-
সমর্পন
মুহাঃ হাবিবুর রহমান
কেরসিনের কুপিটা তখনও জ্বালানো ছিল। মাজু বিবি কি করবে ভেবে পাচ্ছিলনা। শেষ রাতের জমাট অন্ধকারের মতো তার বাকী জীবনটা অন্ধকারে ঢেকে গেল। পঞ্চাশ বছরের বিবাহিত জীবনের অবসান হয়ে গেছে। রহিমদ্দী কিছুক্ষণ পূর্বে ইহলোক ত্যাগ করেছে। অনেকদিন ধরে নানা রকম রোগ শোকে তার বিছানায় কাটানো জীবন ছিল যন্ত্রনা ময়। মরনের সময় সে বউ মাজুবিবিকে কাছে ডেকে জড়ানো কন্ঠে কিছু বলতে চেয়ে ছিল। কিন্ত অসম্ভব যন্ত্রনায় মুখ থেকে কোন কথা বের হয়নি।
মাজু বিবি ও রহিমদ্দীর সংসারে কোনো সন্তানাদি হয়নি। অনেকেই রহিমদ্দীকে বলেছিল আবার বিয়ে করতে, কিন্ত কে শোনে কার কথা। ছোট বেলায় মাজু বিবিকে শাদী করে ঘরে আনে রহিমদ্দী। মাজু বিবির বয়স তখন সাত কি আট হবে। রহিমদ্দীর বয়স তেরোর কোঠায়। শুরু থেকে সংসারে তেমন সচ্ছলতা ছিলনা। গাঙে জাল ফেলে মাছ ধরে চলতো দুজনের সংসার। রহিমদ্দীর আদি বাড়ি কোথায় তা কেউ বলতে পারেনা। কোনো এক সময় নাকি খড়ের গাদার সাথে ভাসতে ভাসতে ভাটির দেশে চলে আসে। গ্রামের মহাজনের বাড়িতে কামলার কাজ করে বড় হয়েছে। বিয়ে শাদি করে আলাদা ঘর তোলে। রহিমদ্দীর বাবা মায়ের কথা মনে পড়েনা। দুঃখ যেন তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। মাজু বিবিকে বিয়ে করে তার কিছুটা হলেও শান্তি হয়েছে। আর কিছু নাহোক তিন বেলা রান্না করে একজন তার জন্য বসে থাকে সেটা ভেবে রহিমদ্দীর খুশীর সীমা থাকেনা। সপ্তার বাজার থেকে গুড়মুড়ি কিনে খাওয়ায়, সন্দেশের দলা গাটিতে করে বাড়ি ফেরে। সন্দ্যা বেলা মাজু বিবি পথ পানে চেয়ে থাকে। এজন্য তাকে প্রতিবেশী ভাবীদের অনেক খোচা সহ্য করতে হয়েছে। একবার প্রচন্ড জ্বরে মাজুবিবির মরনাপন্ন অবস্থা হলো। কাপুনি দিয়ে জ্বর, সাত দিনে শরীর ভেঙে একবারেই কাহিল অবস্থা। বাঁচার কোনো আশাই ছিলনা। রহিমদ্দীর সেকি অস্থিরতা, একবারে পাগল প্রায়। কবিরাজ ডাকে বদ্দি খোঁজে ওষুধ পত্যর কোন কমতি করেনা। পাশের বাড়ির রমিছা রহিমদ্দীকে ডেকে বলে
শোন দেবর জ্বী
তোমার মতো একটা মানুষ পেলে আমার জীবন ধন্য হয়ে যেত।
আমার স্বামী তোমার মতো না, আমাকে শুধু মারে যত্ন তো করেনা, রাত করি বাড়ি ফিরে নাক ডাকায়ে ঘুমায়, আবার যখন তার পশুত্ব জাগে তখন বন্য জানোয়ার হয়ে শরীলটা চেটে পুটে খায়। তুমি কতো ভালো। তোমার মাজুকে আগলে রাকো। রহিমদ্দির সে সব কথায় কান যায় না।
ইউনিয়নের চেয়ারম্যান থেকে অনুমতি নিয়ে ওয়াপদার বাঁধের বাইরে খোলটপটুয়ার চরে সরকারী খাস জায়গায় রহিমদ্দী দো চালা ঘর তোলে। চরের মাটি বাতাস একবারে চেনা তাদের। জোয়ারের পানি তাদের বসত ভিটার একবারে কাছে চলে আসে। ভাটায় আবার সে পানি দূরে চলে যায়। রাতে পানির ছলাৎ শব্দে রহিমদ্দীর ঘুম ভেঙে গেলে জাল নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই একব্যাগ মাছ নিয়ে সে হাজির হয়। কিছু নিজেরা খায় এবং বাকি বাজারে বিক্রি করে দেয়। যে দিন বেশী মাছ ধরতে পারে সেদিন রহিমদ্দীর খুশীর সীমা থাকেনা। জোর গলায় দূর থেকে ডাকবে বউ এই মাজু তাড়াতাড়ি ওঠ দ্যাখ কতো মাছ পাইচি। কাট দেখি, কিছু মাছ রান্না কর, ভোলা মাছটা রানবি কলাম ওটা আমার খুউব পছন্দের। মাজু বিবি তাড়াতাড়ি পড়ি মরি করে উঠে বসে জোরে হাই তুলে বলবে আসি গো।
হাকডাক কম করো দিকি। সবাই ঘুমোচ্ছে, তোমার জ্ঞান নেই নাকি। নারে বউ মাছ পালি আমার জ্ঞান থাকেনা। নে ধর খারা ধর দেখ কত মাছ। রহিমদ্দির গায়ে নদীর চরে থকথকে কাদা।
মাছ যেন আর কেউ খায়না।
গামছা আর দাতনটা এগিয়ে ধরে বললো –
গা ধুয়ে আসো দেকিনি, তোমার গায়ে অনেক কাদা লাগি আচে।
থাকনা কাদা, তাতে তোমার কি? বলেই রহিমদ্দি একগাল ফোকলা হাসি দিয়ে মাছ গুলো উঠনে ঢেলে দিয়ে আরো জোরে হাসতে থাকে।
বাজার বেলায় মাছ গুলো বিক্রি করে অনেক টাকা হয়েছে। রহিমদ্দী বউ এর জন্য আলতা, স্নো, পাউডার কিনলো। দোকানদার তার সাথে মস্করা করে বললো কিরে রহিমদ্দী বউকে খুব ভালোবাসো নাকি? তোমার বউ আজকে খুশী হবেনি। হ হবেনে তুমি কইলে। মনে মনে রহিমদ্দি খুব খুশী, হাতের গামছা কাঁধে তুলে দোকান থেকে হন হন করে সে বেরিয়ে পড়ে।
মাজু বিবি বাজা বলে অনেকের গাল মন্দ শুনেছে। সন্তান হয়না তাতে তার কি দোষ সে আজও জানে না। শহরের ডাক্তার দেখিয়ে রহিমদ্দির দোষ ধরা পড়ে। সেই থেকে রহিমদ্দি মাজুকে বেশী যত্ন খাতির করতে থাকে। মাজু বিবি স্বামীর পায়ের কাছে বসে চোখের জল ফেলতে থাকে। সারা রাজ্যের নিরবতা তার জীবন জুড়ে নেমে এসেছে। বুকের মধ্যে শূন্যতা খা খা করে ফিরছে।
কবর খোড়া শেষ প্রায়। বাঁশের জোগান হয়ে গেছে। মোকাম থেকে কাফনের কাপড় নিয়ে কাটা ছেড়া করে প্রস্তুত করা হয়েছে। জানাযার জন্য মসজিদের হুজুর কে ডাকা হয়েছে। উপস্থিত সবার চোখে জলের ধারা। রমিছা মাজুকে জড়িয়ে আছে। এমন দুঃখের দিনে রমিছা মাজুকে ছেড়ে থাকেনি। সারাক্ষন তার সাথে থেকে সান্তনা দিয়ে গেছে।
জানাযা শেষে রহিমদ্দিকে কবরে শুয়ে দিয়ে শেষ কাজ গুলি সারা হলো। রহিমদ্দির দাফনের সাথে সাথে মাজুবিবির সকল স্বপ্ন দাফন হয়ে গেল। একটি মানুষের চলে যাওয়া কতোটা বেদনার হতে পারে তা আজ বুঝতে পারছে। পৃথিবীর সব আঁধার আজ তার চোখে। বিষন্ন মাজুবিবি রমিছাকে জড়িয়ে কেঁদেই চলেছে। রমিছা কোন ভাষা দিয়ে মাজুকে শান্তনা দিতে পারছেনা। তবুও সাহষ করে বললো “বইন আর কান্দিস না। সবার কপালে সুখ থায়েনা। মানুষটা তোকে কত্তো সোহাগ করতো, কান্দিসনারে। মাজু বিবি আরো জোরে রমিছাকে জড়িয়ে কান্নার শব্দ বাড়িয়ে দিল।
সন্ধ্যা বেলা ঘরের আলো না জ্বালিয়ে মাজুবিবি বারান্দায় বসে রইল। রমিছা থালায় ভাত এনে মাজুকে খাওয়ার কথা বললো। কে শোনে কার কথা। দূর দৃষ্টিরত স্বামীর কবরের দিকে তাকিয়ে রইল। সব শূন্যতা এখন তার জীবনে। বোবা হয়ে গেল। চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো রমিছারে খোদা কেন তাকে বাচিয়ে আমারে নিলনা। ক্যান নিলনা,ক্যান?2 Comments

Md. Habibur Rahman
Lec-Islamic History and Culture Nowabenki Degree College, Shyamnagar Sathira.
১৯৭২ সালে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার ১০নং আটুলিয়া ইউনিয়নের বিড়ালাক্ষী গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে জন্ম। সরকারী ব্রজলাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অনার্স সহ মাষ্টার্স পাশ। বর্তমানে নওয়াবেঁকী মহাবিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে কর্মরত। লেখালেখি, কবিতা আবৃতি, উপস্থাপনা অনেক আগের থেকে। কবিতা, প্রবন্ধ, ছোট গল্প ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত লেখা চলমান। মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে নিজের কাছে খুবই ভালো লাগে। সামাজিক সেবা মূলক কাজে সক্রিয় সম্পৃক্ততা রয়েছে। স্রষ্টার ইবাদত আর সৃষ্টির সেবা মহান ব্রত ও বিশ্বাস।
Friends
Nahar moyna
@moyna
Nushrat Mohima
@nushrat-jahan-mohima
Md Rabiul Islam
@mdrabiulislam
Md-Shajib-Sikder
@md-shajib-sikder
Kh. Mahadi Hasan
@kh-mahadihasan
পরিমল রায়
@parimal-roy
Ghulam Faruq Hamim
@ghulamfaruqhamim
Okkhar ahsan
@okkharahsan
মিশকাত হোসাইন হিশাম
@hisham

গল্পটি পড়তে পড়তে চোখের কোণ ভিজে এল।