-
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে শুধু ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে। আমাদের নওদাবাস গ্রামের তেমনই এক চিরস্মরণীয় চরিত্র ‘কালীশঙ্কর’। তাঁর মুখের ভুলভাল উচ্চারণ আমাদের হাসাতো ঠিকই, কিন্তু তাঁর নিখুঁত দায়িত্ববোধ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আজো আমাদের কাঁদায়। প্রকৃতির এই আপনভোলা মানুষটির গল্প নিয়ে আমার নতুন লেখা— ‘কালীশঙ্কর’।
আশা করি গল্পটি আপনাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেবে।”
কালীশঙ্কর
মানিক কুমার সাঁজোয়াললালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার পূর্ব নওদাবাস গ্রাম। এই গ্রামের ধুলোবালি, মেঠো পথ আর বটতলার আড্ডায় আজও একটি নাম প্রতিধ্বনিত হয়— কালীশঙ্কর। তিনি ছিলেন প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। জন্মগতভাবে পাগল তকমা পেলেও, তাঁর মতো আপন আর নিখুঁত মানুষ খুব কমই দেখা গেছে এই তল্লাটে।
কালীশঙ্করের পৃথিবীটা ছিল শব্দের এক গোলকধাঁধা। তিনি যা বলতে চাইতেন, মুখ দিয়ে বের হতো ঠিক তার উল্টো কিছু। পাশের ইউনিয়নের গেন্দুকুড়ি গ্রামে ছিল তাঁর শ্বশুরবাড়ি, কিন্তু কালীশঙ্করের মুখে তা হয়ে যেত “ঘন্টুকুড়ি”। শ্বশুরবাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলেই লাজুক হেসে বলতেন, “শুরশুরবাড়ী!”
এলাকার মানুষ তাঁর এই বিকৃত উচ্চারণ শুনে হাসত, মজা নিত, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকত অগাধ ভালোবাসা। গ্রামের জটিয়ার বাড়িতে ভাত খেলে তিনি বলতেন, চুদিয়ার ” বাড়িত ভাত খাইছোঁ।” কেউ যখন কৌতূহল ভরে জিজ্ঞেস করত, “কিরে কালীশঙ্কর, কী দিয়া ভাত খাইলি?” গম্ভীর মুখে উত্তর আসত, “গুতা দিয়া!” (আসলে তিনি মাংস বা গোশত বোঝাতে চাইতেন)। লোকে তখন হেসে কুটিপাটি হয়ে বলত, “কইরে, কাকে গুতা দিলি?” তিনি তখন ফাসফাস শব্দে আপন মনে রহস্যময় এক হাসি দিতেন। সেই হাসিতে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক স্বর্গীয় প্রশান্তি।
কালীশঙ্কর ছিলেন গ্রামের মানুষের অলিখিত অভিভাবক। কারো বাড়িতে বাজার পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে ভারী কোনো কাজ— কালীশঙ্কর আছেন তো সব ঠিক। তাঁর দায়িত্ববোধ ছিল পাথরের মতো শক্ত। একবার কেউ কোনো জিনিস তাঁর জিম্মায় দিলে, যমদূত এলেও তা ছিনিয়ে নিতে পারত না। অথচ তাঁর নিজের কোনো চাহিদা ছিল না। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পারিশ্রমিক? একবেলা এক থালা ভাত। কোনোদিন ভাত না জুটলে বাজারের দোকানের একটু সওদা আর এক কাপ চা— তাতেই তিনি তুষ্ট।
সবসময় তাঁর কোমরে পলিথিনে মোড়ানো থাকতো তামাকের (আলোয়া) ডিব্বা। ওটাই ছিল তাঁর একমাত্র বিলাসিতা। নিজের ঘরবাড়ি ছিল, স্ত্রী-সন্তান ছিল, কিন্তু সংসারের কাজ তাঁর ধাতে সইত না। তিনি কাজ করতেন সবার জন্য, বিলিয়ে দিতেন নিজেকে অন্যের উপকারে। এক রাতে প্রলয়ংকরী ঝড়ে পুরো এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে গেল। সকালে দেখা গেল, কালীশঙ্করের ভাঙা ঘরের চাল উড়ে গেছে, সারা গা ভিজে একাকার। অথচ তাঁর মুখে কোনো অভিযোগ নেই। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপকেও তিনি প্রশান্ত মনে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন।
ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কখনো কখনো তাকে বিরক্ত করত, পরনের কাপড় ধরে টান দিত। তখন তিনি আত্মসম্মান রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠতেন। লাঠি হাতে তেড়ে যেতেন ঠিকই, কিন্তু কোনোদিন কারো গায়ে হাত তোলেননি। পরক্ষণেই আবার কচি কাঁচাদের সাথে মিশে যেতেন পরম মমতায়। মানুষ নিজের দুঃখ-কষ্ট ভুলে কালীশঙ্করের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেই যেন হালকা হয়ে যেত। তিনি ছিলেন এক জীবন্ত মানসিক প্রশান্তির আধার।
একদিন প্রকৃতির সেই অমোঘ নিয়মে বার্ধক্য তাঁকে জাপটে ধরল। কালীশঙ্কর চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। আজ নওদাবাস গ্রামের বাতাসে তাঁর সেই বিকৃত উচ্চারণের ডাক আর শোনা যায় না। কিন্তু গ্রামের প্রতিটি মানুষের অন্তরে তিনি রয়ে গেছেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে।
কালীশঙ্কর হয়তো ঠিকমতো শব্দ উচ্চারণ করতে পারতেন না, কিন্তু তিনি যেটা পারতেন তা হলো— নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে ভালোবাসতে। পরপারে তাঁর আত্মা শান্তিতে থাকুক, এই প্রার্থনাই করি।
Friends
সিরাজুল ইসলাম
@sherajulislam
Santo Mon
@santomon
Ariba Mehzabin Yeana
@aribamehzabin
Md. Jahangir Alam
@md-jahangiralam
Nusrat jahan Sadia
@nusratjahansadia
shimul gupta
@shimulgupta
Abbas Ali
@abbasali
মাসুদ আহম্মেদ
@masudahmmed800gmail-com
Eqbal Hossain
@eqbalhossain