Profile Photo

তুলিOffline

  • TulTuli
  • Profile picture of তুলি

    তুলি

    1 year, 10 months ago

    পর্ব ৭
    ~রুম নাম্বার ১২০

    -ম্যাম, আজকে খুব ব্যস্ত রুটিন। একদম শ্বাস নেবার সময় নাই। ৫ টা ওটি আছে। আপনি আসবেন বলে আগে থেকেই সিরিয়াল দেওয়া।

    গড়গড় করে সারাদিনের লিস্ট দিল জুনিয়র ডাক্তার নিরা। তরীর আন্ডারে এম.ফিল করতে এসেছে সে।
    শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে তরী বলে উঠল,
    -শ্বাস নেওয়া নিয়ে মজা করতে নেই নিরা! শ্বাস নেবার কি স্বস্তি তা আমরা ততক্ষণ বুঝিনা যতক্ষণ শ্বাস নিতে পারি!

    সামান্য মজায় এরকম কঠোর কথা কেন শুনতে হল সেই হিসাব করতে যখন ব্যস্ত নিরা তখন পরিস্থিতি বদলাতে তরীর কণ্ঠ শুনতে পেল,
    -ভাবনা ছেড়ে ওটি রেডি করুন আধঘন্টার মধ্যে। আর ৫ জন পেশেন্টের ফাইল আপডেট করে আমাকে দিয়ে যান ১০ মিনিটের মধ্যে। হারি আপ!
    আচমকা আদেশনামা শুনে হকচকিয়ে যায় নিরা! মনের কথাও জানেন কিভাবে ম্যাম!
    -এত ঘাবড়ানোর কিছু নাই। আমি মাইন্ডরিডার নই। সিচুয়েশনের প্রেক্ষিতে প্রেডিক্ট করেছি। যান কাজে যান।
    আর কথা বাড়ানোর সাহস পায়না নিরা। না জানি আর কি কি ভাবছে সব বলে দেয়!
    ‘ইয়েস ম্যাম’ বলে দ্রুত কেটে পড়ে সে।

    এসময় তরী নিজে কতটা কৌতুক করত কথায় কথায়। অথচ এখন কত সিরিয়াস হয়ে গেছে সবকিছুতেই। পরিস্থিতি মানুষকে কত বেশি জটিল করে তোলে!

    -হো হো হো

    চেয়ারে বসে ঘর কাঁপিয়ে হাসছে তিয়াশ। হাসির শব্দে ভাবনার ঘোর কাটে তরীর।
    -রাক্ষসের মত হাসছিস কেন? (তরী)
    -হিসাব মিলছে না যে! (তিয়াশ)
    -কিসের হিসাব? (তরী)
    -কথার জাদুতে তো ভালোই ভড়কে দিলি বেচারী জুনিয়রকে! (তিয়াশ)
    -জুনিয়রকে ভড়কে দেবার অভিপ্রায় আমার নেই তিয়াশ। যেটা সত্যি সেটাই বলেছি কেবল। শ্বাস নেবার যে কতটুকু তৃপ্তি…
    গলা ধরে আসে তরীর। আনমনেই ফিরে যায় সেদিনের বৃষ্টি রাতে। সেদিন বেলীর ফর্সা গাল নীল হয়ে গিয়েছিল। নিস্তেজ হবার আগে কি দারুন আকুলিবিকুলি করেছে একটুখানি শ্বাস নিতে! তরী নিজের চোখে দেখেছে মাথার কাছে বসে। ছোট্ট মেয়েটা ঘটনার আকস্মিকতায় স্ট্যাচু হয়ে গিয়েছিল। কেবল এতটুকু শুনতে পেয়েছিল, বেলী শেষবার তার হাত শক্ত করে ধরে বলেছিল, তুই কিন্তু ডাক্তারিই পড়বি!
    -এই তরী? তরী?
    তিয়াশের ডাকে দ্রুত চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ মুছে নেয় তরী।
    চেয়ার ছেড়ে তরীর সামনে এসে মৃদু গলায় তিয়াশ বলে ওঠে,
    -সবাইকে চুপ করিয়ে রাখা মানুষটার আচমকা নিজে চুপ হয়ে যাওয়া মানায় না রে তরী। তোর এই নীরবতার ভাগ কি আমাকে দেওয়া যায়না? নিজে নিজে গুমড়ে না গিয়ে আমাকেও একটু সুযোগ দে কষ্টের তীব্রতা অনুভব করার?
    (তিয়াশ)

    তিয়াশের এমন ঘোর লাগা কণ্ঠে তরী শিউরে ওঠে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলে ওঠে,
    ক্লাসে যাসনি আজ? (তরী)

    তরীর প্রশ্নে ঘোর কাটে তিয়াশের। কিছুটা লজ্জিত গলায় বলে,
    সরি। (তিয়াশ)

    -ক্লাসে যাসনি কেন? (তরী)
    তিয়াশ মুগ্ধ হয়ে যায়। কেউ এত সুন্দর করে সিচুয়েশন সামলাতে পারে কি করে! এমনভাবে কথা বলছে যেন কিছুই হয়নি!
    তিয়াশের চুপ করে থাকা দেখে তরী আবার বলে ওঠে,
    এমন মৌনতা ধারণ করার মত কিছু হয়নি। বলার হলে কখনও নিজে থেকেই বলবো। এভাবে জানতে চাইতে হবেনা!
    তিয়াশ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না! তরী তাকে বলতে চাইল!
    -কিরে হাবার মত বসে থাকবি নাকি ক্লাস নিতে যাবি?
    আমি ওটিতে যাচ্ছি। তোর হিসাব নিকাষ শেষ হলে রুমে তালা দিয়ে বের হস।

    এটুক বলেই ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল তরী। ওটির সবুজ পোশাকটা যেন তরীর জন্যই তৈরি করা! এটা গায়ে দিলে আর কিছুতে মন থাকেনা তার। এই যে একটু পর পর ভাবনায় ডুব দেওয়া সেটাও যেন রুদ্ধ হয়ে যায় এই পোশাকে। একটা অন্য মানুষ হয়ে যায় সে। পরপর ৩ টা ওটি করে নামাযের বিরতি নিতে রুমে আসে তরী।
    রুম খোলা দেখে কিছুটা অবাকই হয়! তক্ষনি তিয়াশের কথা মনে পড়ে তরীর। তিয়াশ কি তাহলে ক্লাসে যায়নি? দ্রুত পায়ে রুমে ঢোকে তরী।
    টেবিলে মাথা দিয়ে আছে তিয়াশ। তরী কিছুটা অবাক হয়ে বলে উঠল,
    শরীর খারাপ লাগছে তোর?
    না, কোনো সাড়াশব্দ নেই। তরী কিছুটা জোরে ডাক দেয়।
    -তিয়াশ!
    না, কোনো সাড়া নেই।
    এবার কেমন যেন লাগে তরীর। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। আশ্চর্য! ৩ টা ওটি করতেও এতটা নার্ভাস লাগেনি তার। কিসের ভয় পাচ্ছে সে?
    এক পা, দুই পা করে এগিয়ে যেই তিয়াশের কাঁধে হাত দিয়ে ডাকতে যাবে ওমনি তিয়াশ মাথা তুলে তাকাতেই তরী চমকে চিৎকার করে ওঠে।

    একসাথে জয়েন করা এবং একই ডিগ্রী থাকায় তিয়াশ আর তরীর রুম পাশাপাশিই। ক্লাস শেষ করে একটু চোখ বুজে রেস্ট নিচ্ছিল তিয়াশ। তরীর ওটি শেষ হলে একসাথে লাঞ্চে যাবে বলে। কখন যে চোখ লেগে গেছে বুঝতে পারেনি। আচমকা তরীর চিৎকার শুনে ছুটে তরীর রুমে যায় তিয়াশ।
    তরী দুই হাতে মুখ ঢেকে রীতিমত কাঁপছে। তিয়াশ কাছে গিয়ে তরী বলে ডাকতেই আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠে জ্ঞান হারায় সে।
    -কি হয়েছে? তরী! কি হয়েছে তোর?
    চোখেমুখে আতঙ্ক নিয়ে তরীর পালস চেক করতে করতে পানি দিতে বলে নিরাকে। তরীর চিৎকারে নিরাও এসেছিল তিয়াশেন পিছন পিছন। তরীকে জ্ঞান হারাতে দেখে ধরে ফেলে নিরা। তরীর চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিতেই চোখ মেলে তাকায় সে। তিয়াশ আর নিরাকে দেখে পুরা রুমে চোখ বুলায় সে। তরীর মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে তিয়াশ নিরাকে বাইরে যেতে বলে।
    -পানি খা। (তিয়াশ)
    পানির গ্লাসটা এগিয়ে দেয় তরীর দিকে।
    – তুই কোথায় ছিলি এতক্ষণ তিয়াশ? (তরী)
    তরীর শান্ত অথচ ঠান্ডা গলার স্বরে কেঁপে ওঠে তিয়াশ। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
    -আমার রুমে ছিলাম। তোর চিৎকার শুনে এখানে এসে দেখি তুই ভয়ে কাঁপছিস।
    -তিয়াশ (তরী)
    -বল (তিয়াশ)
    -ও এসেছিল। (তরী)
    -কে? (তিয়াশ)
    তরী চুপ করে যায়। সে কি দেখল তখন! তিয়াশ যদি নিজের রুমে থাকে এখানে কে ছিল! তরী যা ভাবছে যদি তাই হয়, তাহলে এতবছর পর কিসের জন্য এসেছে সে? তবে কি তিয়াশকেও…!
    -না! (তরী)
    -কি হয়েছে তরী? বল আমাকে? ভয় পাচ্ছিস কেন? দেখ আমি আছি! (তিয়াশ)
    -তুই চলে যা তিয়াশ। (তরী)
    -কোথায়? (তিয়াশ)

    -আমাকে একটু একা থাকতে দে তিয়াশ। প্লিজ! (তরী)

    কিছু একটা নিয়ে তরী প্রচন্ড ভয় পেয়েছে। যেটা বলতে চাইছে না। কিন্তু তরীর জন্য চিন্তাও হচ্ছে। কি করবে তিয়াশ!
    কি করে জানবে তরীর মনে কি চলছে?

    -পাশের রুমে আছি। আমাকে ডাক দিস দরকার হলে। (তিয়াশ)

    তরীর প্রচন্ড ভয় করছে। বেলী, বাবা-মাকে হারানোর পর সে খুব একা হয়ে পড়েছিল। আয়ানকেও সে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এবার কি তবে তিয়াশকেও!? প্রিয়জনের ভালোর জন্য নাহয় সে আবার একা হয়ে যাবে। কিন্তু তিয়াশ? ওর কোনো ক্ষতি হবেনা ত? অজানা ভয়ে তরীর মন অস্থির হয়ে ওঠে। হঠাৎ ই তার মধ্যে কেউ বলে ওঠে,
    আর কতদিন সব ছেড়ে পালিয়ে বেড়াবি তরী? যে দোষ তুই করিস কি তার জন্য আর কত মাশুল দিবি? কত প্রিয় মানুষদের দূরে সরিয়ে দিবি?

    -তিয়াশ!
    কেবলই রুম থেকে বের হতে যাচ্ছিল সে। তরীর ডাকে ফিরে তাকালে তরী বলে ওঠে,
    আমার শরীরটা খারাপ লাগছে। পরের ২ টা ওটিতে আমাকে এসিস্ট করবি প্লিজ?

    তিয়াশ কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। যে তরী নিজের কষ্টের ভার কাউকে দেয়না, সে আজ তার কাজের ভার দিচ্ছে তিয়াশকে!
    তিয়াশ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়।
    তরী যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। কিছুক্ষণ তো তিয়াশকে চোখে চোখে রাখা যাবে। তিয়াশ তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তরী কিছুতেই তার ক্ষতি হতে দেবেনা ইনশাআল্লাহ। ওটি শেষ করে এই কাহিনীর ইতি টানবে তরী।

Skip to toolbar