Profile Photo

Pritam BiswasOffline

  • Pritam-Biswas
  • Profile picture of Pritam Biswas

    Pritam Biswas

    1 year, 5 months ago

    সময়ের ছায়া(উপন্যাস)
    প্রীতম বিশ্বাস

    অধ্যায় ১: যাত্রার শুরু

    রুদ্র নিউ ইয়র্ক সিটির ব্যস্ত রাস্তার এক কোণে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত উদাসীনতা। মহাবিশ্বের গভীরতা আর সময়ের রহস্য তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িত করত। সে পদার্থবিদ্যা নিয়ে কাজ করে এবং টুইন প্যারাডক্সের মতো তাত্ত্বিক বিষয়গুলো তাকে অস্থির করে রাখত। সময় কি আসলেই এমন, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? নাকি আমরা সময়ের নিয়ন্ত্রণে?

    অভি ছিল রুদ্রের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। অ্যাস্ট্রোনট হিসেবে অভি ছিল গর্বের প্রতীক। কিন্তু এই গর্বের সঙ্গে এক ধরনের বিচ্ছেদের শঙ্কা জড়িয়ে ছিল। অভি একটি উচ্চগতির মহাকাশযানে করে আলফা সেন্টাউরি মিশনে যাচ্ছিল। রুদ্র জানত, এই যাত্রার ফলাফল শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, মানবিক সম্পর্কের গভীর পরীক্ষাও হবে।

    অভির বিদায়ের দিন ঘনিয়ে এলো। রুদ্র আর অভি এক ক্যাফেতে বসে ছিল। চারপাশে মানুষের কোলাহল ছিল, কিন্তু তাদের কথাগুলো যেন এক অদৃশ্য বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে গোপন থেকে গেল। রুদ্র অভিকে বলল, “তুই যখন ফিরে আসবি, পৃথিবী ২০ বছর এগিয়ে যাবে। কিন্তু তোর জন্য সেটা হবে কয়েক মাস। এটা কেমন লাগছে?” অভি হাসল। তার হাসির মধ্যে এক ধরনের ভয় মিশে ছিল। “ভয় লাগে। তোর মতো বন্ধুদের ২০ বছর পর দেখতে হবে, ভাবতেই কেমন অদ্ভুত লাগে।”

    রুদ্র জানত, অভির যাত্রা এক অনন্য অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে। তবে সে এটাও জানত, এই যাত্রার শেষে তাদের বন্ধুত্ব একই থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।

    বিদায়ের দিন অভির মা, বাবা, আর ছোট বোন সবাই এলো। অভির মা চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, “তুই যখন ফিরে আসবি, আমি হয়তো বেঁচে থাকব না।” অভি মাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু তার নিজের মনের মধ্যে অস্থিরতা ছিল। রুদ্র বিদায় নেওয়ার আগে অভিকে বলল, “এই ২০ বছরে পৃথিবীর পরিবর্তন নিয়ে আমি একটা ডায়েরি লিখব। তুই যখন ফিরে আসবি, তখন যেন বুঝতে পারিস, সময় এখানে কেমন ছিল।” অভি কিছু বলল না, শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

    যাত্রার মুহূর্ত এল। মহাকাশযানটি ধীরে ধীরে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে উঠতে শুরু করল। রুদ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনের মধ্যে প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। যদি অভি ফিরে এসে তাকে চিনতেই না পারে? যদি সময় তাদের বন্ধুত্বকেও বদলে দেয়?

    রুদ্র স্থির করল, এই ২০ বছর শুধু অপেক্ষায় কাটাবে না। সে নিজের কাজ আর ডায়েরির মধ্য দিয়ে অভির জন্য একটি স্মৃতি রেখে যাবে। অভি ফিরে আসার পর যেন সময়ের ব্যবধানটা সেতু দিয়ে পেরিয়ে যেতে পারে।

    আকাশে হারিয়ে যাওয়া মহাকাশযানের দিকে তাকিয়ে রুদ্রের মনে হলো, সময় যেন এক ছায়ার মতো তাদের জীবনে এসে পড়েছে। এই ছায়া কি আলোর পথ দেখাবে, নাকি সবকিছু ঢেকে দেবে—এটাই ছিল তার অজানা প্রশ্ন।

    অধ্যায় ২: মহাকাশে অভি

    মহাকাশযানটি আলোর গতির কাছাকাছি বেগে চলতে শুরু করার পর অভি বুঝতে পারল, পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব শুধু ভৌত নয়, এক অদৃশ্য সময়ের সীমানাও তৈরি করছে। মহাকাশের শূন্যতায় চারপাশ যেন অসীম শূন্যতায় মিশে গেছে। অভির সামনে শুধু তার যানের কম্পিউটার স্ক্রিন আর পেছনে পৃথিবীর ক্ষীণ আলোকবিন্দু।

    প্রথম কয়েকদিন অভির মনে এক ধরনের উত্তেজনা ছিল। প্রতিটি সেকেন্ড তাকে নতুন অভিজ্ঞতার স্বাদ দিচ্ছিল। মহাকাশযানের নিজস্ব কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ আর নির্ধারিত সময়ের খাবার তাকে পৃথিবীর জীবনের ছায়া মনে করিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু সময় যতই এগোতে লাগল, ততই অভি উপলব্ধি করল, এখানে সময় আর পৃথিবীর সময় এক নয়।

    একদিন, মহাকাশযানের জানালার দিকে তাকিয়ে অভি দেখল, দূরের তারাগুলো এক অন্য রকম রঙে ঝলমল করছে। সে ভাবল, এই আলোর নাচন কি সময়ের প্রতিচ্ছবি? সময় কি আসলেই বেঁকে যাচ্ছে, যেমনটা রুদ্র তাকে বলেছিল?

    অভি রুদ্রের কথা মনে করল। বিদায়ের দিন রুদ্র বলেছিল, “সময় আমাদের সবার ওপর প্রভাব ফেলে, কিন্তু তুই এই প্রভাবটা অন্যভাবে অনুভব করবি। হয়তো তুই একসময় বুঝতে পারবি, সময় শুধু একটি সংখ্যা নয়। এটা আমাদের সম্পর্কের গভীরতাকেও বদলে দেয়।” অভি তখন বিষয়টা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। কিন্তু এখন, মহাশূন্যের নির্জনতায়, সে বুঝতে পারছে।

    যানটির কম্পিউটার একসময় অভিকে সতর্ক করল। “সময়-প্রবাহের প্রকৃত পার্থক্য শুরু হয়েছে। আপনার গতিবেগের কারণে পৃথিবীর সময়ের তুলনায় আপনার সময় কম গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে।” অভি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। সে জানত, এই যাত্রা তার জন্য কয়েক মাস হলেও, পৃথিবীর জন্য সেটা ২০ বছরের দীর্ঘ সময়।

    ধীরে ধীরে অভি নিজের দিনপঞ্জি লেখা শুরু করল। সে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা লিখে রাখত। কিন্তু একসময় সে টের পেল, লিখতে লিখতে তার লেখাগুলো একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে। মহাশূন্যের এই একঘেয়েমি তাকে গ্রাস করতে শুরু করল। সময় যেন থেমে আছে।

    অভি নিজের মনে প্রশ্ন করল, “রুদ্র কি আমার কথা ভাবছে? পৃথিবীতে কী কী বদলাচ্ছে? ২০ বছর পর আমি ফিরে গেলে কি সে আমাকে ঠিক আগের মতোই চিনবে?”

    এই প্রশ্নগুলো অভিকে ক্রমশ অস্থির করে তুলছিল। কিন্তু মহাকাশে, কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। উত্তরগুলো হয়তো পৃথিবীতে রুদ্রের ডায়েরিতে লেখা হয়ে থাকবে। অভি কেবল অপেক্ষা করতে পারত।

    তারপর একদিন, মহাকাশযানটি আলফা সেন্টাউরির কাছে পৌঁছে গেল। অভি জানত, মিশনের সফলতা তাকে ইতিহাসে অমর করবে। কিন্তু এই অমরত্বের চেয়েও তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সময়কে হার মানানো এই যাত্রার পর, পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে পুরনো বন্ধনগুলো ঠিকঠাক খুঁজে পাওয়া।

    মহাকাশের শূন্যতায়, অভি তার নিজের শ্বাসের শব্দ শুনতে পেল। তার মনে হলো, সময় যেন তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। মহাবিশ্বের এই শূন্যতা, সময়ের এই বিশালতা—সবকিছু মিলিয়ে অভির ভেতরকার মানুষটাকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে।

    অধ্যায় ৩: রুদ্রের ডায়েরি

    রুদ্র ডায়েরির প্রথম পাতায় লিখেছিল, “অভি, এই ২০ বছর শুধু তোর জন্য নয়, আমার জন্যও একটা পরীক্ষা। তুই মহাকাশে গিয়ে সময়ের বাঁক দেখবি, আর আমি এখানে পৃথিবীর সময়ের গতিপথ রেকর্ড করব। দেখি, কে বেশি বদলাই—তুই, নাকি আমি।”

    অভি চলে যাওয়ার পর রুদ্রের জীবন একরকম থমকে গেল। ক্যাফেতে একা বসে থাকা, অভির কথা ভেবে আকাশের দিকে তাকানো, কিংবা ফাঁকা রাতে ঘরে বসে ডায়েরি লেখা—এটাই হয়ে উঠল তার দৈনন্দিন রুটিন।

    প্রথম বছরেই পৃথিবীতে অনেক কিছু বদলে গেল। রুদ্র ডায়েরিতে লিখল, “পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ কমাতে বৈশ্বিক সম্মেলন চলছে, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। অভি, তুই হয়তো পৃথিবীর এই সংকটের কোনো প্রভাবই দেখবি না। তোর কাছে সময় থেমে আছে, আর এখানে সময় যেন আমাদের পেছনে ধাওয়া করছে।”

    দ্বিতীয় বছরে রুদ্র চাকরি বদলাল। সে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যোগ দিল, যেখানে মহাকাশ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হচ্ছিল। সেখানে তার পরিচয় হলো এক সহকর্মী মায়ার সঙ্গে। মায়া বুদ্ধিদীপ্ত এবং সরল মনের মানুষ। রুদ্রের একাকিত্ব ধীরে ধীরে মায়ার বন্ধুত্বে ভাঙতে শুরু করল। কিন্তু ডায়েরির পাতায় সে মায়ার কথা লিখতে ভয় পেত। অভির কথা ভেবে তার মনে হতো, “আমি কি অভিকে ভুলে যাচ্ছি?”

    ডায়েরির চতুর্থ বছরে রুদ্র লিখল, “অভি, পৃথিবীর রাজনীতি আরো জটিল হয়ে উঠছে। নতুন নতুন সংঘাত শুরু হয়েছে। মনে হয়, মানুষ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করেছে। তুই ফিরে এসে হয়তো ভাববি, পৃথিবী আগের চেয়ে বেশি কঠিন হয়ে গেছে।”

    পঞ্চম বছরে মায়ার সঙ্গে রুদ্রের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। কিন্তু রুদ্র ডায়েরিতে সেই সম্পর্কের কথা খুব কমই লিখত। একদিন সে নিজেকে প্রশ্ন করল, “অভি যদি জানতে পারে, আমি এই ২০ বছরে এমনভাবে বদলে গেছি, তবে সে কি আমাকে ঠিক আগের মতোই গ্রহণ করবে?”

    ডায়েরির পাতা ভরতে ভরতে ১০ বছর কেটে গেল। রুদ্রের চুলে সাদা আভা দেখা দিল। তার জীবনে অনেক পরিবর্তন এলেও, অভির জন্য তার অপেক্ষা কমেনি। ডায়েরির পাতায় সে লিখল, “অভি, সময়ের ছায়া আমাদের জীবনে এসে পড়েছে। তুই হয়তো সময়কে জয় করছিস, কিন্তু এখানে সময় আমাদের সবাইকে গ্রাস করছে। আমি জানি না, তুই ফিরে এসে এই ডায়েরির পাতাগুলো পড়ে কী অনুভব করবি।”

    ২০ বছরের শেষ প্রান্তে এসে রুদ্র ডায়েরির শেষ পাতায় লিখল, “অভি, তুই ফিরে আসছিস। জানি না, তুই আমাকে চিনবি কি না। হয়তো তুই সেই পুরনো রুদ্রকে খুঁজবি, যে তোর সঙ্গে বিদায়ের দিন দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তুই জানিস না, এই ২০ বছরে আমি কতটা বদলে গেছি। সময় আমাদের শুধু দূরে সরিয়ে দেয়নি, আমাদের নতুন মানুষ বানিয়েছে।”

    ডায়েরি শেষ করার পর রুদ্র জানালার পাশে দাঁড়াল। আকাশে আজ কোনো তারকা দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু তার মনে হলো, মহাকাশের কোথাও অভি ঠিক তার জন্য ফিরে আসছে।

    অধ্যায় ৪: পুনর্মিলন

    পৃথিবীর আকাশে এক উজ্জ্বল আলোকবিন্দু ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। অভির মহাকাশযান ফিরে আসছে। ২০ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর, অভি পৃথিবীতে পা রাখতে যাচ্ছে। রুদ্র ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। তার চুল এখন প্রায় পুরোপুরি সাদা। মুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু চোখে সেই পুরনো উচ্ছ্বাস।

    মহাকাশযানটি ল্যান্ড করার পর দরজা খুলে অভি ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল। তার চোখে ছিল বিস্ময়ের ছাপ। পৃথিবী যেন তার কাছে নতুন, অপরিচিত। অভির মুখে সামান্য দাড়ি, বয়স বাড়ার কোনো চিহ্ন নেই। যেন বিদায়ের দিনটা মাত্র কয়েক মাস আগের ঘটনা।

    রুদ্র এগিয়ে গেল। অভি তাকে দেখে থমকে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। রুদ্র হাসল। “স্বাগত, অভি। তুই ঠিকঠাক ফিরে এসেছিস।”

    অভি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “তুই কতটা বদলে গেছিস, রুদ্র। সময় তোকে ছুঁয়ে গেছে। কিন্তু তুই কি এখনও সেই রুদ্র?”

    রুদ্র মৃদু হেসে বলল, “সময়ের ছোঁয়া এড়ানো কি সম্ভব, অভি? তুই সময়কে হারিয়ে এসেছিস, আর আমি সময়ের সঙ্গে বেঁচে ছিলাম।”

    তারা দুজন গাড়িতে করে রুদ্রের বাড়ির দিকে রওনা দিল। রাস্তায় অভি জানালা দিয়ে বাইরের পৃথিবী দেখছিল। সবকিছু তার কাছে অদ্ভুত আর নতুন মনে হচ্ছিল। গাড়ির ভেতরে নীরবতা ভেঙে অভি বলল, “রুদ্র, পৃথিবীটা আগের মতো নেই। আমার সবকিছু কেমন অচেনা লাগছে। তুই বলেছিলি, তুই ডায়েরি লিখবি। সেটা কি তুই শেষ করেছিস?”

    রুদ্র মাথা ঝাঁকাল। “হ্যাঁ, অভি। ডায়েরি শেষ করেছি। তোর জন্য লিখেছিলাম। তুই পড়ে দেখলেই বুঝবি, সময় আমাদের কতভাবে বদলে দিয়েছে।”

    বাড়িতে পৌঁছানোর পর রুদ্র অভিকে ডায়েরি দিয়ে বলল, “তুই পড়। তুই যখন মহাকাশে ছিলি, এখানে কী কী ঘটেছে, তা এই ডায়েরিতে লিখে রেখেছি।”

    অভি ডায়েরি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল। প্রথম কয়েক পাতা পড়ে সে থেমে গেল। তার মুখে গভীর চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। “রুদ্র, তুই লিখেছিস, পৃথিবী কতটা বদলে গেছে। কিন্তু তুই নিজে কেমন ছিলি, তা কোথাও লিখিসনি। কেন?”

    রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কারণ আমি নিজেও জানি না, আমি কতটা বদলেছি। হয়তো তুইই আমাকে বলবি, আমি আগের মতো আছি কি না।”

    অভি ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতে মায়ার প্রসঙ্গ পেল। সে অবাক হয়ে বলল, “মায়া কে? তুই তো কখনও আমাকে বলিসনি তার কথা।”

    রুদ্র একটু অস্বস্তিতে পড়ে বলল, “মায়া আমার জীবনের একটা অধ্যায়। তুই যখন ছিলি না, তখন সে আমাকে সময়ের ভার থেকে বাঁচতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এখন তুই ফিরে এসেছিস, মায়ার কথা বলাটা বোধহয় তোর কাছে অপ্রাসঙ্গিক।”

    অভি কিছু বলল না। তার চোখে গভীর চিন্তা জমে উঠল। সে বুঝতে পারছিল, সময় তাদের বন্ধুত্বকে বদলে দিয়েছে। রুদ্র সেই মানুষটি নেই, যাকে সে ২০ বছর আগে চেনত।

    রাত গভীর হলে অভি ডায়েরি বন্ধ করে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশে অসংখ্য তারা ঝলমল করছিল। তার মনে হলো, মহাবিশ্বের শূন্যতা থেকে সে আবার সময়ের ভেতরে প্রবেশ করেছে। কিন্তু এই সময় কি তাকে আগের মতো গ্রহণ করবে?

    পেছন থেকে রুদ্র বলল, “অভি, তুই কি এখনো আমার সেই পুরনো বন্ধু? নাকি তুইও বদলে গেছিস?”

    অভি ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। তার মুখে এক বিষণ্ন হাসি। “আমরা দুজনেই বদলে গেছি, রুদ্র। সময় কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। তুই ডায়েরিতে যা লিখেছিস, তা আমার জন্য একটা আয়নার মতো। আমি শুধু ভাবছি, এই আয়নায় আমি তোকেও চিনতে পারব কি না।”

    রুদ্র কিছু বলল না। তাদের দুজনের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এলো। মহাকাশ থেকে ফিরে আসা একজন মানুষ আর পৃথিবীতে সময়ের সঙ্গে বেঁচে থাকা আরেকজন মানুষের এই পুনর্মিলন যেন সময়েরই এক নতুন পরীক্ষা।

    অধ্যায় ৫: সময়ের সেতু

    দিনের পর দিন অভি ডায়েরির পাতাগুলো পড়ে যাচ্ছিল। প্রতিটি পাতা যেন তার সামনে নতুন এক পৃথিবীর দরজা খুলে দিচ্ছিল। ডায়েরির প্রতিটি শব্দে রুদ্রের অনুভূতি, পরিবর্তন, আর তার একাকিত্বের প্রতিধ্বনি ছিল। কিন্তু প্রতিটি পাতার সঙ্গে অভি বুঝতে পারছিল, রুদ্রের সেই পুরনো সত্তা আর নেই।

    একদিন রুদ্র অভিকে বলল, “তুই কি এখনো পৃথিবীটাকে অচেনা মনে করিস?”

    অভি মাথা ঝাঁকাল। “হ্যাঁ, রুদ্র। এই পৃথিবীটা আমার কাছে নতুন। তুইও নতুন। আমি ভাবতাম, সময় আমাকে ছেড়ে গেছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সময় তোকে আমার চেয়েও বেশি বদলে দিয়েছে।”

    রুদ্র একটু হেসে বলল, “সময় শুধু আমাদের বদলায় না, অভি। সময় আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। তুই আর আমি দুই ভিন্ন সময়ের মানুষ হয়ে গেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই দূরত্বটা পেরিয়ে আবার এক হতে পারব?”

    অভি চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “ডায়েরির শেষ পাতায় তুই লিখেছিস, সময় আমাদের সম্পর্কের গভীরতাকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু আমি জানি না, সেই গভীরতা কি এখনো আছে।”

    রুদ্র একটু থেমে বলল, “গভীরতা আছে। শুধু সময়ের এই সেতুটা পেরোতে হবে। তুই আমার জীবনে ফিরে এসে নতুন এক অধ্যায় শুরু করেছিস। এখন তুই ঠিক কর, তুই কীভাবে এই নতুন অধ্যায় লিখবি।”

    কয়েকদিন পর রুদ্র অভিকে নিয়ে মায়ার সঙ্গে দেখা করতে গেল। মায়া তখন একটি গবেষণাগারে কাজ করছিল। রুদ্র মৃদু হেসে বলল, “মায়া, অভি এসেছে। তুই তো অনেকবার তার কথা শুনেছিস।”

    মায়া অভির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, সময় তোমাকে ছুঁতেই পারেনি। অথচ আমরা সবাই এখানে সময়ের ভারে নত হয়ে গেছি।”

    অভি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমার মনে হয়, সময় আমাদের ছুঁয়েছে, শুধু তার ছোঁয়াটা ভিন্ন। তুমি আর রুদ্র যেভাবে সময়কে দেখেছ, আমি তা পারিনি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, সময়ের সেতুটা পার হওয়া কতটা কঠিন।”

    মায়া অভির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরা দুজন যদি চাও, এই সেতু পেরোনো সম্ভব। সময় মানুষকে আলাদা করে দেয়, কিন্তু সম্পর্কই সেই সেতু, যা আবার এক করে।”

    সেদিন সন্ধ্যায় রুদ্র আর অভি শহরের এক পুরনো ক্যাফেতে বসে ছিল। অভি হঠাৎ বলল, “রুদ্র, তুই বলেছিলি, তুই বদলে গেছিস। কিন্তু আমার মনে হয়, তুই শুধু নিজের সেরা অংশগুলোকে ধরে রেখেছিস। হয়তো সেগুলোই আমাকে আবার তোর কাছে টেনে আনছে।”

    রুদ্র একটু মুচকি হেসে বলল, “হয়তো। কিন্তু তুইও বদলেছিস, অভি। তুই সময়ের সঙ্গে বেঁচে ছিলি না, তবু তুইও অন্য মানুষ হয়ে ফিরেছিস। আমাদের এই নতুন পরিচয়গুলো নিয়েই আমাদের সম্পর্কটা গড়তে হবে।”

    ক্যাফের জানালা দিয়ে আকাশে তারাগুলো ঝলমল করছিল। অভি মনে মনে ভাবল, “সময় হয়তো আমাকে বদলে দিয়েছে, কিন্তু বন্ধুত্বের এই সেতুটা এখনো ভাঙেনি।”

    রুদ্র ডায়েরির শেষ পাতায় নতুন করে লিখল, “অভি ফিরে এসেছে। সময় আমাদের বদলে দিয়েছে, কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব এখনো টিকে আছে। আমরা এখন দুই ভিন্ন সময়ের মানুষ, কিন্তু সেই সময়ের সেতু পেরিয়ে আমরা আবার এক হতে পারব।”

    এইভাবে রুদ্র আর অভির গল্প শেষ হলো, কিন্তু সময়ের সেতু তাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার পথে আলোকিত করে দিল। মহাবিশ্বের শূন্যতা আর পৃথিবীর ব্যস্ততার মধ্যে তারা বুঝতে পারল, সময়ের চেয়ে সম্পর্কই বেশি শক্তিশালী।

    3
    1 Comment
Skip to toolbar