-
অন্ধকার তুহুঁ মম
সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান (Facebook id: Siddique.Mahmud.5)বয়সটা আমার তখন সাড়ে এগারো!
পাসপোর্টে কি একটা বড় জটিলতা হলো।
মা, বড় আপা, বড় ভাই, আমি আর আপার মেয়ে সোনালী খুলনায় ছিলাম বেশ কয়েক দিন! কয়েক দিন মানে মনে হয় মাসখানেকের ওপরে হবে!
কলকাতা পার হয়ে বেনাপোল, নাভারণ, ঝিকরগাছা, যশোর। যশোর থেকে রুপদিয়া, বসুন্দিয়া, নওয়াপাড়া, ফুলতলা, তারপর খুলনা। রুপদিয়া আর বসুন্দিয়ার কথা আমার ‘জিপসি জীবন’ আত্মজীবনী গ্রন্থে আছে!
রুপদিয়ার পর হাঁটা পথে মালডাঙ্গার পর দেয়াপাড়া – আমার মায়ের ছোট নানাবাড়ি। নদীর ধারের অপূর্ব সুন্দর সে গ্রামটা!
খুলনা বাংলাদেশের পশ্চিম-দক্ষিণের শেষ জেলা। সে সময়ে পূর্বপাকিস্তানে ছিল
১৭টা জেলা ছিল!
কোন সালের কথা বলছি?
ওহ! সেটা হলো ১৯৫৭ সাল!
আমার আবার এক্কেবারে ছেলেবেলার কথা খুব স্পষ্ট করে মনে আছে। আমি কিন্তু স্মৃতি কথা যখন লিখি, তখন গুলগপ্পো মোটেই লিখি না!
আমরা এসে উঠলাম থাকতাম খুলনা শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে সারদা বাবু রোডের মোড়ে। রাস্তার অন্য পাশে হাদিস পার্ক। অনেক উঁচু একটা টিলা মতো স্থাপনা তার ওপরে একটা সুন্দর ছাউনি। ওপরে ওঠা পথটার দুই ধারে তালসুপারীর গাছ! তার ওপারে বিশাল বড় পুকুর। সে সময়েও অসম্ভব সুন্দর জায়গা ছিল ওটা। বিকালে আমরা ও মেয়েরা ওখানে বেড়াতে যেতো! সন্ধায় কেম্ন অপূর্ব ঘোলাটে আলো জ্বলতো পার্ক জুড়ে।
বাড়িটা দুই তলা। বেশ বড় বড় ঘর। এখানে থাকতেন মায়ের এক খালা আর খালু আর তাদের পাচ মেয়ে, নাজমা, সালমা, আসমা, আন্না আর দুই ছেলে। বড় জনের নাম চান্নু।
নাজমা আমার চেয়ে বছর দুইয়ের বড় আর ওদের এক ভাই বড় ভাইয়ের চেয়ে বছর খানেকের বড়। আরও ও বাড়িতে থাকতো আমার তিন মামা – জিলু মামা, জালু মামা আর মুন্নু মামা ওরা মায়ের ফুফাতো ভাই। ওদের এক বোন ছিল, চান্দু। তিনি তখন বিবাহিত। তাঁর স্বামী খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তাদের একটা মেয়ে ছিল। পরে আর একটা মেঊড় হতে চান্দু খালা মারা যান!
সে কালে সকল আত্মীয়ই খুবই ঘনিষ্ট ছিল। ফলে মা যে আমাদের নিয়ে ওদের বাসায় গিয়ে হাজির হলেন, তাতে ওদের কোন মনোবিকার দেখা দিলো না। অতগুলো মানুষ বাসায় – সকলের তো খাট-তক্তপোষ পাওয়ার সুযোগ ছিলো না। বাড়িটারও অনেক ঘর ছিলো না। তাই বড় ঘরের মেঝেতে কয়েকটা তোষক পেতে ঢালাও বিছানা করে দেয়া হলো। ওখানেই সারা দিন গুলতানি, ওখানেই রাতে যে যেদিকে পারে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়া!
নিচের তলায় বাড়ির ঠিক বাইরে বেশ বড় উঠান! উঠানের এক ধারে বাড়িটার গায়ে একটা বড় ঘর – ঘরের মধ্যে একটা বিশাল চৌবাচ্চা – মিউনিসিপ্যালিটির সরবরাহ করা টলটলে পানিতে ভরে থাকতো ওটা! চৌবাচ্চাটা উচ্চতায় আমার গলা পর্যন্ত। ওপরে কয়েকটা মগ থাকতো। একাধিম মানুষ ওখানে গিয়ে মগে পানি নিয়ে হাত-মুখ ধোয়া, ওজু করা ও দুপুরে গোছল করার কাজ করতে পারতো। চৌবাচ্চার সামিনের দুই পাশে বেশ অনেকটা জায়গা ফলে একাধিক লোকের কোনই অসুবিধা হতো না। অনেক সময় একাধিক পুরুষ ওখানে গিয়ে গোছল করতে পারতো। মেয়েরাও কখনও একা বা দুই তিন জন একসাথে এখানে তাদের কাজ কারবার সারতো অনায়াসে!
উঠানের শেষ মাথায় বড় টয়লেট – মানে সার্ভিস পায়খানা। তারপর বিশাল দেওয়াল!
বাড়ীটার চৌহদ্দি পার হলে একটা বিরাট এলাকা জুড়ে গোল পাতার ছাউনি দেয়া আসবাবপত্রের কারখানা – বেশ বড়ই – আট দশ জন কারিগর কাজ করতো! ভেতরে টেবিল, চেয়ার, আলমারী, আলনা, খাট, পালঙ্ক, ড্রেসিং টেবিল, ডাইনিং টেবিল আরও কত কি……। মামারা এটার দেখাশুনা করতেন।
মায়ের খালুর নাম আমিনুর রহমান। তিনি সারাদিন কোথায় কোথায় ঘোরাফেরা করতেন, সন্ধ্যে হলে ওকালতি বই নিয়ে বসে বসে গুণ গুণ করে আইনের ধারা-উপধারা মুখস্ত করতেন। মা হেসে বলতেন, কয় বছর ধরে দেখছি খালু ওকালতি পড়েই যাচ্ছেন। পড়া তো শেষ করতে পারেন না।
কয়েকটা বাড়ি পরে থাকতেন মায়ের একমাত্র মামা আখতারুজ্জামান। তাঁদের পাঁচ মেয়ে তিন ছেলে। বড় ছেলে মোহন আমারই বয়সী। বোন গুলোর নাম আর আজ মনে নেই। কারন দীর্ঘকাল সম্পর্কহীনতা। অথচ সে সয়ে কী ঘনিষ্টতা ছিল ওদের সাথে! কেবল বড় ছেলে মোহনের সাথে আমার আজও খুব ঘনিষ্টতা আছে!
মায়ের এই মামা লম্বা, রোগা, এক হারা চেহারা। এই মানুষটাকে কে আমরা নাতি-নাতিনরা আড়ালে ডাকতাম, “কান-টান নানা”।
তাঁর এই অদ্ভুত নামের একটা ইতিহাস আছে!
নানা কারও বাড়িতে বেড়াতে গেকে বা কোন ভাবে তাঁর সাথে আমাদের নাতিদের দেখা হলেই বলতেন, ‘এই, ইদিকে আয়। তোর সাথে তো অনেক দিন দেখা হয়নি, দেখি তোর কানটা শক্ত হয়ে গিয়েছে কি না!’
তারপর দুই হাতে দুই কান ধরে আচ্ছা করে চটকে দিতেন! অনেকক্ষণ ধরে। বড় অভিভাবক, মুরুব্বি মানুষ, তাই আমাদের মনে অপমানবোধ খুব একটা আসতো না, কিন্তু ব্যাথায় চোখে পানি ভরে আসতো। আব্বা-মা রাও তাদের মামার সামনে শিশুদের প্রতি তাঁর এই আচরণের জন্য মুখ ফুটে কিচ্ছু বলতে পারতেন না।
যে সন্ধ্যায় খুলনায় গিয়ে পৌঁছলাম ওখানকার পথ-ঘাট-বাড়িগুলোর আলো খুব ম্রিয়মাণ। কেমন যেন ঘোলাটে। বাসায় আসার পর ঘরের আলোও আমার কাছে খুব কম মনে হলো। আবছা, আবছা। অথচ কলকাতার আলোগুলো কেমন ঝক ঝক করতো সে সময়ে। পরে বুঝেছিলাম বাড়ি-ঘরে ব্যয় স্বাশ্রয় করার জন্যে কম ওয়াটের বাল্ব লাগানো হতো!
রাতের বেলা এলামেলের থাকায় করে ভাত এলো ভাতের একপাশে একটুকরো মাছের টুকরো আর অন্যপাশে এক চামচ ডাল দেয়া হলো।
মাছের গন্ধটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগলো। আমি নাজমাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কি মাছ?’ সে বললো, ‘বোঝ নাই? এটা তো নোনা ইলিশ! কি মজা!’
আমি কোন রকমে সেই অদ্ভুত গন্ধ ও স্বাদের শক্তমতো মাছ থেকে ভেঙে ভেঙে ছোট টুকরো করে গলায় ঢুকালাম। আমাদের বাসায় আময়রা শিখেছি কোন খাবার ফেলতে হয় না। তাই হয় তো অমন খাবারের ব্যাপারে কোন আপত্তি জানানোর সাহস আমার হয়নি!
ঐ সময়ের কথা বলতে গেলে আর একটা পাঁচ শ’ পৃষ্ঠার জীবন কথা হয়ে যাবে। তাই বিস্তারিত বর্ণনা ও ঘটনা বাদ থাক!
ওখানে আমার সময় কাটতো ঐ কাঠগোলা – ফার্নিচারের দোকানে। বসে বসে ওদের কাজ দেখলাম। কাঠ চেরা, প্রয়োজন মতো নানা ম্যাপের টুকরো করা হতো, র্যাদা, উকো, বাটালি ব্যবহার করে নানা আসবাবপত্র বানানো হতো, কাঠের ওপর নানা নক্সা আঁকা হতো। আসবাবপত্র বানানোর পর শিরিষ কাগজ দিয়ে ঘসে ঘসে সমস্ত অবয়বটা অতি মসৃণ করে তোলা হতো। তারপর কয়েকটা স্তরের রঙের আস্তরণ দেওয়া হতো। সবশেষে আসল রঙ বসানো হতো। আমি ঘুরে ঘুরে এই সব কাজ দেখতাম। আর বিকেল বেলা হাদিস পার্কের তালসুপারী গাছগুলোর তলায় বসে থাকতাম। তালসুপারী গাছগুলোর ফলগুলো অনেক সময় হাতের নাগালে পেতাম। সবুজ সবুজ কাঁচা ফল হাত দিয় ছিঁড়ে ওপরের সবুজ আস্তরণ ছিঁড়ে ফেললে সাদা সুপারীর মতো ছোট বাদাম মতো শাঁস পাওয়া যেতো আমি ঐ শাঁস চিবিয়ে চিবিয়ে খেলাম। প্রায় স্বাদহীন কষাটে শাসগুলো আমার খুব ভাল লাগতো খেতে!
এক দিন সন্ধ্যের পর বাসায় আসতে মা আমাকে বললে, ‘যাও গোছল খানা থেকে ভাল করে হাত-পা ধুয়ে এসো।‘
অন্য দিন সন্ধ্যের আগে গোছল খানা থেকে হাত-পা ধুতে আমার অসুবিধা হতো না। কারণ চারপাশে আলো থাকে। সে দিন সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে, গোছল খানার সামনে গিয়ে দেখি ঘরের আলো নেই! সারা গোছল খানা গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। আমার কেমন ভয় লাগলো। আমি মাকে বললাম, ‘আপনিও চলেন।‘ আমার ইচ্ছে মা পাশে থাকলে আমার ভয় লাগবে না!
মা আমার কথায় পাত্তা না দিয়ে ধমক দিয়ে বললেন, ‘যাও।‘
আমি কোন রকমে ভিতরে ঢুকে কোন দিকে হাত দেবো – কোথায় মগ সব উল্টে-পালটে গেল। আমি আবার চেঁচিয়ে বললাম, মা এদিকে আসো।
মা বাইরে থেকে বললেন, এই তো আমি আছি। হাত-পা-মুখ ধুয়ে নাও।
কিন্তু এক মুহূর্তের মধ্যে আমার সারা শরীরে এক অদ্ভুত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। আমি চিকার করে উঠলাম, মা আসো!
মা উত্তর দিলেন না।
আমি আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে বিকট চিৎকার করে অন্ধকার ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলাম!
বাড়ির সবাই চারদিক থেকে গোছলখানার সামনে ছুটে চলে এলো ঘটনাটা শুতে বয়স্করা মাকে বলতে থাকলেন ছেলেটা ভয় পেয়েছে। ওকে একা ভেতরে না যেতে বললেই ভাল হতো!
আমার আজও অন্ধকারে একা ভয় লাগে। খুন ভয় লাগে। কোন বিদ্যে, কোন জ্ঞান, কোন বিচক্ষণতা, কোন অটো-সাজেশন, কোন যুক্তি, কোন কিছুই কাজ করে না আমার ওপর!
অন্ধকার হলেই সেই গোছল খানার নিকষ কালো অন্ধকারের কথা মনে পড়ে, সেই ছবিটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। আমার বয়স ছিল এগারো বছর। ও বাসার আমার বয়সী বা ছোটরা সবাই এই অন্ধকারে অভ্যস্ত ছিল। ওদের কাছে এই অন্ধকার কোন ব্যাপারই ছিল না। কলকাতার ঝলমলে শহর আর ঝলমলে বাসার আলোয় অভ্যস আমি সেদিন আতঙ্কিত হয়ে মনে হয় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যেতাম।
ভয় বা আতঙ্ক আসলেই খুব খারাপ জিনিষ!
আমার স্ত্রী মারা গিয়েছেন আজ চার বছর দুই মাস।
আমি সেই ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারী থেকে একেবারে একা।
সারা বাড়িতে, সারা ঢাকা শহরে আমি একা!
সাত শ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটটাতে আমি সম্পূর্ণ একা থাকি – সকাল থেকে দুপুর, বিকাল থেকে রাত! নিজের খাবার নিজে রাঁধি, নিজের কাপড় নিজে কাচি, সারা বাড়িতে নিঃসঙ্গ— একা শুয়ে থাকি সারা রাত!
Friends
Ali Nur Voice
@safoodtrvelblog
Gazi Md Raihan Uddin
@raihantito
হামীম ফারুক
@gfhamimgmail-com
NURNOBI JIBON
@nurnobi
রায়হান
@arm302099
অরণ্য সৌরভ
@oronnoshowrov
Nehal Nibir
@nehalnibir
Joinal Ali
@joinalali
Umayer Abdullah
@umayerabdullah