-
কিয়ামুল লাইল বা রাতের নামাযে দীর্ঘক্ষণ সিজদায় কাটানো তরীর নিত্যকার বিষয়। এই তো একটা জায়গা যেখানে আমার আমিটাকে প্রকাশ করতে পারে সে। মন খুলে কাঁদতে পারে। তরীর রুমটা সাউন্ড প্রুফ করে বানিয়েছিল যেন কান্নার শব্দ ঘরের বাইরে না পৌঁছায়। অন্তরের দহনটুকু কাউকে বুঝতে দিতে চায়না সে।
-ক্রিং ক্রিং!
মোবাইলে কল আসায় হাতঘড়ির শব্দে চোখ মেলে তাকায় তরী। আজকাল নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়ছে সে। ঘুমিয়ে পড়ছে নাকি চেতনা হারাচ্ছে এনিয়ে ঈষৎ চিন্তার ভাঁজ পড়ল তার ললাটে। গতকালও এমন হয়েছে। টরেন্টো ছাড়ার আগেও ২/৩ দিন এমন আচমকাই ঘুমিয়ে গেছে মনে হয়েছে তার। গতরাতে নামায শেষ করে কিছুক্ষণ কুরআন তিলওয়াত করে ফজর আদায় করে রিডিং রুমে গিয়েছিল তরী। রিডিং রুমে রাখা তার ধূসর মলাটের নীল ডায়েরিটা নিয়ে চেয়ার টেনে বসেছিল সে। পাতা উল্টাতেই যেন সব স্মৃতি জীবন্ত হয়ে চোখে অশ্রুর জানান দিচ্ছিল। কিন্তু তারপর কি করে ঘুমিয়ে পড়ল সে কিছুতেই মনে করতে পারছে না। রিডিং রুমে মোবাইল এলাউ করেনা তরী। ইমার্জেন্সি কল বুঝার জন্য ঘড়িতে কিছু স্পেসিফিক নাম্বার কানেক্ট করে রাখে। ঘুমানোর কারণ নিয়ে ভাবা বন্ধ করে কল রিসিভ করে তরী-
-কিরে তরী! তুই ঠিক আছিস ত?কল রিসিভ করিস না কেন! এই নিয়ে ১১ টা কল দিয়েছি! সেই যে চার্চে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি গেলি, আর কোনো খবরই নিলি না! আমারও কিছু চিন্তা হয় নাকি!
এতক্ষণ মোবাইলের ওপাশ থেকে ক্ষোভ মেটাচ্ছিল তিয়াশ। গতকালের পর আর যোগাযোগ হয়নি তাদের।
তরী: আরে! আমাকে বলতে ত দিবি! এতদিন পর বাড়ি ফিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই আর জানানো হয়নি।
তিয়াশ: তা কি নিয়ে ব্যস্ত হলি শুনি? তোর সেই ভাবনা? আচ্ছা, কি এত ভাবিস রে একা একা? তোর ভাবনার কিছু আমাকে দে না?
তরী: হাসপাতালে দেখা হচ্ছে তিয়াশ। রাখছি এখন।তরী কল কেটে দিতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিয়াশ। তরী কি কখনো তার না বলা কথা বুঝবে না? কি এত ভাবনা তার?
-ময়না, এই ময়না!
-জ্বি, ছোটআপা!
-বড়াপ্পার ঘরে মাকড়সা জাল বুনেছে। ঘর পরিষ্কার করে বিছানায় নতুন চাদর পেতে দিস।
মাথা নাড়িয়ে সায় দেয় ময়না।
-আমি বেরুচ্ছি। সাবধানে থাকবি। কিছু দরকার হলে আলী চাচাকে বলবি।
-নাস্তা করবেন না আপা?
-আমি রোযা রেখেছি ময়না।
-ইফতারে কি খাইবেন আপা?
-চিঁড়া আর টকদই।
-দেশি মুরগীর ঝোল রান্ধি আপা? কাঁচাপেপে দিয়ে?
-আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হোস না ময়না। খাবার খেতে খুব একটা ইচ্ছা করেনা। তোর আর আলীচাচার জন্য রান্না করিস।এটুক বলেই বেরিয়ে পড়ে তরী।
তরী: এই ময়না! আর দুটো লুচি ভেজে আন ত। ও! আলুর দমটা যা হয়েছে নারে! তুই একটা হোটেল দিয়ে দে রে! ময়নামতির লুচির হোটেল!
ময়না: কি যে কন না আপা! আপনেরা আয়েশ কইরা খান, তাতেই খুশি আমি।
বেলী: নারে ময়না। তোর রান্না দিন দিন সত্যিই অসম্ভব ভালো হচ্ছে। মাশাআল্লাহ। কটা আয় রোজগার হলে ক্ষতি কি? তুই রান্না করে দিবি, আর একজন লোক রাখবি, সে দোকানদারব করবে।
তরী: একদম তাই।
ময়না: কি যে কন আপারা! আর দুইটা লুচি দিই?
বেলী: দে দে। ফুলকো দেখে দিবি।ময়না! এই ময়না! বারান্দার গাছগুলোয় পানি দিছোস?
আলী চাচার ডাকে আঁচল দিয়ে চোখ মুছে ভাবনা থেকে ফিরে আসে সে। একসময় এই ডাইনিং রুম কত মুখরিত ছিল। আজ সব কেমন নিস্তব্ধ! প্রাণ থেকেও যেন মৃতবাড়িময়!.
.
.
-তোর সাথে আমার কথা আছে তরী!
তন্বীর শীতল স্বরে সারাগায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তরীর।
তরী: আমি যা করেছি তোর ভালোর জন্য তন্বী!
তন্বী: ভালোর জন্য? আমার ভালো? তুই কি মনে করিস আমি কিচ্ছু বুঝিনা? আমি যাতে শক্তিমান হতে না পারি তার জন্যই তুই সব করেছিস। হিংসা তোর মনে!
ঘর কাঁপিয়ে চেচাতে থাকে তন্বী!
তরী: বিশ্বাস কর তন্বী! এসব শক্তি বলে কিছু হয়না। ওরা তোকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। তোর ইমান নষ্ট করছে। আমার কথাটা শোন তন্বী।প্লিজ!
তন্বী: তোর কোনো কথা আমি শুনবো না তরী! আজকে থেকে তোর সাথে আমার কোনো বন্ধুত্ব নাই।
তরী: তন্বী!-১১ টায় একটা ওটি আছে ম্যাম!
বৈশাখীর কথায় ভাবনা ছেড়ে তার দিকে তাকায় তরী। বৈশাখী মেয়েটা সবে ইন্টার্নী শেষ করে এম ফিল শুরু করেছে। তরীর আন্ডারে থিসিস কম্প্লিট করবে সে। সকাল ১১ টায় ওটি আছে জানাতে এসেছে।
তরী: কোন পেশেন্টের ওটি হবে?
বৈশাখী: ১২০ নং বেডের পেশেন্ট ম্যাম।১২০ নং বেড! তরীর অন্তর জুড়ে সেই চেনা অজানা অস্থিরতায় অবশ হয়ে আসছে। না! আর না। এবার এর একটা সমাধান তাকে করতেই হবে। একথা ভেবেই কাজে মন দেয় সে।
~রুম নাম্বার ১২০
পর্ব ৬1 Comment
Friends
Sourav-Roy
@sourav-roy
সাইমূম ইভান
@syed-symoom-anjum-evan
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
আর্য্য সপ্ত দর্শী
@nandini
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ] [ জাকের আদিত্য ]
@md-zaker-hayat-khan
Motiur Rahman Mizan
@dressed-human
নির্বোধ সুদীপ্ত
@sajalbhowmick
আয়েশা সিমা
@ayesha-sima
মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী
@mehedi_mahmud_chowdhuri

Nice