Profile Photo

নীরব মোস্তফাOffline

  • বিচার চাই
    নীরব মোস্তফা

    ওয়াসীমুদ্দিন মুসলিম ছাত্রাবাসের পুকুর পাড়ের ১০২ নাম্বার রুমটিতে আমার বসবাস। গত বর্ষায় হলের জানালার পাশে একটি আমের বিচি রেখেছিলাম। কিছুদিন হল দেখিলাম এটা অঙ্কুরোদগম হয়ে পাতা ছড়িয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে প্রতিদিন পানি দিতাম। গাছটি আস্তে আস্তে বড় হতে লাগিল। আমার খুব আনন্দ লাগিত। গাছটির প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মাতে লাগিল। যত বড় হচ্ছে তত ভালোবাসা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিন ক্লাস থেকে ফিরে এসে দেখি একটা ছাগল এসে গাছটি খেয়ে ফেলল। শুধু গুড়ি থেকে মূল কান্ডটি রইল। প্রেমিকা হারানোর মত কষ্ট পেয়ে ছিলাম। আমিও হাল ছাড়ার পাত্র না। ঐদিন বিকেলে বড় বাজার থেকে জাল কিনে নিয়ে আসলাম। চতুর্দিকে বেড়া দিয়ে আবার পরিচর্যা শুরু করলাম।

    দুই বছরে গাছটি অনেক বড় হয়ে গেল। বন্ধুরা বলতে লাগল এত যত্ন করলে কিতা অইব ফল কিন্তু অন্যরাই খাইব। আমি খুশি হইতাম। কারণ কেউ না কেউ তো পাবেই তাতেই আমি খুশি। হলে সকালের মেনু ছিল আলু ভর্তা আর ডাল। প্রতিদিন একগুঁয়েমি লাগত। তবে এখন খুব মিস করি। প্রায়ই ডিম ভাজি খেয়ে টিউশনে যেতাম। লাইফে সবচেয়ে বাজে টিউশন ছিল হারুয়া মোড়ে সুমি ম্যানশনে। এত কৃপন আর বাজে লোক কখনো পাইনি। একদিন ঘুম থেকে ওঠে দেখিলাম গাছের নীচে অনেক মানুষের ভীড়। ব্রাশ করতে করতে গিয়ে অবলোকন করিলাম নিশাদ অনশন করেছে। হাতে একটা “নুসরাতের বিচার চাই” লেখা প্ল্যাকার্ড।

    মনটা গরম তেলে ভাজা পপকর্নের মত ফেটে গেল। আমার কিছু বুঝিতে বাকি রহিল না। অবশ্যই গত রাতে তাদের মাঝে মনোমালিন্যতা হয়েছে। ভালোবাসা এমনিই। যে ভালোবাসায় যত বেশি অভিমান সেই ভালোবাসা তত গভীর। নিশাদ একটা রোমান্টিক ছেলে। তাকে আমি লাভার বয় বলে ডাকিতাম। তাছাড়া ইংরেজি সাহিত্যে পড়া ছেলেগুলো এমনিতেই রোমান্টিক হয়। যখনি আমরা তার সাথে মজা করিতাম তখনি সে বলিত, প্লিজ লেট মি লাভ টু নুসরাত। তবে তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল কম। ছেলেদের প্রকাশভঙ্গি এমনই। তাদের প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকে কম কিন্তু গভীরতা থাকে অনেক বেশি। আর এই জিনিসটাই মেয়েরা বুঝতে চায় না।

    আমায়িক ও চটপটে ছেলে সে। খুবই গোছালো ও পরোপকারী। বললেই ভালো ডিমান্ডের টিউশন পেয়ে যেতাম। সবাই জানিতাম নুসরাতের সকল ব্যয়ভার বহন করিত। ড্রেস আপ, শিক্ষা খরচ, মোবাইল খরচ, হাত খরচ এভরিথিং সে বহন করত। মনে হত এখনি সংসার পাতা শুরু করেছে। মাঝেমধ্যে নুসরাত কে বলিতাম, তুমি এত প্রেসার দাও কেন? হেসে হেসে সে বলিত, ছেলেদের দায়িত্ব নিতে হয়। এখন থেকেই সে দায়িত্ব কি জিনিস বুঝুক। নিশাদ একটা টিউশনের টাকা সম্পূর্ণ তাকে দিয়ে দিত। নুসরাত প্রায়ই নিশাদকে নব’র আব্বু বলে ডাকিত। এমনকি তার মেসেন্জারেও নিক নেইম ছিল ওটা। তাদের খুব ইচ্ছে ছিল একটা ফুটফুটে ছেলে সন্তান হবে নাম রাখিবে নব। আমি ছিলাম ডাক পিয়ন। উভয়ের চিঠি আমি খুলে পড়তাম। একবার একটা চিরকুট পড়ে খুব মজা পেয়েছিলাম। পার্কে গিয়ে নিশাদ বড় একটা অপরাধ করেছিল। সেদিন নুসরাত খুব লজ্জা পেয়েছিল। তবে তারা বিশ্বাস করিত আমার দ্বারা তাদের কোন ক্ষতি হবে না।

    কয়েকদিনের মধ্যেই ক্যাম্পাসে তারা লাইলী-মজনুর মত বিখ্যাত হয়ে গেল। এত সাবলীল ছিল তাদের প্রেম দেখে অনেকেই আফসোস করত। শুনিলাম নুসরাতের নন ক্যাডার এক ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে। হিসাববিজ্ঞানের ছাত্রী ছিল সে। জীবনের সমীকরণটা কীভাবে মিলিয়েছে আমার বোধগম্য হচ্ছে না। সুন্দরী মেয়েদের বেশি অহংকার আর জেদ থাকে। এজন্যই তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে। তবে কাউকে ইচ্ছে করে ঠকিয়ে কেউ সুখী হতে পারে না। সেদিন শেক্সপিয়রের ফ্র‍্যালটি দ্যাই নেইম ইজ উইমেন এই কথাটির যথার্থ অনুধাবন করিতে পারিলাম। মেয়েদের মন বুঝা অনেক কঠিন কাজ। সেদিনের পর থেকে মেয়েদের উপর আমার একটা বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হয়েছে। এই দুঃখে মাঝে মাঝে চিরকুমার হতে সাধ জাগে। কিছু কিছু মেয়ে সর্বদা বেটার অপশন খুঁজে। আর পেয়ে গেলে অতীতের সব প্রতিশ্রুতি ও পরিস্থিতি খুব সহজেই গিলে ফেলে। দুনিয়াটা আসলে এমন কেন! বেটার অপশন পেলেই কি বেটার ভালোবাসা পাওয়া যায় !

    আমি আম গাছটাকে যেভাবে তিলে তিলে বড় করেছি, নিশাদের ভালোবাসাটা ঠিক এমনই ছিল। নিশাদ যেদিন সরকারি জব পেয়েছিল সেদিন নুসরাত এসে আমাদের সবাইকে পার্টি দিয়েছিল। প্রথম বর্ষে তার লাইফটা খুবই এলেমেলো ছিল। প্রায়ই পাগলা মসজিদের পিছনে গিয়ে কি যেন টানত। তার বাবা নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে তাকে খরচ দিত। নিজেও টিউশন করে অনেক টাকা আয় করত। একদিন এসে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল তাকে বুঝানোর জন্য। আমি নিজেই তার প্রেমটা জমিয়ে দিয়েছিলাম। সুন্দর একটা মনের বদৌলতে নিশাদ সহজ, সরল জীবন পেয়েছিল। দিনের ১৮ টি ঘণ্টায় থাকত তারা একসাথে হয়ত সরাসরি অথবা ভার্চুয়ালী। আমার খুব কান্না পায় নিশাদ ছেলেটা কখন কি করে ফেলে! হয়ত তার পরিবার শুনলেও কষ্ট পাবে কারণ সে ছিল পরিবারের সবচেয়ে ছোট। অভাব কি জিনিস তাকে কেউ বুঝতে দেয় নি। নিশাদ কীভাবে পারবে একটা স্বাভাবিক জীবন লিড করতে। মাঝ রাস্তায় ফেলে যাওয়া নুসরাতের কাজটা একদম ঠিক হয় নি। উভয় পরিবারই তাদের সম্পর্কের বিষয়টা জানিত। এমনকি নুসরাত নিজেই তার বাবার কাছে আবদার করেছিল। মানুষ কীভাবে পারে এতটা বেঈমান হতে!

    এজন্যই কবি বলেছেন, নারীর অপর নাম ছলনাময়ী। সাতাশটি বছর কেটে গেল কাউকে বিশ্বাস করতে পারিলাম না। এক নজর না দেখে যে রুম থেকে বের হত না, অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রতিরাতে ঘুম পাড়ানির গান শুনাত। অপছন্দের সব আকাঙ্ক্ষা বিলীন করে দিত। সবাইকে এক পাল্লায় আর ভালোলাগার মানুষ কে অপর পাল্লায় রেখে সম্মান করত। এত বিশ্বাস আর স্যাক্রিফাইসের পরেও নুসরাতের কাছে কম মনে হত। কেন জানি তার কাছে কেয়ারলেস ও অপমান লাগত। ভালোবাসা এমনই। সর্বদা কম মনে হবে। কখনো পরিতৃপ্তি আসবে না। যতই পাবে তার চেয়ে বেশি পাবার প্রবণতা থাকবে। আজ সবই মিথ্যা বাহানা!

    তিল তিল করে বেড়ে ওঠা আম গাছটি যেভাবে একটা বড় গাছ হয়েছে তেমনি নুসরাত নিশাদের সম্পর্কটাও এভাবেই এত দূর চলে আসছে। নিজকে আর সংযত করতে পারিলাম না। নিশাদের শ্লোগানের সাথে তাল মিলিয়ে আমিও বলিলাম, আমিও নুসরাতের বিচার চাই। সমস্বরে সবাই বলিয়া ওঠিল আমরাও বিচার চাই। আমরা মিছিল করিতে করিতে কলেজ গেইটে গিয়ে প্রত্যেকের ক্লাসে চলিয়া গেলাম। জানিনা এই পৃথিবীতে তার বিচার হবে কি না। কারণ এই পৃথিবীতে মানুষের মন ভাঙার বিচার হয় না। তবে একদিন বিচার হবে।

    3
    4 Comments
    • আম গাছের বেড়ে ওঠার সাথে প্রেমের সম্পর্কের তুলনাটা দারুণ! মজা পেলাম

    • পাশাপাশি দুটা ধারা বহমান। বর্ণনাটাও অন্যধরণের সাবলীল – বেশ ভালো লাগল লেখাটা। শুভেচ্ছা নিন।

    • আপনার লেখাটি পড়ে খুব মায়া লাগল, জীবনের এমন তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো অনেক সময় আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। ভালোবাসা হারিয়ে যাওয়ার কষ্টটা আপনি যেভাবে আমগাছের সাথে তুলনা করেছেন, তা বেশ হৃদয়স্পর্শী ছিল। আশা করি সময় আপনার মনের সব ক্ষত দ্রুত সারিয়ে তুলবে।

    • আপনার লেখনীর “তিল তিল করে বেড়ে ওঠা আম গাছটি যেভাবে একটা বড় গাছ হয়েছে তেমনি নুসরাত নিশাদের সম্পর্কটাও এভাবেই এত দূর চলে আসছে” লাইনটিতে আবেগের এক দারুণ প্রতিফলন ফুটে উঠেছে, আর আপনি চাইলে প্রিয় এই আম গাছটির বেড়ে ওঠার সাথে মানুষের অনুভূতির মিল নিয়ে আরও গভীরে গিয়ে কিছু নতুন দৃশ্য যোগ করার কথা ভেবে দেখতে পারেন। আপনি চমৎকার গল্প বলেন, তাই আপনার কলম সচল রাখুন।

Friends

Skip to toolbar