-
লোকটির অদ্ভুত বিষয় হলো সে মুখের সামনে একটি বই উল্টো করে ধরে পড়ছে। কোনো গল্প-উপন্যাসের বই নয়। আল্টিমেট ফেইট অফ ইউনিভার্স , প্রফেসর জে এন ইসলামের লিখা। কানিজ আগ্রহ আর কৌতুহল দুটো নিয়েই লোকটিকে দেখছে। সে বসে আছে কানিজের মুখোমুখী সিটে। এই কম্পার্ট্মেন্টটা প্রায় ফাকাই বলা চলে। শুধু দু সিট সামনে এক দম্পতি( সম্ভবত নতুন বিয়ে হয়েছে) দুজন দুজনের হাত ধরে মধুর প্রেমালাপে মগ্ন। ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দে তাদের কথা বোঝা যাচ্ছে না ঠিকই তবে অঙ্গভঙ্গী দেখে কি কথা হচ্ছে তার আভাস পাওয়া যায়। নতুন বিয়ে হলে এরকমই সম্পর্ক থাকে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই একে অপরের প্রতি আগ্রহ কমে প্রায় শুন্যের কোঠায় নেমে আসে। একে অপরের ওপর সন্দেহ , অনীহা দেখা দিতে শুরু করে। নিতান্ত ছাপোষা বাঙালী না হলে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখা দুষ্কর। তবে ইদানিং বাঙালীরা আমেরিকানদের মত বেশ বুদ্ধির(!) প্রয়োগ ঘটাচ্ছে। একে অপরকে ভালো লাগছে না তো-“ ডিভোর্স । অতঃপর টাটা !বাই বাই!”
“দয়া করে এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। কেও এভাবে তাকিয়ে থাকলে আমার প্রচন্ড অসস্তি হয়। “
কথাটা বলেই লোকটি মুখের সামনে থেকে বইটি নামালো। ট্রেনের ওঠার পর এই প্রথম লোকটির মুখ দেখতে পেলো কানিজ। চেহারা চমৎকার। লম্বা ,ফর্সা । মুক্তোর মত দাতেঁর সারি কারো চোখ এড়াবে না। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে লোকটির ভরাট কন্ঠ। কন্ঠে একটা চমৎকার ব্যাক্তিত্ব আছে। বয়স সম্ভবত ত্রিশের বেশি হবে না। ভিড়ের মধ্যে সবার আগে চোখ পড়ার মত চেহারা। হঠাৎ লোকটির কন্ঠে কানিজ চমকে উঠলো। তার হাতে্র পেপার কাপে থাকা কফি খানিকটা উছলে উঠলো। কিন্তু নিজেকে তৎক্ষনাৎ সামলে নিল।
” না , ব্যাপারটা সেরকম কিছু না। আসলে আপনি বইটি উল্টো করে ধরে পড়ছেন। আদৌ পড়ছিলেন কিনা নাকি পড়ার ভান করছেন বোঝার চেষ্টা করছিলাম।“ কথাটি বলে কানিজ মিটিমিটি হাসতে লাগলো।
কানিজ ভেবেছিলো তার কথায় লোকটি কট্মট করে তাকাবে কানিজকে কিছু পাল্টা কড়া কথা শোনাবে। কিন্তু তেমন কিছুর সম্ভবনাই গুড়িয়ে দিয়ে তিনি হো হো করে হাসতে লাগলেন। সামনের নব দম্পতিরাও একবার আড়চোখে পেছনের দিকে তাকিয়ে আবার নিজেদের গল্প চালিয়ে যেতে লাগলো। কানিজের ভারি অসস্তি হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে মনে হলো, তার সামনে পৃথিবীর সেরা রুপবান পুরুষদের একজন বসে আছে যাকে একবার ছুয়েঁ দেখতে না পারলে এই জন্মটাই বৃথা। লোকটির হাসি এখনো শেষ হয়নি, হাসি চাপতে চাপতেই বলল-
: “আসলে এটা রাগ কমানোর একটা ভালো ট্রিকস। আমার যখন রাগ হয় তখন আমি বই উল্টো করে পড়ি। এতে মস্তিষ্কের অনেক পরিশ্রম আর সব মনোযোগ বইয়ের দিকে থাকে। রাগটাও আস্তে আস্তে পড়ে যায়। তবে আমি এই বইটা এর আগে ছয়বার পড়েছি।
:তো আপনার রাগ কমেছে?
:আসলে আজ আমার রাগ হয় নি। খানিক অভিমান হয়েছিলো। তাই ছন্নছাড়া লাগছে, যদিও অভিমান করা একধরনের মেয়েলি স্বভাব যেটা একদমই আমি পছন্দ করি না। তবে মনের ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রন নেই। মনই সব কিছুকে নিয়ন্ত্রন করে।
কানিজ কৌতুকের সুরেই প্রশ্ন করলো-
: তো আপনার কার ওপর অভিমান হয়েছিলো?
:আমার স্ত্রী নিশাতের ওপর। তার আজ আমার সাথে আসবার কথা ছিলো……
কথাটি বলেই লোকটি অন্যমনষ্ক হয়ে গেলো।
কানিজ পরিবেশ ঠান্ডা করার জন্য বলল,
“আচ্ছা আপনার পরিচয়টাই তো জানা হলো না। আমার নামটা কিন্তু খুব কমন ,আমার বান্ধবীদের নামগুলো কতো সুন্দর –কিন্নরী, স্নেহা, রাত্রী। আমার বাবা বিখ্যাত মানুষদের নামে সব ভাইবোনদের নাম রেখেছে। আমার বড় ভাইদের নাম রেখেছে নজ্রুল, ফজলুল।
লোকটি গলার স্বর ঠান্ডা রেখে বলল,
:আপনার নামটা বলুন।
:আমার নাম হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা পাইলটের নামে। বলুনতো আমার নাম কি?
:আমার সাধারণ জ্ঞা্ন ভালো না।
:কানিজ ফাতিমা রোকসানা। বাংলাদেশে কম করে হলেও দশ হাজার কানিজ আছে।
:আছে হয়তো , তবে আমার সামনে আপাতত একজন কানিজই বসে আছে। যে কিশোরীদের মত হড়বড় করে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলে । বাংলাদেশের সব কানিজ হয়তো এভাবে কথা বলে না। অন্য কানিজগুলো হয়তো গম্ভীর। আপনার মত সাবলীল নয়।
কনিজ একটু লজ্জা পেলো বটে তবে নিজেকে সামলে নিলো-
: আপনার সম্পর্কে কিছুই তো বললেন না।
:আমি সৌরভ হাসান। কানাডয় ভ্যাঙ্কুভারে একটা আন্ডার গ্রেজুয়েট কলেজে পড়াই। আর কিছু বলতে গেলে বলবো টরেন্টো ইউনিভার্সিটি থেকে কোয়ান্টাম রসায়নে পি এইচ ডি করেছি………এতটুকুই। তবে ফিজিক্সেও আগ্রহ ছিলো। এখন সেটা বই পড়ে মেটাই।
:ও, প্রফেসর সাহেব। তাই বুঝি জে এন ইসলামের বই উল্টো করে পড়ছিলেন।
সৌরভ কথাটি তেমন গ্রাহ্য করলেন না। বললেন,
:আপনি বোধহয় ডাক্তারী পড়ছেন। না অবাক হবার কিছুই হয় নি…।আপনার ভ্যানিটি ব্যাগের কোনা দিয়ে স্টেথোস্কোপের মাথা বেরিয়ে আছে তাই বুঝতে পারলাম।
:আমি স্টুডেন্ট না হয়ে ডাক্তারও তো হতে পারি।
:ডাক্তারদের আমি অতো হড়বড় করে কথা বলতে দেখি নি।
:আসলে অনেকদিন পর বাড়ি যাচ্ছি তো তাই একটু বেশিই খুশি। তো আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
:ঢাকায় আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর বিয়ে এটেন্ড করে এলাম । এখন যাচ্ছি চট্টগ্রাম। সেখানে কিছু কাজ শেষ করে যাব টেকনাফ। সেখান থেকে সারা বাংলাদেশের সব জেলা ভ্রমনে বেরুব।
:হঠাৎ এমন খেয়াল মাথায় এলো কেন?
সৌরভের দৃষ্টি চলমান ট্রেনের জানলা ছাপিয়ে বাহিরের সবুজ মাঠের ওপর চলে গেলো,
:এর পেছনে তেমন কোনো কারন নেই। তবে আমার স্ত্রীই হয়তো দায়ী। সেদিনও আমি পথে যেতে যেতে একটি বই উল্টো করে পড়ছিলাম। বইটির নাম ছিলো কসমস , কার্ল স্যাগনের লেখা।
আমার বয়স তখন বাইশ কি তেইশ হবে। ভার্সিটির হলে থেকে পড়াশোনা করতাম। কোনো চিন্তা ছিলো না ,বাবা নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। একদিন ফোন করে বাবা জরুরি নোটিশে বাড়িতে ডেকে পাঠালেন। কোনো কারন বললেন না। তার পর দিনই বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে যাবার একটা প্ল্যান ছিলো। বাবার কথাতো আর ফেলতে পারি না। অগত্যা রওনা দিলাম যদিও প্রচন্ড রাগ লাগছিলো।
সেদিনই তারসাথে আমার প্রথম দেখা। হ্যাঁ, নিশাতের কথাই বলছি। সেও ঠিক আপনার মত সুন্দরী। হাত নেড়ে নেড়ে একনাগাড়ে কথা বলতো। তবে এখন আর বলে না। কেনো বলে না জানিনা। সেদিন আমার উল্টো করে বই পড়া দেখে বলে উঠেছিলো,” কেউ ইংরেজি পড়তে পারে না এটা তার দোষ না। তবে মুখোমুখী সিটে সুন্দরী মেয়ে থাকলে সে যে আপনার হাতে কার্ল স্যাগনের বই দেখলেই আপনার প্রেমে পড়ে যাবে সেরকম সম্ভবনাও নেই। কারন আপনি বই উল্টো করে ধরেছেন।“
আমি খানিকটা অবাকই হলাম ওর দিকে তাকিয়ে। বাংলাদেশে এমন সুন্দরী মেয়ে আছে! এর মেয়ের জন্ম মনে হয় মধ্যপ্রাচ্যে হওয়ার কথা। আমাদের সেই প্রথম দেখা গিয়ে ঠেকেছিলো বিয়েতে। আমি কোনোদিন আমার বাবার কথার অবাধ্য হইনি। কিন্তু অবাধ্য হয়ে মাত্র তেইশ বছর আটমাস বিশ দিন বয়সে জীবনের সবচেয়ে গুরত্বপুর্ন কাজটি করেছিলাম। নিশাতকে বিয়ে করে ফেললাম।
আমি ওকে বিয়ে করেছিলাম ঠিকই তবে অনেকটা একতরফা। আমি তখনই বিয়ে করতে চাইনি। ও বিষ খেয়ে আত্মহত্যা অব্ধি করতে গিয়েছিলো আমার জন্য। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিশাতের পরিবারও পাগলামিটাকে মেনে নিয়েছিলো। কিন্তু আমার বাবা আমায় করলো ত্যায্যপুত্র। বাবা আর টাকা পাঠান না। নিদারুন অর্থ সংকটে পরেছিলাম। নিশাত যদিও বাবার বাড়িতেই থাকতো ,কিন্তু নিজের থাকা খাওয়ার খরচ আমাকেই চালাতেও হতো, নিশাতের বাবা আমায় টাকা দিতে চাইতেন আমি লজ্জায় নিতাম না।
মাঝে মাঝে নিশাতের সাথে কথা বলতাম। পড়াশোনা শেষ করে একটা চাকরি পাওয়া অবধি অপেক্ষা ছিলো। বড়লোক বাবার মেয়ের কত শখ। সুইজারল্যান্ড ঘুরবে ,ইলেত বিলেত ঘুরবে আরোও কত কী। আমি বলেছিলাম আগে বাংলাদেশটাই নাহয় ঘুরে দেখি। সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলে। কিন্তু পরে তাকে বেশ আগ্রহী দেখা গেলো।“সৌরভ থামলো।।
:তো এই জন্যই বাংলাদেশের সব জেলা ঘুরবার প্লান? ,কানিজ উৎসুক স্বরে জিজ্ঞেস করলো।
:প্ল্যান ছিলো বইকি। আমার কাছে তখন অত টাকা ছিলো না। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে যা হয় । এম এস সি শেষে টরেন্টো ইউনিভারসিটিতে স্কলারশিপ পেয়ে গেলাম, সাথে একটা আন্ডার গ্রাজুয়েট কলেজে পড়ানোর সুযোগ। মোদ্দা কথা অর্থ সংকট কেটে গিয়েছিলো। যাওয়ার আগে নিশাতকে বলেছিলাম ফিরে আসলে একসাথে এক্সপেডেশনে বেরুব। আমাকে বিদায় দেবার সময় এয়ারপোর্টে নিশাতের সে কি কান্না। লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলাম সবার সামনে।
লং ডিস্টেন্স রোমিং কলের জন্য প্রতিদিন কথা বলা সম্ভব না হলেও নিয়ম করে ওকে মেইল করতাম। কিন্তু দিনদিন একে অপরের মেইলের সংখ্যাও কমে গেলো। ওর সাথে আমার দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছিলো। বেশ বাড়ছিলো। আমি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু কিছুই করার ছিল না।
একদিন একটা রেজিস্ট্রী করা চিঠি পেলাম। যদিও ডকুমেন্টারী চিঠি ছাড়া আমার নামে তেমন কোনো চিঠি আসতো না। হলুদ রং এর খাম। খামের ওপর নাম লেখা –‘From: Tahmina Haque Nishat .’ । খামটা খুললাম। ভেতরে একটা হাতে লেখা চিঠি ,আর কিছু ডকুমেন্টস। চিঠিটা পেয়েই আজ দেশে ফেরা।হঠাৎ ট্রেনের সাইরেন বাজলো। সৌরভ বলল,” স্টেশন এসে গেছে। আমি এখানেই নামবো। “
কানিজ তৎক্ষনাৎ জিজ্ঞেস করলো,” আপনার স্ত্রীর চিঠিতে কি এমন লিখা ছিলো যে আপনি দেশে চলে এলেন?”
সৌরভ উদ্ভ্রান্তের মত খানিক হাসলো। বলল, “ ডিভোর্স লেটার! নিশাত জানে সে মুক্তি চাইলে তাকে আমি মুক্তি দিয়ে দেবো। আটকাবো না। তাই আগে ভাগেই বিয়ের ইনভাইটেশন কার্ডও পাঠিয়ে দিয়েছে। সে শাহেদ নামে একজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। আজ তাদের বিয়ে ছিলো। আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু নিশাতের বিয়ের ইনভাইটেশন রক্ষার্থেই এসেছি। আমাদের সম্পর্কের ইতি ঘটেছে সেটা দেখাতেই আমায় নিমন্ত্রণ করেছে। আমিও এলাম। এখনো ভালোবাসি বলে। অতঃপর সারা বাংলাদেশ ঘুরে একেবারে ফিরে যাব কানাডায়। হ্যাঁ, একাএকাই ঘুরব।
আর ভালো থাকবেন আপনি। বিদায় “সৌরভ চলে গেলো। ট্রেনের জানলা ডিঙিয়ে বিকেলের পশ্চিম আকাশের আভা এসে লাগছে কানিজের গালে। চোখের জল আরও চকচক করছে কমলা রোদে। মনে মনে ভাবছে সে লোকটির হাত ধরে বলতেও পারতো,” চলুন আমি আপনার সাথে সারা বাংলাদেশ ঘুরবো।“ না সব সম্ভব হয়ে ওঠে না। মনটা হতে হয় পানির মত, হাজারো চেষ্টা করলেও পানিতে যেমন দাগ ফেলা যায় না তেমনি মনেও দুঃখের দাগ যেনো না পরে। তবু মনের অজান্তেই মনে কিছু দুঃখের দাগ পড়ে যায় । সব দাগ মোছা যায় না। কানিজ ট্রেনের জানালা দিয়ে ভেজা চোখে তাকিয়ে দেখছে সৌরভ লাগেজটা নিয়ে গটগট করে চলে যাচ্ছে।
গল্পঃ সে আমায় ডেকেছিলো শেষ নিমন্ত্রনে
Fb: s. H. Shrabon
Friends
নন্দিনী
@nandini-chowdhuri
Md. Habibur Rahman
@habib
Ismail Mozumdar
@ismail-hossain-mozumdar
আওসাফ সাদিক
@awsaaf-sadik
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ] [ জাকের আদিত্য ]
@md-zaker-hayat-khan
শিহাবুল ইসলাম
@shihabul
নিশাত আনজুম
@nishathunzom
মেহাস হালদার
@mehedi-mihi
মারুফ হাসান মাইয়ুফ
@al-maroof-hasan

