Profile Photo

জাহিদ বিন হিকমতOffline

  • zahidbinhikmot
  • হারিয়ে গেছে ফুল, বিধ্বস্ত হৃদয়কুল
    জাহিদ বিন হিকমত
    ছেলেটি সত্যিই বড় অমায়িক ছিল। ছিল হাস্যোজ্জ্বল এক প্রদীপ্ত যুবক। তার সরল, মাখা হাসি আর গভীর চাহনিতে ছিল হৃদয়রাজ্য জয় করার এক প্রবল আকর্ষণ। সে কথা বলত কম, কিন্তু তার উপস্থিতিই যেন চারপাশকে আলোকিত করে তুলত। বিপদের দিনে সে ছিল নির্ভরতার আশ্রয়, আবার আনন্দের মুহূর্তে প্রাণখোলা হাসির সঙ্গী। কারও দুঃখ দেখলে তার চোখে ছায়া নামত, আর সাহায্যের হাত বাড়াতে সে কখনো দ্বিতীয়বার ভাবত না।
    জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আশ্চর্য রকমের ইতিবাচক। ছোট ছোট বিষয়েই সে খুঁজে নিত আনন্দের উপলক্ষ, আর নিজের সুখের চেয়ে অন্যের হাসিকেই বেশি প্রাধান্য দিত। তাই হয়তো অল্প সময়েই সে সবার আপনজন হয়ে উঠেছিল।
    বলছি শরিফ ওসমান বিন হাদির কথা।
    ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, শুক্রবার। জুমার নামাজ শেষে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ব্যাটারিচালিত রিকশায় চেপে সহকর্মীর সঙ্গে বিজয়নগরের দিকে রওনা দিয়েছিলেন শরিফ ওসমান বিন হাদি। ব্যস্ত শহরের সেই চেনা রাস্তায় তখন আপাত শান্তি বিরাজ করছিল। কিন্তু সেই শান্তির আড়ালেই লুকিয়ে ছিল অশান্তি—লুকিয়ে ছিল মৃত্যুর ছায়া।
    পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেলে করে ঘাতক দল নিঃশব্দে তাদের অনুসরণ করে। হঠাৎই চলন্ত রিকশার খুব কাছাকাছি এসে মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচু করে নিশানা করে। মুহূর্তের মধ্যেই গুলির বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে ফাঁকা রাস্তা। একটি গুলি ওসমান হাদির কানের ডান পাশ দিয়ে প্রবেশ করে মাথার বাঁ দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘাতকের বুলেট হঠাৎ করেই তাঁর জীবনের গন্তব্য থামিয়ে দেয়।
    ঘটনার পরপরই দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেলটি অদৃশ্য হয়ে যায়। শহরের গলিপথে মিলিয়ে যায় ঘাতকরা। রক্তাক্ত অবস্থায় ওসমান হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। ঐদিন বিকেলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, গুলিটি মাথা ভেদ করে বেরিয়ে গেছে এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে। তাঁকে হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারে রাখা হয়। তিনি তখন কোমায় ছিলেন। তাঁর জিসিএস স্কোর ছিল ৩ এবং তিনি মাইড্রিয়াসিসে ভুগছিলেন।
    ব্যস্ত রাজধানীর এক কোণে দিনের আলোয় ঘটে যাওয়া এই হামলা আরও একবার প্রশ্ন তুলে দেয়—নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার আর মানুষের জীবনের মূল্য নিয়ে।
    উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে দ্রুত নেওয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। ১৫ ডিসেম্বর তাঁকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে নয়টায় কোটি কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে তিনি আল্লাহর মেহমান হয়ে যান।
    মৃত্যুপূর্ব সময়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন একজন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী, লেখক ও শিক্ষক। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ-এর মুখপাত্র হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন।
    জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে গঠিত এই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটি শরিফ ওসমান হাদির হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন—যেখানে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচার হবে প্রধান মূল্যবোধ।
    ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে হাদি তাঁর স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সংগঠন গঠনের পর তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, অপরাধীদের বিচার, আহত ও নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই চার্টার ঘোষণার দাবি তোলেন—যা তাঁকে দ্রুত রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
    ২০২৫ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৮ আসন (মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর) থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়, জনগণের পরামর্শ অনুযায়ী নির্বাচনি ইশতাহার প্রণয়নের ঘোষণা—এসব উদ্যোগ নাগরিক সমাজে ব্যাপক প্রশংসিত হয় এবং গণমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। ভোররাতে মসজিদের সামনে লিফলেট বিতরণ, ডোনেশনের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ এবং সেই অর্থের হিসাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়তে থাকে। নির্বাচনি প্রচারণার সময় তাঁর পকেটে এক ব্যক্তি টাকা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন—এমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
    অতঃপর প্রশ্ন আসে—হাদিকেই বা কেন টার্গেট করা হলো? এর উত্তরে বলা যায়, তিনি দুর্নীতি, স্বৈরশাসন, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে নিয়মিত ও প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখতেন। এর ফলে তিনি ফ্যাসিবাদী শক্তির নজরে পড়েন। পাশাপাশি ভারতীয় প্রভাব ও রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি নিয়ে তাঁর স্পষ্ট অবস্থানও তাঁকে একটি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে বলে তাঁর সমর্থকদের দাবি। অনেকের মতে, নির্বাচন-পূর্ব সময়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
    ফুলটি ঝরে গেছে অকালে। তার সৌরভ ছড়ানোর আগেই নিষ্ঠুর হাতে তা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। কিন্তু ফুলের মৃত্যু কি কেবল ঝরে পড়াতেই শেষ? না—তার ঘ্রাণ রয়ে যায় বাতাসে, তার রং লেগে থাকে স্মৃতির ক্যানভাসে। শরিফ ওসমান বিন হাদিও তেমনই এক ফুল—যার প্রস্থান বিধ্বস্ত করেছে হৃদয়কুল, অথচ যার আদর্শ এখনো নিঃশব্দে প্রস্ফুটিত হচ্ছে মানুষের মননে।
    আজ তিনি নেই, তবু যে বাগানে তিনি স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন, সেখানে প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে, প্রতিবাদ জন্ম নিচ্ছে, আশা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। ফুল হারিয়ে গেছে—হ্যাঁ। কিন্তু সেই ফুলের শূন্যতাই আজ আমাদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। আর যতদিন এই হৃদয়কুল ব্যথা অনুভব করবে, ততদিন তাঁর অনুপস্থিতিই হবে উপস্থিতির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।

Skip to toolbar