-
মানুষের জীবনে এমন অনেক সময় আসে যখন আমরা যে জিনিসটা বেছে নেই দেখা যায় ওটা বেশি দিন স্থায়ী হয় না আবার হুট করে আমরা যেটা করে ফেলি দেখা যায় ওটা আমাদের জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
পায়েলের বেলায় ও ব্যপারটা কিছুটা এমন হলো –
প্রতিদিন এর মত সেদিন ও মোবাইলের নোটিফিকেশন থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গুলো ডিলিট করছিল সে ,তখনই আরেকটি রিকোয়েস্ট নোটীফীকেশন এলো, প্রোফাইল টা দেখেই একসেপ্ট করে ফেলল, কে কী কোথায় থাকে কিছু ই না জেনে।
****
পায়েলেরা মধ্যেবিত্ত পরিবার, বাংলাদেশের আর দশটা মুসলিম পরিবারের মতই ।তার বাবা বেঁচে নেই।চার সন্তান নিয়ে স্বামীর ভিটায় থাকেন বেগম পারুল।
বড় ছেলে তারেক ছোট খাট চাকরির পাশাপাশি মসজিদে দুই ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি করেন। বড় মেয়ে ডাগর চোখের ইলমা,তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয় পাখি উড়ছে।
শ্যামলা বর্ণের হলেও তার বংশের এমন কেউ নেই যে ইলমা-র প্রশংসা করেনি, তাদের মতে ইলমা-র মত মায়াবী চেহারা এই বংশের আর একটিও নেই।
বাবার নেওটা ছিল বললে ভুল হবে বরং বলা ভালো -বাবা ইলমার নেওটা ছিল। যেমন -ছোট বেলায় মক্তবে যাওয়ার সময় খুব কম ই সে যেতে পারতো, সে তখনই যেতো যখন তার ভালো লাগতো,বলা বাহুল্য, তার এই ভালো-লাগাটা সপ্তাহে খুব কম ই আসতো।
তারপর যখন নূরানী মাদ্রাসায় ভর্তি হলো ওখানে শুরু হল আরেক অধ্যায়।
প্রতিদিন যেখানে নিজেরা তৈরি হয়ে যাবে তা না, বরং ভ্যান চালক ই প্রতিদিন আল্লার দেয়া গলায় যত টুকু পারতো উচ্চ গলায় ডেকে তাদের ঘুম ভাঙতে হতো।
বেচারা তো একবার নালীশ পর্যন্ত করেছে তাদের ক্লাস টিচার এর কাছে।
তখন থেকে চালু হলো নতুন নিয়ম, তিন বার থেমে থেমে বাঁশী বাজাবে, যদি না আসে তাহলে কোচ ফিরে যাবে।
প্রথম কিছুদিন ঠিক মতোই ছিল, পরে আবার যার যার অবস্থানে চলে আসল যেমন টা আগেই জানেন।
এত কিছুর পরও ভ্যান চালক ওদের ভালোবাসাতো, তার কারণ ও আছে।
একদিন ভ্যান চালক এর গায়ের সেনটো গেঞ্জি ছেঁড়া দেখে সাথে সাথে বাবার সামনে এসে হাজির,রাগে দুঃখে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো -কোন কচুর টাকা দাও তুমি, ভ্যান মামার গেঞ্জি ছেঁড়া দেখনা, একশো টাকা দাও তাড়াতাড়ি।
মেয়েটার হাত থেকে বাঁচতে তাড়াতাড়ি টাকা দিয়ে দিলেন তিনি।
সঙ্গে সঙ্গে ছুটলো সে ভ্যান মামার কাছে, গিয়ে মায়াবী কন্ঠে বলল -নেন মামা একটা গেঞ্জি কিনবেন।
শুধু তাই নয় একদিন তো এক ফকিরের কাঁধে হাত রেখে মোবাইল এ কার্টুন ই দেখাতে বসিয়ে দিল , তার বাবা মেয়ের কান্ড দেখে বেগম কে দেখিয়ে বললো -তোমার মেয়ের কান্ড দেখছ!
কি আর করা দুজন ই ঠোঁট চেপে হাসলো।
ঘরে ফকিরনী এলে বেগম আবার ভাত একটু বাড়িয়ে দিতেন কারণ তার ঘরের বাচ্চারা আবার সারাদিন না খেয়ে থাকলেও ফকিরের সাথে ঠিকই খেতে বসে যাবে, বাবার প্রতিবাদ সত্যেও বেগমের এক কথা-মেয়দের পেট ভরলেই হলো। এবার বাবা আর কি বলবে -বাচচা মেয়ের সাথেই পারেন না তাদের মায়ের সাথে কিভাবে পেরে উঠবে।
এইতো হল তাদের বড় মেয়ের অবস্থা । এবার আসি গল্পের নায়িকা পায়েল এর কাছে, বড় বোনের মত এতটাও পাগল না সে আবার পুরোপুরি সহজ ও না। ভেঙেই বলি বড় বোনের মত হয়ত গরীবের জন্য পথেই বসে পড়বে না কিন্তু মা কাজের লোকদের বকাঝকা করার সময় উল্টো তাদের ই সাফাই গাইবে সে,হয়ত তাদের দোষ অতটাও না মা যতটা বকছেন, তখন তো বকাঝকা ফেলে মা বেগমের আসল কাজ হয়ে যায় মেয়ের রাগ ভাঙাতে।
এক শীতের দিনে ঢাকা থেকে খালামনিরা পায়েলের জন্য দু- সেট চমৎকার জামা পাঠালেন। একটা বান্ধবীকে দিয়ে আরেকটি নিজে রাখলো, সে দিন এক গরীব আত্মীয় এসে ছিলেন কি এক কাজে, ঠান্ডায় যিনি কাঁপছিলেন, এটা দেখে বসে থাকার পাত্রী তো সে নয়, সাথে সাথে গায়ের থেকে খুলে জামাটা দিয়ে দিল মহিলা কে,মা বেগম যার কিছুই জানেন না,এমন নয় যে তিনি কনজুস স্বভাবের,তবে মেয়েরা থামবে কেন।
আর রইল পরিবারের কনিষ্ঠ পুত্র তালহা,তার কথা তেমন বলার কিছু নেই, তবে বাবার চোখের মণি যে ছিল তা বলাই বাহুল্য, তার থেকেও বেশি, সেই ছিল বাবার আসল নেওয়া।
এমন একটি হাসিখুশি পরিবার হঠাৎ করে মিইয়ে গেল, যখন চলে গেলেন তাদের বাবা।
বড় মেয়েটা তো মানুষিক ভাবেই অসুস্থ হয়ে পড়লো,
পায়েলের বাবার কথা মনে আসলেই বাবার বলা একটি কথা তার বেশি মনে পড়ে –
তখন বাবা খুবই অসুস্থ ছিলেন কিন্তু বাচ্চাদের এটি বুঝতে দেয়নি,
রান্নাঘরে গুঁড়োদুধ চুরি করতে গিয়েছিল সে,
বাবা আসলেন, মেয়েকে প্রশ্ন করলেন –
-মা তুমি কোরআন কতটুকু পড়?
-এই ত এক পারা করে বা আধা পারা করে।
বাবা তখন তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন -মারে তোর উপর ই আমার ভরসা।
সেদিন কথাটার মানে বোঝো নাই পায়েলে,
আজ বুঝতে পারছে।
বাবা যেদিন মারা যায়, সেদিন বাসায় ছিল না সে,নানার বাড়িতে ছিল।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মামার সাথে ফিরে এসেছে। কাঁদতে সে পারে নাই, কারণ তার মনেই হচ্ছীলনা তার বাবা আর নেই,তার বোন প্রতিবেশীনিদের সাথে বসে বসে কাঁদছিল,এত মানুষের ভিড়ে তার ছোট ভাই কোথায় ছিল তার মনে নেই,বড় ভাই তাবলীগ জামাতের সাথে ছিলেন ।সেই কাঁদা এখন পায়েল রোজ কাঁদে।তার ছোট ভাইকে একদিন কেউ জিজ্ঞেস করেছিল, বেটা কেমন আছ।
সে বলেছিল , মামা আমার তো জীবন টাই নষ্ট হয়ে গেছে।ওই লোকটা হয়ত কথা কার গুরুত্ব বোঝেনি, দূর থেকে এটি শুনে ডুকরে কেঁদেছিল পায়েল।
চলবে..4 Comments
Friends
Md. Mijanur Rahman Chowdhury
@md-mijanurrahmanchowdhury
mdjibonahmmed Sagor
@mdjibonahmmedsagor
Taufiq al sadif
@483-taufiq-al-sadif-roll-483
prantik aronno
@prantikaronno
মোঃ ইফতেখার আহমেদ তাজিম
@tazim
N Hakim
@nhakim
Rabbi
@rabbi1
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
Atiq Altaf
@atiqaltaf


এক বুক চাপা হাহাকার আর মধ্যবিত্তের চেনা নস্টালজিয়ার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। দারুণ লেখনী!