Profile Photo

Shahadat HossainOffline

  • Shahadat-Hossain
  • Profile picture of Shahadat Hossain

    Shahadat Hossain

    4 years, 11 months ago

    টুইন আর্থ
    ষষ্ঠ পর্ব

    চার ইঞ্জিনের এর এয়ারবাস টা যখন অস্ট্রেলিয়ার সিডনির আকাশে পৌঁছল তখন ঘড়িতে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাতটা 25 মিনিট / এয়ার হোস্টেস ঘোষণা দিলেন যে আমরা আমাদের গন্তব্য প্রায় পৌঁছে গেছি / আপনারা আপনাদের সিট বেল্ট বেঁধে ফেলুন , আর কিছু সময়ের মধ্যেই আমরা ল্যান্ড করব / বিমানের ভিতরে একটা মৃদু গুঞ্জন ধন্যি ছড়িয়ে পরল / চতুর্দিকেই বেল্ট বাধার খটখট শব্দ শুনতে পেলাম / একসময় সমস্ত বিমানটি নিরব হয়ে গেল / সব যাত্রীরা চুপচাপ বসে আছে কোথাও কোন শব্দ নেই এমনকি কোন শিশু ও কাঁদছে না / প্রত্যেকটা বিমানের জন্যই এই ল্যান্ডিং মুহূর্তটা একটু ক্রিটিক্যাল / এই সময় পাইলট তার মেধা ও অভিজ্ঞতা কে ব্যবহার করে বিমানটিকে নিপুন ভাবে মাটিতে নামিয়ে আনেন / আমি জানালা দিয়ে নিচে তাকালাম / শহরের আলোকোজ্জ্বল ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট গাড়ি এগুলো দেখতে পেলাম / আমার মনে পড়ে গেল এর আগেও আমি একবার এই শহরে এসেছিলাম / সেদিনও বিমানের ল্যান্ড করার আগে এমনিভাবে আমি আকাশ থেকে সিডনি শহরটাকে দেখেছিলাম / আমি প্রচন্ড একটা আনন্দ উচ্ছ্বাস নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম কখন প্লেনের চাকাটা মাটি স্পর্শ করে / যে মুহূর্তে চাকাটা মাটিতে স্পর্শ করে সেই মুহূর্ত টি. আমার খুব ভালো লাগে প্লেন টির চাকা মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে ছোট্ট একটা ঝাকুনি অনুভব করি আমি / এক ধরনের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি / প্লেনে উঠলে সবসময়ই আমার মনে এক ধরনের টেনশন কাজ করে / তবে এই মুহূর্তে আমি কোন টেনশন , উৎসাহ বা আনন্দ কোনটাই অনুভব করছি না কারণ আমি জানি এয়ারপোর্টের বাইরে আমার জন্য অপেক্ষায় কেউ নেই / এ পৃথিবীতে আমার কেউ নেই /

    ইমিগ্রেশনের সমস্ত আনুষ্ঠিকতা শেষ করে আমি যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম তখন ঘড়ির কাঁটা প্রায় রাত নয়টা ছুঁই ছুঁই করছে / আমি এখানে ভিআইপি প্রটোকল পাচ্ছিলাম / তাই সময় খুব একটা বেশি নষ্ট হয় নাই , প্লেন থেকে নামার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দুইজন ইয়াং লেডি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো এবং মুখে বলল ইয়েস স্যার ! অস্ট্রেলিয়াতে আপনাকে স্বাগতম / কেমন আছেন আপনি ? অস্ট্রেলিয়া তে আমরা দুজন আপনার সহচর / আপনার সম্ভাব্য যেকোনো সমস্যার সমাধানের জন্য নিশ্চিন্তে আমাদের উপর নির্ভর করতে পারেন / আমি মেয়ে দুটির দিকে চোখ তুলে তাকালাম / অল্প বয়সী দুটি মেয়ে / বয়স অল্প হওয়ার কারণেই হয়তো চেহারায় এক ধরনের ভালোলাগার ব্যাপার আছে / মিষ্টি চেহারা / আমি তাদের নাম জানতে চাইলাম / তারা বললেন তাদের একজনের নাম রেশমা এবং অপরজনের নাম সাবিত্রী / এবার আমি তাদের দিকে একটু আগ্রহ ভরে তাকালাম / তারপর জিজ্ঞাসা করলাম তোমরা কি বাঙালি ? মেয়ে দুটি একই সাথে উত্তর দিয়ে বলল হ্যাঁ আমরা বাঙালি এবং আমরা বাংলাদেশি / আমি খুশি হয়ে গেলাম এবং বললাম তাহলে তোমরা আমার সাথে প্লিজ ইংরেজিতে কথা না বলে বাংলায় বল / আমি এখনো বাংলা ভুলে যাইনি / মেয়ে দুটো ঝলমল করে হেসে উঠলো / এবং কৌতুক ময় ভঙ্গিতে বলতে লাগলো , জি স্যার আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই সব হবে / আমি বললাম আমি এখন ডার্লিং হারবারের যাব / আমার প্রিয় দাদাভাই রাভিদ কে দেখতে / রেশমা হেসে বলল , নিশ্চয়ই আপনি যাবেন স্যার , তবে আপনার এই দীর্ঘ 22 ঘন্টা র বিমান ভ্রমণে নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা ক্লান্ত / অস্ট্রেলিয়া গভারমেন্ট আপনার অস্ট্রেলিয়া অবস্থানকালীন সময়ে আপনার থাকা ও বিশ্রামের জন্য হোটেলে দুই কামরার একটি সুইট রিজার্ভ করে রেখেছেন / চলুন স্যার প্রথমে আমরা সেখানে যাই / সেখানে গিয়ে প্রথমে দীর্ঘ একটা গরম শাওয়ার নেন তারপর হালকা কিছুটা খাওয়া-দাওয়া করেন এরপর আমরা বের হব / এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে এক ঝাঁক সাংবাদিকের ভেতর পড়ে গেলাম আমি / সবাই আমাকে ঘিরে ধরল / নানা ধরনের ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দে ফ্লাসলাইট জ্বলতে লাগলো / নিউ সাউথ ওয়েলস এর সিডনি শহরের মেয়র ডেবিট এগিয়ে এসে আমাকে এই সাংবাদিকদের হাত থেকে উদ্ধার করে গাড়িতে উঠিয়ে দিলেন এবং হাত নেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করলেন / মেয়ে দুটি গাড়িতে আমার বা পাশে বসা ছিল / আমি গাড়ির ভেতর থেকে বাইরে তাকিয়ে রইলাম / আমার মনের ভেতরটা যেন ছিড়ে যাচ্ছিল / চোখের ভেতর জল জমে যাচ্ছিল / বারবার টিস্যু ব্যবহার করে সেই জল পরিষ্কার করছিলাম আমি / এর আগেও আমি এই শহরে আরেকবার এসেছিলাম তখন আমার দুটি ছেলে আমাকে নেয়ার জন্য এসেছিল / আরিয়া আয়েশা রাভিদ ওরাও এসেছিল / দাদাভাই কে দেখে তখন তাদের কি উল্লাস / কেউ দাদাভাইয়ের হাত ধরে টানে তো কেউ আবার দাদাভাইয়ের কোলে উঠে পড়ে / এরমধ্যে কথা বার্তা তো আছেই তিনজন একই সাথে দাদাভাইয়ের সাথে কথা বলতে থাকে / ওদের মা রা ওদেরকে ধমকাতে থাকে এত কথা না বলার জন্য / কিন্তু কে শুনে কার কথা / ওদের কথা ওরা বলতেই থাকে / আজ আমি আবার সেই শহরে ফিরে এসেছি / আমি ফিরে এসেছি কিন্তু ওরা সবাই চলে গেছে এই শহর থেকে / এই শহরে ওরা আর কেউ নেই / ব্যাপারটা ভাবতেই আমার মনের ভিতর টা শূন্যতায় ভরে যাচ্ছে / বুকের ভেতরটা কেমন যেন চুপসে যাচ্ছে / শহরের ব্যস্ততা সেই রাস্তাঘাট বাড়িঘর সবকিছু আগের মতই আছে / শুধু নেই আমার সেই আদরের ছেলে দুটো / সমস্ত শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজলে ও তাদের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা / মনে আছে এর আগে যখন আমি এই শহরে এসেছিলাম তখন প্রায় চার মাস এখানে ছিলাম / যেদিন আমার দেশে ফিরে যাওয়ার কথা তার আগের রাতে ওদের মা ওদেরকে রাতে ভাত খাওয়ার পর ডেকে বলল , তোমরা আজকে আর দাদাভাই কে বিরক্ত করো না / দাদাভাই কালকে দেশে চলে যাবেন / সুতরাং উনাকে রাতে ঘুমোতে হবে / কথাটা শুনে আরিয়া আয়েশা দুজনে দাদাভাইয়ের দুই হাত চেপে ধরে টানতে টানতে ওদের বাবার কাছে নিয়ে আসে / তারপর বাবাকে বলে বাবা বাবা দাদাভাই কালকে চলে যাবে / বলেই সে কি কান্না / ওরা দুজনে আমা কে এমন ভাবে চেপে ধরেছিল যেন মনে হচ্ছিল দাদাভাইয়ের হাতটা ছেড়ে দিলে এখনই দাদাভাই উড়ে চলে যাবে / তারপর রাতে শোয়ার সময় দুজনে এমন ভাবে আমাকে দুদিক থেকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল যেন দাদাভাই কোন অবস্থাতেই চলে যেতে না পারে / আমার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল / হঠাৎ করে মেয়ে দুটির কথায় আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম / স্যার আমরা আমাদের হোটেলে চলে এসেছি , আমাদের নামতে হবে / আমি চোখ মেলে চতুর্দিকে একবার তাকালাম হোটেলের লবিতে অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছেন / সবাই আমাকে এক নজর দেখার জন্য উদগ্রিব / আমি গাড়ি থেকে নাম লাম/ তারপর সবার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে হেঁটে লিফটের ভেতর ঢুকে পড়লাম/ মেয়ে দুটো আমার লাগেজ গুলো টানতে টানতে নিয়ে এসে আমার পেছনে পেছনে এসে তারা ও লিফটের ভেতর ঢুকে গেল / হোটেল রুমে ঢুকে আমার মনটা খুশি হয়ে গেল / খুব সুন্দর করে গোছানো রুম দুটি / রুমের এক কোনায় এক্সট্রা ডাবল খাট / খাটের পাশেই সাইট টেবিলে ফ্লাওয়ার ভাসে অনেকগুলো তাজা লাল গোলাপ , সঙ্গে হাসনাহেনা ফুল / হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে সমস্ত ঘরটা মৌ মৌ করছে / বিছানার চাদর এবং জানালার পর্দা গুলো একই ডিজাইনের হালকা নীল হলুদ এবং লাল রঙের ডিজাইন করা বিছানোর লাল রং এবং ফ্লাওয়ার ভাসের লাল রং এর গোলাপ গুলো দিয়া কালার ম্যাচিং করা হয়েছে / মেঝের কার্পেটের রংটা হলুদ / রুমের একপাশে কাঠের নকশা করা একটা আলমারি এবং আলমারির উল্টোদিকে এক সেট নীল রঙের সোফা / সোফার সামনে যে টি টেবিলটা আছে সেই টেবিলের উপরে বিছানা টেবিল ক্লথ টি ও নীল রঙের / ক্লথ টির মাঝ বরাবর লাল রংয়ের সুতার কাজ করা / আমি আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে জানলার সামনে গিয়ে দাড়ালাম / পর্দা গুলো হাত দিয়ে সরিয়ে বাইরে তাকালাম / নিচে রাস্তা গুলোতে এখনো ব্যস্ততা তেমন একটা কমেনি / রাস্তায় সারি সারি গাড়ির লাইন / আলো ঝলমল করছে সারা শহর / নানা রংয়ের নিয়ন বাতিগুলো জ্বলছে নিভছে / দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত প্রায় এগারো টা / একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়া এল আমার বুকের ভেতর থেকে / পৃথিবীটা প্রায় আগের মতই আছে আলোর ঝলকানি জৌলুস আগের চেয়ে আরও বেড়েছে / কিন্তু আমার প্রিয় মানুষগুলো কেউ আর এখানে নেই / সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে /

    ঘড়িতে রাত বারোটা বেজে গেছে আরো 10 মিনিট আগেই / হঠাৎই ডোর বেলটা বেজে উঠলো / দরজা র লক খুলে দিতেই ঘরে ঢুকলেন মেয়র ডেবিট / গোলগাল চেহারার হাসিখুশি মুখের মেয়র ডেবিট / তার মুখে সবসময় একটা হাসি হাসি ভাব লেগেই আছে / মনে হয় যেন এই পৃথিবীর কোন কিছু দেখলেই যেন তার হাসি পায় / তার কথার মধ্যে ও সব সময় একটা কৌতুক কৌতুক ভাব থাকে / ওকে স্যার , আমি চলে এসেছি / চলুন এবার যাওয়া যাক আমাদের এই শহরের গর্ব আপনার নাতি রাভিদ আহমেদ এর ভাস্কর্য দেখতে /

    সামনে পিছনে দুটো সিকিউরিটির গাড়ি মাঝখানে একটা বিএমডব্লিউ তে মেয়র ডেভিড সামনে ড্রাইভার এর পাশে মেয়ে দুটো পেছনে আমার পাশে উঠে বসলো / গাড়ি চলতে শুরু করল / ততক্ষনে রাস্তাঘাটের ব্যস্ততা প্রায় নেই বললেই চলে / অনেক খন পরপর দুই-একটা গাড়ি রাস্তার নির্জনতা ভেঙে দিয়ে এদিক সে দিক ছুটে যাচ্ছে / ট্রাফিক সিগন্যালের বাতিগুলো একা একাই খেলা করছে , একবার নি ভ ছে আবার জ্বলছে , একবার লাল হচ্ছে আবার নীল হচ্ছে / আমি তনময় হয়ে শহরটা দেখছিলাম / প্রায় আধাঘণ্টা চলার পর হঠাৎ করেই বড় একটা গেটের সামনে গাড়িটা থেমে গেল / মেয়র সাহেব বললেন এবার আমাদের নামতে হবে / এত রাতে গেট খোলা যাবেনা , আমাদের হেঁটেই ভিতরে প্রবেশ করতে হবে / আমি গাড়িতে বসেই বললাম , মেয়র সাহেব আমার ছোট্ট একটা অনুরোধ আছে / মেয়র সাহেব জিজ্ঞা সু দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে / মুখে তখনো একটা হাসি হাসি ভাব / ভিতরে আমি একাই যেতে চাই , প্লিজ আপনারা দয়া করে এখানেই অপেক্ষা করুন / ওকে ওকে কোন সমস্যা নেই আমরা এখানেই অপেক্ষা করছি / আমি গাড়ি থেকে নেমে ছোট্ট পকেট গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম / প্রায় পাঁচশত গজের লম্বা একটা রাস্তা / রাস্তার দুপাশে বাগান / বাগানে নানা ধরনের গাছ-পালা / রাস্তাটির বা পাশে মাঝা মাঝি জায়গায় ফ্লাড লাইটের আলোয় ঝলমল করছে , সেই আলোর মধ্যেই বেদীতে একটা ব্লেজার পরিহিত মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ভাস্কর্ / আমি আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে সেই ভাস্কর্যের দিকে এগিয়ে গেলাম / কাছে গিয়ে রাভিদ কে চিনতে পারলাম / সেই নাক সেই চোখ হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে / উপরের পার্টির দুটি দাঁত বের করে হাসছে / উপরের পার্টির মাঝের দুটি দাঁতের মাঝে একটু বেশি ফাঁকা / ওর মায়ের দাঁত গুলো এমনই ছিল / ওর মা ছিল আমারি ঘনিষ্ঠ ছোটবেলার বন্ধু র মেয়ে / খুব শখ করে নিজে পছন্দ করে ছেলেকে বিয়ে করিয়েছিলাম / ভাস্কর্য টা র কাছাকাছি গিয়ে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম / একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম রাভিদের মুখের দিকে / রাভিদ তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে মুখ করে / মনে হচ্ছে যেন সে দাদাভাইয়ের সাথে অভিমান করে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে / হঠাৎ করে আমি শুনতে পেলাম , দাদাভাই তুমি আমার গাড়িটা এনেছ ? আমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম / তারপরে জ্ঞান হারিয়ে রাভিদের পায়ের কাছে পড়ে গেলাম /

    যখন জ্ঞান ফিরে এল তখন আমি নিজেকে একটা হাসপাতালে বেডে শুয়ে থাকতে দেখতে পেলাম / প্রথমে আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কেন আমি এখানে শুয়ে আছি / কিন্তু একটু পরেই আমার সবকিছু মনে পড়ে গেল / আমি ঝট করে উঠে বসলাম / দেখতে পেলাম একটু দূরে রেশমা এবং সাবিত্রী মুখটা মলিন করে বসে আছে / মাথার কাছে বসে আছে মেয়র ডেবিট / সেই চিরপরিচিত হাসিটা তার মুখে আর নেই / উঠে বসতেই মেয়র হা হা করে উঠে দাঁড়ালেন / এইতো লক্ষী ছেলের মত জ্ঞান ফিরে এসেছে / যা ভয় পাইয়া দিয়েছিলেন না ? আমি তো ভেবেছিলাম আমার চাকরিটাই বুঝি গেল / অবশ্য এখানকার ডাক্তাররা বলেছে ভয়ের কোন কারণ নেই / আপনার হার্টবিট প্রেসার সব ই নরমাল আছে / অতিরিক্ত মানসিক প্রেসারের কারণে আপনার সিস্টেমটা ফেল করে গিয়েছিল আর কি , আপনি ফ্রিজ হয়ে গিয়েছিলেন / মেয়র আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন তবে ভাই আমি ডাক্তারদের কথা খুব একটা বিশ্বাস করি না / আমার তো মনে হয় এই ডাক্তার গুলা কিছুই বোঝেনা , মনে যা আসে তাই বলে / সব ই যদি ঠিক থাকে তবে অজ্ঞান হয়ে যাবে কেন ? ওকে চলুন আগে আমরা এই হাসপাতাল থেকে পালাই / আপনাকে আপনার আস্তানায় দিয়ে আসি / ও ভালো কথা , আগামীকাল সকাল দশটা এগারোটা মধ্যে আপনার নাতনি আয়েশা বেগম এর একমাত্র নাতনি লিন্ডা হপকিনস আসছে আপনার সঙ্গে দেখা করতে / আজকে হোল্ডে আপনি রেস্টে থাকবেন / আসলে আপনি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে আছেন / প্রচন্ড প্রেসার যাচ্ছে আপনার মনের ভেতর দিয়ে / সুতরাং আজকে পরিপূর্ণ বিশ্রাম নেবেন / শুধু খাবেন আর ঘুমাবেন যেকোনো প্রবলেমে রেশমা ও সাবিত্রী আপনার কাছাকাছি থাকবে ওদেরকে বলবেন / আমি এখন যাচ্ছি / ওকে ব্রাদার হ্যাপি নাইস ডে /

    লিন্ডা যখন আমার রুমে প্রবেশ করলো তখন ঘড়িতে বাজে সকাল দশটা / লিন্ডা এর পেছনে আরো একজনকে দেখতে পেলাম সুন্দর সুদর্শন একটু বোকা বোকা সহজ সরল চেহারার একটি ছেলে / দেখলেই বোঝা যায় বউয়ের একান্ত বাধ্যগত ছাত্র এবং লিন্ডার বাঁ হাতের কড়ে আঙ্গুল ধরে ছোট্ট পুতুলের মত একটা মেয়ে / আমি সোফা ছেড়ে উঠে দাড়ালাম / তাকিয়ে রইলাম লিন্ডার দিকে / জিন্স এর প্যান্ট এবং নীল রংয়ের গেঞ্জি পড়া লিন্ডা আস্তে আস্তে রুমে ঢুকলো , রুমে র ঠিক মাঝ বরাবর এসে থমকে দাঁড়ালো / কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আমার দিকে / আমি ও যেন ফ্রিজ হয়ে গেলাম / তাকিয়ে রইলাম লিন্ডা এর মুখের দিকে / লিন্ডা , আমার আদরের ছোট্ট সেই আয়েশা এর নাতনি / কি আশ্চর্য সেই ছোট্ট আয়েশার এত বড় নাতনি / আমার ভাবতেই কেমন যেন লাগছিল / হঠাৎ করে লিন্ডা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল তারপর কাঁদতে শুরু করল / বড় বাবা সেই তুমি এলে কিন্তু অনেক দেরি করে ফেলেছ / তুমি জানো ? আমার নানু তোমাকে কত ভালোবাসতো ? আমার চোখ দিয়েও তখন জল গড়িয়ে পড়ছিল / লিন্ডা এর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগলাম , মা রে আমার নিয়তি আমাকে আমার এই আদরের ভালোবাসার মানুষগুলো থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল /কেন আমি এরকম অদ্ভুত নিয়তি নিয়ে জন্মেছিলাম তা আমি জানিনা / আমার ভালোবাসার কোন মানুষকেই আমি আমার কাছে ধরে রাখতে পারেনি / কেউ আমার থেকে দূরে সরে গেছে অথবা আমি কারো থেকে দূরে সরে গেছি / লিন্ডা আমার বুকের মধ্যে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো / হঠাৎ দেখি লিন্ডার মেয়েটা একটা টিস্যু এনে আমার চোখের জল মুছে দিচ্ছে / আমি মেয়েটাকে ও জড়িয়ে ধরলাম এবং আমার কান্নার বেগ আরো বেড়ে গেল / একসময় আস্তে আস্তে আমাদের আবেগের মাত্রা কিছুটা কমে এল /লিন্ডা চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে সুস্থির হয়ে বসল / আমাকে বলল আমার কাছে আমার নানুর একটা ডায়েরি আছে / সেখানে তার ব্যক্তি জীবনের অনেক কিছুই লেখা আছে এমনকি তোমাকে নিয়েও অনেক কিছু লিখেছে আমার নানু / আমি ডায়েরি টা নিয়ে এসেছি তোমার জন্য / বলেই সে তার সুটকেসের ভেতর থেকে একটা পুরনো ডাইরি বের করে আমার হাতে দিল / এরপর সে তার মোবাইল খুলে তাদের পুরনো পারিবারিক ছবি আমাকে দেখাতে লাগলো / সেখানে রাভিদ আরিয়া আয়েশা সবার ছবি ই আছে / একটা ছবিতে দেখলাম রাভিদ তার অফিসে বসে কাজ করছে / মাথায় ঝাঁকড়া চুল অ্যাস কালারের একটা ব্লেজার পড়া / আরেকটা ছবিতে দেখলাম আরিয়া একটা ল্যাবরেটরীতে সাদা এপ্রোন গায়ে দিয়ে গভীর মনোযোগের সাথে কাজ করছে / আরেকটা ছবিতে দেখলাম আরিয়া শাড়ি পরে খুব সুন্দর করে সেজেছে একটা সুদর্শন ভুলভাল চেহারার একটা ছেলে পেছন থেকে তার খোপায় বড় লাল রংয়ের একটা গোলাপ গুঁজে দিছে /আমি অনুমান করলাম এটাই আরিয়া র সেই ভালোবাসার মানুষটা / আমি তাকিয়ে রইলাম ছবিটার দিকে / খুব মায়া লাগলো ছেলেটাকে দেখে / ইচ্ছে হলো ছেলেটার নাক টা ধরে একটু আদর করে দিতে / বারবার মনে হতে লাগলো ইস যদি এই সময়টায় আমি ওদের সঙ্গে থাকতাম ? এরপর লিন্ডা ওর নানার ছবি বের করল / অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রলোক / আয়েশা তাহলে বিদেশি ছেলে বিয়ে করেছিল / ছোটবেলা থেকেই আয়েশা এর মধ্যে বিদেশি বিদেশি একটা ভাব ছিল / তার কথা বলার স্টাইল হাটা চলাফেরা কোন কিছুতেই আমার কাছে ওকে বাঙালি মনে হত না / শুধুমাত্র তার হাসিটা ছিল মধুর , খুবই মধুর একজন বাঙালির হাসি / সে বেশিরভাগ সময় মুখ টিপে টিপে হাসতো / সেই ছোট্ট আয়েশা / যে প্রতি মুহূর্তেই দাদাভাইয়ের সাথে দুষ্টুমিতে মগ্ন থাকতো / প্রচন্ড শীতের মধ্যে রুম হিটার টা বন্ধ করে হি হি করে হাসোতো / ছোট্ট মায়াবী আয়েশার মুখটা বারবার মনের ভেতর ভেসে উটছে / আয়েশা এর কথা মনে হলেই একটা কথা আমার খুব মনে পরে / সে সারা দিন দাদাভাইয়ের সাথে দুষ্টুমিতে ব্যস্ত থাকতো/ কিন্তু আবার কিছুক্ষণ পরপরই এসে দাদা ভাইকে জিজ্ঞাসা করতো / দাদাভাই আমি গুড নাকি ব্যাড ? যদি আমি বলতাম তুমি ব্যাড / তাহলে আবার রাগ করতো / কিন্তু যদি আমি বলতাম না তুমি গুড তাহলে খুশি হয়ে একটা হাসি দিত / অনেক সময় শুধু তার এই হাসিটা দেখার জন্যই আমি বলতাম তুমি ভেরি গুড / তারপর সে আনন্দে গদগদ হয়ে আমার কাছে এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলতো দাদাভাই তোমাকে আমি একটা কথা বলবো / আমি বলতাম ঠিক আছে বল / সে বলতো না না আমি তোমার কানে কানে বলবো / আমি বলতাম আচ্ছা ঠিক আছে কানে কানে ই বল / সে কানে কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলতো / দাদাভাই তুমি কিন্তু ব্যাড / বলেই আবার দৌড় / এই সেই আয়েশা / আমি অতীত জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম / কি দুর্ভাগ্য আমার / এই আনন্দঘন সময়গুলোতে আমি কোথায় কোন দূর অজানায় হারিয়ে গিয়েছিলাম / হঠাৎ করে ই আমার লি এর কথা মনে পরে গেল / আচ্ছা লি এখন কেমন আছে ? লি একদিন আমাকে একটা কথা বলেছিল সে জানতে চেয়েছিল যেদিন আমি আমার প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাব তখন তাকে আমার মনে থাকবে কিনা ? আমি বিড়বিড় করে বলতে থাকলাম না লী তোমাকে আমি ভুলিনি / কিভাবে ভুলবো আমি ? তুমি বিনে আমার মনের ভেতরটা তো একদম ফাঁকা , আর কেউ তো নেই সেখানে / আমার হৃদয়ের সম্পূর্ণটাই আমি তোমার কাছে ফেলে এসেছি / লিন্ডা হঠাৎ আমাকে মৃদু একটা ঝাঁকুনি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো কি ভাবছো তুমি ? অমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম / মুখে বললাম না না কিছু না কিছু ভাবছি না আমি / লিন্ডা আমাকে বলল তুমি তোমার সবকিছু গুছিয়ে নাও / তোমাকে আমি আমার সাথে নিয়ে যাব / তুমি এখন থেকে আমার কাছেই থাকবে / আমি গভীর একটা মমতা নিয়ে লিন্ডার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম / আমার চোখ দুটো কেন যেন আবার ভিজে উঠতে চাইছে / চোখের সেই জল লুকোতেই চোখেমুখে জলের ঝাপটা দেওয়ার ভান করে বাথরুমে ঢুকে গেলাম / আমি সাবিত্রী এবং রেশমাকে ওই রাতের জন্য ছুটি দিয়ে দিলাম / ওদের রুমে লিন্ডার স্বামী এবং মেয়ের বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিলাম / সারারাত লিন্ডা আমার সাথে বসে বসে গল্প করল / ওর বাবার কথা , মার কথা , খালা মামা সবার কথা , সে গল্পের যেন শেষ নেই , ওর নানু নাকি খুবই রাস ভারী টাইপের মানুষ ছিল / / আয়েশা খুব রাশভারী টাইপের মানুষ ছিল ? কথাটা শুনেই কেমন যেন আমার হাসি পেতে লাগলো / যে মানুষের দুষ্টামি তে আমি প্রতিমুহূর্তে তটস্থ থাকতাম সে নাকি রাশভারী টাইপ এর মানুষ ছিল ??? কি আশ্চর্য / আমি আমার ছেলে দুটির কথা জানতে চাইলাম / লিন্ডা ওদের ছবি বের করে দেখালো / সেই মাথাভর্তি চুল ওয়ালা রাজিব এর মাথায় এক গাছি চুল ও নেই / ইয়া লম্বা দাড়ি / তবে সজীবের মাথায় কিছু চুল আছে তবে সম্পূর্ণটাই কাশবনের মত ধবধবে সাদা / দাড়িগুলো কিছুটা সাদাকালোর মিশ্রন / আমি ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম / আমার চোখ দুটি দিয়ে জলের ধারা বইতে থাকলো / কথা বলতে বলতে ভোরের দিকে ক্লান্ত হয়ে সোফাতে ই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম / হঠাৎ ফোনের শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় তাকিয়ে দেখি লিন্ডা কার্পেটের উপর একটা কুশনের উপর মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে / আমি তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে রিং টোন টা মিউট করে দিলাম তারপর ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলাম আননোন নাম্বার / বোতাম টিপে ফোনটা রিসিভ করতেই ভেসে এল গুড মর্নিং স্যার , নাসা থেকে বলছি ,আমাদের মহাপরিচালক স্যার আপনার সঙ্গে কথা বলবেন , প্লিজ ওয়েট এ মমেন্ট / আমি ওপাশ থেকে খুব সুন্দর একটা মিউজিক ভেসে আস তে শুনলাম / একসময় মিউজিক টা বন্ধ হয়ে গেল নাসার মহাপরিচালকের কন্ঠ শুনতে পেলাম / কেমন আছেন আপনি ? নিশ্চয়ই আপনার অস্ট্রেলিয়ার সমস্ত কাজ শেষ হয়েছে / আপনি যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি আমেরিকাতে ফিরে এসে আমার সঙ্গে দেখা করুন / মেয়র ডেবিট আপনার সব ব্যবস্থা করে দেবে / ঠিক আছে ? আপনার সঙ্গে আমার জরুরী মিটিং আছে / আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি / আমি উত্তরে বললাম ওকে আমি আসছি / লাইনটা কেটে গেল / আমি ফোনটা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম / যখন ঘুম থেকে উঠলাম তখন সকাল নয় টার কাছাকাছি / দেখলাম আমার আগেই সবাই ঘুম থেকে উঠে গেছে / রেশমা এবং সাবিত্রী ওরাও চলে এসেছে / লিন্ডার ছোট্ট মেয়েটা আমার মাথার কাছে বসে আছে / লিন্ডার স্বামী সাবিত্রী ও রেশমা এর সাথে বসে গল্প করছে / আর লিন্ডা সদ্য গোসল সেরে একটা টকটকে লাল রঙের গেঞ্জি এবং কাল একটা প্যান্ট পড়েছে / লিন্ডা কে দেখতে খুবই সুন্দর লাগছে / আমি লিন্ডার মাথাভর্তি চুল গুলোকে ধরে এলোমেলো করে দিয়ে আদর করে দিলাম / লিন্ডা হাসতে থাকলো / মুখে বলল বড় বাবা তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও খুব খিদে পেয়ে গেছে / (চলবে)

    #Shahadat

    7
    2 Comments
Skip to toolbar