Profile Photo

rukaiya rakhiOffline

  • rukaiyarakhi
  • Profile picture of rukaiya rakhi

    rukaiya rakhi

    1 week, 3 days ago

    “ভাঙ্গা ঘড়ির কাঁটা”
    পর্ব – ৪
    লেখিকাঃ রুকাইয়া রাখি

    সকালে ঘুম ভাঙল রাইসার। ঘরের ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা ছিল—যেটা শান্তির নীরবতা না, বরং ঝড় থেমে যাওয়ার পরের ভারী নীরবতা।
    রাইসা চোখ খুলে প্রথমে দেখল মায়ের মুখ। রাশিদা বেগম রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু মনটা যেন কোথাও নেই।
    রাইসা ধীরে বলল,
    —আম্মু… আজকে থেকে আমি প্রাইভেট স্কুলে যাব?
    রাশিদা বেগম একটু থেমে গেলেন। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
    —যাবা। ব্যাগ রেডি কর।

    রাইসা উঠে বসল। নীল ব্যাগটা হাতে নিয়ে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। যেন এই ব্যাগটা তার জীবনের নতুন দরজা, কিন্তু দরজাটা খুলতে ভয় লাগছে।
    ঠিক তখনই দরজার বাইরে শব্দ।
    আবু সাইফুল।
    তার গলা ভেতরে ঢুকল আগে, মানুষটা পরে।
    —এই সিদ্ধান্ত আমি মানি না।
    রাইসা চুপ হয়ে গেল।
    রাশিদা বেগম ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন।
    —কেন মানবে না?
    আবু সাইফুল হালকা হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।
    —কারণ তুমি সবসময় নিজের সিদ্ধান্ত একা নাও।
    রাশিদা বেগম শান্ত গলায় বললেন,
    —এটা শুধু আমার সিদ্ধান্ত না। এটা আমাদের মেয়ের ভবিষ্যৎ।
    এই “ভবিষ্যৎ” শব্দটা যেন ঘরের বাতাসে ভারী হয়ে ঝুলে থাকল।

    রাইসা আস্তে করে বলল,
    —আব্বু… আমি কি ভুল কিছু করছি?
    আবু সাইফুল তার দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
    তারপর বললেন,
    —তুই কিছু ভুল করছিস না। কিন্তু জীবন তোর ইচ্ছায় চলে না, রাইসা।
    রাইসা চুপ।
    তার মনে হলো, সে কোনো অদৃশ্য দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—যেটা কেউ দেখতে পায় না, কিন্তু সে প্রতিদিন মাথা ঠুকে ঠুকে বুঝতে শেখে।

    স্কুলের পথে।
    নুসরাত রাইসাকে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
    —ভয় পাচ্ছিস? নুসরাত জিজ্ঞেস করল।
    —না… একটু।
    —কেন?
    রাইসা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
    —সবাই আমাকে দেখবে।
    নুসরাত হেসে বলল,
    —দেখুক। তুই তো খারাপ না।
    এই “খারাপ না” কথাটা রাইসার বুকের ভেতর একটু জায়গা করে নিল।
    স্কুলে ঢুকতেই শব্দ, দৌড়, হাসি।
    সব কিছু চলছিল নিজের নিয়মে।
    রাইসা থেমে দাঁড়িয়ে রইল।
    একজন মেয়ে পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল,
    —নতুন না?
    রাইসা মাথা নাড়ল।
    —নাম কী?
    —রাইসা।
    মেয়েটা একটু থেমে বলল,
    —তুমি কথা কম বলো নাকি?
    রাইসা উত্তর দিল,
    —আমি বুঝে বলি।
    মেয়েটা হেসে চলে গেল।
    রাইসা বুঝল না, এই হাসিটা ভালো না খারাপ।

    ক্লাসে।
    টিচার বললেন,
    —আজকে সবাই নিজের পরিচয় দেবে।
    এক এক করে সবাই বলছে।
    রাইসার পালা এলো।
    সে উঠে দাঁড়াল।
    —আমার নাম রাইসা। আমি… পড়তে ভালোবাসি।
    ক্লাসে কেউ খুব একটা খেয়াল করল না।
    সে বসে পড়ল।
    তার মনে হলো, সে যেন একটা শব্দ বলেছে—যেটা বাতাসে হারিয়ে গেছে।

    বিকেলে বাসায়।
    রাশিদা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
    —কেমন লাগল?
    রাইসা ধীরে বলল,
    —সবাই অনেক জানে।
    —তুইও জানবি ধীরে ধীরে।
    —আম্মু… আমি কি ওদের মতো হতে পারব?
    রাশিদা বেগম একটু থেমে গেলেন।
    —তুই ওদের মতো হতে যাবি না। তুই নিজের মতো হবি।
    এই বাক্যটা রাইসা ঠিক বুঝল না, কিন্তু মনে রাখল।

    রাতে।
    আবু সাইফুল চুপচাপ বসে আছেন।
    হঠাৎ বললেন,
    —তুই কি ওখানে যেতে চাস?
    রাইসা ধীরে বলল,
    —হ্যাঁ।
    আবু সাইফুল চোখ নামিয়ে বললেন,
    —তাহলে যাও।
    এই এক শব্দ—“যাও”—রাইসার কাছে খুব বড় মনে হলো।
    অনুমতি না, কিন্তু বাধাও না।
    মাঝামাঝি একটা অদ্ভুত জায়গা।

    রাইসা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
    বাইরে অন্ধকার শহর।
    সে ফিসফিস করে বলল,
    —আমি কি ঠিক পথে আছি?
    কেউ উত্তর দিল না।
    শুধু দূরে একটা কুকুর ডাকল।
    আর সেই ডাকের ভেতর দিয়ে গল্পটা যেন একটু একটু করে এগোতে লাগল—যেখানে কেউ পুরোটা বোঝে না, কিন্তু সবাই বাঁচতে থাকে।
    চলবে…

Skip to toolbar