Profile Photo

Pritam BiswasOffline

  • Pritam-Biswas
  • Profile picture of Pritam Biswas

    Pritam Biswas

    1 year, 8 months ago

    অসমাপ্ত
    প্রীতম বিশ্বাস

    লিখন তখন মাত্র ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েছে। ছোট্ট শহরের ছেলেটি, সবসময়ই চুপচাপ, নিজের পড়াশোনা আর বই নিয়ে ব্যস্ত। প্রেম-ভালোবাসা তার জীবনে তখনো ছোঁয়া দেয়নি। কিন্তু একদিন, পত্রিকার পাতায় চোখ বোলাতে গিয়ে হঠাৎ একটি ছবি তার মনকে নাড়িয়ে দেয়। ছবিতে ছিলো এক মেয়ে, যার চোখে গভীরতা, মুখে একরকম মিষ্টি বিষণ্ণতা— সেই ছবি যেন লিখনের মনের কোথাও গভীরে গেঁথে যায়।

    মেয়েটির নাম ছিল রিয়া। লিখনের মন বারবার সেই মুখটাকে কল্পনায় আঁকতে লাগল। সে জানত না কেন, কিন্তু মনে হলো, এ মেয়েটি যেন তার জীবনের একটা অংশ হয়ে উঠেছে।

    সময় চলে গেল, আর লিখন জীবনের নিয়মিত পথে ফিরে এল। একদিন, কলেজের বায়োলজি ক্লাসে গিয়ে হঠাৎ তার দৃষ্টিতে সেই মেয়েটি আবার ধরা দিল। সেই একই মায়াবী চোখ, সেই বিষণ্ণ মুখ, বাস্তবে তার সামনে দাঁড়িয়ে। লিখনের বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। কিছুতেই তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। এই মেয়েটি কি সত্যি তার সামনে দাঁড়িয়ে, নাকি তার কল্পনার অংশ?

    ক্লাস শেষে, হঠাৎই মেয়েটি তার দিকে এগিয়ে আসে। “তুমি লিখন, তাই না?” মেয়েটি হেসে বলে।

    লিখন কিছুটা অবাক হয়। “হ্যাঁ, কিন্তু তুমি আমার নাম জানলে কীভাবে?”

    রিয়া হালকা হেসে বলে, “আমি দেখেছি তোমাকে অনেকদিন ধরে। তুমি বেশ শান্ত আর ভদ্র, তাই না?”

    লিখন একটু অপ্রস্তুতভাবে হেসে বলে, “হ্যাঁ, হয়তো তাই। কিন্তু তোমার নাম কী?”

    “আমার নাম রিয়া।”

    লিখনের মনে এক ঝড় বয়ে যায়। তার পত্রিকার পাতায় দেখা সেই রিয়া! ভাগ্য কি এমনভাবে কাউকে সামনে এনে দাঁড় করাতে পারে? তাদের কথাবার্তা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ফোন নম্বর দেওয়া-নেওয়া হয়, এবং এর পরের দিনগুলোতে ফোনের কথোপকথনে জমে ওঠে এক মিষ্টি বন্ধুত্ব।

    একদিন, রিয়া ফোন করে বলল, “লিখন, আমাদের মধ্যে একটা হেলদি রিলেশন গড়ে উঠতে পারে না?”

    লিখন বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। “তুমি সত্যি এটা বললে?”

    “হ্যাঁ, লিখন। আমি তোমাকে পছন্দ করি। তুমি খুব আলাদা। আমরা কি একসঙ্গে থাকতে পারি না?” রিয়ার কণ্ঠে ছিল গভীর আন্তরিকতা।

    লিখন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার মনে হাজারো প্রশ্ন ঘুরতে থাকে, কিন্তু মনের গভীরে সে জানত, রিয়াকে সে ভালোবেসেছে। “আমি রাজি,” লিখন মৃদু স্বরে বলে।

    সেই মুহূর্ত থেকে, তাদের সম্পর্কটা যেন এক নতুন মোড় নিল। মুঠোফোনের প্রতিটি কথোপকথন, প্রতিটি হাসি-মজা যেন তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এলো। লিখনের মনে হলো, জীবনের সবটুকু সুখ যেন সে পেয়েছে।

    কিন্তু সুখ সবসময় স্থায়ী হয় না। লিখনের ঠাকুমা হঠাৎ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন, আর তার পরিবারের ওপর নেমে আসে কঠিন বিপর্যয়। পরিবারকে সামলাতে গিয়ে লিখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়, মন ভারী হয়ে থাকে সবসময়।

    একদিন, লিখন গভীর ক্লান্তি নিয়ে রিয়াকে ফোন করে, “রিয়া, আমি খুব খারাপ অবস্থায় আছি। সবকিছু ভেঙে যাচ্ছে। ঠাকুমা অসুস্থ, পরিবারের চাপ… আমি আর পারছি না।”

    রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর বলে, “লিখন, তুমি নিজের যত্ন নাও। আমি জানি তুমি অনেক সমস্যার মধ্যে আছো, কিন্তু… আমাদের সম্পর্কটা আগের মতো থাকবে তো?”

    লিখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “হ্যাঁ, থাকবে। তুমি আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, রিয়া।”

    কিন্তু দিন দিন লিখন আরও মানসিকভাবে অসুস্থ হতে থাকে। সে আর আগের মতো সময় দিতে পারছিল না। রিয়া ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। একদিন লিখন যখন কিছুটা সুস্থ হয়, সে ফোন করে রিয়াকে। অনেকদিন পর রিয়ার কণ্ঠ শুনে লিখনের মনে আনন্দ হয়।

    “রিয়া, আমি অনেক ভালোবেসেছি তোমাকে। আমি ফিরে এসেছি। এখন আমরা আগের মতোই থাকতে পারব, তাই না?”

    রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে ধীরে বলে, “লিখন, আমি… আমি অন্য কাউকে ভালোবাসতে শুরু করেছি।”

    লিখন শ্বাস বন্ধ করে শোনে। “তুমি কী বলছো, রিয়া? এতদিনের সম্পর্ক, সব শেষ?”

    “আমি দুঃখিত, লিখন। কিন্তু আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করতে পারিনি। আমারও জীবন আছে, আর আমি আর আগের মতো অনুভব করছি না।”

    লিখনের পৃথিবী যেন থমকে যায়। তার চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসে। ফোনের ওপারে রিয়া আর কিছু বলে না, ফোন কেটে যায়।

    পনেরো বছর কেটে গেছে। রিয়া এখন তার নতুন ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করেছে। লিখনও বিয়ে করেছে, তারও সংসার হয়েছে। কিন্তু আজও রিয়ার সেই হাসি, সেই কথাবার্তা তার মনের এক কোণে বাসা বেঁধে আছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই রিয়ার কথা তার মনে পড়ে। নিজের স্ত্রীকে সে ভালোবাসে, তবে সে জানে, তার জীবনের এক অংশ চিরকাল রিয়ার জন্য রয়ে গেছে।

    একদিন, তার স্ত্রী লিখনের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, লিখন? তোমার চোখে সবসময় একটা শূন্যতা দেখি।”

    লিখন স্তব্ধ হয়ে যায়। তার স্ত্রী সঠিকটাই বলেছে। সে সত্যিই রিয়াকে আজও ভুলতে পারেনি। পনেরো বছর পরেও রিয়ার স্মৃতি যেন তার মনের এক কোণে চিরকালীন হয়ে আছে।

    লিখন নিজের ডায়েরির পাতায় লিখে, “ভালোবাসা শেষ হয়ে যায় না, শুধু হারিয়ে যায়। কিন্তু ভালোবাসার স্মৃতিগুলো থেকে যায়, এক অমরতার মতো। রিয়া, তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো। আমি হয়তো তোমার স্মৃতির মধ্যেই বেঁচে আছি।”

Skip to toolbar