Profile Photo

Obaidul Islam MithuOffline

  • Obaidul
  • Profile picture of Obaidul Islam Mithu

    Obaidul Islam Mithu

    3 years, 7 months ago

    আমার বাসার গ্যাসের চুলা ঠিক করে মিস্ত্রি নগদ ৯৫০ টাকা নিলো খুব দয়া করে । চুলার দাম হাজার দুয়েক । যেইটা নষ্ট হইছিলো সেইটাই হইলো গিয়া চুলার জান, ১হাজারের নিচে হয় না, আমার সাথে কথা বইলা ভালো মানুষ মনে হইছে বইলা ৫০ টাকা কম। পটাশ কইরা সুইচ ঘুরাইতেই দপ কইরা জ্বলে উঠলো। বললাম, ‘বাহ, আপনি তো খুব সুন্দর সুইস দেন। চুলা কোনো হ্যাতক্যাত করল না।’ তিনি মুচকি হাইসা বললেন, ‘সারাদিন তো এই কাজই করি।’
    সারাদিন এই কাজ করেন? কত সুইস ঘুরান তাইলে ?
    যাক গে। উনি যোগ্য লোক। আমার কিছুই বলার থাকতে পারে না। আমার শুধু ভাবার আছে।
    বছর দশেক আগে বাংলা একাডেমি থেকে আমাকে একটা যোগব্যায়ামের বইয়ের প্রচ্ছদ করতে দিছিলো । বাংলা একাডেমিতে কাজ করতে পারলে লোকে ধন্য হয়। আমিও হয়েছি। এতটাই ধন্য যে, বন্ধুদের দেখাবো বলে গোটা তিরিশেক ব্যায়ামের বইই কিনে ফেলবো । সে যাই হোক, মাস ছয়েক পরে ওখান থেকে ফোন দিয়ে আমাকে ১ হাজার টাকা ধরিয়ে দিলো। আমার হৃদয় নিংড়ানো রঙের সম্মানি। আমি যে তাতে দুঃখ পেয়েছি এমন নয়। হোক ছ’মাস পর। তবু তো পেয়েছি। ছবি আইকা আমার চোদ্দোপুরুষ একহাজার টাকা পায়নি কোনোদিন। আমি পথিকৃৎ।
    বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার মূরাল কইরা আমার চৌদ্দগুষ্ঠির কে কয় টাকা কামাইছে জীবনে। আমার টাকা লোকে যতই মাইরা দেইক।। আমি বংশের পথিকৃৎ।। কিন্তু ওই গতকাল আমার মূরাল মিস্ত্রির ফ্লাটের সামনে দেখা হইয়া মনে হইলো
    মেট্টিক পাশ করার পর বা তারো আগে চুলার সুইস বা ইন্টার পাশ করার পর যখন ঢাকা আসলাম তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে বেকার ১০ বছর না কাটাইয়া মূরাল মিস্ত্রি বা অন্য যে কোনো মিস্ত্রি হইলে আমার জীবনে কী এমন ক্ষতি হইত? কিছুই হইত না। অন্তত এই পাঠশাঠের সামাজিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতাম।
    সকালে একটা ব্যাগ নিয়ে বেরোতাম। তার পর চলত চুলা সারা । যে-চুলায় আগুন বের হইতেছিলো না সে অচিরেই চাঙ্গা হয়ে আগুন ছাড়ত, যে- বাসায় খাবার রান্না হইতেছিলো না, সেই পরিবার ঘন্টা খানেকের মধ্যেই কত প্রয়োজনীয় খাবার রেঁধে খেয়ে ফেলত। এই আমার ভাবধরা সাহেবি কাজের চেয়ে এ অনেক বড় কাজ। রোজগারপাতিও যথেষ্ট। সবচেয়ে বড় কথা, ভুলভাল কাজ কইরা চইলা আসলেও কেউ কিছু কইতে পারতো না। ফ্রি ডিজাইনের পেরা থাকতো না। বিল বেশি ধরাইছি কেউ কইতে পারতো না। আরে ভাই খাইলে চুলা সারান, নইলে জাইগা।। একটা ম্যাগাজিনে একটা কবিতা ছাইপা ১০০ টাকা সম্মানি পাইছিলাম, ভাগ্যিস এখন আর কবিতা লিখতে পারি না।।
    জীবনানন্দ দাশ নাকি বাংলা কবিতায় উজ্জ্বলতম নাম। জীবনানন্দকে কেউ বলেন নির্জনতার কবি, কেউ বলেন বোধের কবি, কেউ প্রকৃতি কবি আবার কেউবা বলেন পরাবাস্তব কবি। নানান নামে, নানান উপমা-অলংকার দিয়েও শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দ কে, তাঁর কবিতার ধরণ কে ব্যাখা করা যায় না। সেই কবির বাসরেও জীবনে আনন্দ আসে নি তার। বাসর ঘরে ঢুকে মানুষ কত রোমান্টিক গানের আর কথার ফোয়ারা উজাড় করে দেয়! আর জীবনানন্দ বাসর ঘরে বউকে বললেন- রবি ঠাকুরের ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে’ গাইতে পারবে আমার জন্য?
    মানে বাসর রাতেও এমন দু:খী গান! তার বউ নিশ্চয়ই গেয়েছিলেন……..
    “আজি এ কোন গান নিখিল প্লাবিয়া
    তোমার বীণা হতে আসিল নাবিয়া!
    ভুবন মিলে যায় সুরের রণনে
    গানের বেদনায় যাই যে হারায়ে
    জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ায়ে
    বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে”
    একের পর এক রিজেক্ট হওয়া পান্ডুলিপিতেই বোধহয় কলম ঘসে ঘসে সেই জীবনানন্দই আবার আশায় বুক বেঁধে লিখেছিলেন ” চিরদিন দুঃখ ভোগ করে যাওয়াই তো জীবনের উদ্দেশ্য নয়..।”
    এই দু:খি লাইন অবশ্য তিনি আমার মতোন সংসার নিয়ে ভেবে লেখেন নাই লিখেছেন কবিতা নিয়ে।
    অনেক লেখক ই সেই সময় জীবন আনন্দে কাটালেও, জীবনানন্দ? ওই সময়ে! চাকরির জন্য হন্যে হয়ে এদিক থেকে ওদিক ঘুরতে ঘুরতে জুতোর তলা খসে যায়। পরপর ৫টি কলেজে চাকুরি হারালেন। কবিতাও সমাদর পায় নি।
    তিনি কেন যে মিস্ত্রি হননি আমার বুঝে আসে না!
    ট্রাম চাকায় বিদ্ধ হওয়ার আগে তাকে আক্রমণ করেছে শনিবারের চিঠির ঊন-চরিত্রের সমালোচকেরা। জীবনানন্দ বেঁচে থেকেও যেন মরে গিয়েছিলেন। তার কবিতায় বার বার মৃত্যুর কথা এসেছে। বলেছেন-
    “একদিন কুয়াশার এই মাঠে আমারে পাবে না কেউ খুঁজে আর, জানি;
    হৃদয়ের পথ–চলা শেষ হলো সেই দিন— গিয়েছে সে শান্ত হিম ঘরে,
    অথবা সান্ত্বনা পেতে দেরি হবে কিছুকাল— পৃথিবীর এই মাঠখানি ভুলিতে
    বিলম্ব হবে কিছুদিন;”
    পৃথিবীর মাঠ ভুলে গেছেন কিনা জানি না। কিন্ত আমার জীবনের ডিপ্রেশনাল নার্ভ ভুলে নাই আমাদের নির্জনতার কবিকে। কারণ তিনি যে লিখে গেছেন, আমাদের ‘ভালো লাগে না’ সময়ের উপখ্যান। তার কথা ভাবতেই আমরা বরং কল্পনা করি, উত্তরা টু আজিমপুর বিকাশ বা ভিআইপি নামধারী লোকাল বাসের মতোন একটা লক্কর-ঝক্কর ট্রাম।
    সন্ধ্যায় হ্যাজাক লাইটের মধ্যে দিয়ে এক আটপৌরে লোক হাঁটছে। তার বউ তারে ভালো পায় না। সম্পাদকেরা তার লেখা ছাপায় না। পড়াতে গিয়ে বেতন পায়না ৷
    আমার বাপ মায়ের মতোন তাঁর মা বাপেরও স্বপ্ন ছিলো নিশ্চয়ই স্বপ্নের ছেলে-পিলেরা “কথায় না বড় হয়ে, কাজে বড় হবে”। আর ওই ছন্নছাড়া লোকটা মরে গেল একলা একলা ‘কথা’ বলতে বলতে; ট্রামের নীচে চাপা পড়ে।
    পৃথিবীর শেষ ট্রাম এসে গেছে তার জীবনে!
    একটু আগেও যে কিনা রাস্তার পাশে ডাবের দোকানের দিকে অপলক তাকায়ে ছিল। বিড় বিড় করে কি জানি বলছিল, লোকে দেখেছে।
    তারপর, সে মরে গেছে।
    আর, সে এতদিন আনমনে লিখে গেছে তার কথা। আমাদের অনেকের কথা। ডিস্টার্বিং ইন্ট্রোভার্সির কথা!
    কিংবা আমাদের ডিপ্রেশনের খতিয়ান। আমাদের ‘জীবন’ ছিল।
    আমার ধারণা ,
    আমাদের এই জীবনানন্দ দাশ-ই দুনিয়ার সবচে’ যুতসই ডেফিনেশন লিখে গেছেন; এই “ডিপ্রেশন” শব্দটার।
    একদম লিরিক্যাল ডেফিনেশন….
    “অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
    আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
    আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
    খেলা করে;
    আমাদের ক্লান্ত করে
    ক্লান্ত- ক্লান্ত করে…”

    একুশ শতকের নাগরিক মানুষের একান্ত দুঃখবোধ। হুট করে মন খারাপ হয়ে যাওয়া। কেমন খালি খালি লাগা শূন্যতা। বিং এন্ড নাথিংনেস ফিলিংস। নিজস্ব জীবনের প্রতি মাঝমধ্যে চলে আসা বিবমিষা। সব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মাঝেও এক ধরণের অস্থিরতা।
    এই যে “সেন্স অব মরবিডিটি”!
    এইসব কোন লোক কবিতায় অত সুন্দর করে বলে গেছেন, বলেন তো!!
    পাশ্চাত্য মানুষদের মন খারাপের কবি কীটসের “Ode on melancholy” কিংবা সিলভিয়া প্লাথের “Dying is an art” এইসব পড়ে-টড়ে একদিন সন্ধ্যাবেলা মন খারাপ করে বসে থাইকেন।
    ‘জীবনের’ মতোন না।
    আমাদের জীবন, আমাদের মতোন।।
    পাশ্চাত্যের সাথে আমাদের সব কিছুরই ব্যবধান।
    “ডিপ্রেশন” সেলিব্রেট করার মধ্যেও যেন আছে কয়েক হাজার নটিক্যাল মাইল ব্যবধান।
    বরং কাছের মনে হয়, ধূসর রঙের একটা পান্ডুলিপি।
    তা আজ শাহবাগের বাসে উইঠা ফার্মগেট নাইমা ছন্দ সিনেমা হলের সামনে আইসা এলাকার এক রিকশাওয়ালার সাথে দেখা হয়ে গেলো, হলের সামনে তার সাথে চা খাইতে খাইতে জানলাম ইনকাম ভালো। কইলো “আপনে তো শুনছি বড় নেতা, কিছু করতে পারেন নাই না? চা খেয়ে একটা স্টার ধরাইয়া দোকানের বিল দিতে দিতে উনি আমাকে বললেন, ‘আপনার নানাতো মাস্টার আছিলো। জ্ঞ্যানী মানুষ। আমরা তাঁর হাতেই মানুষ হয়েছি।
    ‘মনে মনে বললাম, আপনি মানুষ হলেও আমি ততটা হইনি। নানারই দোষ। মাদ্রাসা থেকে কান ধরে টানতে টানতে বাড়ি নিয়া যাইতে যাইতে বলছিলো ” আমার মেয়েকে শেষ বয়সে ফয়তার চাইল তুলে খাওয়ানো লাগবে না “। আমার সব্বোনাশে আরেকজনের দোষ আছে যার জন্য আমি মিস্ত্রি না হইয়া কবি হইতে চাইছিলাম। জীবনানন্দ।।

    ওবায়দুল ইসলাম মিঠু
    ২২ অক্টোবর, ২০২২
    ফার্মগেট, ঢাকা।

    1
    1 Comment
    • জীবন ও জীবনানন্দকে খুব সুন্দর পর্যবেক্ষন করেছেন লেখক। খুব ভালো লাগলো পড়ে। অভিবাদন জানবেন।

Friends

Skip to toolbar