-
শিরোনাম- আমার বাচ্চা খায় না
কলমে- রহমান সুমন
তারিখ- ১৪ আগস্ট ২০২৬শিরোনামের এই ৪টা শব্দের পেছনে লুকিয়ে থাকা একটা জাতীয় মহামারী*
রাত ১টা।
ঘুম আসছে না। ফোন হাতে ইউটিউব ঘাঁটছি।
হঠাৎ সামনে আসলো একটা ভিডিও।৬ মাসের একটা বাচ্চা। গায়ে ছোট্ট একটা রোম্পার। সামনে কাঠের হাইচেয়ার। প্লেটে সেদ্ধ আলু, ডিমের কুসুম, এক টুকরো কলা।
বাচ্চাটা নিজে নিজে হাত দিয়ে খাবার তুলছে। মুখে লেগে যাচ্ছে, টেবিলে পড়ছে। তবুও মা পাশের সোফায় বসে বই পড়ছে। একবারও দৌড়ে আসছে না। একবারও বলছে না “ধ করো মা, প্লিজ।৩০ সেকেন্ডের ভিডিও। কমেন্টে লাখ লাখ লাইক।
So independent! BLW baby goals!আর আমি?
আমার ৪ বছরের ছেলেটা পাশের রুমে। টিভিতে বেন-টেন চলছে। আমি এক হাতে ভাতের বাটি, অন্য হাতে চামচ। পিছে পিছে ঘুরছি।
“বাবা আর একটা লোকমা… কার্টুন অফ করে দিব কিন্তু… প্লেন আসতেছে…”ভিডিওটা বন্ধ করে দিলাম। বুকের ভেতর কেমন যেন হু হু করে উঠলো।
আমরা কি করছি?
সমস্যাটা আসলে “খাওয়া” না, অভ্যাস
আমরা ভাবি বিদেশী বাচ্চারা জন্ম থেকেই গপাগপ খায়। না ভাই।
ওদেরও শেখানো হয়। ৬ মাস বয়স থেকেই।
ওদের মায়েরা ৩টা জিনিস করে যেটা আমরা করি না:বাচ্চাকে নিজে খেতে দেয়ধ হাত নোংরা হবে, খাবার নষ্ট হবে জেনেও দেয়। কারণ ওরা জানে এটাই শেখার রাস্তা।
ক্ষুধার উপর ভরসা করে-এক বেলা না খেলে পরের বেলা ঠিকই খাবে। মাঝে চিপস-বিস্কুট দিয়ে ক্ষুধা মারে না।
খাবারের সময় স্ক্রীন নিষিদ্ধ। খাওয়ার সময় শুধু খাওয়াই। কাক, কার্টুন, গল্প কিছু না।
এই কথা বললেই অনেক মা রেগে যান।
“আপনি বোঝবেন না আপু। আমার বাচ্চা না খেয়ে থাকে।”
হ্যাঁ, বুঝি। আমিও মা।কিন্তু চলেন আজকে একটু অন্য ছবি দেখি।
২।যে ছবিগুলো আমরা দেখতে চাই না। এগুলো গুগল থেকে নেয়া ছবি না। এগুলো বাস্তবতা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার একটা বাচ্চা। হাতে এক টুকরো রুটি। বালির উপর বসে খাচ্ছে। এক দানা যেন নিচে না পড়ে সেদিকে খেয়াল। আফ্রিকার একটা ২ বছরের বাচ্চা। মায়ের পুরনো প্লেটে একটু ভাত। নিজে হাতে মেখে খাচ্ছে।
আমাদের দেশের বস্তির একটা বাচ্চা। রাস্তার পাশে বসে। সামনে একটা কলা। খোসা ছাড়িয়ে খুব যত্নে খাচ্ছে।ওদের না আছে হাইচেয়ার, না আছে ৫ পদের তরকারি। না আছে টিভি।
তবুও ওরা খায়। কারণ ওরা জানে ক্ষুধা কি জিনিস। ওরা জানে খাবার নষ্ট করা মানে কি। আর সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার কি জানেন?
আমাদের অনেকের ৮-১০ বছরের বাচ্চাও এখনও নিজে প্লেট ধরে খেতে পারে না। আর ওই বস্তির ২ বছরের বাচ্চাটা দেখবেন কী সুন্দর গুছিয়ে খাচ্ছে।৩। তাহলে দোষটা কার? দোষটা আমাদের ভালোবাসার।
আমরা বাচ্চাকে না খাওয়া” দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা শিখিয়েছি। না খেলে মা কাঁদবে, বাবা রাগ করবে, দাদু গল্প বলবে এটা ওরা ১ বছর বয়সেই বুঝে যায়।
আমরা চাওয়ার আগেই প্লেট ভরে দেই। ক্ষুধা লাগার সময়ই দেই না। তারপর বলি “বাচ্চা খায় না”।
আমরা ধর্ম মানি। সব ধর্মেই বলা আছে খাবারের শুকরিয়া করো, অপচয় করো না। কিন্তু আমরা নিজেরাই বাচ্চার প্লেটের অর্ধেক খাবার ডাস্টবিনে ফেলি। তারপর বলি স্কুলের বাচ্চা খাবার নষ্ট কর।৪। সমাধান কি নেই? আছে। কিন্তু কঠিন।
১। ক্ষুধা লাগতে দিন- নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দিন। না খেলে তুলে নিন। ২ ঘন্টা পর আবার দিন। মাঝে নাস্তা অফ।
২. স্ক্রীন ব্যান-খাবার টেবিলে মোবাইল-টিভি নো। প্রথম ১ সপ্তাহ কষ্ট হবে। তারপর বাচ্চাই অভ্যস্ত হয়ে যাবে।
৩। নিজে খেতে দিন-প্রথমে ঘর নোংরা হবে। জামা নষ্ট হবে। হতে দিন। এভাবেই ওর মোটর স্কিল, ব্রেইনের ডেভেলপমেন্ট হবে।
৪। তুলনা বন্ধ করুন- পাশের বাসার বাচ্চা ১ কেজি বেশি — এই টেনশন বাদ দিন। বাচ্চা সুস্থ আর একটিভ থাকলেই হলো।শেষ কথা- এটা শুধু পেটের ব্যাপার না
আজকে যে বাচ্চাটা “মাংস নাই কেন, খাবো না” বলে চিৎকার করছে,
সেই বাচ্চাটাই ১৫ বছর পর বলবে মা, কি রান্না করেছো? এটা খাওয়া যায়?আমরা ছোটবেলায় ওকে শিখিয়েছি, তোর চাহিদাই শেষ কথা।
ওর সামনে আমরা খাবারকে টেকেন ফর গ্র্যান্টেড বানিয়ে ফেলেছি।তাই আমার বাচ্চা খায় না”এটা একটা রোগ না।
এটা একটা আয়না। আমাদের প্যারেন্টিং, আমাদের লাইফস্টাইল, আমাদের কৃত্রিমতার আয়না।
সিদ্ধান্তটা আপনার।
কারণ একদিন এই বাচ্চাই আপনার শেষ বয়সের লাঠি হবে। সেদিন সে আপনাকে শ্রদ্ধা নিয়ে ভাত বাড়বে, নাকি বিরক্তি নিয়ে — সেটা আজকে আপনি ঠিক করবেন।3 Comments
Friends
Md Amanot Sheikh
@mdamanotsheikh
Md Sheerajul Islam
@alibababtv
shah moazzam
@shahmoazzam
sordar alom
@sordaralom
Mullick Md. A. khaleque
@mullickmd-a-khaleque
প্রিন্স হাওলাদার
@prince-howlader
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor


ভালো লাগল আপনার বিশ্লেষণমূলক এভং দরকারী লেখা। একবার দেখেছিলাম, রেড ইন্ডিয়ানরা বাচ্চাদেরকে যদি দেখে আগুনের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, তারপরেও না করত না, কারণ ওরা জানত, আগুনে হাত পুড়ে যাবার যন্ত্রণা থেকেই বাচ্চারা শিখবে… এরকম একটা ব্যাপার।