Profile Photo

আসাদুজ্জামান চৌধুরী সম্রাটOffline

  • অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে

    সংস্কৃতি হচ্ছে জাতির মননের ব্যঞ্জনাময় অভিপ্রকাশ । যার দ্বারা জাতির মানস প্রবণতা হৃদয়ের স্পন্দনের মর্মধ্বনি , জাতির কর্মকৃতির মূল ছন্দ অনায়াসে ধরা পড়ে । একটি জাতির সংস্কৃতি সেই জাতির যুগ-যুগান্তরে স্বপ্ন-সাধনা কর্মকৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে । যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে নিত্যদিনের আচার-অনুষ্ঠান রীতিনীতির অনুসরণে, কাজের ও অবসরের প্রকৃতিতে ।

    আবহমান বাংলার পরিবেশ প্রকৃতি ও জীবন নিয়ে গড়ে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতি । কালের বিবর্তনে নানা জাতির সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগে তা হয়েছে পরিপুষ্ট । দ্রাবিড়, অস্ট্রিক, আর্য-অনার্য সংস্কৃতির মৌল প্রেরণায় গড়ে উঠেছিল বাঙালি সংস্কৃতির প্রাচীন রূপ । আবার মধ্যযুগে এর উপর প্রভাব পড়ে মুসলমান সংস্কৃতির । তারপর আধুনিককালে ইংরেজি শিক্ষা ও সভ্যতার সঙ্গে যোগসূত্রে বাঙালি সংস্কৃতিতে ব্যাপক পাশ্চাত্যের প্রভাব পড়েছিল । ধারণা করা হয়, উনিশ শতকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির উদ্দ্যম, প্রবৃত্তির, লীলা, ভোগ-বিলাসিতা, উচ্ছৃঙ্খলতা বাঙালি সংস্কৃতির ওপর চড়াও হয়েছিল । বর্তমানে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে অপসংস্কৃতি আমাদের ঘাড়ে চেপে বসতে চলেছে । যে নৈতিক অবক্ষয়, স্থুলতা ও মাদক নেশা পাশ্চাত্যের যুবসমাজকে গ্রাস করেছিল তার প্রভাব আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে এদেশের তারুণ্যে উপর পড়েছে । ফলশ্রুতিতে শিক্ষাঙ্গনে মাথাচাড়া দিয়েছে অসুন্দর ও অনাচার , অশ্লীল গান বাজনা নৃত্য , Rag Day নামের অশালীন অনুষ্ঠান, একে উপরের ড্রেসে নোংরা শব্দ লেখালেখি , রঙ মাখামাখি এবং রাজনৈতিক সহিংস্রতা ও মারামারি ইত্যাদি । উল্লেখ্য যে অপসংস্কৃতির প্রভাবে বর্তমানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে প্রাপ্য সম্মানটুকু পরিপূর্ণভাবে পাচ্ছে না । এমনকি ছাত্ররা যেকোনো মুহূর্তে শিক্ষকদেরকে হামলা করতেও তেমন দ্বিধাবোধ করছে না । এক সময় বাংলা চলচ্চিত্রগুলোর কাহিনী ও অভিনয় ছিল খুবই বাস্তবধর্মী ও শিক্ষণীয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে অপসংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাবে বাংলা চলচ্চিত্রগুলো এমন রূপ ধারণ করেছে , যা তরুণ প্রজন্মকে নির্লজ্জ ও চরিত্রহীনে পরিণত করছে । একইভাবে দেশের বর্তমান অনেক শিল্প সাহিত্যের অবস্থাও একই রূপ ধারণ করেছে । এছাড়া বিনোদনমূলক বিভিন্ন আ্যপ অর্থাৎ টিকটিক, ইউটিউব, স্যান্ক ভিডিও, লাইকিসহ ইত্যাদি সফটওয়্যারের প্রতি তীব্র আসক্তি হয়ে, এই ভুবনে চলছে মানুষকে হিংস্র কুৎসিত , অসুন্দর, স্থূল ও রুচিহীন স্বভাবের অধিকারী হওয়ার মহড়া । আজ আমরা কথায় কথায় জগাখিচুড়ি ইংরেজি বলছি অথচ প্রমিত উচ্চারণে নিজ ভাষা বাংলাটাও বলতে অনেকেই অদক্ষ । বর্তমানে দেশে অপসংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের অনেক ছেলেমেয়ে এতোই নির্দয় হয়ে ওঠেছে যে , আজ দেশের অনেক মা-বাবা বৃদ্ধ বয়সে নিজের ঘরে ঠাঁই না পেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে করুণ জীবন-যাপন করছে । এক কথায় অপসংস্কৃতির প্রভাবে সমাজ জীবন থেকে সততা, দয়াবোধ, নম্রতা, সার্বজনীনতা, লজ্জাবোধ, সুস্থতা ও ন্যায়নীতি যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে । একইসাথে মাদকাসক্ত, অশ্লীলতা, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সহিংসতা ও আত্বহত্যাসহ বিভিন্ন অপসংস্কৃতির প্রবণতা সমাজে বৃদ্ধি পেয়েছে । এছাড়া তরুণ সমাজকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার অশোভন, স্থূল, ইতর ও বিকৃত জীবনের দিকে।

    প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে অপসংস্কৃতির বিস্তার ও দাপট বর্তমানকালে মারাত্মক রূপ নিয়েছে । তাই এ সকল রুচিহীন ও নৈতিকতা বিনাশী অপসংস্কৃতির হাত থেকে তরুণ প্রজন্মকে তথা সমগ্র জাতিকে রক্ষা করা একান্ত জরুরি। । সেজন্য দেশে চলমান অসুন্দর , অনাচার অপসংস্কৃতিকে রুখতে সবাইকে সেগুলোর বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সোচ্চার হতে হবে । এক্ষেত্রে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে, যাতে নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে পদচ্যুত হয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির করাল গ্রাসে লিপ্ত হয়ে না পড়ে । দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলোকে লোক দেখানো সংস্কৃতি চর্চা না করে সুষ্ঠু ও সার্বিক সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে । শুধু নগর পর্যায়ে নয়, তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার আয়োজন করতে হবে । এক্ষেত্রে দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে দেশের বিদ্যমান সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলোকে প্রতি বছর আর্থিক অনুদানসহ যাবতীয় সকল সুবিধা প্রদান করতে হবে । যাতে দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সুষ্ঠুভাবে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত প্রতিবছর বিভিন্ন স্থানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে সংস্কৃতি চর্চার আয়োজন করতে পারে এবং দেশে বিদ্যমান অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সবাইকে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে । পাশাপাশি সকল শিক্ষিতবর্গ ও অভিভাবকদেরকে নিজেদের সন্তানসহ সমাজের সকল মানুষকে নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে বিনীতভাবে অবগত করতে হবে এবং তা চর্চার জন্য সবাইকে বিশেষ অনুপ্রেরণা দিতে হবে । উল্লেখ্য, আমাদের সমস্ত কর্মতৎপরতার লক্ষ্য হবে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনোজাগতিক মুক্তি অর্জন । তাই দেশের সবাইকে ব্যাক্তি ও জাতীয় কর্মউদ্যোগে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতিকে সর্বদা মনে প্রানে আঁকড়ে ধরতে হবে এবং দেশের চলমান সকল অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।

    লেখক,
    আসাদুজ্জামান চৌধুরী সম্রাট
    শিক্ষার্থী_
    বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ,
    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

    সম্পাদকীয় পর্ষদ,
    বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম,
    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
    মোবাইল নংঃ-০১৮৬৭৯৪৫৭৭৪.

    5
    3 Comments
Skip to toolbar