-
পর্ব ৮
~রুম নাম্বার ১২০লুতফুৎন্নেসা হলের বাতাস তিলওয়াতের ধ্বনিতে মুখরিত। চারপাশ কর্পূরের গন্ধে ম ম করছে। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে পিন পতন নিরবতা। সেই মানুষটাকে নিয়ে একদিন হাসি তামাশায় মেতে উঠেছিল পুরো হোস্টেল, সেই মানুষটা কি নিদারুনভাবে ঘুমাচ্ছে! কোনো সাড়া নেই। ক্লাসে যাবার তাড়া নেই। নেই কোনো ব্যস্ততা! মৃত্যু কি ভয়ানক সত্য! কি ভীষণ চুপিচুপি এসে চারপাশটাও চুপ করিয়ে দেয়!
শুক্রবার জুমুআর নামাযের পর তন্বীর দাফনের জন্য গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় হোস্টেল সুপারসহ আরও কয়েকজন।
ক্যাম্পাসে যে যার যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। হয়তো ২/১ দিন পরে তন্বী নামটাও মনে থাকবেনা কারো। কিন্তু এই নিরবতার একক সাক্ষী রুম নাম্বার ১২০! রুমের সামনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে ১২০ লেখাটা দেখছে তরী। আজ থেকে এই রুমে সে একা থাকবে। অপমৃত্যুর জন্য এক্ষনি কেউ আসতে চাইবে না রুমে। থাকবেনা কোনো মুখরতা। রোজ সন্ধ্যা হলেই কেউ জোরে জোরে গলা ফাটিয়ো পড়ে তরীর কান ঝালাপালা করবেনা। ধুপধাপ শব্দ করে হুলুস্থূল চলাফেরা করে কেউ তরীর ঘুম ভাঙাবে না। জ্বর হলে কেউ হল স্পেশাল শাহী সেমাই বানিয়ে মাথার কাছে অপেক্ষা করবেনা। তরীর বইয়ের বুকমার্ক বের করে কত পাতা পড়ল তার হিসাবে কেউ গন্ডগোল করবেনা। মাথা চাপ ধরে গেলে কেউ নারকেল তেল গরম করে আনবেনা। পুরো ঘটনায় তরী যেন একেবারে নিথর হয়ে গেছে। কিছুতেই যেন হিসাব মিলাতে পারছে না। এই তো গতকাল রাতেই ফরেনসিকের অটোপসি চ্যাপ্টারটা পড়ছিল দুই রুমমেট মিলে। পড়তে পড়তে কত আধ্যাত্মিক আলোচনাও করল দুইজনে! মানুষ কেন এমন করে মরে যে তার ছোট্ট শরীরটা একদম ক্ষত বিক্ষত করে কাটা হয়! এসব ভেবে কত মন খারাপও করল দুইজনে! আর আজ সকালেই এমন ঘটনা কি করে ঘটতে পারে?
(তরীর ছোটফুফু থাকে শহরে। ফুফু হাইপ্রেসারের রোগী। গতকাল পড়া শেষ করে সবে রাতের খাবারের জন্য ডাইনিং এ যাবে, তখনই মুঠোফোনে কল আসে তরীর ফুফাতে ভাই তাকবীরের। তাকবীর জানায় ফুফু সেন্সলেস হয়ে গেছে। খবর পেয়েই একটা রিক্সা নিয়ে ছুট দেয় তরী। রাতটা ফুফুর বাসাতেই ছিল সে। মাইল্ড স্ট্রোক করেছে ফুফুর। তাকবীর অনেকটা নিজের অমতে মায়ের কথা রাখতে বিয়ে করেছিল মায়ের পছন্দ করা কিশোরী এক মেয়েকে। খুব ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু তাকবীরের ছেলে জন্মের সময় প্রসব পরবর্তী জটিলতার সাথে লড়াইয়ে হেরে যায় ১৮ বছর বয়সী মেয়েটা! ছোটবেলা থেকে মেয়েদের সাথে অপ্রয়োজনে কথাও বলেনা তাকবীর। কাজিনদের মধ্যে তরীর সাথেই যা একটু কথাবার্তা হত। তাও খুশল বিনিময় পর্যন্ত। তাকবীর ছিল গণিতে ভীষণ চৌকস। তরীরও ছিল গণিতে দারুন কৌতূহল। তাকবীর তাই তরীকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার প্রশ্ন এনে দিত সমাধান করার জন্য। এজন্যই বাকি ভাইবোনদের তুলনায় তরীর সাথে তার বেশি যোগাযোগ হত। বুয়েটে পড়ার সুবাদে তরীদের বাসায় ছুটির দিনে বেড়াতে আসত তাকবীর। তরীর গণিতের পান্ডিত্য মুগ্ধ করত তাকবীরকে। সে অবাক হয়ে দেখত ছোট্ট মেয়েটা নিজের মত করে প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়েও কি করে সব সমাধান করে! একটা ভালোলাগা তৈরি হয় অজান্তেই। কিন্তু সেই কথা কখনও সাহস করে বলে উঠতে পারেনি তাকবীর। সে বোঝে তরী তাকে বড়ভাইয়ের মত শ্রদ্ধা করে। সে চাইনি তরীর চোখে অসম্মানের হতে। তাই নিজের মনকে কড়া শাসন করে মায়ের পছন্দকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। বিয়ের পর দাম্পত্য জীবনও বেশ ভালো চলছিল তাদের। তার স্ত্রী ছিল অসম্ভব রূপসী আর গুণবতী। তাকবীর তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। তাই সে মারা যাবার পর আর বিয়ে করেনি। মানসিকভাবে প্রচন্ড ভেঙ্গে পড়েছিল যদিও। একা হাতে ছোট্ট আয়ানকে মানুষ করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তাই আয়ানের ৫ বছর পর্যন্ত সে বেলী আর তরীর কাছেই ছিল। তরী মেডিকেলে ভর্তির পর আয়ানকেও আবাসিক মাদ্রাসাতে ভর্তি করানো হয়। বেলীকে বড়আম্মু আর তরীকে ছোটআম্মু বলে ডাকে আয়ান। প্যারেন্টস ডে তে গিয়ে আয়ানকে দেখে আসে তরী।
ফুফু গতকাল ঘর গোছাতে গিয়ে তাকবীরের ডায়েরিটা পায়। সেখান থেকেই জানতে পারে তরীর প্রতি ছেলের দুর্বলতার কথা। নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হতে থাকে তার। সে তাড়াহুড়া না করলে হয়তো ছেলেটা তার মনের কথা বলতে পারত। হয়ত আজকে তার ছেলের জীবনটা অন্যরকম হত। এসব ভেবেই স্ট্রোক করেছেন তিনি।
আয়ানের মা মারা যাবার পরে তরী জানতে পারে নিজেও। সে নিজেও একদিন ডায়েরিটা হাতে পেয়েছিল। খোলা ছিল বলে চোখ পড়ে গেছিল। তাই ফোনে যখন তাকবীর ভাই বলছিল, ঘর গোছাতে গিয়ে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। তখনই কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে তরী। সে জানে তাকবীর ভাই কত অগোছালো। তাই খবরটা পেয়েই দৌঁড়ে গেছে ফুফুর কাছে।
সারারাত অবজারভেশনে রেখে আশংকামুক্ত বলে সকালে ক্যাম্পাসে ফিরেছে তরী। আপাতত এসব নিয়ে কথা না বলাই ভালো মনে করে। ফুফু সুস্থ হলে একদিন বুঝিয়ে বলবে যে তাকদীরে এমন করে হয়তো নিক্ষেপ করা বড় গুনাহ!)
কিন্তু ক্যাম্পাসে ফিরে এমন একটা ঘটনা দেখবে কখনও ভেবেছিল সে?-আম্মা? গেট খুলছি!
আলী চাচার ডাকে ভাবনা থেকে ফিরে গাড়ি পার্ক করে বাড়িতে ঢুকলো তরী। সবগুলো ওটি শেষ করতে করতে বিকাল হয়ে গিয়েছিল। আসরের নামায হাসপাতালেই আদায় করেছে। নিজের রুমে জায়নামায রেখে দিয়েছে তরী। যেন কাজের জন্য নামায কাযা না হয়। তিয়াশ শেষ ২ টা ওটিতে এসিস্ট করেছে বলে কিছুটা চাপ কমেছে তরীর। বাড়ি ফিরতে ফিরতে পুরো রাস্তা তরী তখনকার ঘটনাটা নিয়ে ভেবেছে। তরীকে চিন্তিত দেখে তিয়াশও কিছু জানতে চায়নি। তিয়াশই ড্রাইভ করছিল। চার্চে তিয়াশকে ড্রপ করে বাকি পথ তরী নিজেই ড্রাইভ করেছে। নামায পড়ে আলী চাচা কুরআন তিলওয়াত করছিল বলে তরী আর গেট খোলার জন্য হর্ন দেয়নি। অপেক্ষা করছিল। তক্ষনি ভাবনায় ভেসে ওঠে তন্বীর মৃত্যুদিনটা!1 Comment
Friends
Sourav-Roy
@sourav-roy
সাইমূম ইভান
@syed-symoom-anjum-evan
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
সা দি য়া (নন্দিনী)
@nandini
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ] [ জাকের আদিত্য ]
@md-zaker-hayat-khan
Motiur Rahman Mizan
@dressed-human
নির্বোধ সুদীপ্ত
@sajalbhowmick
আয়েশা সিমা
@ayesha-sima
মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী
@mehedi_mahmud_chowdhuri


গল্পের মাঝখান থেকে শুরু করলাম পড়া। খুব ইন্টারেস্টিং মনে হল। তাই ভাবছি শুরু থেকে শুরু করব এবার।