-
ছোট গল্প
মাহামুদা খাতুন
বৃষ্টি_বিলাসশ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি সময় চলছে এখন। শ্রাবণ মানেই লাগামছাড়া বৃষ্টি। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে বারি বর্ষণ।কিন্তু বিগত তিনদিন ধরে বৃষ্টির কোন পাত্তাই
নেই।পড়ার টেবিলে মন খারাপ করে বসে আছে যায়িদ। পড়ায় তার একদম মন বসছেনা।বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে সে ক্লান্ত। কিন্তু তার আসার কোন খবরই নেই। বড় রাস্তায় কিছু বাচ্চা ছেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে গান গেয়ে যাচ্ছে
আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দেবো মেপে,
লেবুর পাতা করমচা, যা বৃষ্টি ঝরে যা।উদাস মনে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ রাস্তার পাশের তাল গাছটা তার নজর কাড়ল। গাছের সাথে ঝুলে থাকা বাবুই পাখির বাসাগুলো বাতাসে দোল খাচ্ছে। কি অসাধারণ শিল্প! পাখির বাসাগুলো দেখে ছোটবেলায়
পড়া একটা ছড়া মনে পড়ে গেল যায়িদের।বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়ায়,
“কুড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহা সুখে অট্টালিকা পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টির ঝড়ে।”
বাবুই হাসিইয়া কহে, “সন্দেহ কি তাই?
কষ্ট পাই তবু থাকি নিজের বাসায়,
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোড়, কাঁচা ঘর, খাসা।”কবিতাটার নাম স্বাধীনতার সুখ। রজনীকান্ত সেনের লেখা এই কবিতাটা পড়ার পর যায়িদের অন্যরকম একটা অনুভূতি হয়েছিল। বাবুই পাখিকে তার খুব ব্যক্তিত্ববান মনে হয়েছিল। যদিও ব্যক্তিত্ববান কথাটা ব্যক্তির সাথে যায় তবু এইখানে ব্যবহার করার জন্য এর থেকে ভাল কোন শব্দ আপাতত যায়িদের থলিতে নেই।তার মনে হয়েছে নিজের জীর্ণতা নিয়ে বাবুই পাখির মধ্যে বিন্দুমাত্র জড়তা নেই।
এটা শুধু একটা ছড়া না, এখান থেকে শেখারও আছে।অর্থাৎ নিজের অবস্থা নিয়ে কখনও লজ্জা পাওয়া উচিৎ না। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে যায়িদদের সবকিছুতে মধ্যবিত্ত্যের ছাপ স্পষ্ট। স্কুলের বন্ধুদের বাড়িতে হাল ফ্যাসনের আসবাব,তাদের চটকদার পোশাক আর অর্থনৈতিক ভাল অবস্থা দেখে যায়িদের মধ্যে যে হীনমন্যতা ছিল তা এই কবিতাটা পড়ার পর কেটে অনেকটাই গেছে।নিজের অবস্থা নিয়ে হীনমন্যতা থাকা মুসলিমের জন্য শোভনীয় না। হাদিসে এসেছে,
মুমিন এতো চমৎকার চরিত্রের অধিকারী, যে কিনা সুখে থাকলে শোকর করে এবং দুঃখে থাকলে সবর করে।
কবিতাটা পড়ার পর থেকে যায়িদের মনে আর কোন হীনমন্যতা কাজ করেনা। কবিতাটায় আর একটা চমৎকার শিক্ষা আছে তা হল চড়ুইয়ের মিথ্যা অহমিকা। অহঙ্কার ইসলামে নিষিদ্ধ। অহঙ্কারী কখনও জান্নাতে যাবেনা। অবশ্য অন্যভাবে দেখলে চড়ুয়ের দিকটা খেয়াল করলে তারও একটা ভালো ব্যাখ্যা দেওয়া যায় তা হলো তার অপরিসীম অভিযোজন ক্ষমতা। যেকোন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার তাদের যে ক্ষমতা তা থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে।
দুপুর থেকে সে একভাবে বসে আছে আর তার মন ভাবনার ডানায় ভর করে উড়ে বেড়াচ্ছে। নানা ভাবনার মাঝেও বৃষ্টির জন্য যে আকুলতা তা থেকে কিছুতেই বের হতে পারছেনা।
সকাল থেকে মেঘেদের খেলা শুরু হয়েছেতো হয়েছে আর থামার নাম নেই। সূর্যটা আলো আঁধারের খেলায় মেতেছে যেন। গুরু-গম্ভীর কালো মেঘের মুহুমুর্হু গর্জনে মনে হচ্ছে এখনই বুঝি বৃষ্টি নামবে কিন্তু পরক্ষণেই গর্জন থেমে আলোকিত হয়ে ওঠছে চারিদিক। ঝিরঝির বৃষ্টি একদমই পছন্দ না যায়িদের। ঝুম বৃষ্টি হবে আর সে দুই হাত মেলে বৃষ্টিতে ভিজবে অথবা পাশের মাঠে গিয়ে পাড়ার ছেলেদের সাথে বল খেলবে তবেই না বৃষ্টিতে ভেজার সার্থকতা।
বর্ষা তার প্রিয় ঋতু কিনা জানেনা তবে বর্ষাকাল তার পছন্দ। অবশ্য সব ঋতুরই আলাদা আলাদা সৌন্দর্য আছে।
তার কাছে মনে হয় বৃষ্টির আলাদা একটা ছন্দ আছে। বৃষ্টিতে ভেজা তার নেশা।স্কুল থেকে আসার সময় বৃষ্টিতে ভিজে এসে মায়ের বকুনি খাওয়া তার নিত্যদিনের ব্যাপার। বাড়িতে থাকলে মায়ের বকুনি খাওয়ার ভয়ে চুপিচুপি বৃষ্টিতে ভিজতে হয় তাকে। তিনদিন আগে হওয়া বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লেগেছে তাই আজকে তার মায়ের কড়া আদেশ একদমই বৃষ্টিতে ভেজা যাবেনা। আর তাই জানালার কাছে বসে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা। বৃষ্টিতে ভিজতে না পারুক জানালায় বসে বৃষ্টির ছন্দ শুনতে নিশ্চয় মন্দ লাগবেনা।আর জানালা দিয়ে হাত দুটো বের করে ভিজিয়ে নিতেতো কোন অসুবিধা নেই।
কিন্তু সেই সকাল থেকে অপেক্ষার পর বিকাল হয়ে গেল তাও বৃষ্টির দেখা মিলছেনা।এতক্ষণ আলো থাকলেও আবারও চারিদিক ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেল। চারিদিক থেকে আসরের আজানের সুললিত আওয়াজ ভেসে আসছে। ওজু করে মসজিদের উদ্দেশে বের হয়ে গেল যায়িদ। নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় আকাঙ্খিত ঘটনাটা ঘটল। ঝুম করে বৃষ্টি পড়া শুরু করল। সারাদিনের বিষণ্ণতা বৃষ্টির পানিতে মিশে অজানা আনন্দে মন নেচে উঠল। মনে পড়ল বাবা বলেছে বৃষ্টির পানি গায়ে লাগানো হারিয়ে যাওয়া একটা সুন্নাহ। হাদিসে এসেছে,
একবার সাহাবীদের সাথে থাকা অবস্থায় বৃষ্টি নামলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁর কাপড়ের কিয়দংশ উন্মোচন করলেন যেন শরীরে বৃষ্টির পানির স্পর্শ লাগে। এবং সাহাবীদের বললেন এই রহমতের বৃষ্টি মহান রবের কাছ থেকে মাত্রই এসেছে”। [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সালাতুল ইস্তিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার সালাত। হাদিস নং ৮৯৮]
এই বৃষ্টির মধ্যে যেমন কল্যাণ আছে তেমনি এই বৃষ্টি দিয়ে এক জাতিকে নিশ্চিন্ন করে দেয়া হয়েছে। আদ জাতিকে তাদের অবাধ্যতার কারণে টানা সাত রাত এবং আট দিন ধরে ঝড়োবৃষ্টি দিয়ে তাদের শাস্তি দিয়েছেন আল্লাহ্। তাই কল্যাণকর বৃষ্টির জন্য দুয়া করতে ভোলেনা যায়িদ।
বৃষ্টির আর একটা কল্যাণকর দিক হল এসময় দুয়া কবুল হয়।তাই বৃষ্টির সময় সে তার মনের যত আর্জি আছে সব তার রবের কাছে প্রেরণ করে।
কাক ভিজা হয়ে বাসায় ঢুকতেই মায়ের বকুনির কবলে পড়তে হলো তাকে। অগ্নিশর্মা হয়ে পারভিন আক্তার বললেন,
তোকে না বৃষ্টিতে ভিজতে বারণ করেছি।আমি নামাজে যাওয়ার সময় বৃষ্টি ছিলনা মা। নামাজ থেকে আসার সময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে আমার কি করার আছে? ঝটপট উত্তর দিল যায়িদ।
এরকম আবহাওয়ায় বের হওয়ার দরকার কি ছিল?
সকাল থেকেইতো এমন চলছে।আমি কি জানতাম এখন বৃষ্টি আসবে?
ছাতা নিয়ে যাসনি কেন?
ছাতা বহন করতে ভাল লাগেনা।
আমি জানি তুই এটা ইচ্ছা করেই করেছিস যাতে আমাকে অজুহাত দেখাতে পারিস।
যায়িদ মুচকি হেসে বলল, আচ্ছা মা তুমি সব বুঝে যাও কেন? আমার মায়ের অনেক বুদ্ধি। তাইতো আমারও অনেক বুদ্ধি। তারপর পোশাক পাল্টে মাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করল, মা বৃষ্টির পানি গায়ে লাগানোও সুন্নাহ।যায়িদ পারভিন আক্তারকে হাদিসটা শুনিয়ে দিল।
পারভিন আক্তার বললেন, জানি। জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়েও বৃষ্টির পানি শরীরে লাগানো যায়। এরজন্য সম্পূর্ণ ভিজা লাগেনা। কিন্তু তুইতো কাকভেজা হয়ে এসেছিস।
কি করব বল? ছাতা নেইনি, ভিজেতো যাবোই। তারপর বলল, আসলে মা বৃষ্টিতে ভেজার মজাই আলাদা। মা তুমি কখনও বৃষ্টিতে ভেজনি?
যায়িদের কথায় পারভিন আক্তার মুচকি হাসল। মনে মনে ভাবল, শুধু বৃষ্টিতে ভেজা? আমরাতো কাদায় গড়াগড়ি খেতাম, ছিপ বা খাঁচা দিয়ে মাছ ধরতাম, আরও কত কিছু করেছি। কিন্তু ছেলেকে সেসব বলা যাবেনা। তাই একটু ক্ষীণস্বরে বলল, বৃষ্টিতে আবার কে না ভিজে?
যায়িদ মায়ের ঘুরিয়ে দেওয়া উত্তরটা ঠিকই বুঝতে পারল। ছেলের কাছে নিজের বৃষ্টিতে ভেজার গল্প করতে চাননা, তাহলে ছেলেকে বৃষ্টিতে ভিজতে বারণ করতে পারবেনা। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মুচকি হাসি দিল যায়িদ। মায়ের সাথে কিছুক্ষণ খুনসুটি করে নিজের ঘরে চলে গেল।
আসার সময় পাশের মাঠে লাগানো কদম গাছ থেকে কয়েকটা কদম ফুল নিয়ে এসেছে সে। কদমের সাথে তার আলাদা একটা সখ্যতা আছে। কদমের পাপড়ি ছিঁড়ে নানা রূপ দিতে তার ভীষণ মজা লাগে। কিন্তু এখন সে ফুলগুলো সাজিয়ে রাখবে। টেবিলে রাখা ফুলদানিটায় ফুলগুলো সাজিয়ে রাখল। বৃষ্টি এখনও থামেনি। পড়ার টেবিলটায় বসে আবারও বৃষ্টি উপভোগ করতে লাগল।
পড়ন্ত বিকাল। কাকভিজা হয়ে পাখিরা সব বাড়ি ফিরছে। গোধূলির সাজে সেজেছে পশ্চিমাকাশ।এ সময়টায় প্রকৃতি একটা অসাধারণ রূপ নেয়। বৃষ্টির তেজ কমতে লাগলো। আস্তে আস্তে বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশের বুকে জেগে উঠল মন ভালো করে দেয়া সাত রঙে রাঙ্গানো রংধনু। দীর্ঘ এক বছর পর রঙ ধনুর দেখা পেল যায়িদ। তার অপেক্ষা সফল হল।
আজ এতো এতো ভালো লাগার ঘটনা ঘটায় মন ভালো হয়ে গেল যায়িদের। দিনের আলো শেষ হয়ে রাতের আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে চারিদিক। মাগরীবের নামাজ পড়ে মন দিয়ে পড়তে বসল সে। রাতের সব কাজ শেষ করে ঘুমাতে গেল আর অপেক্ষায় থাকল এর একটা নতুন দিনের।
সমাপ্ত
1 Comment
Friends
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Morsalin Islam Shouradip
@morsalinshouradip
জাস্রা জুমান
@nmafin4gmil-com
Hijbullah hiju
@hijbullah
মোঃ রিদওয়ান আল হাসান
@mridwanalhasan
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam

দারুণ গল্প লিখেছেন। মুগ্ধতা একরাশ।