গাজীপুরের নামী রেস্তোরাঁও ফিকে হয়ে যায়।
    ​কিন্তু প্রথম লোকমাটা মুখে তোলার সাথে সাথেই বাইরের আকাশটা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে উঠল। একটু আগের রোদমাখা সকালটা নিমেষেই মেঘে মেঘে ছেয়ে গেল। আর দেখতে দেখতে, টিনের চালে ঝমঝমিয়ে নামল শ্রাবণের মতো অকালবৃষ্টি।
    ​জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মনে মনে ভাবলাম, “ইস! চারটা মাস পর বাড়ি এলাম, বন্ধুদের সাথে একটু দেখা করব, আড্ডা দেব—তা না, শুরু হলো বৃষ্টি!” গ্রামে এসেও ঘরের কোণে বন্দী হয়ে থাকার এই মন খারাপটা শুধু একজন প্রবাসী কিংবা দূর-পরবাসে থাকা মানুষই বোঝে। গ্রামের বৃষ্টির রূপ সুন্দর, কিন্তু যখন তা বন্ধুদের সাথে মিলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই সৌন্দর্যটাও এক ধরণের একাকীত্ব তৈরি করে।
    ​২. মেঘ কাটার সন্ধ্যা
    ​অপেক্ষা করতে করতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। প্রকৃতির নিয়মেই যেন মেঘগুলো একসময় ক্লান্ত হয়ে সরে গেল। পূব আকাশে তখন এক চিলতে ভাঙা চাঁদ, আর তামাই গ্রামের বাতাস ধুয়ে মুছে সাফ। মাটির একটা সোঁদা ঘ্রাণ চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে।
    ​মোবাইলটা বের করে মেসেজ দিতেই ওপাশ থেকে সিয়ামের চেনা কণ্ঠ, “কিরে জাহিদ? বৃষ্টি তো থামল। বের হবি না?”
    ​ঠিক আধঘণ্টার মধ্যে আমার বাড়ির সামনে এসে থামল একটা বাইকের হেডলাইট। ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনেই বুঝলাম, মোহাম্মদ আলী তার প্রিয় বাইকটা নিয়ে হাজির। পেছনে বসে আছে সিয়াম। দুজনকে দেখেই বুকের ভেতরের চার মাসের জমে থাকা সব একাকীত্ব কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
    ​”কিরে জাহিদ! গাজীপুর গিয়া তো আমাগো ভুইলাই গেছস!” মোহাম্মদ আলী বাইক থেকে নেমেই এক গাল হেসে জড়িয়ে ধরল।
    সিয়াম পাশ থেকে বলল, “আরে ছাড় তো, আগে চল আদাচাকী যাই। বৃষ্টির পরের ঠাণ্ডা বাতাসে বাইক রাইডিংয়ের মজাই আলাদা।”
    ​আমি আর দেরি না করে মোহাম্মদ আলীর বাইকের মাঝখানে চেপে বসলাম। আমাদের চিরচেনা তিন মূর্তির যাত্রা শুরু হলো। চাকা গড়াল পিচঢালা গ্রামীণ পথ ধরে। দুপাশে বৃষ্টির পানিতে ভেজা সবুজ খেত, বাঁশঝাড় থেকে টুপটাপ করে পানি ঝরছে বাইকের উইন্ডশিল্ডে। সন্ধ্যার আবছা আলোয় চেনা মোড়গুলো পার হয়ে আমরা এগিয়ে চললাম আদাচাকীর দিকে।
    ​৩. আদাচাকী চায়ের দোকান
    ​আদাচাকী মোড়ের এই চায়ের দোকানটা আমাদের কাছে শুধু একটা দোকান নয়, এটা আমাদের কৈশোর আর যৌবনের শত শত স্মৃতির এক জীবন্ত দলিল। বৃষ্টির কারণে চারপাশটা একটু ফাঁকা, তবে দোকানের ভেতরের চেনা হলদেটে বাল্বটার আলো যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। চুল্লিতে কেটলির শিষ দেওয়ার শব্দ আর ফুটন্ত চায়ের সুবাস চারপাশের ঠাণ্ডা বাতাসকে এক মায়াবী রূপ দিয়েছে।
    ​বাইকটা স্ট্যান্ডে রেখেই আমরা কাঠের চেনা বেঞ্চিটায় গিয়ে বসলাম। দোকানদার মামা আমাকে দেখেই চিনে ফেললেন, “আরে জাহিদ ভাই! কবে আইলেন?”
    “এই তো মামা, সকালে। জলদি তিনটা স্পেশাল কড়া চা দেন তো, আদা-লেবু দিয়া।”
    ​কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের হাতে চলে এল তিনটি ধোঁয়া ওঠা কাঁচের কাপ। গরম কাপটা হাতের তালুতে নিতেই বৃষ্টির রেশ ধরে রাখা ঠাণ্ডা শরীরটা যেন প্রাণ ফিরে পেল। চায়ের প্রথম চুমুকটা দিতেই সিয়াম কাপটা টেবিল ঠুকে নামিয়ে রাখল।
    ​”চা তো জমল, এবার আসল কথা ক। সামনেই জুনে তো খেলা শুরু। এবার তোদের ব্রাজিলের কী অবস্থা রে মোহাম্মদ?” সিয়ামের চোখেমুখে চেনা সেই চপলতা আর তর্কের উসকানি।
    ​শুরু হয়ে গেল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহা-আড্ডা।
    ​৪. তিন মেরুর ফুটবল যুদ্ধ
    ​আমাদের তিনজনের ফুটবলীয় পছন্দ বরাবরই তিন মেরুর। মোহাম্মদ আলী কট্টর ব্রাজিল সমর্থক, সিয়ামের রক্তে আর শ্বাসে আর্জেন্টিনা, আর আমি সবসময়ই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর অন্ধ ভক্ত হিসেবে পর্তুগালের ঝাণ্ডা বয়ে চলি।
    ​মোহাম্মদ আলী চায়ের কাপে একটা দীর্ঘ চুমুক দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “শোন সিয়াম, তোদের আর্জেন্টিনার দিন শেষ। মেসি বুড়ো হয়ে গেছে, মায়ামিতে গিয়া এখন শুধু অবসর কাটায়। এবার কাপ আমাদের। আর সবচেয়ে বড় খবর কী জানিস? নেইমার ফুল ফিট হয়ে দলে ফিরছে। জুনিয়র অলরেডি ইঙ্গিত দিয়া রাখছে।”
    ​”আরে রাখ তোর নেইমার!” সিয়াম হাহা করে হেসে উঠল। “নেইমার তো কাঁচের পুতুল। মাঠে নামলেই চোট পায়, আর না হয় বেঞ্চে বইসা টাকা গণে। এই বয়সে ওরে দিয়া বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব না। ব্রাজিল এবারও কোয়ার্টার ফাইনাল থেইকা কানতে কানতে বিদায় নিব।”
    ​তর্কটা জমে উঠল নিমেষেই। আদাচাকীর সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে গ্রামীণ সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা ভেঙে আমাদের কণ্ঠস্বর চড়ে উঠল।
    মোহাম্মদ আলী টেবিল চাপড়ে বলল, “নেইমার দলে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের মনে ভয়। তোরা যতই হিংসা করিস না কেন, নেইমারের ওই ড্রিবলিং আর ক্রিয়েটিভিটির অভাব পূরণ করার মতো প্লেয়ার এখনকার ব্রাজিলে নাই। ভিনিসিয়ুস-রদ্রিগোরা যতই ভালো খেলুক, দলের লিডার তো নেইমারই।”
    ​আমি এতক্ষণ চুপচাপ চা খাচ্ছিলাম আর বন্ধুদের এই চেনা ইমোশনটা উপভোগ করছিলাম। এবার আমি মুখ খুললাম, “তোরা দুজন যে এত চিল্লাচিল্লি করতেছস, আর্জেন্টিনার তো খবরই নাই! স্কালোনি যে স্কোয়াড ঘোষণা করতে দেরি করতেছে, তোরা জানস কিছু? দিবালা আর এনজোকে নিয়া নাকি এখনো ঝামেলা চলতেছে। বেশি অহংকার ভালো না সিয়াম, দেরিতে দল ঘোষণা করলে কম্বিনেশনে সমস্যা হয়।”
    ​সিয়াম চা শেষ করে কাপটা বাড়িয়ে দিল মামার দিকে, “আরেকটা হাফ চা দেন তো মামা।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “জাহিদ, তুই পর্তুগাল নিয়া কথা কমই ক। তোদের রোনালদোর বয়স এখন ৪২। এখনো আল-নাসেরে পেনাল্টি মাইরা লাফায়। বিশ্বকাপে ওরে বেঞ্চে বসায়া রাখলে দল তাও একটু আগাইবো, নাইলে গ্রুপ পর্বেই বিদায়!”
    ​”খবরদার, রোনালদোকে নিয়ে কথা বলবি না!” আমি ভুরু কুঁচকে একটু রাগের ভান করলাম। “৪২ বছর বয়সেও ওর যে ফিটনেস, তোদের নেইমার বা মেসির তা স্বপ্নেও নাই। রোনালদোর এটাই শেষ বিশ্বকাপ, আর শেষবার ও দুনিয়াকে দেখায় দেবে পর্তুগাল কী জিনিস। ব্রুনো ফার্নান্দেজ আর বার্নার্ডো সিলভার মতো মিডফিল্ড এবার আমাদের সাথে আছে।”
    ৫. চায়ের কাপে আবেগের নদী
    ​আড্ডা যত বাড়ছিল, আমাদের ভেতরের ভেদাভেদগুলো যেন ততটাই মিলিয়ে যাচ্ছিল। আসলে ফুটবল তো একটা উসিলা মাত্র। আমরা পরষ্পরের পিঠ চাপড়াচ্ছিলাম, পুরনো দিনের কথা মনে করছিলাম। এই ফুটবল নিয়ে কতদিন আমরা তামাই স্কুলের মাঠে মারামারি করেছি, কত রাতে একসাথে বসে প্রজেক্টরে খেলা দেখেছি।
    ​গাজীপুরের সেই একঘেয়ে কারখানার জীবন, প্রতিদিনের টার্গেট পূরণ আর ওভারটাইমের খাটুনির মাঝে এই নিঃস্বার্থ আনন্দটা কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। সেখানে সবাই পেশাদার, সবাই শুধু নিজের স্বার্থ বোঝে। কিন্তু এই আদাচাকী চায়ের দোকানে, বন্ধুদের সাথে বসে ফুটবল নিয়ে চিল্লাচিল্লি করার মাঝে যে আদিম, খাঁটি আনন্দ লুকিয়ে আছে—তা পৃথিবীর কোনো দামী এসিরুমে বসে পাওয়া সম্ভব নয়।
    ​সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত যখন বাড়ছে, তখন চারপাশের বাতাস আরও ঠাণ্ডা হয়ে এল। চারদিকের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর আদাচাকীর চুল্লির গনগনে লাল আগুন আমাদের আড্ডাকে এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে রাখল।
    ​মোহাম্মদ আলী হঠাৎ শান্ত গলায় বলল, “জানস জাহিদ, তুই যখন বাড়ি থাকস না, আমরা যখন এই দোকানে আইসা বসি, তখন খুব ফাঁকা লাগে। ফুটবল নিয়া চিল্লাই ঠিকই, কিন্তু পর্তুগালকে পচানোর মতো মানুষ পাই না।”
    ​সিয়ামও একটু ইমোশনাল হয়ে গেল, “হ রে ভাই। জাহিদটা গাজীপুর গিয়া যেন কেমন যান্ত্রিক হয়ে গেছে। এবার ঈদে কয়দিন আছস বল তো?”
    ​বন্ধুদের এই সরল ভালোবাসা দেখে আমার চোখের কোণটা কেমন যেন ভিজে উঠল। চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে বললাম, “আছি রে ভাই, আরও দশটা দিন আছি। তোদের সাথে রোজ এই আদাচাকীতেই সন্ধ্যা কাটবে।”
    ​৬. ফেরার পথ এবং এক বুক প্রশান্তি
    ​রাত প্রায় সাড়ে দশটা। দোকানদার মামা দোকান গোছাতে শুরু করেছেন। আমরাও বেঞ্চ ছেড়ে উঠলাম। মোহাম্মদ আলী বাইকটা স্টার্ট দিল। রাতের তামাই গ্রাম এখন সম্পূর্ণ শান্ত, শুধু চাকার নিচে পিচঢালা রাস্তার চেনা ফরফর আওয়াজ।
    ​বাইকের পেছনে বসে সিয়ামের কাঁধে হাত রাখলাম। মাথার উপর মেঘমুক্ত কালো আকাশ, কোটি কোটি তারা যেন আমাদের এই পুনর্মিলনকে দেখেই হাসছে। গাজীপুরের সেই ক্লান্তি, জীবনের না-পাওয়া আর আগামী দিনের ব্যস্ততা—সবকিছু যেন এই গ্রামীণ রাতের বাতাসে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।
    ​এক কাপ চা, একটুখানি মেঘ কাটার সন্ধ্যা আর হৃদয়ের খুব কাছের দুজন বন্ধু—জীবনের এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী-ই বা হতে পারে! তামাই গ্রামের বুকে কাটানো এই ‘চা সন্ধ্যা’ আমার জীবনের স্মৃতির পাতায় এক সোনালী অক্ষরে লেখা হয়ে রইল।

Friends

Profile Photo
mohosin Ali
@mohosinali
Profile Photo
news71
@news71
Profile Photo
Mojib Rsm
@mojibrsm
Profile Photo
Salehin An Nahiayn
@salehinannahiayn
Profile Photo
Md Abdullah
@mdabdullah
Profile Photo
Abdullah Meherab (Rocky)
@abdullahmeherab
Profile Photo
Sarifa Sultana
@sarifasultana
Skip to toolbar