Profile Photo

Mohammad RaisuddinOffline

  • mohammadraisuddin
  • Profile picture of Mohammad Raisuddin

    Mohammad Raisuddin

    • 1 month, 1 week ago

    প্রবাসীদের রক্তের জল ও সোনা চাচার অভিজ্ঞতা
    কলমে-মুহাম্মদ রাইস উদ্দিন –

    মরুভূমির বিষাক্ত তপ্ত বাতাস আর খাঁ খাঁ করা নিঃসঙ্গতার মধ্যে প্রবাস জীবনের প্রতিটি দিন কাটে এক পরম অনিশ্চয়তায়। চারপাশের এত ঝলমলে আলো আর ধনসম্পদের ভীড়ে প্রবাসীদের অন্তরটা কেবল জন্মভূমির এক চিলতে মাটির জন্যই হাহাকার করে। কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে যখন সবাই নিজের ঘরে ফেরে, তখনো অনেকে মনের ভেতরের জমাট বাঁধা কান্নার আওয়াজ বাইরে আসতে দেয় না। এমনই এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় কারখানার এক কোণে মন খারাপ করে বসে ছিল তরুণ মোশাররফ।

    তাকে ওভাবে মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন বয়োজ্যেষ্ঠ সোনা চাচা। প্রবাসে দীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতা তার চুলে পাক ধরিয়েছে, মুখে এঁকে দিয়েছে কষ্টের নানা বলিরেখা।

    মমতার সুরে সোনা চাচা জিজ্ঞেস করলেন, “—মোশাররফ, বাবা মনডা কি কারণে খারাপ? কোনো বিপদ-আপদ হইছে নাকি?”

    মোশাররফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ মোছার চেষ্টা করল। নরসিংদির আঞ্চলিক টানে বুকভাঙা কষ্ট চেপে বলল, “—হ চাচা, বড় ভাই বিয়া কইরা বউ লইয়া ঢাকায় সুখে আছে, মা-বাবার কোনো খোঁজখবর লয় না। আর ছোট ভাইরে কত কষ্ট কইরা লন্ডনে পাঠাইলাম, হ্যায়ও ঐখানে যাইয়া বিয়া কইরা বইসা আছে, অথচ পরালেখাই এখনো শেষ হয় নাই!”

    সোনা চাচা একটু তিক্ত হাসি হেসে মাথা নাড়লেন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার টানে বললেন, “—এমনডা যে হইবো, তোমার এই সোনা চাচা হেই আগেই জানতো। পরবাসে চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা, বুঝলা ভাতিজা?”

    মোশাররফের চোখে তখন বারো বছরের জমানো কষ্ট আর আফসোসের জল। সে বলল, “—হ চাচা, অহন সব হারাইয়া হাড়ে হাড়ে বুঝতাছি। আপনার কথা হেইদিন শুনলে আজকে আমার ব্যাংকে অন্তত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা জমা থাকতো! আমার এই দশ-বারো বছরের রক্তপানি করা কামাই—সব পানিতে গেল! লগে কাজ করা কত সহকর্মীরা দ্যাশে নিজের নামে কত সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং তুললো, আর আমি সব বিলানি দিয়া অহন খালি হাতে দাঁড়ায়া আছি!”

    সোনা চাচা মোশাররফের কাঁধে সান্ত্বনার হাত রেখে বললেন, “—তুই ছোট ভাই হইয়া নিজের রক্তের পানি করা টাকায় বড় ভাইরে লেহাপড়া করাইয়া ইঞ্জিনিয়ার বানাইলি, ছোট ভাইরে কত আশা লইয়া লন্ডনে পাঠাইলি… আমি দশ বছর আগেই কইছিলাম, ‘নিজের নামে একটা আলাদা একাউন্ট খোল, নিজের ভবিষ্যতের লিগা কিছু ট্যাকা জমাইয়া রাখ।’ অহন বুঝলি তো? সোনা চাচার কথা বাসি হইলেও অক্ষরে অক্ষরে ফলে!”

    মোশাররফের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। সে যেন প্রবাসীদের চিরন্তন ট্র্যাজেডির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ভেঙে পড়ে সে বলল, “—বাবাডা গতবছর তিল তিল কইরা কষ্ট পাইয়া মারা গেল, সারাটা জীবন একটু সুখের মুখ দেইখা যাইতে পারলো না। মা’র বয়স হইছে, অহন তার একটু সেবা-যত্ন দরকার। দুইডা বইনরে কত শখ কইরা বিয়া দিলাম, হ্যারাও শ্বশুড়বাড়িতে খুব একটা সুখে নাই। অহন আমি কোনদিকে যামু, কি করুম—কিছুই বুইঝা উঠতে পারতাছিনা…”

    সোনা চাচা অভিজ্ঞতা আর বাস্তবতার চরম শিক্ষা দিয়ে বললেন, “—অহন এক কাজ কর, সোজাসুজি ছুটিতে বাড়ি যা। ভালো ঘর দেইখা একটা লক্ষ্মী বউ বুইঝা আন। তারপর নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাইবা সুন্দর, ছিমছাম একটা ঘর তোল। এহন থাইকা অন্তত নিজের লিগা সচেতন হও—মন সামাজিক হইলেও মনে রাইখো, ‘ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই’, বিপদে এই স্বার্থের যুগে কেউ কারও পাশে দাঁড়ায় না!”

    অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মোশাররফ আত্মোপলব্ধির সুরে বলল, “—বাবা এতদিন বাইচা আছিল, সংসারের সবাইরে বড্ড আপন মনে হইতো। তাই হ্যাদের সব আবদার মিটাইতে গিয়া নিজেরে একদম উজার কইরা দিছি। অহন নিজের স্বার্থ গুছানো শেষ, সবাই যার যার পথ ধইরা চইলা গেছে… আসলেই আমি বড্ড বোকা আছিলাম, তাই না চাচা?”

    সোনা চাচা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই দীর্ঘশ্বাসে যেন জড়িয়ে আছে লাখো প্রবাসীর না-বলা বেদনা। তিনি নিজের বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে আসা কষ্টের কথাগুলো উচ্চারণ করলেন, “—আমি দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধইরা এই পরবাসে সংসারের বোঝা টানতাছি ভাতিজা, আজও স্বদেশের মাটিতে চিরতরে ফিরা যাইতে পারলাম না! কিসের সংসার, আর কিসের আপনজন? সমস্যার কোনো শেষ নাই… আমাগো মতো প্রবাসীদের এই বুকভাঙা কষ্ট, একা রাইতের কান্না আর ত্যাগের খবর কেউ রাখে না, বুঝতেও চায় না। আমাগো রক্ত জল করা পরিশ্রমের বিনিময়ে সবাই ভালো থাকে, অথচ আমাগোরে খালি ট্যাকা বানানোর এক-একটা মেসিন মনে করে!”

    ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এল এশার আজানের মধুর সুর। প্রবাসের নিঃসঙ্গতায় এই আজানের সুর যেন প্রতিটি ব্যথিত হৃদয়ে কিছুটা প্রশান্তি এনে দেয়।

    আজানের সুর শুনে মোশাররফ নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “—চাচা! এশার আজান তো অনেক আগেই দিছে। চলেন, অযু কইরা নামাজটা পইড়া আসি। পরম করুণাময় আল্লাহ আমাগো এই নিরব আত্মত্যাগ আর কষ্ট কখনো বৃথা যাইতে দিব না। আর যারা আমাদের সরলতার সুযোগ নিয়া অন্যায়ভাবে ঠকাইছে, হ্যারা হ্যাদের কৃতকর্মের বিচার একদিন ঠিকই পাইবো।”

    সোনা চাচাও উঠে দাঁড়ালেন। মোশাররফের পিঠে হাত রেখে মোনাজাতের ঢঙে বললেন, “—হ চলো বাবা, চল… আল্লার দরবার ছাড়া আমাগো তো আর কেউ নাই!”

    দুই প্রবাসী পথচলা শুরু করেন মসজিদের দিকে। চোখের জল আর মনের জমানো ক্ষোভগুলো হয়তো নামাজের সেজদায় গিয়ে ঝরে পড়বে, আর আগামীকালের নতুন সকালে আবার শুরু হবে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর এক অসীম, নির্দয় লড়াই।

    3
    5 Comments
    • সুন্দর পটভূমি, আর ভাষা। প্রবাসী এই দুই চরিত্রের জন্য মায়া তৈরি হয়ে গেল …

    • রক্ত জল করা পরিশ্রমের পরও প্রবাসীর একটাই আশ্রয়
      প্রভুর দরবার আর সেজদার নীরব প্রশান্তি…..🤍

    • মোহাম্মদ রাইস উদ্দিন, প্রবাসীদের জীবনের এই নির্মম বাস্তবতাগুলো পড়তে পড়তে খুব কষ্ট হচ্ছিল। আপনার লেখাটি পড়ে মনে হলো প্রতিটি প্রবাসীর মনের ভেতরে ঠিক এমন হাহাকারই লুকানো থাকে। আচ্ছা, এমন পরিস্থিতিতে পড়ে আপনি কি মনে করেন যে নিজের ভবিষ্যতের কথা আগে ভাবাটাই এখনকার সময়ে সবচেয়ে জরুরি?

    • প্রবাসীদের আত্মত্যাগ কখনও কেউ বুঝে না, নির্মম হলেও সত্যি।

    • প্রবাস জীবনের হাহাকার আর অভিজ্ঞতার যে সংমিশ্রণ আপনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো এক বাস্তব চিত্র। আপনার এই লেখার “সোনা চাচার কথা বাসি হইলেও অক্ষরে অক্ষরে ফলে!”—এই অংশটি সত্যিই খুব গভীর এক জীবনবোধের পরিচয় দেয়। আপনি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে এই অনুভূতিগুলো তুলে এনেছেন, তাই আপনার লেখনী নিয়মিত জারি রাখার জন্য অনেক শুভকামনা রইল।

Friends

Profile Photo
Ahsanul Martin Mishor
@ahsanulmartinmishor
Profile Photo
Ramjan ali
@ramjanali
Profile Photo
Farhan Sadik
@farhansadik
Profile Photo
m zaman
@mzaman
Profile Photo
Gileman Alom
@gilemanalom
Profile Photo
Sima Nto
@simanto
Profile Photo
Abdullah Al Ahad
@abdullahalahad
Skip to toolbar