Profile Photo

নাহিদ হাসান নয়নOffline

  • Nahid-Hasan-Noyon
  • ✍️ছোটগল্প: “বাবার ঘড়ি”
    প্রথম পর্বঃ

    ঘড়িটা এখনো দেয়ালে টাঙানো।
    চলে না, শুধু ঝুলে থাকে।
    যেমন বাবা থাকতেন—চুপচাপ, বাড়ির চারপাশে, চোখ রাখতেন সবদিকে, কিন্তু কোনো শব্দ করতেন না।

    এই ঘরটা বাবার হাতে বানানো।
    ছাদে টিন, দেয়ালে মাটি লেপা, কাঠের জানালায় আজও সেই পুরনো হুক।
    ঘরের এক কোণে রাখা বাবার কাঠের টুলটা আমি এখনো সরাইনি।
    ওটার ওপর আর কেউ বসে না—কেউ সাহসও করে না।

    বাবা কথা বলতেন কম,
    কিন্তু তার চুপ করে থাকা,
    তার সকালবেলার হাঁকডাক,
    তার বাজার থেকে ফেরার পায়ের শব্দ—এসবেই গল্প ছিল।

    আমি তখন ছোট।
    বাবা ঘরে ঢুকলে কেমন জানি শীতল একটা হাওয়া আসত ঘরে—
    না ঠান্ডা, না গরম, এক ধরনের ভরসার গন্ধ।

    একদিন হঠাৎ সে গন্ধ হারিয়ে গেল।

    বাবা শুধু বললেন—”চিন্তা করিস না, আমি তোর ভেতরেই থাকব।”

    আমার তখন বুঝবার বয়স ছিল না।
    শুধু মনে আছে, আমি তখন ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম—
    ঘড়ি থেমে গিয়েছিল, বাবা যাওয়ার পরদিন।

    অনেক বছর পেরিয়েছে।

    এই ঘরে আমি এখন একা থাকি।
    ঘড়িটা ঠিক করাইনি—কারণ ওটা যেন বাবার অভিমানের মতো হয়ে গেছে।
    ওর না চলাটাই একটা কথা বলে—
    যা বাবাও বলতেন না, কিন্তু বোঝা যেত।

    শুনেছো কখনো ঘড়ি থেমে গেলে একটা নীরবতা জন্ম নেয়?

    ওটা এমন নীরবতা, যা শব্দের চেয়ে গভীর,
    যেখানে বাবার হাঁপ ধরে আসা নিঃশ্বাস,
    তার চুপচাপ বসে থাকা সন্ধ্যাগুলো,
    আর আমার চোখে জল আটকে রাখার লড়াই—সব এক হয়ে যায়।

    আমি এখন প্রায়ই বারান্দায় বসে থাকি।
    হাতে চায়ের কাপ, চোখে মেঘ।

    পড়শিরা ভাবে আমি একা।
    তারা জানে না—বাবা এখনো আমার ঘরের ভেতর হেঁটে বেড়ান।
    আমি জানি, তিনি ঘড়িটার কাঁটার ভেতর থাকেন।
    চলে না ঠিকই, কিন্তু তার ছায়া পড়ে প্রতিটি ঘণ্টায়।

    কাল রাতে হঠাৎ বাতাসে কাঁপে উঠেছিল জানালার কাঁচ।
    আমি ভেবেছিলাম—বাবা কি ফিরেছেন?

    তারপর দেখি, ঘড়ির কাঁটা এক মিনিট এগিয়েছে।

    আমি বুঝি, সময় অনেক আগেই থেমেছে।
    এখন যা চলছে, তা শুধুই বাবার অপেক্ষা।

Skip to toolbar