-
‘ধানঘড়া’
– পি কে সরকার
কানাই স্বপ্নে প্রায় ছবির মত একটা গ্রামের দৃশ্য দেখে। এ গ্রামের উত্তর দিকে রাঙ্গা মেঠো পথ। দক্ষিণ দিকে মাঠের মাঝ দিয়ে সরুপথ।
উত্তরের সড়কের পাশে বেশ কিছু জাম গাছ। সেই গাছ তলে মার্বেল খেলছে সখাদের সাথে। পূর্বের বড় দিঘীতে সাঁতার কাটছে। গ্রামের সব বাড়ি মাটির তৈরী। খড়ের দু’চালা ছাউনি।
সবুজ সাগরের মাঝে ছোট্ট একটি দ্বীপের মত। পূর্ব-পশ্চিমে বিলে প্রচুর মাছ, জোঁক, জলজ উদ্ভিদ রয়েছে। পানকৌড়ি, মাছরাঙা, বক আরও অনেক রকমের পাখি উড়ছে বসছে।
কানাই ভাবে, কেনো সে প্রায় এ স্বপ্ন দেখে? তবে ছবির মত এই গ্রামটি কোথায়? সে খুঁজতে থাকে আর ভাবতে থাকে।
কানাই একটা সময় খুঁজে পায়। সেই রকম রাঙ্গা মাটি পথ। কিন্তু সব কিছু মিলছে, বাড়িগুলো নেই। কেনো এমন হচ্ছে সে বোঝতে পারে না? বাড়ি ফিরে, ভাবছে আর ভাবছে।
কানাই কি এত ভাব! মায়ের ডাকে কানাই চিন্তার জগৎ থেকে বের হয়।
কই? কিছু ভাবি না তো মা।
মায়ের চোখ ফাঁকি দিবি। কক্ষনো পারবি না; সারাক্ষণ কি চিন্তা করিস?
না, মা, কিছু না।
আবার রাতে, এই একি স্বপ্ন! স্বপ্নে বাড়ি দেখে কিন্তু বাস্তবে নেই কেনো? ভেবেই পায় না কূল। ঘুম ভেঙ্গে গেল, ভাবছে সে। কেন এমন হচ্ছে! বেশ কিছু সময় পর আবার ঘুমিয়ে পরে। কিন্তু সেই গ্রাম আবার স্বপ্নে চলে আসে। এ গ্রামে সাঁঝ নামে সাঁঝবাতি, শঙ্খ ধ্বনি আর উলুধ্বনি দিয়ে। প্রভাত হয় পাখিদের কলতানে। চারিদিকে সবুজ ধানখেত। কৃষাণ কৃষাণি ব্যস্ত শস্য ফলাতে। খু্ব সুখেই তাদের দিন কাটছিল।
হঠাৎ প্রায় প্রায় দুর্বিষহ রাত কাটতে লাগলো গ্রামবাসীদের। কিছু দিন পরপর ডাকাত পড়ে এই গ্রামে। কালীপদ, তরণী, রমণী তিন ভাই,এই গ্রামের বাসিন্দা। তারা আর অত্যাচার সহ্য করতে পারছে না। প্রচণ্ড অমানবিক নির্যাতন সহ্য করে থাকতে হয়। তাদের মত আরও অনেক সনাতন ধর্মের লোকের বাস এ গ্রামে। যতীন, নলিন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অন্য লোকালয়ে চলে গেল। আস্তে আস্তে সবাই চলে যেত লাগলো। কালীপদ বোঝতে পারছে না কি করবে?
কিন্তু জন্মস্থান ছাড়তে মন চায়নে। একটা সময় মেজভাই তরণী শ্বশুরালয়ে চলে গেল। কেউ কেউ নিজ দেশ ত্যাগ করলো।
ডাকাতগুলো প্রায় ওদের চেনা জানা। কেউ তো পাশের গ্রামের। উদ্দেশ্য ঠিক ডাকাতি এরকমটা নয়। এদের মনে ভীতি সৃষ্টিই ডাকাতির মুখ্য কারণ।
হঠাৎ চিৎকার, চেঁচামিচি। কানাই তার মাকে এবার দেখতে পেলো। তার জন্ম হবে, তাই তার মা পিত্রালয়ে এসেছে। ডাকাতের দল গ্রামে ঢুকে পড়ছে। সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। আজ যে কার নির্যাতনের পালা। প্রাণ ভয়ে কাঁপছে সবে। কানাই দেখছে কালীপদ তার দাদু। তার দাদুকে গাছে বেঁধে নির্যাতন করছে। ডাকাতদের মধ্য থেকে কেউ একজন বলছে, এত মার খেয়ে কিভাবে থাকিস এখানে? তোদের কি প্রাণের মায়া নেই? এর মাঝে আরও কয়েক জনকে বেঁধে, মারতে মারতে নিয়ে আসলো। কানাই স্বপ্নে ভয়ে কাঁপছে।
এভাবে আর কতই নির্যাতন সহ্য করে! তাই একে একে জমি, বাড়ির ভিটা মাটি, জন্মস্থান ছেড়ে পালাতে লাগলো। একটা সময় ছবির মত সুন্দর গ্রামখানি জনশূন্য হয়ে পড়লো।
১৯৭১ সালে পালাতে হয়নি কিন্তু স্বাধীনতার পরে নিজ দেশের লোকের অত্যাচারে জন্মস্থান ছাড়তে হলো। কালীপদ আর রমণীর পরিবার যেদিন গ্রাম ছাড়ে, সেদিন প্রচণ্ড কষ্টে দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে গ্রাম ছাড়ে। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভয়ে কাঁপছে সে। তখনও মনে হচ্ছে ডাকাত দল তার সামনে।
কানাই, শীতের রাতে ঘামছিস কেনো বাবা? সেই রাতে তার মাকে সে সম্পূর্ণ স্বপ্নের কথা খুঁলে বললো।
তার মা তাকে বললো, হ্যাঁ বাবা, ওটাই আমার জন্মস্থান, তোরও জন্মস্থান। তোর জন্মের কিছু দিন পর, তোর দাদুসহ অনেককে অমানবিক নির্যাতন করে তারা। সবকিছুই নিয়ে গিয়েছিল। কিছুই ছিল না, পরনের কাপড় পর্যন্ত রাখেনি। ওই সব দিনের কথা মনে পড়লে আজও বুক কেঁপে ওঠে। আমি মনে করতে চাইনে।
কানাই এত দিনে বুঝতে পারলো যে ঐ ছবির মত গ্রামখানি তার জন্মস্থান। ইস্! কত কষ্ট হয়েছে তাদের! ডাকাতদের আঘাতের চেয়ে কষ্টদায়ক ছিল জন্মভূমি ছেড়ে আসা।
পি কে সরকার
“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”
Friends
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com
মো: নাজমুল আখতার
@faith
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
Kazi Fahim hossin
@fahim6542
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নাদিম হোসাইন
@nadim-hossain
Latifur-rahman-Pramanik
@latifur-rahman-pramanik
afrida-jahar
@afrida-jahar
আমীর হামজা (লাম)
@amit
