-
গল্প:-আমার বন্ধু বকুল(সত্যি ঘটনা অবলম্বনে)
–রাসেল আদিত্য।বকুল,আমাদের অভিমানী বন্ধুর নাম।আজ খুব বেশী মনে পড়ছে বকুলকে।
আমার স্পষ্ট মনে আছে বাইশ বছর আগের সেই রাতের কথা।সেদিনও বন্ধুরা সবাই অন্য দিনের মতো সন্ধ্যায়
একে একে জড়ো হয়েছিলাম কুঁড়িবাড়ী পুকুর ঘাটে,আমাদের নিয়মিত আড্ডাস্থলে।
সবাই মিলে সেদিনও জেমস-বাচ্চু-হাসানের গানে
মেতে ছিলাম রাত প্রায় দশটা অবধি। বকুলও ছিলো,
তবে আমাদের সাথে কোরাস ধরেনি সে।
সবার কাছ থেকে একটু দূরত্ব রেখে সে ঘাটের সিঁড়ির নীচের দিকে বসেছিলো।
মাখন আর আমি একবার ওর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম,কিরে কি হইছে?
বললো, না কিছুনা।
মাখন ওর স্বভাবগতভাবেই বললো-
তাইলে এইনে(এদিকে) থোম ধইরা বইয়া রইছস ক্যান?
বকুল কোন উত্তর না দিয়ে পুকুরের জলের দিকে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েছিলো।
তারপর আড্ডা শেষে আমরা সবাই যখন নিজ নিজ বাড়ীর পথ ধরেছি,
চালতা তলায় এসে আমি বকুলকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।অথচ পুকুরের সবচেয়ে কাছে ওর বাসা।
আমি ওর কাছে গেলাম,
সিগারেট অফার করলাম,
বকুল সিগারেট জ্বালিয়ে লম্বা একটা টান দিয়ে
উপর দিকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললো,
রাসেল, মানুষের জীবন কতো অদ্ভুত তাইনা?
আমি বললাম,যেমন?
যেমন এতো সুন্দর দুনিয়া অথচ আইজ মরলে কাল দুইদিন….!
আমি দুষ্টুমির ছলে বললাম,
হঠাৎ দেহতত্ত্বে চইলা গেলা ক্যান বন্ধু?
বকুল নিরুত্তর থেকে একটু পরেই বললো,
সতেরো দিন পর আজ বিকালে রাত্রীকে দেখলাম।
আমি বললাম,পরের বউরে দেইখা কি লাভ বন্ধু?
রাত্রীকে ভুলে যাও বকুল।
বড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে উদাস গলায় বললো
হ বন্ধু, প্রেম কি বুড়া অয়?দেহা হইলেই মনে হয়।
আমি কথা বাড়াইনি আর।
কেননা রাত্রী-বকুলের প্রেম নিয়ে অনেক কিছু ঘটেছে গত দুই বছরে।ওদের ভালোবাসা সেই ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু।
দুজন দুজনকে ভালোবাসলেও বাস্তবতা হলো রাত্রী এখন অন্যের স্ত্রী।রক্ষনশীল পরিবারের মেয়ে রাত্রী পরিবারের সকলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বকুলকে ভালোবেসেছিলো।অনেক শারীরিক ও মানসিক টর্চার সহ্য করেও ওরা অবিচল ছিলো।ওদের প্রেমকাহিনী আজো ঐ এলাকায় কিংবদন্তি হয়ে আছে।যদিও শেষ রক্ষা হয়নি।এই গল্পের উদ্দেশ্য ভিন্ন, তাই সম্পর্কের বিশদ বিবরণ দিচ্ছিনা।
যাইহোক রাত্রীর বিয়ে হয়ে যাবার পর বকুলকে সামলাতে ওর পরিবার ও আমরা বন্ধু সার্কেল অনেক হিমশিম খেয়েছি।
গেলো কিছুদিন ধরে বকুলকে সবাই স্বাভাবিক হতে দেখে আমরা বন্ধুরা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম,
রাত্রী প্রসঙ্গে বকুল কাউকে কিছু বললে আমরা
কেউই যেনো বিষয়টি গুরুত্ব না দিই,
প্রসঙ্গ বদলে ফেলি বা চলে যাই।মূলতঃ রাত্রীর স্মৃতি ভুলিয়ে রাখতেই ঐ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।তো চালতা তলায়
বকুল রাত্রীর কথা বলায় আমিও বকুলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিলাম আমার বাসায়।পরদিন ভোর সকাল…..
“ও রাসেল,আরে ঐ রাসেল ওঠসনা ঘুম থেইকা
আরে বকুলে না ফাঁসি দিছে!”
আম্মুর ঐ কথা আর আমার গায়ে ধাক্কা মিলিয়ে
কি যে এক ভয়ানক অনুভূতি হয়েছিলো আমার তা আজো অনুভব করি আমি।
ধরফর করে উঠে বসি,পুরো শরীর কাঁপছিলো আমার।
আম্মুকে বলি-
কি হইছে?
আরে বকুলে না ফাঁসি দিছে…..!
মহিলা ঘাটের সামনে কড়ই গাছে বকুলের লাশ…!
আম্মু আর কিছু বলেছিলো কিনা জানিনা
আমি ঐ অবস্থায় এমনকি জুতো ছাড়াই দৌড়,
রাতের সেই চালতা তলা থেকে মহিলা ঘাটে শত-শত মানুষ দাঁড়িয়ে।
সামনে এগিয়ে যাই আমি।দেখি-
জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য আমার চোখের সামনে।
কড়ই গাছের ডালে গামছা পেঁচানো গলায়
ঝুলে আছে বকুল,আমার বন্ধু বকুল,
আমাদের বন্ধু বকুল!
জিভটা একটু বেড়িয়ে আছে।বন্ধুদের ভেতর আমিই আগে
গিয়েছিলাম সেখানে।আমার বাসার খুব কাছেই ছিলো।
খানিক পরে মাখন এলো।আমি কিংকর্ব্যবিমূঢ় হয়ে বকুলের ঝুলন্ত দেহটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।মাখন এসে
আমাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে বলে ওঠে,
আরে বকুইল্যায় ঝুইল্যা রইছে আর তুই চাইয়া চাইয়া দেখতাছস?আরে ওরে ধর।ওর কষ্ট হইতাছে বলেই মাখন গিয়ে বকুলের পা জড়িয়ে ধরে আমাকে গলার গামছা খুলতে বলে।
উপস্থিত মুরব্বিরা এটা করতে আমাদের নিষেধ করে।
বলে,মালেক চেয়ারম্যানরে খবর দিছি হেয় ঢাকা থেকে আইতাছে।পুলিশ বা চেয়ারম্যান আসার আগে কেউ লাশ নামাইস না।ভেজালে পড়বি।
মাখন তো এটা মানবেই না।ওর একটাই কথা,
আমার বন্ধু হেগো আশায় এমনে ঝুইল্লা থাকব আর সবাই
তামশা দেখব?
পুলিশ আমারে ধইরা নিলেও আমি ওরে এমনে ঝুইলা থাকতে দিমুনা।শেষ পর্যন্ত মাখনের বাবা এসে ওকে নিবৃত্ত করে।
চেয়ারম্যান, পুলিশের আসা,পোষ্টমর্টেম,জানাজা,দাফন শেষে রাত সাড়ে বারোটায় বন্ধুরা সবাই সেই ঘাটে বসে।
কারো মুখে কথা নেই। কিন্তু আমার মনে হাজারো আফসোস খোঁচা দিচ্ছে।
ইশ্,আমি রাতে কেনো ওর সাথে আরও সময় দিলাম না?
কেনো ওঁর আইজ মরলে কাইল দুইদিন কথাটা গুরুত্ব দিলাম না?কেনো রাত্রীকে নিয়ে কি বলতে চাইলো আমি তা শুনলাম না?
আমার বারবার মনে হচ্ছিলো,
যদি রাতে আমি ওকে সঙ্গ দিতাম তাহলে হয়তো ও আত্মহত্যা করতোনা।আমার কাছে কষ্ট বলে ও হয়তো হালকা হতো।এমনই নানান যদি কিন্তু নিজেকে অপরাধী বানিয়ে দিচ্ছিলো।
আমরা সবাই এটাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না,
আত্মহত্যা করার সময় ছিলো রাত্রীর বিয়ের সময় বা পরের কয়েকদিন।একবার কতগুলো স্লিপিং পিল খেলেও পরে বকুল স্বাভাবিক হয়ে এসেছিলো।প্রায় তিনমাস পর কেনো সে আত্মহত্যা করলো?
আমাদের কাছে এই প্রশ্নের কোন উত্তর ছিলোনা।সাত মাস পর…..…!
আমি নারায়ণগঞ্জে ফিরে এসেছি।
চাষাঢ়া মহিলা কলেজের পাশে রেললাইনে দাঁড়িয়ে আছি।
হঠাৎই একটি কলেজ ড্রেস পড়া মেয়ে এসে আমাকে বললো,ভাইয়া রাত্রী আপু আপনাকে ডাকে।
বললাম, কোন রাত্রী?
বলে আপনি এলেই দেখতে পাবেন কোন রাত্রী।
মনে পড়লো বকুলের রাত্রীর তো নারায়ণগঞ্জেই বিয়ে হয়েছিলো।ঐ রাত্রী নয়তো?
আমি মেয়েটার সাথে চাষাঢ়া রেলস্টেশনের দিকে গেলাম।
হ্যাঁ এটা বকুলের রাত্রীই ছিলো।কুশল বিনিময় শেষে আমি ওদের দুজনকে নিয়ে কলেজ রোডের এক আন্টির বাসায় যাই।বাসায় গিয়ে রাত্রী মুখ থেকে বোরকা সরাতেই দেখি ওর দুই চোখ লাল হয়ে ফুলে আছে।বোঝাই যাচ্ছে সে অনেকক্ষন ধরে কাঁদছে।
আমি ওকে স্বান্তনা দিয়ে বললাম,কেঁদোনা বোন।
আমার ভুলের জন্য আজ বকুল নেই। আমি যদি-
এটুকু বলতেই রাত্রী আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
না রাসেল ভাই।ওর মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী।
মৃত্যুর আগের দিন বিকালে ওর সাথে আমার দেখা হয় মন্জুদের বাসায়।আমাকে দেখে ও বলে,
আমি বেঁচে আছি তোমার আশায়।এই বিয়া আমি মানিনা।
চলো আজ রাতেই আমরা পালিয়ে যাই।
আমি বলি,না এটা সম্ভব না আর।তুমি আমাকে ভুলে যাও।
আমাদের ভাগ্যে মিলন নেই।আমি এটা মেনে নিছি,তুমিও মেনে নাও।বকুল মানছিলোনা আমার কথা।শেষে হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলো,তুমি কয়দিন থাকবা?
বললাম পরশু চলে যাবো।
ও বললো তুমি এখন আমারে ফিরাইয়া দিলে আমি সুইসাইড করমু।আমি ভেবেছিলাম আমাকে রাজি করাতে ও এটা হুমকি দিচ্ছে।আমি বললাম,তবুও কিছু করার নেই।
এটা বলেই আমি মন্জুদের বাসা থেকে বেড়িয়ে আসি।
পরদিন সকালে শুনি সত্যিই………!
কান্না গলায় রাত্রী বলছিলো,কি ভুল আমি করলাম।
যদি জানতাম সত্যিই ও এটা করবে তাহলে তখনই আমি ওর সাথে পালিয়ে যেতাম।গল্পটা আর বড় করছিনা।
গল্পের টুকিটাকি:-
# এটা সত্যি একটি ঘটনা
#ঘটনাকাল ২০০১ ইং
**বর্নিত চরিত্রের সকলের নামও সঠিক।শুধু রাত্রীর নামটি ছদ্মনাম রেখেছি যৌক্তিক কারণেই।
****ঘটনাস্থল মুন্সীগনজ সদর এলাকা।প্রিয় পাঠক,
পৃথিবীতে ভালোবেসে আত্মাহুতি দেওয়া প্রায় সকল নারী পুরুষই প্রিয়জনকে আত্মহত্যার ওয়ার্নিংটা দেয়।কিন্তু সকল প্রিয়জনই গল্পের রাত্রীর মতো ওটা ভয় দেখানো বা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল মনেকরে গুরুত্ব দেয়না।
কিন্তু তারা একবার ভাবেনা,সবাই এক হয়না।মন থেকেও বলে অনেকে।পরে যখন সত্যিই বকুলের ভাগ্যবরণ করে তখন হুঁশ ফেরে রাত্রীর মতো।
তাই আপনাদের কাছে হাতজোড় মিনতি করি
প্রয়োজনে অভিনয় করে হলেও আত্মহত্যার হুমকি দেয়া মানুষটিকে বিশ্বাস করুন।তাঁকে সঙ্গ দিন,বোঝান।
রাতারাতি না বুঝলেও একসময় সে বুঝবেই।কেননা সে তো আপনাকে ভালোবাসে।দিনশেষে আপনার ভালো থাকাটাই তার কাছে মূখ্য হয়ে উঠবে।
ভালোবাসা যদি রিয়েল হয়,সেটা থেকে বেড়িয়ে আসা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ।তাই চেষ্টা করুন রিয়েল লাভকে পূর্ণতা দিতে।
আপনি সুখী হবেন ইনশাআল্লাহ।সবাই ভালো থাকবেন।
#রাসেল_আদিত্য
Friends
Al-Masud
@al-masud
Anup Dey
@anup-dey
Mitul hasan
@mitul
Masfi K
@masfi-mohammad
সালমান সাদিক
@salmansadique
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
Md. Arif Hossain
@arifhossain
আকরাম খান
@akram_khan
দুনিয়া মামুন
@duniamamun
