-
• 12 months agoপরিমল রায়• 12 months ago
মান্টো এর লেখা গল্পের ভাবানুবাদ
১৯৭১।ভারতের শরণার্থী শিবির। গণমানুষেরা গাদা-গাদি করে বসবাস। বেঁচে থাকার রসদ চাল-ডাল নেয়ার হেতু শরণার্থী শিবিরলাইন গুলোতে উপচে পড়া ভীড়। কোথাও তিল পরিমাণ বসার জায়গা নেই; তবুও, মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে ত্রাণের খাবার পেতে দলে দলে ত্রাণ শিবিরে ভীড় জমাচ্ছিল। হ্যাঁ! পর্যাপ্ত পরিমানের খাদ্য সরবরাহের ছিল না। হাইজিনের কোন বালাই ছিলোনা ছিল। নিরাপত্তার বালাই নাই; সক্রামক রোগ ছড়াতে থাকে বিস্তরভাবে ।কিন্তু কারো কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময়টুকু ছিলনা । সর্বত্রই আতঙ্ক আর ঈশ্বর যেন বিশৃঙ্খলার রাজত্ব কায়েম করেছে জনগণের উপর । এহেন পরিস্থিতিতে ঈশ্বরকে দোষারোপ করা যেতেই পারে।
যদ্দুর মনে পড়ে এটা ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি বা তারপরের সময়। বজ্রপাতের আলোয় পথ চিনে হাঁটতে হয়েছিল। যাই হোক, স্বেচ্ছাসেবকরা ‘শরণার্থী’ নারী ও শিশুদের সেবা দানের কাজ শুরু করে। এই কাজে হাজার হাজার নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে অংশ নেয়। এসব দেখে আমিও ব্যাতিক্রম ছিলাম না, এসকল কাজ করতে গিয়ে এক অদ্ভুত আনন্দে আচ্ছন্ন হয়ে পরেছিলাম। অন্যদিকে ঈশ্বরও যেন মানুষের অপকর্মের চিহ্নগুলি মুছে ফেলতে ব্যস্ত ছিলেন। আমরা সবাই দুর্ভোগরত মানুষদের লুটপাট আর হারিয়ে যাওয়া সম্মানগুলিকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম … কিন্তু কেন?
যাতে মানুষ তার পুণ্যের উপর আরো ক্ষতের দাগ হতে রক্ষা পায়? যাতে সে দ্রুততার সাথে রক্তমাখা আঙ্গুলগুলোর মেরামত করতে পারে এবং আবার তার সহকর্মীদের সাথে একই টেবিলে বসে খেতে পারে? যাতে মানবতার সূঁচ এবং সুতো তুলে নিতে পারেন এবং অন্যরা এখনও তাদের চোখ বন্ধ করে সতীত্বের ছেঁড়া কাপড় মেরামত করতে পারে? যদিও আমি কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারিনি… আমরা যা করছি তা শতভাগ ; তথাপি এই স্বেচ্ছাসেবকদের প্রচেষ্টা অবশ্য প্রশংসনীয়। প্রতিদিন অসংখ্য বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। পথে পথে অকল্পনীয় অসুবিধা ছিল ছড়ানো; কারণ কেউ কেউ, নারী ও মেয়েদের অপহরণ করেছিল, তারা ছিল পারদের মতো; এক মিনিট উপরে, আরেকটা নিচে, এখানে এখন, কাল চলে গেছে। এখন এক পাড়ায়, তারপর অন্য পাড়ায়। এবং কেউ কোনো তথ্য দিয়ে অংশ নিতে ইচ্ছুক ছিলনা।
এই স্বেচ্ছাসেবকদের বলার মতো অদ্ভুত গল্প ছিল। একজন লিয়াঁজো অফিসার আমাকে একদিন রাধিকাপুরের দুই মেয়ের কথা বলেছিলেন, যারা তাদের বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যেতে অস্বীকার করেছিল। অন্য একজন বর্ণনা করেছেন যে, জলন্ধরে একবার, যখন তারা একটি অপহৃত মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়েছিল, তখন বন্দীকারীর পুরো পরিবারকে বিদায় জানাতে বলেছিল যেন তাদের বন্দী একজন প্রিয় পুত্রবধূ; সেও একটি দীর্ঘযাত্রায় রওনা হয়।
বাবা-মায়ের সাথে আবার দেখা করার ভয়ে বেশকিছু মেয়ে পথে আত্মহত্যা করেছে। কিছু লোক ছিল যারা তাদের ট্র্যাজেডির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল এবং দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ পানে আসক্ত হয়ে পড়েছিল– যখন তৃষ্ণার্ত তারা পানির পরিবর্তে মদ চাইত এবং অশ্লীল কথা বলত।
যখনই আমি এই অপহৃত নারী ও মেয়েদের কথা ভাবতাম, তখনই দেখতে পেতাম ফুলে ওঠা পেট। এই পেটের কি হবে? এই পেটে যা আছে তার মালিক কে– ভারত নাকি পাকিস্তান? আর নয় মাসের শ্রমের কী হবে? মজুরি কে দেবে- ভারত না পাকিস্তান? নাকি সবই নিষ্ঠুর প্রকৃতির খাতায় জমাবে? এই খাতার কোথাও কি একটি ফাঁকা কলাম নেই? তথাপি উদ্ধার হওয়া নারীরা বাড়ি ফিরছিলেন। উদ্ধারকৃত মহিলারা বাড়ি যাচ্ছিলেন মলিন মুখে।
আমি সবসময় ভাবতাম কেন এই নারীদের ‘পলাতক’ বলা হয়? তাদের পালিয়ে যেতে বলা হয়নি। ‘পলাতক’ শব্দের একটি রোমান্টিক অর্থ আছে; নারী ও পুরুষের সমান ভূমিকা রয়েছে। পালিয়ে যাও বা পালিয়ে যাওয়া, এটিকে আরও রোমান্টিক নাম দেওয়ার জন্য, এটি একটি খাদের মতো যা প্রতিটি স্নায়ু এবং সাইনকে উত্তেজনায় ঝাঁকুনি দেয়। কিন্তু এটি একটি সরল এবং সরল অপহরণ যেখানে একজন দরিদ্র প্রতিরক্ষাহীন মহিলাকে তুলে নিয়ে অন্ধকার গর্তের মধ্যে আটকে রাখা হয়।
কিন্তু সময়গুলো এমন ছিল যে যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি, পরামর্শ এবং দার্শনিক কথা -বার্তার কোনো মূল্য ছিলনা। এইদিন গুলিতে, গ্রীষ্মের তাপ সত্ত্বেও, লোকেরা সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরের ভিতরে ঘুমায়, আমিও আমার মনের দরজা-জানালা গুলি বন্ধ করে দিয়েছিলাম – যদিও এটি এমন একটি সময়ে, আমি তা খোলা রাখা অপরিহার্য ছিল।কিন্তু আমি কি করতে পারতাম? আমি এর চেয়ে ভালো কিছু ভাবতে পারিনি।
উদ্ধার হওয়া নারীরা বাড়ি ফিরছিলেন। উদ্ধারকৃত মহিলারা বাড়ি যাচ্ছিলেন। এই উদ্ধার এবং পুনরুদ্ধার অন্যান্য জাগতিক ব্যবসার মত লেনদেনের অনুষঙ্গীতে পুরোদমে ছিল। আর, হাতে-কলম, সাংবাদিক, লেখক-কবিরা তাদের শিকারে ব্যস্ত। আর কবিতা, গল্প আর প্রবন্ধের বন্যা বয়ে চলেছে অবিরাম। কলম হোঁচট খেয়ে পথ হারায় মাঝে মাঝে। নিছক সংখ্যা দেখে হতাশ হয়ে শিকারিরা কী করবে তা ভেবে হতাশ হয়ে পড়েছিল৷
আমি একজন লিয়াঁজো অফিসারের সাথে দেখা করেছি যিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনাকে এত বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে কেন?’ আমি কোন উত্তর দিতে পারিনি।
সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হল প্রতি ট্রিপে আমি একজন বৃদ্ধ মহিলাকে দেখেছি- একজন মুসলিম বৃদ্ধ মহিলা। আমি তাকে প্রথম বার দেখেছিলাম; সে মধ্যবয়সী। এটি জলন্ধরের বাই-লেনে ছিল। তিনি ছেঁড়া নোংরা ন্যাকড়া পরিহিত ছিল, তার চোখ ফাঁকা ছিল, তার চুল ম্যাট এবং ময়লা আবৃত ছিল, এবং তাকে হারিয়ে যাওয়া এবং দুঃখে পাগল দেখাচ্ছিল।সে নিজের দেখাশোনা করার মতো অবস্থায় ছিলনা, তবুও এটা স্পষ্ট যেন; তার চোখ কাউকে খুঁজছে।
‘একজন মহিলা স্বেচ্ছাসেবক আমাকে বলেছিলেন যে অধিক শোকে সে মন হারিয়েছে। তিনি বাংলাদেশের বাসিন্দা ছিলেন। তার একমাত্র কন্যা, যাকে সে খুঁজে পায়নি। তাকে খুঁজে বের করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তাঁর ভাগ্য প্রসন্ন ছিলনা। মেয়েটি সম্ভবত যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন, কিন্তু বৃদ্ধ মহিলা তা মানতে রাজি হননি।
‘আমি তাকে দ্বিতীয় বার বাংলাদেশের সীমান্তে দেখেছি, যেখানে ট্রাক চালকরা তাদের গাড়ি পার্ক করে। তাকে আগের চেয়ে দুর্বল এবং ক্লান্ত লাগছিল। আঁচিলে তার ঠোঁটে আবৃত। তার চুলগুলো সাধুরমতো ড্রেডলক দিয়ে জড়ানো ছিল।আমি তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম এবং তাকে তার অন্ধ আশাহীন অনুসন্ধান ছেড়ে দিতে রাজি করালাম। আমি আমার হৃদয় শক্ত করে তাকে কঠোরভাবে বললাম, “বুড়ি মা, তোমার মেয়েকে মেরে ফেলা হয়েছে।”
‘পাগলা মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মেরেছে? … না।’ তার সুরে একটা স্থির সংকল্প ছিল, ‘কেউ তাকে মারতে পারবেনা। আমার মেয়েকে কেউ মারতে পারবেনা। ‘এবংসেতার অন্ধ, নিরর্থক অনুসন্ধান করতে পুনরায় অন্যত্র চলে গেল।
‘আমি ভাবলাম- এই রকমটা কিভাবে সম্ভব? পাগলা মহিলা কেন নিশ্চিত হলেন যে তার মেয়ের বিরুদ্ধে কেউ ছুরিকাঘাত করবেনা? যে কোন ধারালো ব্লেড বা ছুরি তার গলার কাছে আসতে পারেনা? সে কি অমর ছিল? নাকি তার মেয়ের প্রতি বুড়ির ভালোবাসাই ছিল অমর? সর্বোপরি, একজন মায়ের ভালবাসা অমর, তাই তিনি কি কেবল মায়ের ভালবাসা খুঁজছিলেন? সে কি কোথাও হারিয়েছে…?
‘আমি তাকে আমার তৃতীয় সফরে আবার দেখেছি। একখান ছোট ন্যাকড়া সবে তা শরীরে আবৃত এবং তিনি প্রায় নগ্ন ছিল। আমি তাকে দেয়ার জন্য; কিছু জামাকাপড় কিনে ছিলাম কিন্তু সে সেগুলো গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।
‘আমি তাকে বললাম, ‘বুড়ি মা, আমি তোমাকে সত্যি বলছি। আপনার মেয়েকে খুন করা হয়েছে।”
‘তিনি একই দৃঢ় সংকল্পের সাথে উত্তর দিয়েছিলেন, “আপনি মিথ্যা বলছেন।”‘
‘আমি তাকে যতোই বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করেছি, ততোই সে, “না, না, করছে। আমি তোমাকে সত্যি বলছি। আপনি তার জন্য যথেষ্ট চোখের জল ফেলেছেন। এখন আমার সাথে চলেন, আমি তোমাকে ভারতে নিয়ে যাব।
‘সে আমার কথা শুনেনি এবং নিজের কাছে বিড়বিড় করতে শুরু করেছে। মাঝখানে তার ছিন্ন-ভিন্ন মনোলগ, সে হঠাৎ চমকে উঠল। এবার তার কণ্ঠে সংকল্প ইস্পাতের চেয়েও শক্তিশালী। “না! আমার মেয়েকে কেউ মারতে পারবেনা।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”
‘ বৃদ্ধা মৃদুস্বরে উত্তর দিল, ‘সে সুন্দরী। সে এত সুন্দর যে তাকে কেউ মারতে পারবেনা- কেউ তাকে থাপ্পড় মারার জন্য হাতও তুলতে পারবেনা।
‘আমি অবাক হয়েছিলাম – সে কি সত্যিই এত সুন্দর হতে পারে? প্রতিটি মায়ের চোখে তার সন্তান সূর্য ও চাঁদের চেয়েও সুন্দর। যদিও এটা সম্ভব যে তার মেয়ে সত্যিই খুব সুন্দরী ছিল, এই প্রবল উত্তাল সময়গুলো কি কোনো সৌন্দর্যকে মানুষের কলুষিত হাত দ্বারা নিষ্প্রভ রেখে যেতে পারে? বোধ হয়। বৃদ্ধ মহিলাটি কেবল সেই একটি পাতলা সুতো ধরে রেখে নিজেকে বোকা বানাচ্ছেন? পরিত্রাণের হাজার উপায় আছে, কিন্তু দুঃখ হল একমাত্র আড়াআড়ি অংশ যা এক লক্ষ অভিসারী রাস্তার জাল বুনেছে।
‘আমি সীমান্তের ওপারে আরও বেশ কয়েকটি এলাকায় ভ্রমণ করেছি এবং প্রতিবারই পাগল মহিলাটিকে দেখেছি। তাঁর শরীরের চামড়া এবং হাড়ছাড়া সবকিছুই হ্রাস হয়েছে. তিনি মাত্র দেখতে পান ক্ষীণভাবে কিন্তু তার অনুসন্ধান অব্যাহত- নিঃশঙ্ক এবং আগের চেয়ে শক্তিশালী। তিনি আগের মতোই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে তার মেয়ে বেঁচে আছে এই সাধারণ কারণ—কেউ তাকে হত্যা করতে পারেনা।
তাই স্বেচ্ছাসেবকটি আমাকে বলেছিলেন যে তাকে কারণ দেখানোর চেষ্টা করা অর্থহীন। সে সম্পূর্ণ পাগল ছিল; তাকে কোন মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং তাকে মানসিক আশ্রয়ে ভর্তি করাই ভালো হবে।
‘কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমি তাকে চালিয়ে যাওয়া একমাত্র জিনিসটি কেড়ে নিতে পারিনি- তার মেয়ের জন্য তার অন্ধ অনুসন্ধান।‘আমি তাকে এই বিশাল পাগলাগারদ থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারিনি যেখানে সে অবাধে মাইলের পর মাইল ঘুরে বেড়াতে পারে এবং তার ফোসকা পায়ের তৃষ্ণা নিবারণ এবং তাকে সীমান্তের ওপারের কোনও সঙ্কুচিত প্রকোষ্ঠে আটকে রাখতে পারে।
‘আমি তাকে শেষবারের মতো বাংলাদেশে দেখেছি। তার অবস্থা এমন ছিল যে আমার চোখে জল এসে গেল। এবার আমি তাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে মানসিক আশ্রয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম।
‘সে সীমান্তে দাঁড়িয়ে, অন্ধ চোখে একদিকে তাকিয়ে ছিল। হাট-বাজার। আমি স্বেচ্ছাসেবকের সাথে বসে একটি অপহৃত মেয়ের কথা বলছিলাম যেটি পাশের বাজারে একজন হিন্দুব্যবসায়ীর সাথে বসবাস করছে বলে জানা গেছে। আমি আমার কথোপকথন শেষ করে উঠেছিলাম এবং পাগলা মহিলাটিকে এক গুচ্ছ মিথ্যা বলার উদ্দেশ্য । এমন সময় এক দম্পতি পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাকে কোনো ভাবে আমার সাথে ভারতে নিয়ে আসতে রাজি করিয়েছিলাম। পাশে হেঁটে যাওয়া মেয়েটি মুখ ঢেকে রেখেছিল কিন্তু পুরোপুরি নয়। তার সাথে থাকা লোকটি ছিল একজন হিন্দু যুবক।
‘দুজনই পাগলা মহিলার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেই যুবকটি দু-এক পা পিছিয়ে গেল। তিনি মেয়েটির হাত ধরে তার দিকে টেনে নিলেন। মেয়েটিও প্রায় অনিচ্ছাকৃতভাবে তার ঘোমটা পিছনে ঠেলে দিল। তার ঘোমটা তুলার সাথে সাথে, মেয়েটির মুখছবি ফ্রেমবন্দী হল আমার মনে; আমি একটি উজ্জ্বল গোলাপী মুখ দেখেছি, যা অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য আমি বর্ণনা করতে পারিনা, কেবল উপভোগ করতে পারি।
‘আমি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। হিন্দু যুবকটি, সৌন্দর্যের প্রতীক যুবতীটিকে, ভারসাম্যহীন মহিলার দিকে ইঙ্গিত করে ফিসফিস করে বলল, “তোমার মা।”
‘মেয়েটি পাগল মহিলার দিকে তাকালো এবং সেই মুহূর্তে, তার ঘোমটা ধরে রাখতে ভুলে গেল। তারপর সে যুবকের হাতটা চেপে ধরে আঁকড়ে ধরা স্বরে বলল, “চল যাই।“এবং দুজন দ্রুত চলে গেল। মহিলাটি চিৎকার করে মেয়েটির নাম ধরে ড্যাকতে লাগল।
‘তিনি উত্তেজিত ছিলেন। আমি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি ব্যাপার বুড়ি মা?”
বুড়িমা—’কাঁপছিল। “আমি তাকে দেখলাম!”‘
‘কে ‘? আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম.
‘তাঁর কপালের নিচের দুটি গর্তে ডুবে থাকা দৃষ্টিহীন বলগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। “আমি আমার মেয়েকে দেখেছি। ”
আবারও আমি তাকে বললাম, “কিন্তু সে অনেক আগেই মারা গেছে।”
‘সে চিৎকার করে বলল, “তুমি মিথ্যা বলছ!”‘
‘ওকে সব সময় বোঝানোর জন্য এইবার বললাম, ‘আল্লাহর কসম– আপনার মেয়ে মারা গেছে।’
‘সে কথাগুলো শুনেই রাস্তার মাঝখানেই মরে গেল।’
[নোটঃ উর্দু ভাষার খ্যাতিমান গল্পকার Sadat Hasan Manto এর নামে ব্রিটিশ সরকার অশ্লীলতার অভিযোগ আনলে; তিনি বলেন –‘লেখায় অশ্লীলতা থাকলে বুঝতে হবে, আমরা সেই সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি (If you find my stories dirty,the society you are living in is dirty. With my stories, I only expose the truth).ব্রিটিশ সরকার তাকে শাস্তি দিতে না পারলেও, দেশান্তরিত মান্টোকে পাকিস্তান সরকার ঠিকই এ অপরাধে তাকে সাজা দেন।পাকিস্তানে বসে মান্টো লিখেন – আমার মৃত্যুর পর আমাকে পুরস্কৃত করা হবে, আর সেদিন আমি বিজয়ী; হেসে বলব –কে বড় ছোট গল্পকার—আমি না ঈশ্বর ? হয়েছিলও তাই!]