-
প্রথম গুরুতর অসুস্থতা এবং প্রথম সিলেট-যাওয়া
আমার বয়স ১৩-১৪ বছর থাকতেই আমি বাত-ব্যথা রোগে ভুগতে শুরু করেছি। জানতাম না কেন রোগটিতে আক্রান্ত হলাম? এখন বুঝতে পারছি, ঠান্ডাজনিত কারণেই মানুষ বাত রোগে ভোগে। আমরা ছোটবেলায় বর্ষার পানিতে কত ভিজেছি, ইয়ত্তা নেই। শীতকালেও কনকনে শীতে ভুগেছি প্রতি শীতকালে। এখন মনে হয়, আগের মতো হাড়কাঁপানো শীত পড়ে না শীতকালে। এই সব কারনে বাতে ভুগতে শুরু করেছি। বার বার ডাক্তারের কাছে যেতে হয়েছে রোগটির জন্য। রোগটি কখনোই নির্মূল হয় না। ঔষধ খেলে রোগের প্রকোপ কমে যায়, রোগটি দমে যায়, পরে ঠান্ডা লাগলে আবার বেড়ে যায়। আমার শরীরে ইউরিক এসিড বেশি হয়ে গিয়েছিল। জয়েন্টে জয়েন্টে পেইন ছিল। একেক বার একেক জয়েন্টে পেইন করতো।
[এক]
২০০১ সালের মে মাসের শুরুর দিকে, আমি যখন টুমচর মাদ্রাসায় (লক্ষ্মীপুর শহরের কিছু দক্ষিণে) ফাযেল প্রথম বর্ষে (স্নাতক) পড়ি, তখন একদিন আমার বাতব্যথা বেড়ে গেলো। আমার মেঝো ভাই আর আমি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে একই ক্লাসে পড়তাম। টুমচরে আমরা একই সাথে থাকতামও। ‘বড় বাড়ি’তে থাকতাম তখন। আমার বাতব্যথা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় তিনি আমাকে আমাদের ক্লাসমেট ইউসুফ জামিলের বাবার কাছে নিয়ে যান। ইউসুফ জামিল আর আমি তখন দৈনিক ইনকিলাবের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘ইনকিলাব উপহার’-এ লিখতাম। কোনো সপ্তাহ তার লেখা প্রকাশিত হতো, কোনো সপ্তাহে আমার, আবার কোনো কোনো সপ্তাহে দুই জনের লেখা প্রকাশিত হতো একই সাথে। বেশ মজার ছিল দিনগুলো। ওই ইউসুফ জামিল, ব্যক্তিগত জীবনে অনেক ঝড়-ঝঞ্জা পোহানোর পর বিগত কয়েক বছর আগে হঠাৎ মৃত্যুবরণ করে।
ইউসুফ জামিলের বাবা নিজ ঘরের সামনের কামরায় হোমিও চিকিৎসা করতেন। টুমচর পঞ্চায়েত বাড়ি। মাদ্রাসার দক্ষিণেই। রাস্তার পাশে ওদের ঘর। আমাকে সন্ধ্যার পর তাঁর কাছে নিয়ে যাবার পর তিনি আমার সমস্যার কথা শুনে প্রথমে আমাকে একটি ‘ওয়েন্টমেন্ট’ থেকে মালিশ করতে বললেন পায়ের গোড়ালেীতে, যেখানে ব্যথা হচ্ছে, সেখানে। ছোট্ট একটি বোতলের লিক্যুয়িড-জাতীয় ওই ওয়েন্টমেন্ট পায়ে মালিশ করার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার পায়ের গোড়ালী বা জয়েন্ট ফুলে যেতে শুরু করলো। ব্যথাও বেড়ে গেলো। তিনি আরও কিছু ঔষধ দিলেন। বললেন, ‘হোমিও ঔষধ ব্যবহার করলে প্রথমে লক্ষণ তীব্র হয়ে যায়,পরে রোগ সেরে যায়’। আমি কিন্তু কষ্ট পেতে লাগলাম। ওখান থেকে চলে আসলাম কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। পরের দিন বাড়ি ফিরে এলাম।
এরই মধ্যে ব্যথা অনেক বেড়ে গেলো। দুই পা ফুলে যাওয়া কমলো না। আমাকে লাঠি ভর দিয়ে চলাফেরা করতে হতো। এলোপাথিক ঔষধ খেয়ে কিছুটা আরাম পেলাম। আমার এই অসুস্থতার খবর আমার বড় ভাই পেলেন। তিনি সিলেটে থাকতেন। হামদর্দ কোম্পানীতে সেলস সেক্টরে চাকরি করতেন। তাঁর কথায় পরে ঠিক হলো, তাঁর কাছে, সিলেটে আমাকে নিয়ে যাওয়া হবে।
আমাকে সিলেট নিয়ে যাবার দায়িত্ব পড়লো আমার মেঝো ভাই’র ওপর।
আমরা সিলেট রওনা হলাম। ঘটনাক্রমে সেদিন ছিল শুক্রবার। লক্ষ্মীপুর থেকে সিলেটের সরাসরি কোনো বাস না থাকায় ঠিক হলো আমরা ফেনি থেকে ট্রেনে করে সিলেট যাবো। আমরা ফেনি গিয়ে পৌঁছলাম সন্ধ্যার পর। আমি এর আগে কখনো ট্রেনে চড়িনি। সেদিন শুক্রবার থাকায় আন্তঃনগর বা অন্য সরাসরি কোনো ট্রেন ছিল না সিলেটগামী। আমাদেরকে উঠতে হলো লোকাল ট্রেন ‘জালালাবাদে’। প্রথম ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা ছিল আমার জন্য বেশ তিক্ত। ট্রেনটি রাত ১০ টায় রওনা হলো। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া এই সব স্থান পেরিয়ে সিলেট যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো- লোকাল ট্রেন হওয়ায় ট্রেনটি বিভিন্ন স্টেশনে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ থেমে থাকতো। অধিকাংশ স্টপেজে আধাঘন্টার মতো থেমে থাকতো, যা ছিল খুবই বিরক্তিকর। আমার ফোলা পা এতে আরো ফুলে গেলো। খুবই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা শেষে আমরা শেষমেষ সিলেট গিয়ে পোঁছলাম পরের দিন বিকাল ৪টায়!
[দুই]
সিলেট যাওয়ার পর, পরের দিন আমার ভাই আমাকে হামদর্দের সিলেটে শাখার হাকিমের কাছে নিয়ে গেলেন। তাঁর নাম মনে হয় আব্দুল আউয়াল ছিল। অত্যন্ত ভালো মানুষ।
আমার রোগের বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জেনে তিনি আমাকের হামদর্দের কিছু ঔষধের পাশাপাশি ‘বেঙ্গল ইউনানী দাওয়াখানা’র কিছু ঔষধও প্রেসক্রাইব করলেন। বেঙ্গল ইউনানী দাওয়াখানার একটি শাখা সিলেটেই, আমরা যেখানে থাকতাম, তার একটু দূরেই ছিল। বেঙ্গল ইউনানী দাওয়াখানা’র ঔষধগুলোর নাম ছিল ‘বরশাশা’, সিরাপ ‘মুনজেজে হার’ এবং সিরাপ ‘আর-কে শাহতারা’। বেঙ্গল ইউনানী দাওয়াখানা ছিল ফেনির একটি কোম্পানী। সিলেটে তাদের শাখা ছিল। ফেনিতে ছিল কারখানা। আমি পরে ফেনি থেকেও ঔষধগুলো সংগ্রহ করেছি।
সাধারণত হামদর্দের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত নিজস্ব হাকিমদের প্রতি নির্দেশনা থাকে, হামদর্দ ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানীর ঔষধ যেন প্রেসক্রিপশনে না লেখা হয়। ওই হাকিম সাহেব নিয়মের বাইরে গিয়ে আমাকে হামদর্দের ঔষধের পাশাপাশি বেঙ্গলের ঔষধও প্রেসক্রাইব করেন। আমার ভাইয়া হামদর্দের ওই শাখায় কর্মরত থাকায় এবং আমার এই জাতীয় রোগের ক্ষেত্রে হামদর্দের কার্যকর ঔষধের অভাবেই তিনি আমার ক্ষেত্রে এটা করেছেন।
ঔষধগুলো গ্রহণের পর থেকে আমার শারীরিক সমস্যার ইতিবাচক পরিবর্তন হতে শুরু করে। বেঙ্গলের ‘বরশাশা’ ঔষধ সেবনের ফলে আমার কোষ্ঠ পরিষ্কার হয়ে যেতো। বেঙ্গলের ঔষধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে আমার Mentl Naturl Powr বেড়ে যেতে শুরু করে, যা আমার জন্য ছিল সমস্যাজনক। ইউনানী বা হার্বাল ঔষধের এই একটা মধুর সমস্যা। পরে, ঔষধ সেবন বন্ধ হয়ে যাবার পর সমস্যাটি হ্রাস পায়। অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
[তিন]
আমরা থাকতাম সিলেটের জিন্দাবাজার, আম্বরখানায়। সিলেটের কেন্দ্রবিন্দুতে। মেস-এ থাকতাম। আমার ভাইয়ার সাথে আরও কয়েকজন থাকতেন মেসে। মেসে বুয়ার হাতের রান্না খেতাম আমরা। বুয়ার রান্না করা ‘কলমির শাক’ আমার কাছে খুব ভালো লাগতো। মসুরের ডালও বেশ ভালো লাগতো।
আমার ভাইয়া ডিউটিতে চলে যাবার পর আমি সিলেট শহরের এদিক ওদিক ঘুরতাম ইচ্ছেমতো। সিলেটের শাহজালাল মাজারে গিয়েছি। মাজারের পুকুরের গজার মাছগুলো দেখেছি। মনে হয়েছে, এই গজার মাছগুলোর বয়স অনেক অনেক বছর হয়ে গেছে। শাহজালাল মাজারের কবরস্থানে দেখলাম চিত্রনায়ক সালমান শাহ-এর কবর। সিলেট ওসমানি স্মৃতি জাদুঘরে গেলাম একদিন।
আমি সিলেট থাকতেই একদিন সিলেটে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের একটি বিশাল জনসভা হলো। আমি সেখানে গেলাম। জনসভায় শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক এবং মুফতী আমিনী এলেন। জনসভায় আল্লামা আজিজুল হককে নিয়ে একটি সঙ্গীত গাইলেন একজন। সঙ্গীতটি ছিল- ‘‘শাইখুল হাদীস আজিজুল হক, তুমি সত্য-ন্যায়ের বাতি…’’। জনসভায় মুফতী আমিনী জ্বালাময়ী বক্তব্য দিলেন।
সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটি মসজিদে আমি সবচেয়ে বেশি নামাজ পড়েছি। সেটি ছিল ‘কালেক্টরেট জামে মসজিদ।’ মসজিদটি নতুন করে নির্মিত হয়েছে তখন। মসজিদের সাউন্ড সিস্টেম ছিল দারুণ। মসজিদের সিলিংয়ের মাঝখানে প্লাস্টিকের টিন লাগানো হলো, যাতে বাইরে থেকে ভেতরে ন্যাচারাল আলো আসতে পারে। খুব ভালো লাগতো মসজিদটিতে নামাজ পড়তে।
সিলেট শহর আমার বেশ ভালো লেগেছে। ঢাকা শহরের মতো ধাঁধাপূর্ণ শহর নয়। ঢাকা শহর আমার কাছে বেশ ফালতু শহর মনে হয় এখনও। এখনও ঢাকা আমার কাছে ধাঁধাপূর্ণ এক শহর। সিলেট শহরের রাস্তাঘাট, অলিগলি চেনা-বুঝা বেশ সহজ। শহরটিকে অনেকটা পরিকল্পিত শহর বলেই মনে হলো।
[চার]
২১ দিনের মতো সিলেটে কাটালাম। বর্ষাকাল ছিল। বেশ ভালো সময় কাটলো। আমার রোগের উন্নতি হতে লাগলো। শেষে আরো কয়েকমাসের ঔষধ সংগ্রহ করে বাড়িতে চলে আসার সিদ্ধান্ত হলো।
বাসে করে বাড়ির পথ ধরলাম। রাতের বাস। বেশ আরামদায়ক বাস-যাত্রা। রাতে বাসে ভ্রমণ সব সময় আমার কাছে মজার। গরমের যন্ত্রণা নেই। পথে যানজট নেই। তার ওপর ওই ভ্রমণে সঙ্গী ছিল- কালজয়ী কিছু গান। বাসে অডিও প্লেয়ারে একটি CD-ই বারংবার বাজানো হলো। ওই CD ছিল জহির আহমেদের গানের জনপ্রিয় CD। ‘সারাদিন গান গেয়ে পাখিটা, আকাশে আকাশে শুধু উড়বে’, ‘যদি সব সাগরের জল কালি হতো’, ‘শেষ রাতের আঁধারে, তারাগুলো কাঁদে বেদনায়’। এই সিডিতে যতোগুলো গান আছে, সবগুলো হৃদয় কেড়ে নেয়ার মতো। পুরো পথ এই গানগুলোই ঘুরেফিরে বাজানো হলো। আমি এর আগে এই গানগুলো শুনিনি। এগুলো শুনেই অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করলো।
বাস-ভ্রমণটাকে অন্য মাত্রায় স্মরণীয় করে রাখার জন্যই মনে হয় গানগুলো বাজানো হলো সেদিন।
আমি এখনও মাঝে মাঝে গানগুলো শুনি। গানগুলো শুনে নস্টালজিক হয়ে যাই। ইউটিউবে এই গানগুলোর কমেন্টে মানুষ কিভাবে মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে, দেখলে অবাক হতে হয়। গানগুলোর ইউটিউব লিঙ্ক এই পোস্টের কমেন্টে দেয়া হবে।
সিলেট ভ্রমণের শুরুটা কষ্টের হলেও ভ্রমণটা সবমিলিয়ে বেশ দারুণ ও উপভোগ্য ছিল। আবার সিলেট যেতে মনে চায়। কিন্তু কখন সুযোগ হয়, কে জানে!
Friends
আব্দুল্লাহ আল হুসাইন
@alhussin0133159
Yusop Bin mohiuddin
@yusopbinmohiuddin
Ashraful Alam
@ashrafulalam
Nakiba Jannat
@nakibajannat
Skill Shelf
@skillshelf
Mohammod jabed Hosen
@mohammodjabedhosen
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor