Profile Photo

Pritam BiswasOffline

  • Pritam-Biswas
  • Profile picture of Pritam Biswas

    Pritam Biswas

    1 year, 7 months ago

    রাত বারোটা বাজে। ঘরে টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলো ছড়িয়ে আছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে দেখা যায়, বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শহরের নীরবতার মধ্যে ছন্দ তৈরি করেছে। এই সময়টাতেই প্রীতম ভাবতে বসে। গত কয়েকদিন ধরে কিছু একটা তাকে পেয়ে বসেছে, একটা অদ্ভুত অনুভূতি। আজকাল ইদানীং প্রায়ই কোনো কারণ ছাড়াই তার বুকের মধ্যে ধকধক শব্দ হয়। হঠাৎ হঠাৎ কেমন একটা অনুভূতি হয়, যেন কিছু খুঁজে পাওয়ার পথে হাঁটছে, কিন্তু সেটা কী, তা নিজেই জানে না।

    আজ রাতে, অনেকক্ষণ পর তার মোবাইলে একটা মেসেজ এল। নীলার মেসেজ। ছোট্ট, এক লাইনের। “তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে, প্রীতম।” এটাই মেসেজ।

    প্রীতম মেসেজটা দেখে কিছুক্ষণ থমকে রইল। এতো সহজ একটা মেসেজ, তবু এর ভেতর যেন অনেক গভীর কিছু লুকানো আছে। নীলাকে সে চিনত কলেজের প্রথম দিন থেকে। দু’জনের আলাপ বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছিল সহজেই। নীলা ছিল সবসময় হাসিখুশি, প্রাণবন্ত, আর খুবই কৌতূহলী। প্রীতম তার পাশে সবসময় একটু নীরব থাকত। তবুও, নীলার সাথে তার একটা আলাদা বোঝাপড়া ছিল—কথায় নয়, মনে। নীলা যখন কোনো হাসির গল্প বলত, প্রীতম দেখত তার চোখের ভেতর একধরনের অদ্ভুত বিষণ্ণতা, যা সে সবসময় লুকানোর চেষ্টা করত।

    গত কয়েক মাস ধরে তারা দু’জনই ব্যস্ত। ঠিক কথা বলার সময় পায়নি। অথচ আজ নীলা মেসেজ পাঠিয়েছে। প্রীতমের ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। সে মেসেজটা আবার পড়ল, খুব ধীরে। যেন শব্দগুলো ধীরে ধীরে তার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। “তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে, প্রীতম।” এত অল্প কথায় এতো গভীর কিছু বলার ক্ষমতা নীলার ছিল।

    প্রীতম তার মোবাইল হাতে নিয়ে ভাবল, “কী বলব? আমি কি সত্যিই তার সাথে কথা বলতে চাই?” সে জানে, নীলার সাথে কথা বললেই সে হারিয়ে যাবে। নীলার কণ্ঠস্বর, তার কথাবার্তা—সবকিছু কেমন যেন মায়ার মতো ঘিরে ধরে প্রীতমকে। কিন্তু সে জানে, তাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেয়াল আছে। তাদের বন্ধুত্বের মধ্যে ভালোবাসার একটা সূক্ষ্ম আভাস ছিল, কিন্তু সেটা নিয়ে কেউই কিছু বলেনি। দু’জনই বুঝে নিয়েছিল, এই সম্পর্ক হয়তো বন্ধুত্বের গণ্ডি পেরোতে পারবে না।

    প্রীতম জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু বৃষ্টির গন্ধ এখনো বাতাসে। হঠাৎ করেই প্রীতম সিদ্ধান্ত নিল, সে নীলার সাথে কথা বলবে। মনের মধ্যে যা আছে, সব খুলে বলবে। অনেক দিন ধরে তার ভেতরে যা জমে আছে, সেটা প্রকাশ করবে।

    প্রীতম মোবাইলটা হাতে নিল। টাইপ করল, “নীলা, তুমি কি এখনও জেগে আছো?”

    সেন্ড করার পর অপেক্ষা। কিছুক্ষণের মধ্যেই রিপ্লাই এলো, “হ্যাঁ, জেগে আছি।”

    প্রীতম একটু থেমে গেল। তারপর টাইপ করল, “নীলা, তুমি জানো, আমি তোমাকে কখনো ঠিকভাবে বলিনি, কিন্তু আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।”

    মেসেজটা সেন্ড করার পর তার বুকটা ধকধক করতে লাগল। সে জানে, এই একটা মেসেজ সবকিছু বদলে দিতে পারে। হয়তো নীলা মেসেজ পড়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকবে। হয়তো কিছু বলবে না। আর যদি কিছু বলে, সেটা কী হবে?

    মিনিট কেটে যাচ্ছে, কিন্তু নীলার কোনো রিপ্লাই আসছে না। প্রীতম যেন এক অসম্ভব প্রতীক্ষার মধ্যে আটকে গেছে। তার ভেতরটা কেমন করে উঠল। এই মুহূর্তটা হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। তার সমস্ত জীবন যেন এক মুহূর্তে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

    অবশেষে, ফোনটা ভাইব্রেট করল। নীলার মেসেজ।

    “প্রীতম, আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি। কিন্তু আমাদের জীবনের পথটা হয়তো এক হবে না। কিছু অনুভূতি আছে, যা আমরা কেবল অনুভব করি, কিন্তু সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া হয়তো সম্ভব নয়। আমি জানি না আমাদের ভবিষ্যৎ কী, কিন্তু এতটুকু জানি, তুমি আমার জীবনের একটা অংশ হয়ে থাকবে, সবসময়।”

    প্রীতম মেসেজটা পড়ে চুপচাপ বসে রইল। তার ভেতরটা কেমন করে উঠল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সে শান্ত অনুভব করল। হয়তো ভালোবাসা সবসময় প্রাপ্তির মধ্যেই নয়, কখনো কখনো সেটা নিঃশব্দে মেনে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত।

    প্রীতম জানালা খুলে বাইরে তাকাল। আকাশে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে কিছু তারা দেখা যাচ্ছে। হয়তো ভালোবাসাও অনেকটা তারাদের মতো—সবসময় দেখা যায় না, কিন্তু ঠিকই থাকে, আমাদের অজান্তে।

Skip to toolbar