Profile Photo

Md Majnur Rahman John (Krishno John)Offline

  • Krishno-John
  • আমারে আমি বেসেছি ভালো, কেবলই পরের তরে!
    কৃষ্ণজন

    আম্মা দশটা টাকা দেন না?
    আচমকা সংবিৎ ফিরলো যেন নীলার! মনে হচ্ছিল দূর থেকে ভেসে আসছে কথাগুলি। আসলে এতোটাই ঘোরে ডুবেছিল সে, চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্নই হয়ে গিয়েছিল কিছু সময়ের জন্য। তবে ঘোর নয়, প্রবল বিষন্নতায় নিমগ্ন ছিল। হুঁশ ফিরতেই বুঝলো সে তো আসলে ট্রেন স্টেশনে বসে আছে। দেখলো একটা ছোট মেয়ে, বয়স ৮/১০ এর বেশি হবে না, গায়ে নোংরা পোশাক। কাঁদো কাঁদো ভাব নিয়ে ভিক্ষে চাইছে। ভীষণ মেজাজ খারাপ হয়ে গেল নীলার। বলল,
    যাও এখান থেকে। সামনের দিকে যাও।
    কে শোনে কার কথা! মেয়েটি আবারও বলে উঠলো,
    আম্মা দশটা টাকা দিবেন?
    এবার সত্যি সত্যি ক্ষেপে গেল সে। ধমক দিয়ে বলে উঠলো
    ভাগো বলছি! আর একবার ভিক্ষে চাইলে চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো।
    আজকাল দেশের অবস্থা জঘন্য হয়ে যাচ্ছে। অসভ্য বাপ-মা’গুলো ছোট ছোট বাচ্চাগুলিকে দিয়ে ভিক্ষা, চুরি-ডকাতির ইত্যাদির অভ্যাস গড়ে তুলছে। ইচ্ছে করে ময়লা পোশাক পরিয়ে পাঠানো হয়, কান্না কান্না অভিনয় করতে শেখায় যাতে অন্যের সহানুভ‚তি সৃষ্টি করতে পারে। বিরবির করে কথাগুলো বলে কিছুটা শান্ত হলো সে। শান্ত হতেই অবাক হলো নীলা। মনে মনে ভাবলো, এ আমি কী করছি? একটা ছোট বাচ্চার সাথে এমন ব্যবহার করাটা কি ঠিক হচ্ছে? আবার ভাবনায় ডুবে গেল।

    অন্য সময় হলে নীলা হয়তো বাচ্চাটাকে হাত ধরে পাশে বসাতো, পছন্দের কিছু কিনে দিতো। বাচ্চাদের খুবই আদর করতে পছন্দ করে। কিন্তু এই মুহূর্তে পরিস্থিতিটা ভিন্ন। বাসা থেকে প্রচÐ রাগ করে বের হয়েছে সে। একরকম চির বিদায় নিয়েই বলা চলে। মনে মনে ঠিক করেছে আর ফিরে যাবে না। গতরাতে একচোট হয়ে গেছে রাজিবের সাথে। মেয়েও কম যায় না! ২৫ বছর সংসার করার পর নীলার এখন মনে হচ্ছে, বৃথাই এই সময়টুকু পার করেছে সে এই সংসারে, কেউই তার আপন নয়। সকাল বেলা একদম নীরবে বের হয়ে আসে ঘর থেকে। গন্তব্য জামালপুর। একবার বেড়াতে গিয়ে একটা জায়গা খুব ভালো লেগে যায় তার। খুব ছোট একটা জায়গা কিনে নিজের টাকায়। টিন আর বেড়া দিয়ে গ্রাম্য ঘর বানিয়ে রেখেছিল। মাঝে মাঝে বেড়িয়ে আসে, খুব ভালো লাগে। কিন্তু এবারে বিষয়টা ভিন্ন। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর ফিরবে না। কাদের জন্য ফিরবে? কারো জন্য কম করেনি সে? বিনিময়ে অবহেলা আর অপমান ছাড়া কিছুই ভাগ্যে জুটেনি তার। পরিবার, স্বামী-সংসারের কথা চিন্তা না করলে আজ সে অনেক উপরে উঠতে পারতো। নীলা মেধাবী ছাত্রী ছিল, পেশাগত জীবনেও অনেক ধরনের বড় বড় সুযোগ এসেছে তার কিন্তু স্বামী-সন্তান, বৃদ্ধ মাতা-পিতা এদের ছেড়ে দুরে সরে যেতে চায়নি সে। নিজের ক্যারিয়ারের সাফল্যের জন্য নামকাওয়াস্তে সংসার করতে চায়নি সে। একজন আদর্শ স্ত্রী, একজন আদর্শ মাতা হয়েই থাকতে চেয়েছে সে। জীবনে অসংখ্য সাধ-আহ্লাদ ত্যাগ করেছে এই পরিবারের জন্য। আজ এই পরিবারই তাকে বোঝা মনে করে।
    আম্মা সকাল থেকে কিছু খাই নাই! দেন না দশটা টাকা?
    ভাবনায় ছেঁদ পড়লো আবার। তবে এবার আর চটলো না সে। শুধু বলল,
    আমার কাছে দশ টাকা নেই!

    আসলেই তার কাছে দশ টাকা নেই। ব্যাগে আছে কিছু হাজার টাকার নোট। একটা অভিমানের ঘোরে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে স্টেশনে। টিকেট কাটতে গিয়ে দেখে কোনো ভাঙ্গতি নেই। একদম সকাল সকাল, কাউন্টারের লোকটিও বললো ভাঙ্গতি নেই। কী করবে, কী করবে ভাবতে ভাবতে প্লাটফর্মের একটা ওয়েটিং সিটে বসে পড়ে। বসেই আবার বিষণ্ণতায় গ্রাস করে তাকে। এবার আর সে নিতেই পারছে না। গতরাতেও গায়ে হাত তুলেছে রাজিব। রিশমার কর্মকাণ্ড নিয়ে নাকি তাকে কিছু বলা যাবে না? তার মেয়ে, সে ভাববে না তো কে ভাববে? রিশমার আজকাল যাদের সাথে ওঠা-বসা, তাদের একদম মেনে নিতে পারছে না নীলা। আধুনিকতা মানেই যে মধ্য রাতে বাড়ি ফিরতে হবে, অকেশনের নামে ছেলে বন্ধুদের সাথে মদ-গাঁজা খেতে হবে, এমনটা নীলা মোটেও মানতে রাজি নয়। যদিও রিশমা দাবি করে, সে এসব কিছুই খায় না। কিন্তু নীলা ওর মুখে সিগারেট এর গন্ধ পেয়েছে কয়েকদিন, একবার এলকোহলের গন্ধও পেয়েছে। সে এই গন্ধ ভালো করেই চিনে। রাজিব একজন নিয়মিত ড্রাংকার। তার অফিসিয়াল স্ট্যাটাসের জন্য প্রায়ই ড্রিংক করতে হয়। অবশ্য এটা তার দাবি। সত্যিটা কী কে জানে? একসময় এসব মানতে না পারলেও ধীরে ধীরে নীলা মেনে নিয়েছে। গতকাল রাতেও এই বিষয় নিয়ে মেয়েকে বকাঝকা করছিল নীলা। বাবাও এসে পক্ষ নিলো মেয়ের। বলে,
    এই বয়সে এসব একটু আধটু করবেই। আজকাল ছেলে-মেয়ে বলে আলাদা কিছু কি আছে? যুগ বদলেছে।
    তাই বলে মেয়ে হয়ে নেশাপানি করবে, এটা কেমন কথা? নিজে মাতাল আর মেয়েটাকেও মাতাল বানাবে?
    এটা আর নিতে পাররো না বোধ হয় রাজিব। তাছাড়া ড্রিংক করা অবস্থায় ছিল। সজোরে চড় মারে স্ত্রীর গালে। স্তব্ধ হয়ে যায় নীলা। অন্যসময় পাল্টা ঝগড়ায় মেতে ওঠে নীলা। কিন্তু এবার আর তা করলো না। প্রচণ্ড আত্মসম্মানে লাগলো তার। মনে হলো কুকুরকে যতই বোঝানো হোক কুকুর ঘেউ ঘেউই করবে। দারুণ অভিমান আর লজ্জায় চলে গেল নিজের রুমে। তখনই সিদ্ধান্ত নিল, এদের সাথে আর নয়। ভোরবেলা নিঃশব্দে ছোট একটি ব্যাগে কিছু কাপড় গুছিয়ে বের হয়ে পড়ে সে।

    ঠিক আছে, তাইলে আর কী!
    কথাটা বলে মেয়েটা সরে যেতে লাগলো, এগিয়ে গেলো সামনের ওয়েটিং সিটে বসা আরেকটি লোকের দিকে। অবাক হলো নীলা, এতো সহজে মেনে নিল! যেভাবে জোঁকের মতো এঁটে গিয়েছিল তাতে তো মনে হয় সহজে পার পেতো না সে। কিন্তু ধমক দিয়ে যাকে সরাতে পারছিল না সে, নরম কথায় কাজ হয়ে গেল দেখে নিজেই একটু হকচকিয়ে গেল! হঠাৎ খুব মায়া হলো মেয়েটার জন্য। বাবা-মা বা পরিবেশ তাকে যাই শিখাক, মেয়েটা তো নিষ্পাপ । নীলা ডাক দিয়ে উঠলো,
    এক খুকি? এই? এই?
    মেয়েটা ঘাড় ঘুরে তাকালো। কিছুটা দ্বিধাচিত্তে এগিয়ে আসলো তার দিকে।
    কী?
    বলেন?
    কী নাম তোমার?
    নীলার হঠাৎ মমতায় মেয়েটা অস্বস্তিতে পড়লো। কিছুটা সন্ধিহান চোখে বলল,
    ক্যান?
    বলই না?
    জি, ময়না।
    নীলা মেয়েটির নাম আরো আধুনিক কিছু ভেবেছিল। আজকাল বস্তিতেও অনেক আধুনিক নাম শোনা যায়। বিশেষ করে সেলিব্রেটিদের নাম। নীলা ব্যাগটা খুললো, একটা একহাজার টাকা নোট বের করে ময়নাকে বলল,
    নাও এটা।
    মেয়েটি চোখে বিষ্ময়!
    দ্বিধা করছে সে।
    আমারে দশ টাকা দিলেই হবে।
    আরে বোকা আমার কাছে তো ভাংতি নেই, এটাই নাও। এখন আর ভিক্ষে না করে বাসায় চলে যাও। বাবা-মাকে এই টাকাটা দিয়ে ভালো কিছু রান্না করতে বল।
    ময়না লোভকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। এক হাজার টাকার নোট কী বা কত বড় এটা না বুঝলেও সে এটা ভালোই বুঝে, এই নোটটা অনেক দামি! অনেক কিছু কেনা যায় এটা দিয়ে।

    এর মধ্যে একটি ট্রেন চলে গেল। নীলা বসেই আছে, টিকেট কেনার আগ্রহ বোধ করছে না। আসলে এতোটাই বিষণœ হয়ে আছে যে আবার উঠে গিয়ে টিকেট কাটার চেষ্টা করবে সে ইচ্ছেটাই জাগছে না। ময়মনসিংহ থেকে জামালপুরের অনেক লোকাল ট্রেনই আছে, তাই জলদি যাওয়ার তারাটা কম তার। আবার নিজের চিন্তায় ডুব দিতে দিতে দেখতে পেল, ময়না সামনের ওয়েটিং সিটে বসা একজন লোকের সাথে কথা বলছে। মনে মনে ভাবলো, ভিক্ষা এদের অভ্যাস, শত পেলেও ভিক্ষা করবেই। হঠাৎ মনে হলো এতো টাকা দেওয়াটা মনে হয় ঠিক হয়নি। এর মূল্য সে বোঝেনি। আসলে তার মূল্য কেউই বোঝেনা, আবার অভিমানের ভাবনায় ডুব দিলো সে।

    লোকাল ট্রেনের শব্দে আবার সম্বিত ফিরে পেল নীলা। মনটা শক্ত করলো সে। মনে মনে ভাবলো, না এভাবে বসে থাকার কোনো মানে নেই। হয় ফিরে যেতে হবে না হয় গন্তব্যে রওয়ানা দিতে হবে। মোহগ্রস্ত হয়ে এক জায়গায় সারাদিন পার করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। নিজেকে ধোঁকা দেয়ার কোনো মানে নেই। আসলে মনে মনে নীলা ভাবছিল তাকে খুঁজতে রাজিব বা রিশমা কেউ না কেউ এদিকে হয়তো আসবে। মনে যতই অভিমানের পাহাড় জমুক অবচেতন মন প্রবল মায়া কাটাতে পারছিল না। অবচেতন মন চাইছিল এটা দেখত যে, তার জন্য পরিবার অস্থির হয়ে উঠেছে। কিন্তু এবার মনকে শক্ত করার চেষ্টা করলো, না তারা কেউই আসবে না! তাদের কাছে এতো গুরুত্ব নেইও তার। থাকলে তো এমন পরিবেশ হতোই না যে তাকে রাগ করে বাড়ি ছাড়তে হয়। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ খেয়াল করলো সেই মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে না। ভাবলো, বোধ হয় বাড়ি ফিরে গেছে। বড় একটা টাকা নোট পেয়েছে, বাপ-মাকে দেখানো জন্য হয়তো অস্থির হয়ে আছে। টাকাটা দেখে বাবা-মা হয়তো বিষ্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলবে! প্রথমে হয়তো বিশ্বাসই করতে চাইবে না এটা আসল টাকা। হয়তো ভাববে চুরি করেছে অথবা তার কাছে হয়তো নিয়েই আসবে বিশ্বাস করানোর জন্য। মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতে নীলা কৌতুহলী হয়ে উললো, মেয়েটা গেল কই? কী যেন নাম?- ময়না! খানিক আগে একটা মাঝ-বয়সী লোকের সাথে কথা বলছিল একটু দূরেই, লোকটাও নেই! কী জানি, লোকটা হয়তো ট্রেনে উঠে চলে গেছে। নীলা সিদ্ধান্ত নিল এবার যে ট্রেনটা আসবে তাতে উঠে পড়বে। টিকেট কাটার জন্য উলে দাঁড়ালে। হঠাৎ খেয়াল করলো, ময়না আর লোকটা যে সিটে বসে কথা বলছিল তার নিচে একটা টাকার মতো কী যেনো দেখা যাচ্ছে। এগিয়ে গেল সে। নীলা উপর হয়ে টাকাটা নিল, অবাক হলো তার দেয়া এক হাজার টাকার নোটটা! নীলা ভাবলো, মেয়েটা বোধ হয় টাকার গুরুত্ব বোঝেনি তাই ফেলে দিয়ে চলে গেছে। একটা কেমন যেন গন্ধ আসতে লাগলো নীলার নাকে। কীসের গন্ধ বুঝে উঠতে পারলো না, এদিক ওদিক তাকাতে থাকলো। খেয়াল করলো গন্ধটা ফ্লোর থেকে আসছে। তাকিয়ে বিশেষ কিছু দেখতে পেল না। দেখলো একটা চকলেটের মোড়ক। কী মনে করে যেন নীলা উবু হয়ে চকলেট এর কাগজটা উঠালো। নাকের কাছে নিতেই একটা গন্ধ লাগলো, গন্ধের ধাক্কায় মাথাটা চক্কর দিয়ে ঘুরে উঠলো। একটু হলেই পড়ে যেত মাটিতে। সিটের হাতল ধরে নিজেকে সামলালো। প্রচন্ড এক আশঙ্কায় মন কেঁড়ে উঠলো ভীষণভাবে! ধীরে ধীরে সিটটাতে বসলো, মন চলে গেল পুরোনো একটি স্মৃতিতে। বড়ই তিক্ত সেই স্মৃতি।

    নীলা পুতুল খেলছিল। একা একাই খেলছিল। মা বলল,
    নীলা মা যা তো, তোর হাবু কাকাকে নাড়ুগুলি দিয়ে আয়।
    নীলা বলল,
    একটু পরে, আমি এখন খেলছি।
    নীলার বয়স তখন নয় কি দশ হবে। স্কুল থেকে এসেই তার নতুন বানানো পুতুলটা নিয়ে খেলতে বসেছে। গ্রামের স্কুল, বাড়ি থেকে একটু দূরে। হেঁটে এসে ক্লান্ত হয়ে পুতুলটা নিয়ে খেলতে বসেছে মাত্র। সাথে সাথে ওঠে যেতে ইচ্ছে করলো না। হাবু কাকা ওদের ম্যানেজার ধরণের কর্মচারী। ওদের জমি-জমা, বাজারের আড়ত সব কিছু দেখাশোনা করে। সে নীলাদের দুর্সম্পর্কের আত্মীয় বলে লোকদের বলে বেড়ায়। অনেকদিন ধরেই তাদের আশ্রয়ে আছে। মা এসে নাড়ুর বাটিটা রেখে বলল,
    একটু পরে দিয়ে আসিস কিন্তু।
    আচ্ছা মা।
    কথাটা বলেই নীলা আবার খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। বর পুতুল আর কনে পুতুলের বিয়ে দিতে দিতে হঠাৎ তার মনে হলো, আরে নাড়ুগুলি তো এখোনো দিয়ে আসিনি। দৌড়ে রওয়না হলো, হাবু কাকার ঘরের উদ্দেশ্যে। হাবুর ঘরটা ওদের বাড়ির পিছনদিকে বেশ খানিকটা দূরে। এই পুরো জায়গাটাই ওদের। হাবুর নিরিবিলি থাকতে ভালো লাগে বলেই একটু দূরে ঘর ওঠাতে বলেছিল। ওরাও চিন্তা করলো বাইরের লোক একটু দূরে থাকাই ভালো। সেই থেকে সে ওখানে আছে। তার বয়স ৪০ পার করেছে কিন্তু দেখতে আরো বৃদ্ধ লাগে। তার একটা বদঅভ্যাস আছে। সুযোগ পেলেই জুয়া খেলে। জুয়া খেলে খেলেই সর্বশান্ত হয়েছে! তাও নেশা কাটাতে পারেনি। নীলার বাবাও তাই তাকে নগদ টাকা পয়সা দেয় না খুব একটা। হাবুর যখন যা লাগে কিনে দেয়। সারাদিন বিড়ি ফুঁকে, কেউ কেউ বলে তার গাঁজার নেশা আছে। কিন্তু ওরা তেমন কিছু কখনো লক্ষ্য করেনি। তাই তার তেমন আর কোনো খারাপ অভ্যাস আছে বলে তাদের জানা নেই।

    নীলা বাইরে থেকে ডাক দিল,
    হাবু কাকা! হাবু কাকা!
    কে?
    আমি নীলা, মা নাড়ু দিছে
    আয় ভিতরে আয়।
    কথাটা বলে হাবু দরজা খুললো।
    নীলা বলল,
    আমি এখন বসুম না, তোমার নাড়ু নাও।
    আরে একটু বস। তোর জন্য আমি হাট থেকে সন্দেশ আনছি।
    চকলেট শুনে নীলা খুশি হয়ে উঠলো! এটা তার খুব পছন্দ।
    দাও, দাও, তাড়াতাড়ি দাও
    দিচ্ছি! দিচ্ছি!
    বলেই হাবু একটা ছোট ব্যাগের দিকে হাত বাড়ালো। ভিতর থেকে কয়েকটা কাগজে মোড়ানো প্যাকেট বের করলো। নীলার হাতে দিতেই নীলা বলল,
    আচ্ছা, আমি তাহলে যাই? পরে খামুনে।
    আরে না না, এখনই খা, কেমন মজা আমাকে বল?
    বাধ্য হয়ে নীলা প্যাকেট খুলে একটা সন্দেশ মুখে দিল। মুখটা স্বাদে ভরে গেল।
    উফ হাবু কাকা! দারুন মজা!
    নীলা একটা সন্দেশ শেষ করে আরেকটা সন্দেশ মুখে দিল। হঠাৎ কেমন যেন ঝাপসা মনে হতে লাগলো চারপাশ! প্রচণ্ড ঘুমের একটা অনুভ‚তি আসলো তার! হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছে। সে অবস্থাতেই সে দেখলো, হাবু কাকা তাকে বিছানায় শুয়ে দিচ্ছে। তার জামা খোলা চেষ্টা করছে। সে ভালোমতো বুঝতে না পারলেও এটা বুঝলো, হাবু কাকা ভালো কিছু করছে না। আর খুব গোপনীয় কিছু। নীলা চিৎকার করা চেষ্টা করলো কিন্তু তার আওয়াজ জোরালো হলো না!

    মরিয়ম মাছ কাটতে বসেছিল, দেখলো বটিটাতে ধার কমে গেছে। রান্না ঘর থেকে উঠে বটিটা ধার করানো জন্য ঘরের বারান্দার দিকে আগোলো। বারান্দার খুঁটির সাথে একটা দা-বটি ধার করানো পাথর ফিক্স করে লাগিয়ে রেখেছে নীলার বাবা। বিভিন্ন সময়েই যেহেতু ধারের প্রয়োজন হয় তাই এলোমেলো না খুঁজে যাতে একজায়গায়ই এসে সবাই তাক করতে পারে। উঠানে এসে নীলাকে না দেখতে পেয়ে মরিয়মের মনে হলো, নীলা কই? এতোক্ষণ লাগে নাকি নাড়ু দিয়ে আসতে? ওকি হাবুর ঘরেই গেছে নাকি নাড়ু নিয়ে বন্ধুদের খাওয়ানোর জন্য নিয়ে গেছে? ওর এই স্বভাব সম্পর্কে মরিয়ম ভালোই জানে। মেয়েটা অনেক উদার মনের। সবার জন্যই কিছু না কিছু করতে চায়। এই বয়সে এই ধরনের গুণী মেয়েকে নিয়ে এক ধরনের গর্ব বোধই হয় তার মনে মনে! চিন্তা করতে করতে অবচেতন মনে বটি হাতে নিয়েই এগিয়ে গেল সে হাবুর ঘরের দিকে।
    অস্পষ্ট গোঙ্গানির আওয়াজ আসছে হাবুর ঘর থেকে। সর্তক হলো মরিয়ম! কীসের আওয়াজ? অনেক কিছুই হতে পারে কিন্তু মায়ের মন, নীলাকে নিয়েই আশঙ্কা জাগলো তার মনে। দ্রুত দরজা ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকলো সে। ঢুকেই পিলে চমকে গেল! দেখলো তার ছোট মেয়েটা আপ্রাণ ধস্তাধস্তি করছে হাবুর সাথে। মরিয়ম কিছু ভাবার আগেই খুন চেপে গেল মাথায়। সজোরে একটা কোপ বসালো হাবুর ঘাড়ে। চিৎকার করে কাঁতরাতে থাকলো হাবু। কিছু কিছু পরিস্থিতি সাধারণ মানুষকেও অনেকসময় প্রবল ব্যক্তিত্বময় করে তুলে। বিশেষ করে সন্তানের বেলায় মা। মরিয়ম হঠাৎ করে খুব ঠান্ডা মাথার হয়ে গেল। দ্রুত নীলাকে পোশাক পরালো। মরিয়ম বুঝতে পেরেছে, শয়তানটা এখনো নীলার কোনো সর্বনাশ করতে পারেনি তবে আরেকটু দেরী হলে হয়তো হয়ে যেত। নীলা মাথা তখনো দুলছে। হাবুর চিৎকার শুনে রফিক ছুটে আসলো। রফিক ওদের গোমস্তা, একটু দুরেই কাজ করছিল। রফিকের আওয়াজ শুনে। মরিয়ম বের হয়ে আসলো, রফিকে আর হাবুর ঘরে ঢুকতে দিল না। রফিকের চরম কৌতুহলী চেহারাকে পাত্তা না দিয়ে বলল,
    এখনই নীলার বাপকে আসতে বল। তাড়াতাড়ি যা।
    হাবু শেষ পর্যন্ত মারা যায়নি। আর নীলা বাবাও বিষয়টা নিয়ে হাউ কাউ করে নিজেদের সম্মান নষ্ট করতে চাইলো না। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে হাবু নিরুদ্দেশ হলো। নীলারা আর কখনো তাকে দেখেনি।

    হুশ ফিরলো নীলার! কেন জানি অজানা আশংকায় ভরে গেল তার মন। লোকটাকে দেখেই তার পছন্দ হয়নি তখন। কেমন যেনো চাহুনি! কিন্তু নিজের অশান্তির চিন্তায় বিষয়টা লক্ষ্য করলেও পাত্তা দেয়নি তখন। কেন জানি নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতে থাকলো তার। যে জানে যৌক্তিকভাবে কোনো দোষই নেই তার কিন্তু সে যে মানবিক প্রাবল্য হৃদয়ে ধারণ করে তাতে তার নিজেকে নিজেই দোষ দিতে থাকলো। মনে মনে ভাবলো, না! বসে থাকা যাবে না। মেয়েটাকে খুঁজতে হবে। স্টেশনের চারপাশে অনেক নিরব জায়গা আছে। ঝোপ-ঝাড়ও আছে। কেথায় খুঁজবে ওকে? মেয়েটার জন্য প্রবল মায়া হতে থাকলো তার। ভাবতে ভারতে সিদ্ধান্ত নিল, ট্রেনের কিছু পুরানো বগি ফেলে রাখা আছে একপাশে। ক্রিমিনালি চিন্তা যদি করে থাকে ঐ লোক, সেদিকেই যাওয়া করা। নীলা যাত্রা করলো সেদিকে। সে ভুলেই গেল কেন ট্রেন স্টেশনে এসেছিল? আর তার মনের কষ্টই বা কী? কিছুদূর যাওয়ার পর বাঁ পায়ের একটা সেন্ডেল দেখলো, ছোট বাচ্চাদের। সঙ্গে সঙ্গেই ও বুঝলো এটা সেই মেয়েটারই সেন্ডেল। প্রকৃতি কেন জানি মা’দের অসম্ভব অনুভ‚তির ক্ষমতা দিয়েছে। তার অনুমান পুরোপরি সত্য হলো। অল্প খুঁজতেই সে দেখতে পেল একটা বগির ভিতরে তাদেরকে। মেয়েটাকে প্রায় বিবস্ত্র করে ফেলেছে। অসভ্যটা উলঙ্গ হতে যাচ্ছে।

    কী করবে? কী করবে? নীলার কিছু বুঝে আসছিল না। মেয়েটার বাবা-মা কাউকেই সে চেনে না! আর চিনলেই বা কী? এতো সময় নেই! পুলিশে ফোন দেবে? আশে পাশে কোনো পুরুষ লোকও দেখতে পাচ্ছে না। হঠাৎ রাগ হলো নীলার, কী এসব ভাবছি! এখন এসব ভাবার সময় আছে নাকি? যা করার নিজেকেই করতে হবে। সেদিন নীলাকে তার মা বাঁচিয়েছিল, আজ নীলাকে ময়নার মা হতে হবে। হঠাৎ তার মনে হলো, যে দুঃস্বপ্ন সে রিশমাকে নিয়ে দেখে আজ তার বাস্তাব রূপ ময়নার মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছে। ময়নাকে এখন আর নীলার ময়না হলো হলো না, ও স্পষ্ট রিশমাকে দেখতে পাচ্ছে। দ্রæত চারপাশে তাকালো নীলা। মনমতো কিছু পেল না। আকেটু তাকাতেই একটা পুরানো কাঠের টুকরো দেখতে পেল। হাল ফিরে পেল যেন নীলা। দ্রত কাঠের টকুরোটা নিয়ে এগিয়ে গেল। লোকটি নিজের কাজে ব্যস্ত হয়েছিল। ময়নাও আপ্রাণ ধস্তাধস্তি করছিল দুর্বলভাবে। সজোরে কাঠের টুকরোটা চালালো লোকটি মাথায়। আঘাতে চমকে উঠলো লোকটি। কাঁপতে কাঁপতে ঘুরে তাকালো। একজন মহিলা দেখে তার ভয় কিছুটা কমে গেল। নীলা চিৎকার করে উঠলো,
    ছেড়ে দাও ওকে! ছেড়ে দাও! না হলে একদম মেরে ফেলবো!
    নীলা ভেবেছিল, ওর কথায় লোকটা ভয় পেয়ে পালাবে। কিন্তু হলো উল্টো। একেই তার আনন্দে বাগড়া বসিয়েছে তার উপর মাথায় প্রচÐ ব্যাথা দিয়ে এই মহিলা। দ্রæত প্যান্টটা পরে, কোমর থেকে একটা ছুড়ি বের করে নীলার পেটে বসিয়ে দিল। দুবার চালালো। বিষয়টা এমনই আচমকা হলো যে নীলা কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। সে ভেবেছিল লোকটা পোশাক পরে এখান থেকে পালাবে কিন্তু এতো দ্রæত যে তাকে আক্রমণ করবে ভাবতেও পারেনি। ছুরি চালিয়েই লোকটা দৌড় মারলো। তার প্রতিশোধ নেওয়া হয়ে গেছে। নীলা বুঝতে পারলো সে জ্ঞান হারাচ্ছে! শেষ মুহূর্তে সে দেখতে পেল মেয়েটা ছুটে তার দিকে আসছে।

    আম্মু! আম্মু!
    খুব দূর থেকে শব্দটা ভেসে আসছে- মনে হলো নীলার। চারপাশ অন্ধকার! এমন কেন লাগছে? ও কোথায় আছে? কিছুই বুঝতে পারছিল না সে! হঠাৎই সব মনে পড়লো। বুঝতে পারলো ও বেঁচে আছে। কিন্তু চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে। আবার শুনতে পাচ্ছে,
    আম্মু আম্মু!
    আহা কী মমতা মাখা! ভালোবাসা, শঙ্কা-উদ্বেগ মিশানো কণ্ঠে মেয়েটা ডাকছে তাকে। কিন্তু ময়নার গলা রিশমার মতো লাগছে কেন? আর ময়না তাকে আম্মুই বা ডাকবে কেন? ততোক্ষণে নীলার ঘোর অনেকটা কেটেছে। জোর করে চোখটা খুলল। দেখেই চমকে উঠলো! মনটা আনন্দে ভরে গেল। দেখলো, রাজিব এবং রিশমা। পরম মমতামাখা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখ খুলতেই রিশমা বলে উঠলো,
    আম্মু! আম্মু! আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি কখোনো তোমার কথার অবাধ্য হবো না। আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি আম্মু।
    আমিও তোকে অনেক ভালোবাসিরে মা। আমার সবচেয়ে বড় ভালোবাসাটাই তুমি।
    রাজিব হাত রাখলো নীলার কপালে। বলল,
    নীলা আমি তোমাকে ছুঁয়ে বলছি , আমি আর কখনো মদ পান করবো না। শুধু মেয়ে নয় পারিবারিক সকল সিদ্ধান্ত তোমার কথায় চলবে। আমাকে মাফ করে দাও। আরেকটাবার সুযোগ দাও প্লিজ।
    নীলা জানে রাজিব কথা রাখতে পারবে না। কিন্তু তাতে আসলে কিছু আসে যায় না। সকলেরই সীমাবদ্ধতা আছে। এগুলো মেনেই তো তারা আপনজন। তাছাড়া সে যে চেষ্টা করে না, তা না। সবাই তো আর মহাপুরুষদের মতো দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে পারে না। নীলা বলল,
    মনে থাকে যেন
    থাকবে! থাকবে!
    নীলর হঠাৎ মনে হলো,
    আচ্ছা আমি হাসপাতালে কীভাবে এলাম? আর ময়না কোথায়? অস্থির হয়ে উঠলো নীলা।
    তার অস্থিরতা দেখে রাজিব বলল,
    অস্থির হইও না! ময়না ভালোই আছে। ওর বাবা-মা নিয়ে গেছে। তারা তোমাকে নিয়ে বারবার কৃজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। তুমি জ্ঞান ফিরলে আবার আসবে বলেছে?
    আমি এখানে আসলাম কীভাবে?
    রাজিব বলল,
    এটা ভাগ্য বলতে পারো। কিছু কিছু সময় প্রকৃতি মানুষকে খুব ফেভার করে! তোমাকে সকালে বাসায় দেখতে না পেয়ে প্রথমে কিছু বুজিনি। অনেক্ষণ পরে যখন বুঝতে পারলাম, সাথে সাথে ফোন করা শুরু করলাম তোমাকে, মোবাইল বন্ধ তোমার, টেনশন বেড়ে গেল আরো! সবইকে ফোন দেওয়া শুরু করলাম কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারলো না! বাধ্য হয়ে রিশমা আর আমি বেরিয়ে পড়লাম তোমার খোঁজে। ট্রেন স্টেশনে চলে আসলাম, জামালপুর যাওয়ার জন্য। কেন জানি মনে হচ্ছিলো তুমি ওখানেই গেছ। আসতে না আসতেই দেখলাম একটা ছোট মেয়ে ছুটে আসছে, চিৎকার করতে করতে, গায়ে রক্ত লেগে আছে। লোকজন যারা ছিলাম জড়ো হয়ে গেলাম। ভাবলাম, মেয়েটাকে বোধ হয় কেউ আঘাত করেছে। কিন্তু মেয়েটা এসে যা বলল, তাতে চমকে উঠলাম! মেয়েটা বলতে লাগলো,
    আপনারা তাড়াতাড়ি আসেন, ম্যাডামকে মাইরা ফেলসে! একটা ব্যাডা আমাকে বগিতে নিয়া গেছিল, তখন ম্যাডাম গিয়া ঐব্যাডার মাথায় লাঠি দিয়া বাড়ি মারসে। ঐ ব্যাডা ছুড়ি দিয়া ম্যাডামরে কোপ দিয়া পালাইছে, তাড়াতাড়ি আসেন। রাজিব বলে চলছে,
    কেন জানি না আমার মন কেঁপে উঠলো! দৌঁড় দিলাম, রিশমাও পিছে পিছে দৌঁড়াচ্ছে। যা ভেবেছিলাম! এমন সাহসী কাজ কোন ম্যাডাম করতে পারে তা আমার জানা আছে। আমি অপদার্থ হতে পারি কিন্তু আমি খুব ভালোমতোই জানি আমি এক মহিয়সী নারীর স্বামী। দ্রæত গিয়ে তোমাকে কোলে তুলে নিলাম। হাসপাতালে এসে তোমার অপারেশন করে তোমাকে আশঙ্কামুক্তা করেছে ডাক্তার।

    হঠাৎ করে নীলার কাছে পৃথিবীটা অসম্ভব সুখের মনে হচ্ছে। এই আপনজনদের জন্যই তো সবকিছু। আমরা অভিমান করি! রাগ করি! ভুল বুঝি! কিন্তু বিপদে এই আপনজনরাই পাশে থাকে। যেমন সেদিন ছিল তার মা, আজ পাশে তার স্বামী ও মেয়ে। এই মুহূর্তে এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে মরে যেতে একটুও ইচ্ছে হলো না তার।

    2
    5 Comments
    • ভীষন ভালো একটা গল্প পড়লাম। সাবলীল বর্ণনায় একেবারে গল্পের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম।

      • অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনাদের প্রশংসা যখন পাই মনটা আনন্দে ভরে যায়!

      • তুলট মঞ্চে আপনার নিয়মিত উপস্থিতির দাবী জানিয়ে রাখলাম

    • 🌟 মূল্যায়ন:
      ✅ দৃঢ় প্লট
      ✅ গভীর আবেগ
      ✅ নাটকীয় টার্নিং পয়েন্ট
      ✅ সামাজিক বার্তা (নারী নির্যাতন, ভিক্ষাবৃত্তি, পারিবারিক সহিংসতা)
      ✅ স্মৃতি ও বর্তমানের চমৎকার সংমিশ্রণ
      রেটিং (★): ★★★★★ (৫/৫)

Friends

Profile Photo
ishan_syed
@put23009laoia-com
Profile Photo
মৌমিতা
@ofd66076toaik-com
Profile Photo
Avik_kazi
@rlw81159toaik-com
Profile Photo
আহান খান
@ukm39186laoia-com
Profile Photo
Mohammad Solayman
@solayman
Profile Photo
afrida-jahar
@afrida-jahar
Profile Photo
Md-Akadullah
@md-akadullah
Skip to toolbar