Profile Photo

MD. SAFFAT HOSSAINOffline

  • Saffat
  • Profile picture of MD. SAFFAT HOSSAIN

    MD. SAFFAT HOSSAIN

    2 years, 6 months ago

    ভালো থেকো পরিণীতা
    —————————
    নয় ঘণ্টা বাস জার্নি করে যখন পাড়ার মোড়ের বাসস্ট্যান্ডে নামলাম, তখন ভোর ৫টা। শীতের সকাল, লোকজনের চলাচল নেই। গত দশবছরে পাড়ার অবস্থা খুব একটা পরিবর্তন হয়নি, শুধু বাড়ি গুলোকে বার্দ্ধক্য স্পর্শ করেছে বলা যায়।

    খুব সন্তর্পণে এগিয়ে গেলাম কালনী নদীর ধারে। স্রোত এখন অনেকটাই কম। শীর্ণ ঘাস আর পাতা ঝড়া গাছ শীতের রুক্ষতার জানান দিচ্ছে। হঠাৎ নাকে এলো চিরচেনা একটা মিষ্টি গন্ধ। সত্যিই তো, এটা তো চামেলি ফুলের গন্ধ, এখানে এলো কীভাবে! ভাবতে ভাবতে বসে পড়লাম বাধানো ঘাটে। মনে হলো, গন্ধটা আমার কাধে মাথা রেখেছে। সে এসেছে! আমি আর উঠে দাঁড়াই নি, দশবছর আগেও এমন ভোর আমাদেরও ছিল।

    পরিণীতা চলে গেছে প্রায় দশবছর হয়ে গেলো, আমিও ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম অন্য এক শহরে। কিন্তু এতগুলো দিন পরও সে তার উপস্থিতি আমাকে উপলব্ধি করিয়ে দিলো। তার চুলের বাধা চামেলি ফুলের গন্ধ আর শীতের কুয়াশা স্মৃতির প্রতিটি পাতা ঝাপসা করে ভাসিয়ে তুললো আবার।

    ভালো থেকো পরিণীতা।

    ★ ২

    রোদের তীব্রতা বাড়তেই লোকজনের আনাগোনা শুরু হলো। কালনী নদীও তার ঘুম ভেঙে নৌকো বয়ে নিতে শুরু করছে। আমার চোখের ঝাপসা স্মৃতি, চামেলি ফুলের গন্ধ বিলীন হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

    সকাল ৭টা বাজে।

    ধীরে ধীরে বাড়ির পথে রওনা দিলাম।
    পথে একটা জায়গায় এসে থামতে হলো। একটা বারান্দা, যেখানে পরিণীতা দাঁড়িয়ে থাকতো তার ফুলগুলোর সাথে। আজ সেখানে সে নেই। অযত্নে পড়ে আছে ফুলের টব গুলো। উঠোন জুড়ে পসার জমিয়েছে নাম না জানা লতা-গুল্ম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে যেতে থাকলাম বহু পুরোনো নিজের বাড়ির দিকে।

    বাড়ির সামনে আসতেই দেখলাম বাড়ি ভর্তি লোকজন। বুঝতে পারলাম ছোট ভাই’ টার বিয়ে। হঠাৎ একজন এসে জিজ্ঞেস করলো,
    – আপনি কি ক্যাটারার এর লোক?
    – না, আমি…. বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। সামনে দেখি বাবা দাঁড়িয়ে। একটা ইশারা দিতেই লোকটি চলে গেলো। বাবা বললেন,
    – কী? এত বছর পর কি মনে করে?
    আমি চুপ করে কথা টা শুনলাম। কষ্ট হলেও সোজা চলে গেলাম নিজের পুরোনো ঘরটায়। সারা বাড়ি ভর্তি লোকজন যার মধ্যে নিজেকেই অপরিচিত মনে হলো। তাই একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।

    ঘুম যখন ভাঙলো, তখন বেলা ১২টা। লোকে লোকারণ্য, বরযাত্রী বেরিয়ে পরবে এখনই। আমি সামনে যেতেই মা ছুটে এলেন। আমাকে ছুঁয়ে দেখার পরিবর্তে বললেন,
    – তুই ঘরে থাক। লোকে দেখলে নানান কথা উঠবে।
    – ঠিক আছে মা।
    চলে এলাম। দশবছর নিরুদ্দেশ থাকার পর এসে সন্তানের অধিকার চাওয়া টা বোকামো বলা যায়।

    বরযাত্রী বের হলো বেলা ১টায়। আমি ছোট ব্যাগ টা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম রাস্তায়। এই বাড়ি আমার নয়, আমি এখানে নিতান্তই অপরিচিত, অযাচিত।

    ★ ৩

    গতরাতে অল্প কিছু খেয়ে বাসে উঠেছিলাম। বহুদিন পর বাড়ি যাচ্ছি, মনের ভেতর আনন্দ আর শঙ্কা একসাথে কাজ করছিলো। মাঝপথে দু’একটা হাইওয়ে হোটেলে বাস থামলেও আলসেমিতে নামিনি।
    এখন বেলা প্রায় দেড়টা। খাবার জুটেনি কোথাও আর। তাই বাধ্য হতেই পাড়ার ভাতের হোটেলের দিকে গেলাম। হোটেলের সামনেই দেখা হলো বন্ধু সবুজের সাথে। দেখা হতেই বললো,
    – কী রে সুমন, এতদিন পর এলি?
    – হ্যাঁ। আজই এলাম।
    – তা এখানে হোটেলে কেনো?
    – কিছু খেতে এলাম।
    – সে কী! আজ না তোর ভাইয়ের বিয়ে?
    একটু দমে গেলাম। আজ তো আমার নেমন্তন্ন বাড়িতে থাকার কথা। তাই কোনো উত্তর দিতে পারিনি। চুপ করে চলে এলাম খেয়া ঘাটের সান বাধানো বুড়ো বটতলায়।
    এই বটতলা টা আমার খুব পছন্দের ছিল। পরিণীতা বকুল ফুল নিয়ে এসে বসতো, তারপর মালা গেঁথে নিজের খোপায় পড়তো আবার আমার হাতেও একটু বেঁধে দিতো। গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে ভাবছিলাম তাঁরই কথা।

    ★ ৪

    দশ বছর আগের কথা।
    তখন আমাদের প্রেমের বসন্ত চলছে। হঠাৎ কাল বৈশাখি শুরু হলো। পরিণীতার বিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করছে তার বাবা-মা। এদিকে আমরা দুজন দুজনকে এতটাই ভালোবাসি যে আলাদা থাকার কথা ভাবতেই পারছি না। একদিন পরিণীতার বাবা তাকে বললে,
    – শোন মেয়ে, যদি তুই আমার পছন্দ করা ছেলে কে বিয়ে না করিস, তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি।
    – কিন্তু বাবা আমি যে সুমনকে ভালোবাসি।
    – রাখ তোর ভালোবাসা। অমন ভালোবাসা আমি অনেক দেখেছি। বেকার ছেলে, কাজ কর্মের বালাই নেই।
    পরিণীতা চুপ করে শুনলো। তখন সত্যিই আমি বেকার ছিলাম। কয়েকটা চাকরির পরীক্ষাও দিয়েছিলাম। যে কয়টার রেজাল্ট দিয়েছে তাতে নাম আসেনি, পরিণীতাও তা জানতো।
    একদিন সন্ধ্যায় এই বটতলায় এসে আমার সাথে দেখা করে সে। বলে,
    – সুমন, আমাদের ভালোবাসা রবীন্দ্রনাথ এর একটা ছোট গল্প হয়ে থাকবে। শেষ হয়েও হবে না শেষ।
    – মানে? কী সব বলছো এসব
    – ও কিছু না। দেখো, আকাশ টা কেমন লাল হয়ে আছে।
    দুজন মিলে সন্ধ্যে টা একসাথে কাটিয়ে যার যার বাড়ি ফিরলাম।
    পরদিন সকালে শুনলাম, পরিণীতা আর নেই। মারা গেছে। আমি দেখতে যেতে চেয়েও পারিনি। কারণ ওর বাবা মা আমাকেই সন্দেহ করতো। কিন্তু প্রমাণ না থাকায় কিছু করতে পরেনি।
    আমি চলে আসি পাড়া থেকে। ঠিক তারপর দিনই সিভিল সার্ভিস এর রেজাল্ট বের হয়, আমার নাম সেখানে সুপারিশ করা হয়েছে।
    যদি আর একটু সময় দিতো পরিণীতা আর তার পরিবার……

    ★ ৫

    মশার কামড়ে ঘুম ভাঙলো। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। জোছনা দেখা যাচ্ছে। ঘাটের সব কাজ গুছিয়ে মাঝি জেলে রা চলে গেছে। মনে হচ্ছিলো যেন পুরো এলাকা ঘুমিয়ে পড়েছে।
    হঠাৎ চামেলি ফুলের গন্ধ ! তাহলে কি পরিণীতা এসেছে আমার সামনে?
    সামনে তাকিয়ে দেখি, সে হাওয়ার ভাসছে একটা স্নিগ্ধ হাসিমাখা মুখ নিয়ে।
    – সুমন, আমরা আবার এক হচ্ছি।
    – কীভাবে?
    – তোমার পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখো।
    আমি দেখার জন্য উঠতে গিয়েও পারছিলাম না দুর্বলতার কারণে। বহু কষ্টে উঠে দেখি, ওটা মশার কামড় নয়। জোছনার আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দুটো দাগ, মানে সাপের কামড়।
    সাথে সাথে সামনে তাকালাম, দেখি পরিণীতা হাত বাড়িয়ে আছে।
    আমি বহু চেষ্টা করেও ছুতে পারছিলাম না। অনেক চেষ্টা করার পর হঠাৎ যেন খুব সহজেই পারলাম। শরীর টা হালকা হয়ে গেছে। পরিণীতা আমার হাত ধরে সামনে নিয়ে যেতে লাগলো, বকুলতলার দিকে।
    – কোথায় যাচ্ছি আমরা?
    – সুখের খোঁজে।
    – ব্যাগ টা নিই?
    – ওটা তোমার নিথর শরীরের পাশেই আছে। কিন্তু আর লাগবে না সেটা।
    দেখি বটতলায় আমার নিথর নীল দেহ টা পড়ে আছে। আমার আর দুঃখ নেই।
    হাওয়ার ভাসতে ভাসতে পূর্ণতা পেলো ভালোবাসা আর আমার পরিণীতা। ছোট গল্প এক অসমাপ্ত আখ্যানের পথে রওনা দিলো।

    1
    1 Comment
    • দারুণ হয়েছে! পড়তে ভালো লাগলো সাহে মনে একটা কষ্ট-কষ্ট অনুভূতি।

Skip to toolbar