-
ঋণ
কৃষ্ণজনপ্রচণ্ড পিপাসা লেগেছে! বারবার গলা শুকাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সাহারা মরুভূমিতে এসে পড়েছি। ধু ধু করে যেদিক পানে চাই, কোনোখানে জনমানব নাই! ঘামতে ঘামতে ডিহাইড্রেশনের শিকার হয়ে যাচ্ছি। ভিষণ ভয় লাগছে! তবে গলা শুকানোর কারণ কোনটা বুঝতে পারছি না? ভয় না ঘাম? মনে হচ্ছে দৌঁড়ে পালাই। সীমার কথা মনে হল। ইচ্ছেটা উবে গেল একনিমিষেই। সীমাকে পেতেই হবে। যে করেই হোক। ওর জন্য একটা কেন দশটা খুন করতেও আপত্তি নাই। এতো সুন্দর মেয়ে জীবনেও দেখিনি আমি! আহ! কী মায়াবতী। হ্যা, ওর জন্য খুনটা আমাকে করতেই হবে। খুনটা করতে পারলেই অনেক টাকা! স্পষ্ট বলে দিয়েছে সীমা, আমাকে ভালোবাসে ঠিকই কিন্তু শূন্যহাতে পালাতে পারবে না। স্বামী নিয়ে সে সুখে নাই কিন্তু অভাব তার চেয়েও অনেক বড় শত্রু। সীমার স্বামী নাসির, একটা নাম্বার ওয়ান হারামি। সরকারি দলের নেতা। আসলে সে একটা সন্ত্রাসী। আন্ডার গ্রাউন্ডে অনেক ধরনের যোগাযোগ তার। দু’টি নেশার স্পট আছে, একটি বেশ্যা পাড়াও চালায়। দু’হাতে টাকা কামায়। সারাদিন মদের উপর থাকে, বেশির ভাগ রাত পাড়াতেই কাটায়। এইসব পুরুষদের যা হয় সাধারণত, শরীরের উপর নানা অত্যাচারে এক সময় পুরুষত্বহীনতা চলে আসে। নাসির শালারও তাই হয়েছে। রাত-দিন দুর্ব্যাবহার। মারধোর আর আদর-সোহাগের অভাবে সীমা ভিতরে ভিতরে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। আমার সাথে যখন দেখা হয়, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। উজার করে ঢেলে দেয় তার জমানো সব ভালোবাসা। আহা! কী যে সুখ। আমি নাকি তার ভালোবাসার প্রকৃত পুরুষ। আবার প্রথমও বলে? তবে সীমার এই কথায় কিছুটা সন্দেহ আছে। এর আগেও দু’চারজন কে নাড়াচাড়া করেছে বলে আমার মনে হয়। কে জানে? হয়তো মন মতো হয়নি তারা। যাহোক ভাই, আমার তাতে মাথাব্যাথা নেই। আমার জন্য এখন সে পাগল, এটাই আসল কথা।
সীমার ওখানে আছি আজ দু’বছর হতে চলল। সয়মটা ছিল এমন, আমার যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। বাবা-মা নেই! পরের ঘরে আশ্রিত হয়ে ভালই ছিলাম। যে বুড়ো পালত, ভালই আদর করত। প্যাঁচ লাগল বুড়ো মরার সময়। বেচারা খাটে স্থায়ী আসন নিয়ে নিয়েছে ততদিনে। একদিন চার ছেলে-মেয়েকে ডেকে বলল, আমি মিজানরে কাঁসিপুরের জায়গাটা দিয়া যাইতে চাই। বেচারার কেউ নাই! লেখাপড়া যা শিখছে তা দিয়া বড় কোন চাকরিও পাইবো না। জায়গাডা পাইলে অন্তত মাথা গোঁজার একটা ব্যবস্থা হইত। বড় ভাই মফিজ খুব খুশি হয়ে উঠল। বলল, দারুন কইছেন আব্বা, মিজান আমাগো ভাইয়ের মত। আমরা না দেখলে ওরে দেখবো কে? সব ভাইবোন সহজেই মেনে নেওয়াতে বুড়ো খুব খুশি হল।পরের দিন, বড়ভাবির গলার হার পাওয়া গেল আমার বিছানার নিচে। হারের দাম যা-তা নয়। এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা! সাথে সাথেই পাকড়াও হলাম। বড়ই সৌভাগ্য! মারধোর করা হলো না। তবে দড়ি দিয়ে বাঁধা হলো ভাল করে। নেওয়া হল বুড়োর কাছে। মফিজ ভাই বলল,
দুধ-ভাত দিয়া এতোদিন কালসাপ পালছেন আব্বাজান!
কী হইছে? মিজানরে বাঁনছস ক্যান?
যারে আপনি লাখ-লাখ টাকার সম্পত্তি দিতে চাইছেন, সে হাজার টাকার লোভই সামলাইতে পারে না। আপনের বড় বউয়ের হার চুরি করছে। ওরে এখনি থানায় দিতে হইব।
বুড়ো বলল,
এক্কবারে ঠিক কথা। এই কাল সাপরে এখুনি থানায় দেওন উচিৎ। তয় এতদিন যখন পালছি একটু মায়া পইড়া গেছে। থানায় না দিয়া ওরে ঘেটিতে ধইরা বাইর কইরা দে। তোরা যা, আমি নিমকহারামডারে আরও কয়টা কথা কইয়া লই।
ছেলেরা বেড় হয়ে যেতেই বুড়ো বলল,
খুব কাঁচা কাজ! সবই বুঝিরে বাজান, কিন্তু কি আর করমু? দিন ঘনাইয়া আইছে, চাইলেও এহন আর কিছু করা সম্ভব না। তুই চইলা যা মিজান! তরে যদি সম্পদ দেওনের জিদ ধইরা থাকি তয় ওরা তরে জানেই বাঁচতে দিব না।
একদম খালি হাতে বেড়িয়ে আসলাম। এতো বড় দুনিয়া! কই যাই? এঘাটে-ওঘাটে করতে লাগলাম। কোন কাম-কাজ মিললো না। শেষমেষ আর কি, রিক্সাচালকই হলাম। কিন্তু ম্যাট্রিক পাশ করা মানুষ, রিক্সা চালাতে মন সায় দিচ্ছিল না। নিজেকে সান্ত¡না দিলাম, আজকাল বহু শিক্ষিত লোকই তো রিক্সা চালায়।রাত ১০টা। প্যাসেঞ্জার মনমত পাচ্ছি না। বসে বসে বিড়ি ফুকছি। ভাবছি, রিক্সা জমা দিতে যাওয়া যাক। হঠাৎ করেই দেখলাম, কে যেন এসে আছাড় খেয়ে পড়ল চাকার সামনে। ভাল করে তাকাতে দেখি, রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে লোকটা। পায়খানার রাস্তা বরাবর একটা ডেগাড় ঢোকানো। বলে উঠল, ভাই আমারে বাঁচান! ওরা এহনি আবার ধইরা ফালাইতে পারে, আমারে বাঁচান! ভাল-খারাপ যেমনই হই-আর দশজনের মতই মানবতা জেগে উঠল! বহুত কষ্ট, টেনেটুনে লোকটাকে রিক্সায় উঠালাম। পিছনে ছোরা গেঁথে থাকায় স্বাভাবিক ভাবে বসতে পারল না। পিছন ফিরে কোনমতে রিক্সার হুডকে ঝাপটে ধরল। লোকটি গোঙ্গাতে লাগল। টিকে থাকতে পারবে কি না সন্দেহ হলো?
ধইরা থাকতে পারবেন তো?
চিন্তা কইরেন না, বিলাইর জান আমার। আপনি টানেন।
কিছু লোককে এদিকেই দৌঁড়ে আসতে দেখা গেল। আমাদেরকে দেখে, ধর ধর করে উঠল। টান দিলাম রিক্সায়, চালক জীবনের সর্বচ্চো গতিতে। একদম ঢুকে পড়লাম থানার ভিতর। প্রাণে বেঁচে গেল এই যাত্রায় নাসির। পরে জেনেছিলাম, টুন্ডা ফারুকের কাজ ছিল এটা। নাসিরের সবচেয়ে বড় শত্রু। মাস্তান হিসেবে নাসিরের প্রভাব ছিল বেশি। সরাসরি আঘাত করার সুযোগ পাচ্ছিল না ফারুক। তক্বে তক্বে ছিল। হঠাৎ একটা সুযোগ পেয়ে যায় ফারুক। খুব চালাকি সাথে চমৎকার একটা গুটি বিছায়। মরিয়মকে ব্যবহার করে এ কাজে। নাসিরকে বশ করতে খুব একটা কষ্ট করতে হলো না। নাসিরের আলুর দোষ মারত্মাক! তাকে মেয়ে দিয়ে ফাঁসানো খুব একটা কঠিন কাজ না। বেঁচে যাওয়ার পর আমার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ হয়ে উঠল নাসির। হয়ে উঠলাম তার খাস লোক!মানুষ হিসেবে বেশ শক্তিশালী আমি। পোড় খাওয়া মানুষ সাধারণত এমনই হয়। বিষয়টি খুব দ্রুত চোখে পড়ে সীমার। অল্প সময়ের মধ্যেই তার আমন্ত্রণ পাই। এতো রূপবতী নারীর সারা এড়াতে পারে কোন বুদ্ধু? খুব দ্রুত অন্তরঙ্গ হয়ে উঠি আমরা। এখনতো একজন আরেকজনের জান। সীমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নাসির। শুধু তো সমস্যা না মহাসমস্যা! শালাকে খুন করা খুব কঠিন। সারাক্ষণ গার্ড নিয়ে চলে। নিজ গণ্ডির বাইরেও যায় না এখন খুব একটা। বিকল্প চিন্তা শুরু করতে লাগলাম। ভেগে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি আমরা। কিন্তু ভাগলেই তো হবে না? বাঁচার জন্য টাকা দরকার। নাসিরের সাথে থেকে বড় ধরনের মাল কামানো সম্ভব না। শালা বড় কাষ্টে। নিজের বউর কাছে কোন টাকা পয়সা রাখে না। কর্মচারী আর চ্যালাদের খাইয়ে-দাইয়ে যে টাকা দেয় তা অনেকটা বেতনের মত। নাসির গুণ্ডা হলেও ভদ্রলোক। নিয়মিত ব্যাংকে টাকা জমায়। সীমার চাপ বেড়েই চলছে,
কিছু একটা কর মিজান। আমার দম অতিষ্ট হইয়া যাইতাছে।
চেষ্টায় তো আছি, পথ তো পাইতাছি না!
কোনোভাবে লাখ পাঁচেক হইলেও যোগাও, পলাইয়া গিয়া যাতে পানিতে না পড়ি।
কি করব বুঝতে পারছিলাম না। সুযোগটা আসল তখনই। নাসিরকে পাহারা দিচ্ছি, ঘরে ঢুকল দুইজন লোক। হাত মিলানোর ধরনেই বোঝা গেল পূর্ব পরিচিত। একজন কথা বলে উঠল,
বস, একটা বড় কাম নিয়া আইছি।
কি কাম?
একটা সুপারি। অনেক বড় কাম।
কত বড়?
দশ লাখ!
তোমগো লোক থাকতে আমার কাছে কেন?
লোকটা ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করল,
সমস্যা আছে বস। যারে খামু সে একটা হারামী দারোগা। আমাগো বসের ডাইন হাত সাজুরে এরেস্ট করছে। সেটিং দিলাম বিশ লাখ টাকার, হালায় টাকা খাইয়া পাল্টি দিছে। এখন টাকার কথা পুরা অস্বীকার করে আর সাজুরে কোর্টে চালান দিয়া দিছে। বসের এখন মাথা খারাপ! কয়, যত টাকা লাগুক আমি ঐ দারোগার লাস দেখতে চাই। আমোগো লোকজন কমবেশী সবাইরে তারা চিনে। খাইতে গিয়া ঊন্নিশ-বিশ হইলে আরও বিপদে পইড়া যাইতে পারি। আমারে বস তাই আপনার কাছে পাঠাইলো। যেমনেই হোক লোক ম্যানেজ কইরা দিতে হইব। নাসির বলল,
খাইতে হইব কোন জায়গায়?
চিটাগাং রেলস্টেশনে,
হালার উপর নজর রাখতাছিলাম, পরশুদিন ওই হালার বউ-বাচ্চা ঢাকা থেইকা আইবো। খবরটা দিছে ওর বাড়ির বুয়া। পাক্কা ইনফরমেশন। খবরটার জন্য মেলা টাকা দিছি ওই বেটিরে। কাজটা খুব একটা বেশি কঠিন না। স্টেশনের ভিতরে আগে থেইকাই ঢুইকা থাকতে হইব। ওই হালায় ফ্যামিলির কারবারে লগে পুলিশ রাখে না। আপনেগো লোক গেলে হেগো চিনবোও না। হালায় স্টেশনে আইলেই একটু আড়াল থেইকা মাথায় দুইডা গুলি ভইরা দিলেই হইব। ভোর বেলায় এমনেও মানুষ বেশি থাকে না। বাইরে আমাগো গাড়ি থাকব, ফাঁকা গুলি কইরা বাইর হইয়া আইলেই আমরা গাড়ি লইয়া টান দিমু।
পাখি চিনমু কেমনে?
ফটো নিয়া আইছি।
লোকটি একটা ছবি রাখলো টেবিলে উপর। নাসির বলল, আইচ্ছা তোমরা এখন যাও আমি লোক ঠিক কইরা তোমাগো জানামুনে। লোক দুটি চলে গেল। নাসির তাকালো বিলাই কিরণের দিকে,
কি রে, যাবি নাকি?
আপনে কইলে তো যামুই।
তরে পাঠাইতে মন চায় না, কিন্তু অন্য কাউরে পাঠাইতেও সাহস পাইতাছি না!
আমিও বুঝি, তয় এতো দূরে যাওনডা ঠিক হইব কি না তাও বুঝতাছি না?
বিলাই কিরণ খুনের জগতে এক মহা ত্রাশ! এই পর্যন্ত নয়জন মানুষ খুন হয়েছে তার হাতে। এদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রিও আছে একজন। তার কণ্ঠে দ্বিধা শুনে বিরক্ত হলো নাসির। খিস্তি দিয়ে উঠল,
কস কি? তুই ডরাইসস নাকি?
কী যে কন ভাইজান? ডরাই না, তয় লগে একজন থাকলে ভাল হয়।
কাকে পাঠানো যায় নিয়ে নাসির চিন্তায় ডুব দিল। ভাবলাম, এটাই সুযোগ। কোনভাবেই এটা হাতছাড়া করা যাবে না। বললাম, নাসির ভাই, একটা কথা কইতে চাই। এই খুনের সুযোগটা আমারে দেন। আমার টাকা দরকার। এই গরিবী হাল আর ভাল লাগে না! নাসির হা হা করে হেসে উঠল। বলল, কও কি মিয়া? তুমি করবা খুন? কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আচ্ছা যাও, তোমারে একটা সুযোগ দিলাম। তয় কন্ডিশন আছে। তুমি যদি আগে গুলি চালাও তয় পাইবা ৭০% পার্সেন্ট, মানে সাত লাখ। আর যদি বিলাইয়ের গুলি করতে হয় তয় একটাকাও পাইবা না। কি রাজি? কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। বললাম, শর্ত মঞ্জুর। সে রাতেই পৌঁছলাম চট্টগ্রাম।প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেল, পাখির খবর নাই। পাখির নাম বেলয়েত হোসেন। ছবিটা দেখে নিয়েছি ভাল করে। নিজেকে ভয়ঙ্কর দেখানোর জন্য মোটা একটা গোঁফ রেখেছে। মুখটা লম্বাটে। এই ধরনের লোকদের চেহারা চাড়ালদের মত হয় কিন্তু লোকটার চেহারায় মায়া-মায়া ভাব আছে। পানির পিপাসায় অতিষ্ট হয়ে উঠলাম। পানি খোঁজার সিদ্ধান্ত নিলাম। তখনই, বিলাই ফিসফিস করে উঠল, পাখি আইসা গেছে! কথা শুনে ভিতরটা কেমন যেন শিরশিরিয়ে উঠল। কিন্তু মাথার উপর ঠাটা পড়ল! দেখলাম, দুই জন কনেস্টেবলও বেলায়েতের সঙ্গে এসেছে। বিলাই খিস্তি দিয়ে উঠল, শুয়রের বাচ্চারা ভূল ইনফরমেশন দিছে। বিলাইকে বললাম,
বস এখন কি করমু?
চুপচাপ খাড়াইয়া থাকেন, দেখি কি হয়?
ট্রেন এসে থামল। দেখলাম, যাত্রীদের ভীরের মধ্যে থেকে একজন ভদ্রমহিলা ও ছ’সাত বছরের একটা বাচ্চা বেলায়েতের কাছে এসে দাঁড়ালো। ছেলেটি দৌঁড়ে বেলায়েত কাছে যেতেই তাকে কোলে তুলে নিল। বেলায়েতের বউ বেলায়তকে কিছু বলল। বেলায়েত কনেস্টেবলদের দিকে মুখ করে কিছু বলল। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ দুটি ট্রেনের দিকে ছুটল। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না? তবে মনে হলো, ট্রেনে বোধয় কিছু হারিয়েছে? খোঁজ করার জন্যই বোধয় পুলিশ দুটি ট্রেনের দিকে যাচ্ছে। অপূর্ব সুযোগ এসে পড়ল! দ্রæত এগিয়ে গেলাম। অনেক কাছে চলে আসলাম। বিলাই ফিসফিস করে উঠল, মিজান ভাই দেরি কইরেন না গুলি চালান। ধীরে ধীরে জ্যাকেটে আড়াল করে রিভলবার বেলায়েতের দিকে তাক করলাম। হাত কাঁপতে লাগল! শত হলেও মানুষ খুন। আমার তো আর বিলাইয়ের মত নয়টা খুনের অভিজ্ঞতা নেই। মোটেসোঁটে একটা । তাও আমার আবার নিজের বাপকে।বয়স চৌদ্দতে পড়েছে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছি, ঊনিশ থেকে বিশ হলেই মায়ের গায়ে হাত তোলে বাবা। বাবা ছিল গ্রামের মাতব্বর। টাকা-পয়সা, জায়গা-সম্পত্তির অভাব ছিল না। মাতবর কিসিমের মানুষদের মত সব বদগুণই ছিল তার। ভিলেইজ পলিটিক্স, খুন, মদ, নারী মোট কথা কোন গুণই তার চরিত্র থেকে বাদ ছিল না। হঠাৎ করে ঘোষণা দিল, আবার বিয়ে করবে। শুনেই মা হাউকাউ শুরু করল। মইরা যামু, সতীনের ঘর করমু না! বাবারও একই কথা, আমার বাড়ি আমার ঘর, আমি যাকে খুশি ঘরে আনমু, তুই কওনের কে? এক কথায়-দু’কথায় শুরু হল তুমুল ঝগড়া। একপর্যায়ে বাবা উঠান থেকে কঞ্চি নিয়ে মাকে পেটাতে শুরু করল। এবার আর সহ্য হলো না আমার! আমের চারা লাগাব, দাঁ দিয়ে মাটি খুঁড়ছিলাম। ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়ালাম। পিছন থেকে বাবার ঘারে, দিলাম এক কোপ। কম বয়স থেকেই আমি শক্তিশালী। বাবার গলায় অর্ধেক ঢুকে গেল ধারাল দাঁ। গড়ড়ড়ড়ড়ড়ড় করে একটা আওয়াজ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে গেল মা! একটু হুশ হতেই চিৎকার করে উঠল, কে কোথায় আছ? আমার স্বামীরে মাইরা ফেলছে! আমার পোলায়! চিৎকার করে কেঁদে উঠল। বলতে লাগল, এইডা তুই কী করলি? তুই আমার পোলা না। তুই একটা খুনি। তুই আমারে বিধবা করছস। বাগানে ছিল মতি চাচা। চিৎকার করে উঠল, ধর, ওরে ধর। মায়ের গালি খেতে খেতে আর মতি চাচার ধরতে আসা দেখে, হুশ হলো। মনের ভিতর থেকে শুনতে পেলাম, বাঁচতে চাইলে মিজান পালা। এক ছুটে পৌঁছলাম লঞ্চঘাটে। ঢাকামুখী লঞ্চটা তখন ঘাট ছেড়েছে মাত্র। কী করি, কী করি? লঞ্চ ধরার জন্য দিলাম লাফ। পড়লাম গিয়ে পানিতে। সবাই হৈ হৈ করে উঠল, আহারে! বাচ্চাটা কে? মারা পড়বে তো? কে আছ উদ্ধার কর? সবাই শুধু উদ্ধার করতেই বলছে, বাঁচাতে নামছে না কেউ! এসময় কেউ একজন ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাঁতার জানতাম না যে তা নয়। তবুও কেন জানি সাঁতরাতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমি মারা যাচ্ছি! লঞ্চে উঠানো হলো। উদ্ধারকারী দেখলাম বাপের বয়সী। জিজ্ঞেস করল, কি নাম তোমার? পানিতে ঝাঁপ দিছ কেন? ভিষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, শুধু বললাম, বাপরে খুন করছি! লোকটি আমার মুখে হাত চাপা দিল। বলল, আর কারও সামনে এই কথা কইও না। ঢাকায় নিয়ে আমাকে আশ্রয় দিল। জানি না, কী কারণে যেন ওই বুড়ো আমাকে খুব স্নেহ করত। কী দেখেছিল আমার মুখে কে জানে?
বেলায়েত বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বউয়ের সাথে রগড় করছে। বা হাতে জ্যাকেটটা আরেকটু সরিয়ে নিলাম। রিভলবারটা এমনভাবে তাক করলাম যাতে ওর ঘাড়ের গুলি লাগে। বিলাই বলে উঠল, মিজান ভাই আপনে আর আধা মিনিট সময় পাইবেন। তারপর আর সময় দিমু না। এতক্ষণে আমি ফালাইয়া দিতাম, আপনেরে সম্মান করি বইলাই ওয়েট করতাছি। যা আছে কপালে! প্রস্তুত হলাম গুলি করার জন্য। গুলিটা করতে যাচ্ছি, দেখতে পেলাম বাচ্চটার মুখ। কোলে তুলে রাখায় বাচ্চাটার মুখ বরাবর হয়ে আছি। বাচ্চাটা হাসছে, পিতার কোলে নিরাপদ আশ্রয়ের সুখ তার চোখ মুখ বেয়ে ঝরে পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভূদ ঘটনা ঘটল! খুব পুরানো একটা স্মৃতি ভেসে উঠল মনে। আমাদের উঠানে বিরাট আসর জমেছে। লোকে লোকারণ্য। উঠানে সারিবদ্ধ কয়েকটি চেয়ার। মাঝের চেয়ারে বাবা, অন্য চেয়ারগুলিতে গ্রামের মান্যগণ্য ব্যক্তিরা। চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামবাসী। উঠানের ঠিক মাঝখানে, একটি লোক পিঠমোড়া করে বাঁধা। লোকটি নিমাই। কুখ্যাত গরুচোর! গ্রামের কত গরু যে সে চুরি করেছ ইয়ত্তা নেই! বহুদিন ধরে গ্রামবাসী খুঁজছিল। আজ ভোরবেলা, ফজল মুন্সীর গরু চুরি করতে গিয়ে হাত নাতে ধরা পড়েছে। নিমাইয়ের পাশেই বসে আছে তার সাত বছরের মেয়েটি। মেয়েটি বসে বসে কাঁদছে। কতটুকুই বা সে বুঝতে পারছে? কী কারণে যে কাঁদছে, সেই ভাল জানে। বাবাকে বলতে শুনলাম, কি করা যায়? কেউ বলছে চোখ অন্ধ করে দিতে, কেউ বলছে পুলিশে দিতে। বাবা বলল, না। এই আপদ রাখন যাইব না। অন্ধ করলে পরে আমগোই পালতে হইব। পুলিশে দিলে ফিরা আইসা আবার এই কাম শুরু করব। ওরে মাইরা ফেলতে হইব। পিটাইয়া মারমু যাতে এই ধরনে সাহস ভবিষ্যতে আর কারো না হয়। মেয়েটাকে জোর করে সরিয়ে আনা হলো। শুরু হল মার। আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করছে নিমাই! আমি চেয়ে চেয়ে দেখছি। নিমাইয়ের মেয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। বলছে, বাপেরে ছাইড়া দেও! ছাইড়া দেও তোমরা। বুকে একটা চাপা কষ্ট অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছে ছুটে গিয়ে তাদের থামাই। বলি, নিমাইরে আপনারা ছাইড়া দেন। মাইয়াডা বড় কষ্ট পাইতাছে। মাইয়াডারে এতিম কইরেন না। ছোটকাল থেকে এতিম শব্দটা অনেক শুনেছি। সেদিনই বোধয় এতিম কী তা প্রথম বুঝলাম। গরু চুরির অপরাধে মানুষ পিটিয়ে মারা সঠিক কি না জানি না, সেটা বোঝার জ্ঞান তখন হয়তো আমার হয়নি। কিন্তু একটা অসহায় শিশুর সামনে ভয়ঙ্করভাবে তার পিতাকে পিটিয়ে মারা আমার কচি মনে দাগ কেটে বসেছিল। অনেকদিন ভুলতে পারিনি। নিরব দর্শকের মত শুধু দেখেই গিয়েছিলাম। দেখা ছাড়া আর কিইবা করার ছিল? দশ মিনিটও লাগল না, পাঁচ-সাতটা বাশের বাড়িতে নিমাইয়ের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। মেয়েটি গিয়ে বাবার লাসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
বিলাইয়ের ফিসফিসানি উৎকন্ঠায় পরিণত হলো। উত্তেজনায় তার কণ্ঠ কাঁপতে লাগলো।
মিজান ভাই করতাছেন কি? গুলি করেন না কেন?
বেটার কোলে তো বাচ্চা! গুলি করলে তো বাচ্চাটার গায়েও লাগবো?
লাগলে লাগুক। তাতে কি হইছে? এক জনের জায়গায় দুই জন মরব, সমস্যা কি? তাড়াতাড়ি করেন।
আমার হাত তখন থেমে গেছে। বুঝে গেছি আমার পক্ষে সম্ভব না! শুধু বললাম, বিলাই আমি পারুম না। অশ্লীল ভাষায় খিস্তি দিয়ে উঠল বিলাই, এইসব মাগিদের নিয়া কোনো কিছ্ইু করা সম্ভব না! সীমা ভাবী যে আপনের মতো একটা মাগির লগে কেমনে প্রেম করে হালার দেমাগেই আইতাছে না? বিলাইয়ের কথায় আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম! মনে মনে ভাবলাম, সীমার ব্যাপারটা তবে কি গোপন নেই? পুশিল দুজনকে দেখা গেল ট্রেন থেকে নামতে, বোঝাগেল তারা ফিরে আসছে। বিলাই তার পিস্তল বের করল। তাক করল বেলায়েতের দিকে। বলল, জীবনে কখনও ফেল মারি নাই এইবারও মারুম না। বুম করে একটা গুলির আওয়াজ হল। এক মুহূর্তের জন্য বুঝি সবকিছু থমকে গেল। চমকে উঠল বেলায়েত ও তার স্ত্রী। তাকাল গুলির উৎসের দিকে! পুলিশ দুজনও নিজেদের জায়গায় থমকে গেল। লুটিয়ে পড়ল বিলাই স্টেশনের ফ্লোরে। চোখ দুটি ভরা অসীম বিষ্ময়! বেলায়েত তী² দৃষ্টি নিয়ে তাকালো আমার দিকে। রিভলবারের মুখ থেকে ধোঁয়া তখনও পুরোপুরি বাতাসে মিশে যায়নি। বেলায়েত যা-ই বুঝুক না কেন তার চোখে হিংস্র হয়ে উঠল। কোমরে হাত চলে গেল। অদ্ভুত একটা তৃপ্তি পেলাম। মনে মনে ভাবলাম, বহুদিন ধরে সিন্ধুকে আটকে রাখা ঋণটা আজ শোধ করলাম। দারুণ হালকা মনে হলো নিজেকে! পুলিশ দুজন দৌড়াতে শুরু করেছে। সম্বিত ফিরে আসল আমার। বুঝলাম পালাতে হবে। ধরা খেলে রক্ষা নাই! এখানে ধরা পড়লে জেল, বাইরে ধরা পড়লে নাসিরের হাতে মরণ। বেঁচে থাকলে সীমার মতো বহু মেয়েই পাওয়া যাবে। তাছাড়া ওসব খানকিদের উপর এমনিতেও ভরসা করা ঠিক না। ওরা শেষ পর্যন্ত কারোই হয় না! ঊর্ধ্ব গতিতে দৌড়াতে শুরু করলাম। ঠিক সেভাবে, বাবাকে খুন করে লঞ্চ ঘাটের দিকে যেভাবে দৌড়ছিলাম।6 Comments
Friends
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
ishan_syed
@put23009laoia-com
ঐন্দ্রিলা আপু
@tjb02611toaik-com
মৌমিতা
@ofd66076toaik-com
Avik_kazi
@rlw81159toaik-com
আহান খান
@ukm39186laoia-com
Mohammad Solayman
@solayman
afrida-jahar
@afrida-jahar
Md-Akadullah
@md-akadullah

গল্পটি থ্রিলারধর্মী হলেও, এটি মিজানের ভেতরের ভালো-মন্দ ও অস্তিত্বের সংগ্রামকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছে।