-
#থ্রিলার
-ভাই আপনি কি করেন?
-আমি হইলাম গিয়া মর্গের লাশের পাহারাদার। মানুষ যারে ডোম কয় আরকি।
কথাটা বলেই সৌরভকে ডিঙিয়ে ট্রেনের জানালা দিয়ে পানের পিক ফেলে এক গাল হাসলো লোকটি।
শেষ অব্ধি কিনা এক ডোমের সাথে সারারাত ট্রেনে কাটাতে হবে। ভাবতেই সৌরভের গা শিউরে উঠলো। বাড়ি থেকে ঢাকায় ফিরছে। ট্রেনে উঠেই সিটে গা এলিয়ে দিয়েছিলো। কখন যে চোখ লেগে এসেছিলো তা বুঝতে পারেনি।খানিক বাদেই চটকা কেটে যেতেই আবিষ্কার করলো পাশে বসা অদ্ভুত বেশভুষার লোকটিকে। সৌরভ টের পায় নি লোকটি পাশের সীটে এসে কখন বসেছিলো । লোকটির গায়ে রঙচঙা শার্ট, লুঙ্গি পড়া। উপচে পড়া পানের পিকে লালচে ঠোঁট।গা থেকেও জর্দার গন্ধ বেরুচ্ছে। বয়স আন্দাজে ত্রিশ মতন হবে। এই বেশভুষা বাদ দিলে লোকটির চেহারা খারাপ বলা চলে না। তবে সৌরভের কাছে বিরক্তির ব্যাপার হচ্ছে সেই কখন থেকে লোকটি অনর্গল কথা বলে মাথাটাই ধরিয়ে দিয়েছে।
-ঢাকায় থাকেন কই? করেন কি? দ্যাশের বাড়ী কই?……… ইত্যাদি ইত্যাদি।
সৌরভ যতটা সম্ভব সংক্ষেপে উত্তর দেবারই চেষ্টা করেছে। কিন্তু বিপরীতে নিজ থেকে কেবল একটা প্রশ্নই করেছে ক্ষানিক আগ্রহ নিয়ে । সেটা হলো-
-ভাই আপনি কি করেন?
উত্তরও পেলো যারপরনাই অপ্রত্যাশিত। সে নাকি মর্গের ডোম। লোকটির পেশা শুনে সৌরভ অন্তরে কিঞ্চিৎ আতকে উঠলো বটে তবে বাহিরে তা প্রকাশ করলো না।
– আপনি ডোমের কাজ করেন ! আচ্ছা ভাই রাত্রে লাশ আসলে আপনার ভয় করে না?
– ডর লাগবো ক্যান! আমার তো ভালাই লাগে। জ্যাতা মাইনষের থেইকা মরা মানুষ বহুত ভালা।
প্রাক্টিক্যাল দিক থেকে তিনি ঠিকই বলেছেন। বেঁচে থাকতে এক মানুষ অন্য মানুষকে ঠকায় , ছলনা করে। নানা ভাবে কষ্ট দেয়। এমনকি জীবন নিয়ে নিতেও পিছ পা হয় না। সে তুলনায় মরা মানুষ অনেক নিরাপদ। তবে আধোভৌতিক দিক থেকে ব্যপারটা অন্যরকম।
কিন্তু একজন ডোমের আয়ই বা কতো যে একেবারে ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্টে উঠে বসে আছে। সেক্ষত্রে সৌরভের আয়ও যে অনেক তা কিন্তু নয়। সৌরভ একটা অখ্যাত বেসরকারি ক্লিনিকের রিসিপশনিশট।এই সামান্য চাকরির বেতনে ঢাকা শহরে বাস করে বাড়িতে বাবা -মা ,ছোট বোন দুটোর পড়ার খরচ দিয়ে তার চলে না। তবে ট্রেনে চড়তে গেলে সে সবসময় শোভন সিটের চেয়ে ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্টই বেছে নেয়। মোটামুটি আয়েশি ভ্রমন। কেবল এক্ষেত্রে টাকার মায়া করেনা।
সৌরভের ধ্যান ভাঙলো লোকটির প্রশ্নে,
-“তো ভাইসাব বিয়া টিয়া করসেন নি ? চেহারা তো মাশাল্লা দিলে সেই। “
সৌরভ জানালার পাশের সিটেই বসেছিলো। লোকটির প্রশ্নে তার দৃষ্টি চলন্ত ট্রেনের জানলা পেরিয়ে চলে গেলো অনেক দূরে। সেদিকেই দৃষ্টি রেখে বলল,
-“ বিয়ে একটা করেছিলাম ভাই। প্রতিদিন রাতের আঁধারে তার চেহারাটাই সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমাদের অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ছিলো। মানে সমন্ধ করে বিয়ে। ভেবেছিলাম বিয়ের পর প্রতি মূহূর্তে ভালোবাসার মোহে তাকে বস করতে পারবো। তবে আমি পারিনি। সেই দুঃসাহসিক অভিযানে আমি হেরে গিয়েছি কারো বিপরীতে। তার প্রাক্তন প্রেমিকের বিপরীতে। বিয়ের পর ভাবতাম সে তার চরিত্র অনেক খাম খেয়ালীপনায় ভরা। পরে বুঝলাম আমার দিকে তার কোনো মন ছিলো না।
-ভাই এতো শক্ত কথা বুজি না। একটু ভাইঙ্গা কইবেন?
-বউটাকে ধরে রাখতে পারিনি। সংসারে টাকার অভাব, টানাটানি । একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখলাম সে বাসায় নেই। একটা চিরকুট রেখে চার মাস আগে সংসারে অভাবের দোহাই দিয়ে পুরোনো প্রেমিকের সাথে বিয়ের সব গয়না গাটি নিয়ে পালিয়ে গেছে। একেই নিজের স্ত্রী হারানোর অত দুঃখ তার ওপর আমার ওয়াইফের পরিবার উলটো আমার বিরুদ্ধেই মামলা ঠুকেছে। সন্দেহ করছে যে আমি নাকি আমার ওয়াইফকে মারধর করতাম বলে সে পালিয়ে গেছে। পুলিশও আমার ওয়াইফের মিসিং কেসের অগ্রগতি করতে পারছে না বলে এখন আমার ওপর দোষ চাপাচ্ছে। আজব দুনিয়া।
কেউ সৌরভের বৈবাহিক জীবন নিয়ে প্রশ্ন করলে এই কাহিনীই শুনিয়ে দেয়। বউ পালানো যেনো কমন ফ্যক্টর হয়ে দাড়িয়েছে।
-বুঝি সবই ,দুনিয়ার আর কি দোষ ! আমিও বিয়া একখান করছিলাম। ভাই ট্যাকা না থাকলে সংসারে বউও থাহে না । সবই হইলো গিয়া ট্যাকার বান্দি। তয় আল্লা দিলে আমার অহন ট্যাকার অভাব নাই। পেরাই মাসেই লাখ খানেক ইনকাম অয়।
– কি বলেন ভাই। আপনি সাধারণ লাশঘরের পাহারাদার হয়ে এতো টাকা রোজগার কিভাবে সম্ভব?
-সম্ভব ভাই । ঢাকা শহরে হগগলই সম্ভম। ভাই সব কথা আপনেরে খুল্লাই কই। শোনেন লাশঘরের লাশ কাইট্টা তেমন আয় রোজগার অয় না। তয় আমি এর লগে আরেকটা ব্যবসাও করি।
-কিসের ব্যবসা?
লোকটি সৌরভের পাশের সিটে বসলেও আরো কাছাকাছি চেপে এলো। তারপর আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো। এই কম্পার্টমেন্টে যাত্রী কম । কেউ শোনার সম্ভবনা নেই। তবু এক মৃদু সতর্কতার সাথে ফিসফিসিয়ে বলল,
– কঙ্কালের ব্যবসা।
এবার তো সৌরভের ভিরমি খাবার যোগাড়।
– আরে ভাই ডরাইয়েন না। ভালা ব্যবসা। ডাক্তরী পড়ইননা পোলাপাইনই আমার থেইক্কা কঙ্কাল লইয়া যায়। ভালা দাম দেয়। তয় ইদানিং কাস্টমার কম। যেইসব লাশগুলা বেওয়ারিশ হেইসব লাশ অনেক দিন ধইরা মর্গে পইরা থাহে। কোনো আত্মীয়স্বজন লাশ নিতে আহে না। তো আমি হেই লাশ গুলারেই টার্গেট করি।
-টার্গেট করেন মানে?
– টার্গেট করণ মানে হইলো গিয়া হেইসব লাশের কঙ্কালই বেচি। বেওয়ারিশ লাশের দাফন কাফন করে আঞ্জুমানে মফিদুল টাইপের সংস্থা গুলান।তয় হেরা লাশ কবর দিলে লুকাইয়া লুকাইয়া যাইয়া দেহি হেরা কোনহানে কবে কবর দেয়। কবর দেওনের দুই তিন মাসের মইদ্দে লাশ পুরা পইচ্চা হাড্ডি বাদে কিচ্চু থাহে না। তো হেই কঙ্কালডিই রাইতের আন্দারে তুইলা আইনা বেচি। মাঝে মইদ্দে অবইশ্য অন্য কবর থেইক্কা তুইল্লা আইন্নাও বেচি। ম্যালা কামাই হয়। পুরা কাঁচা টেহার ব্যবসা। হাতে কিসু রাহিনা।
আল্লার দুনিয়াত বাচঁমু আর কয়দিন। তো খাই দাই। ইছছামত খরচা করি।
– আপনার বউ কিছু বলে না? নাকি সে জানে না ব্যপারটা- যে আপনি এই ভাবে টাকা আয় করেন?
-জানবো আর কেমনে? হের কঙ্কাল দিয়াইও তো ব্যবসা করছি।
এবার সৌরভ আর নিজেকে আটঁকে রাখতে পারলো না। গলার স্বর তীক্ষন করেই বলল,
-ধুর মিয়া কি বলছেন যা তা।ইয়ারকি করার আর জায়গা পান না নাকি?
– আরে ভাই চ্যাতেন কিললাইগা? আপনে আমার শালা লাগেন নি। ইয়ারকি করুম ক্যান? আপনেরে দেইখা মনে অইলো আপনেরও ট্যাকার অভাব। ট্যাকার ধান্দায় আছেন। তো হের লাইগাই আপনেরে সব খুইলা কইলাম । আপনেও আমারে কয়ডা কাস্টমার আইন্না দিতে পারেন। হের বদলে আপনেও ট্যাকা পাইবেন আমারও লাভ।সৌরভ উদ্ভ্রান্তের মত তাকালো। যেন দ্বিধায় আছে। লোকটি ওর দ্বিধাদ্বন্দকে পাত্তা না দিয়ে আবার বলতে লাগলো,
– তো ভাই হুনেন কেমনে এই ব্যাবসার শুরু। আমারও ভাই আপনের মতন ট্যাকার মেলা অভাব আসিলো। বউ খালি হারাদিন ক্যান ক্যান করতো । হের এইডা লাগবো হেইডা লাগবো। আমি কইতাম আমার এতো রোজগার পাতি নাই তুই বাসা বাড়িত বান্দির কাম কইরা ট্যাকা কামাইয়া তোর যা লাগে তুই কিন গা। আমার এই রোজগার দিয়া তোর মত রাজরানীরে পালতে পারতাম না। এরুম চিল্লাচিল্লি পেরাই লাইগগা থাকতো। তয় একদিন বেহেন্না বেলাত হে আবার চিল্লাচিল্লি শুরু করলো। মেজাজটা হইলো বেজায় খারাপ । চুলের মুডিত ধইরা গায়ের জোর দিয়া একটা চটকানা দিলাম । এইবার বান্দির ঝি ঠান্ডা অইলো। দেখলাম ভিরমি খাইয়া মাটিত পড়সে। ভালাই হইসে পইরা থাউক। তয় আমি দরজা লাগায়া বাইর হইয়া গেলাম আমার সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিউটি আছে । হেদিন আবার নাইট ডিউটি আসিলো না । সন্ধ্যা বেলাত আইয়া দেহি ঘরের সব যেমন আসিলো এমনি পইরা আছে। আর আমার বৌ বান্দির ঝিও সকাল বেলাত যেমনে পইড়া আসিলো হেমনেই আছে। আমার কইলজা তো পুরা ধরাস কইরা উঠলো। বালা কইরা ধইরা দেখলাম বৌরের শইলডা পুরা ঠান্ডা। কান দিয়ে রক্ত বাইর হইয়া শুকায়া গেসে। বুঝলাম বান্দির ঝি মরসে।
অহন আমি কি করমু? কি করমু…… মাথাত একটা বুদ্দি আইলো । হেতির লাশটা আমাগো বস্তির পিছনের রেললাইনের পাশে মাডি খুইরা চাপা দিয়া দিলাম। বস্তির মইদ্দে ছড়ায়া দিলাম বৌ এক রিশকাঅলার লগে পলায়া গেসে। হগগলেই জানতো আমার লগে হের ডেইলী কাইজ্জা অইতো। বেবাক লোকেই বিশ্বাস করল আমার কথা। পুলিশও আমারে সন্দেহ করলো না। এর কয়েকদিন পরেই এই কঙ্কালের ব্যবসা শুরু করলাম। মজার বিষয় হইলো গিয়া ভাইসাব আমার বউ হারামজাদীর এর কঙ্কালডাই প্রত্থমে বেইচা দিসি। হা……হা……হা…
লোকটির হাসি দেখে সৌরভ এবার নিশ্চিত হলো লোকটি পাগল। এভাবে নিজের খুনোখুনির কথা কাওকে বলে! মোটেও না।
-তয় ভাই সাব মনে অয় আমারে পাগল ভাবতাসেন।
এবার সৌরভের বুকটাও ধরাস করে উঠলো। লোকটি কি তার মন পড়তে পারে কিনা?
– ভাইসাব একটা জিনিস দেহাই তয় আমনে আমারে বিশ্বাস করবেন। এই কথাটি বলে লোকটি নিজের সিটের নিচ থেকে একটা কাপড়ের পুটলি বের করলো।
সেটার বাধন খুলতেই সৌরভের চক্ষু চড়কগাছ। ভেতরে নরকঙ্কাল।
-কি ভাই অহন বিশ্বাস করলেন? এক জায়গা থেইকা চুরি কইরা আনলাম। পুরা টাটকা মাল। বেশি দিন অয় নাই মরসে। একটা নতুন কাস্টমার পাইসি। এইডা হের কাছে বেচুঁম।
কথা বলতে বলতেই পুটলীটি আগের জায়গায় স্থান করে নিলো।
-এতো কথা কইলাম ক্যান জানেন? আপনেরে খুব বিশ্বাসী মানুষ মনে হয়। কামের মানুষও মনে হয়। আপনে হাসপাতালে কাম করেন। যদি আমারে কাস্টমার ধইরা দিতে পারেন তাহলে আপনেও কমিশন পাইবেন।
আর আপনের কাছেও যদি কঙ্কাল থাহে আপনেও আমারে কইবেন। কাস্টমার আইনা দিমু।সৌরভকে এখন উদ্ভ্রান্তের মত লাগছে। সে কি আদৌ স্বপ্ন দেখছে কিনা। কি শুনলো এতোক্ষণ । তবে লোকটির শেষের কথাটাই ওর মাথায় ঘুরছে- “আপনের কাছেও যদি কঙ্কাল থাহে আপনেও আমারে কইবেন। কাস্টমার আইনা দিমু।“ অনেকক্ষণ দুজন যাত্রীর কেউই কোনো কথা বলছে না । হ্যাঁ, অনেক্ষণ। যেন দুজনেই নিরবতার ধ্যানে মগ্ন। তবে একটা সময় সেই ধ্যান ভেঙ্গে দিলো সৌরভের শীতল কন্ঠ।
-ভাই আমার কাছেও একটা কঙ্কাল আছে। আমি ওইটা বিক্রি করবো। কত টাকা পাওয়া যাবে?
লোকটি সৌরভের দিকে লোকটি চোখ পিটপিট করে তাকালো। যেন পুরো যাত্রায় এই প্রথম সৌরভকে দেখছে। এরকম ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ এই তো কেবল সৌরভের আসল রূপ ফুটে বের হতে শুরু করেছে। তবে লোকটি নিজেকে ধাতস্থ করে নিলো। অতঃপর একটি বাঁকা হাসি ছুড়ে দিয়ে বলল,
-দেখলেন ভাইসাব রতনে রতন চেনে। আপনেরে আমার দেইখাই মনে হইসে আপনে এই লাইনের লোক।
আবার খানিক বিরতি দিয়ে বলল,
-কঙ্কালডা আপনের বৌয়ের না?
সৌরভ পুনরায় বিস্মিত হলো। এই লোক এতোকিছু বুঝতে পারে কিভাবে। সে কি মাইন্ড রিডার নাকি?
-আরে ভাই তবদা খাইয়া আছেন ক্যান। আমরা এক গোয়ালেরই গাঁই। শরম পাওনের কিছু নাই। বৌ মারন খারাপ কিসুনা। উলটা বৌ পালা মানে হাতি পালা। অহন কঙ্কাল বেইচা তো আপনে মাত্র চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার ট্যাকার মালিক অইবেন। তয় বৌ নামের মরা ঐ হাতির দামও উটবো না। এর চাইয়া মাইরা ফেলানই ভালা।
একটু থেমে ভুরু নাচিয়ে লোকটি নাটকীয়তার সাথে একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিলো,
-তয় বৌরে মারসিলেন ক্যান ভাইসাব। কইয়া ফালান। আরে আমরা আমরাই তো।সৌরভ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলো।তারপর দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলো-
– আমাদের বিয়ে হয়েছে মাত্র দেড় বছর। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন মাত্র দেড় বছর আগে। কিন্তু নীলিমাকে ভালোবেসেছিলাম বিয়ের প্রথম দেড়মাসেই। খুব সূক্ষ প্রেম। যেটা নীলিমা বুঝেছিলো কিনা জানিনা। ভাবতাম এই ভার্চুয়াল যুগে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের পর ভালোবাসা যায়। অনেকেই তো এভাবে সুখী আছে।অবশ্য এই সূত্র আমার ক্ষেত্রে খাটেনি। নীলিমাকে কতটা ভালোবেসেছিলাম সেটা নীলিমা জানতো না। আর জানবেও না। সারাদিনের পরিশ্রমের পর ওর মুখটাই আমাকে স্বস্তি দিতো। তবে আমি নীলিমাকে আর্থিক ভাবে ভালোবাসতে পারিনি। আমি এক গরীব প্রেমিক । আমার ফ্যামিলিকেও টাকা পাঠাতে হতো। বাবা মা দুটো ছোট বোনের পড়ার খরচ। আমি পারছিলাম না। তবে নীলিমা সাধারণ ঘরের মেয়ে হলেও অনেক উচ্চাকাঙ্খী ছিলো। ওর ও আপনার স্ত্রীর মত এটা চাই ওটা চাই। দামি ফোন চাই। ইত্যাদি। কিনে দিয়েছিলাম বটে দামি এন্ড্রয়েড ফোন । যেটা আমার সংসারকেই পুরোপুরি ধবংস করে দিয়েছে।
-ক্যান কি হইসিলো?
– ওর বড়লোক প্রেমিক জুটে গিয়েছিলো এই ফোন , ইন্টারনেট , ফেসবুকের দৌলতে। প্রথম প্রথম অতটা গুরুত্ব দেই নি।আমি তো সারাদিন কাজেই থাকি বুঝতে পারিনি ব্যাপারটা। কিন্তু মাঝরাতেও মেসেজ আসতো। জিজ্ঞাসা করলেই বলত কলেজের ফ্রেন্ডরা নাকি মেসেজ করে। আমিও ফোন চেক করিনি। অন্ধ ভালোবাসা যাকে বলে। চোখে কালো ঠুলী এটে বসেছিলাম। এরকম অন্ধত্বেরও তো একটা সীমা থাকে। সেই সীমা পেরিয়ে যেতেই আবিষ্কার করলাম নীলিমার সাথে শাহেদ নামে একজনের প্রেমের সম্পর্ক। অবৈধ সম্পর্ক। কিন্তু আমি চুপ ছিলাম। বুঝলাম কেউ কেউ হাত ধরে ধোকা দিয়ে চলে যাবার জন্য। তবে বুঝতে দেই নি যে আমি ওর ইনবক্স মানে মেসেজ চেক করে সবটা জেনে ফেলেছি। ওদের সময় দিচ্ছিলাম এই মেসেজ মেসেজ খেলার হাওয়া ওদের কতদূর নিয়ে যায়। হ্যাঁ, নিয়ে গিয়েছিলো অনেক দূর। যতটা দূর আমার কল্পনাও কখনো পৌঁছাতে পারবে না।
-কতদূর ভাইসাব?
– ওরা ঠিক করে আমি অফিস গেলে এই সুযোগে একদিন পালিয়ে যাবে। আমার ধরা-ছোঁয়া, স্পর্শ , কল্পনা, প্রেম,ভালোবাসা থেকেও বহুদূরে। ঠিক এতোটাই দূর। আমিও ঠিক করলাম ওদের পালে হাওয়া দিয়ে অনেকদূরে পাঠিয়ে দেবো। হ্যাঁ, নীলিমাকে খুন করবো। ওরা পালিয়ে যাবার আগের রাতে ওকে অনেক ভালোবেসে বিদায় দিয়েছি। রাতের আধারে আদিম ভালোবাসা। নীলিমাও শেষবারের মতো আমার সাথে এই শারীরিক ভালোবাসা বেশ উপভোগ করলো। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে যখন শেষ আদর দিচ্ছিলাম তখনই ওর গলাটা চেপে ধরলাম। খুব নরম গলা ওর। আমার ঠোঁট ওর ঠোঁটে আর ওর গলা আমার শক্ত হাতের ভেতর। অনেক ভালোবাসা দিয়ে মারলাম। মরে গেলো। ভাই বিশ্বাস করবেন না তখন না আমার একটা গান মাথায় বাজছিলো। করুন সুরে বাজছিলো। একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত-
‘তোমার খোলা হাওয়া
লাগিয়ে পালে।।
টুকরো করে কাছি আমি
আমি ডুবতে রাজি আছি।
আমি ডুবতে রাজি আছি। ‘
আমি নীলিমাকে মেরেও সুখে থাকতে রাজি ছিলাম। না আমি সুখে নেই। মোটেও সুখে নেই। ওকে অন্তত একবার সুযোগ দেয়া উচিত ছিলো। কিন্তু আমি দেই নি। কারণ বিশ্বাস জিনিসটাই এমন। যে একবার বিশ্বাসে ফাটল ধরায় তাকে আর দ্বিতীয়বার বিশ্বাস করা যায় না। তাই যতই অপরাধবোধ জাগুক নিজেকে বাচাঁবার তাগিদে নীলিমা নিজের পুরোনো প্রেমিকার সাথে পালিয়ে গেছে এসব ভুয়া যুক্তি দেখিয়ে পার পেয়ে গিয়েছি। ওর সেই প্রেমিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে এতদিনে পুলিশও মনে হয় এই কেসের হাল ছেড়ে দিয়েছে। তো শেষমেশ আপনার কথা শুনে চিন্তা করলাম –‘এক গরীব প্রেমিক’ হবার কারণে যে আমায় ছেড়ে যাচ্ছিলো তার থেকেও কিছু নাহয় আয় করি। তাই কঙ্কালটা বিক্রী করবো।
-বহুত দুক্ষের কাহিনী আপনের। তয় ভাই লাশটা কই?
-আমরা যেখানে ভাড়া থাকি সেখান থেকে কিছু দূরেই একটা ডোবা গত বছর বালি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। তার এক জায়গায় বালির নিচে পোতা ।
এখন বলুন আমি কত টাকা পেতে পারি।
-কমলাপুর স্টিশনেই আমার কয়েকজন লোক থাকবো। হেগোর লগে আপনের পরিচয় করাইয়া দিমুনি। হেরা কাস্টমার খুইঁজা দিবো । হেরাই দাম কইয়া দিবো নি আপনেরে। এই আর পাঁচ সাত মিনিটের মইদ্দেই টেরেন স্টিশনে ডুকবো। খাড়ান হেগরে কল দিয়া জানায়া দেই।
লোকটি কাকে যেনো ফোন করে স্টেশনে থাকতে বলল।
-চলেন সব কিছু গুছায়ে নেন। টেরেন অহনই থামবো।
সৌরভও ওভারহেড কম্পার্টমেন্ট থেকে ব্যাগ নামা্তে নামাতেই জিজ্ঞাসা করলো,
-ভাই আপনার নাম নাম্বারটাই তো নিলাম না।
-খাড়ান ট্রেন থাইম্মালোক কইতাসি।
ট্রেন থামতেই কয়েকজন পুলিশ হুড়মুড় করে কামড়ায় ঢুকে পরলো। লোকটি সেদিকে ইংগিত করে বলল,
-ঐ তো আমাগো কাস্টমার আইয়া পড়সে।
সৌরভের শীরদাড়া বেয়ে এক ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো। পুলিশ কিভাবে কাস্টমার হয়। কাপা কাপা গলায় লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলো,
– ভাই আপনি কে?
লোকটি হাসতে হাসতেই উত্তর দিলো। তবে এবার আঞ্চলিক ভাষায় নয়। শুদ্ধ বাংলায়,
– “ভ্রমণ করার সময় কোনো অপরিচিত ব্যাক্তির দেয়া খাবার খাবেন না ও পানীয় পান করবেন না।“ এটা তো সব স্টেশনেই বলা হয়ে থাকে। আপনি আমার দেয়া খাবার না খেলেও আমার দেয়া টোপ পুরোটাই গিলে বসে আছেন। খুন করে একটু চালাক চতুর হতে হয়। ও আমার পরিচয়টাইতো দেয়া হলো না। দূর্ভাগ্যক্রমে আমি কোনো ডোম নই। সেটা হলে আপনার মত গরিব প্রেমিকের জন্য বেশ ভালোই হতো।
-তো…।তো আপনি কে?
সৌরভের কাঁপা কাঁপা কন্ঠের বিপরীতে খানিক হাসলো লোকটি,-আমি ডিবি অফিসার অলক হাসান। আর আপনার স্ত্রী নীলিমা সাদিককে খুন করার অপরাধে আপনাকে আটক করা হলো। এত সহজ কেস পুলিশ হ্যান্ডেল করতে পারেনি বলে প্রথমে আমার হাসি পেয়েছিলো। না পরে বুঝলাম কেসটা জটিল।বেশ জটিল। বর্তমান যুগে এরকম খুনের জন্য অবৈধ প্রনয় কমন ফ্যাক্টর। তাই ছদ্মবেশে আপনার ভ্রমন সঙ্গী হলাম। তবে আপনার কাহিনী শুনে বেশ খারাপ লাগছে। কিছুই করার নেই আমার। আমিও বিবাহিত। ভার্সিটিতে থাকার সময় আমি আর আমার মিসেস পালিয়ে বিয়ে করি । বেকার ছিলাম তখন। এক বেকার প্রেমিকই বলা চলে। টিউশনি করে চলতাম। কিন্তু বিসিএস দেয়ার আগে আমার সারাদিন পড়াশোনা করার জন্য আমার ওয়াইফ জোর করে টিউশনি্গুলো ছাড়িয়ে দেয়। মজার ব্যাপার হলো আমার জন্য সে নিজে তখন টিউশনী করে সংসার চালিয়েছে।
একটা কথা শুনুন কেউ কেউ হাত ধরে সারাজীবন ভালোবাসার জন্য, সারাজীবন রয়ে যাবার জন্য। আমাদের হাত আলাদা হয় না। আর আপনাদের হাত প্রথম থেকেই আলাদা ছিলো। তবে ভুল তো করেই ফেলেছেন । মাশুল গুনতে হবে।
সৌরভের চোখ গড়িয়ে জল পড়ছে। এটা অনুতাপের জল নাকি সে জানেনা। সেদিকে তাকিয়েই অলক হাসান মুখে খানিক সহানুভূতির হাসি ফুটিয়ে বলল,-তো মি. সৌরভ মোহাইমিন এই লং জার্নিতে আপনার সঙ্গী হতে পেরে ভালো লাগলো। পরে আবার দেখা হচ্ছে। আপাদত এই কন্সটেবলরাই আপনার সাময়িক সঙ্গী।
অলক ট্রেনে থেকে সহাস্য মুখে নেমে পড়লো। বুক ভরা স্বস্তির শ্বাস। কারণ এনাদার কেস ইজ সলভড। তার চেয়েও বড় কারণ সে ভুল মানুষকে ভালোবাসেনি। তাকেই ভালোবেসেছে যে জনম জনম ভালোবাসবে। রয়ে যাবে আজন্মকাল।
গল্পঃ কেউ কেউ রয়ে যায়।
-শ্রাবণ।
Friends
নন্দিনী
@nandini-chowdhuri
Md. Habibur Rahman
@habib
Ismail Mozumdar
@ismail-hossain-mozumdar
আওসাফ সাদিক
@awsaaf-sadik
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ] [ জাকের আদিত্য ]
@md-zaker-hayat-khan
শিহাবুল ইসলাম
@shihabul
নিশাত আনজুম
@nishathunzom
মেহাস হালদার
@mehedi-mihi
মারুফ হাসান মাইয়ুফ
@al-maroof-hasan


