Profile Photo

Intisar JabedOffline

  • intisarjabed
  • Profile picture of Intisar Jabed

    Intisar Jabed

    11 hours, 44 minutes ago

    শেষ পয়সার দান

    চট্টগ্রাম শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে নদীর পাড়ে ছোট্ট গ্রাম চরপাড়া। এখানে ১০০ ঘর মানুষের বাস।

    রহিমের বয়স ১২। ক্লাস সিক্সে পড়ে। বাবা করিম মিয়া শহরে রিকশা চালায়। প্রতিদিন ভোর ৫টায় বের হয়, রাত ১০টায় ঘামে ভেজা শরীরে ফেরে। কোনোদিন ৪০০ টাকা, কোনোদিন ২০০ টাকাও হয় না।

    মা আয়েশা বেগম ৩ বাড়িতে রান্নার কাজ করে। মাসে ৬০ টাকা। তার অর্ধেক যায় ছোট বোন রুমার ডাক্তার আর ওষুধের পেছনে। রুমার বয়স ৫। জন্ম থেকেই শ্বাসকষ্ট।

    তাদের ঘরটা টিনের। বৃষ্টি হলে ফুটা দিয়ে পানি পড়ে। তবুও রহিম পড়াশোনায় ফার্স্ট। শিক্ষকরা বলে, “এই ছেলে একদিন বড় হবে।”

    রোজ স্কুলে যাওয়ার সময় বাবা পকেট থেকে কচলে যাওয়া ১০ টাকার নোটটা দেয়। বলে, “বাবা, কিছু খেয়ে নিস।” ওই ১০ টাকাই রহিমের সারাদিনের ভরসা।

    আষাঢ় মাস। ৭ দিন ধরে বৃষ্টি। পাশের নোয়াগাঁও গ্রাম নদীর পানিতে তলিয়ে গেল। ২০০টা পরিবার গাছের উপর, স্কুলের ছাদে আশ্রয় নিয়েছে। খাবার নাই, পানি নাই, বাচ্চারা জ্বরে কাঁপছে।

    সোমবার অ্যাসেম্বলিতে হেডস্যার মাইকে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন,
    “আমরা মানুষ। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে হয়। ক্লাস টিচারের কাছে সাহায্য জমা দাও। ১ টাকা হলেও দাও।”

    টিফিনের সময়। ক্যান্টিনে হইচই। সোহান ৫০ টাকার নোট উড়িয়ে বলল, “স্যার, আমারটা আগে নেন।” সবাই হাততালি দিল।

    রহিম পকেটে হাত দিল। ১০ টাকার নোটটা ঘামে ভিজে গেছে। একবার ভাবল কলা কিনবে। পেটে খুব ক্ষুধা। আবার ভাবল, “ওই গ্রামের রুমার বয়সী বাচ্চাটা না খেয়ে আছে।”

    কাঁপতে কাঁপতে টাকাটা বাক্সে ফেলে দৌড়ে ক্লাসে চলে গেল। সারাদিন পানি খেয়ে থাকল।

    বিকালে রেজাল্ট। স্যার লিস্ট পড়লেন। “সর্বোচ্চ দাতা সোহান – ৫০ টাকা। করতালি।”
    রহিমের নামও ছিল লিস্টের একদম শেষে – “রহিম – ১০ টাকা”। কেউ শোনেও নি।

    বাড়ি ফিরে রহিম খাটের নিচে মুখ লুকিয়ে কাঁদল। মা বুঝে গেল।
    মা বলল, “কাঁদিস কেন রে পাগল?”
    রহিম বলল, “মা, আমার দান কি মূল্যহীন? আমি না খেয়ে দিয়েছি, তবু কেউ দেখল না।”

    মা উনুনে ভাত বসাতে বসাতে বলল, “শোন। একবার নবীজির কাছে এক সাহাবী একটা খেজুর দান করেছিল। আরেকজন ১০০ উট দান করেছিল। নবীজি বলেছিলেন, খেজুর দাতার সওয়াব বেশি। কারণ সে তার সবটুকু দিয়ে দিয়েছে। বাবা, তুই তোর সবটুকু দিয়েছিস। এটাই বড় দান।”

    ১৫ দিন পর। স্কুলে পত্রিকা এলো। “বন্যা দুর্গতদের জন্য সাহায্য: ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা উঠেছে।”
    লিস্টে সোহানের নাম বড় করে। আর সবার নিচে ছোট করে “রহিম – ১০”।

    সেই রাতেই দরজায় কড়া। গ্রাম থেকে ৮ কিলোমিটার হেঁটে এসেছেন ৬৫ বছরের নূর আলী চাচা। তার গায়ে কাদা, পায়ে কাটা।

    হাতে ২টা ব্যাগ। একটাতে চাল-ডাল-আলু। আরেকটাতে একটা পুরনো ডায়েরি।
    নূর চাচা বললেন, “বাবা রহিম, আমার নাতি জুয়েল। বয়স তোমার মতো। বন্যার ৩ দিন সে শুধু পানি খেয়ে ছিল। তোমাদের স্কুলের টাকায় আমরা যে চাল পেয়েছি, তার প্রথম ভাতটা জুয়েল খেয়েছে। আর বলেছে, ‘দাদু, যে ১০ টাকা দিয়েছে সে নিশ্চয়ই আমার মতোই ছোট।'”

    ডায়েরিটা রহিমের হাতে দিয়ে বললেন, “এটা আমার ছেলের। সে দুবাই থাকে। প্রতি মাসে টাকা পাঠায়। বলেছে এই টাকা তোমার বোনের চিকিৎসার জন্য। ৫০ হাজার টাকা। আর এখানে আমার জমানো ২০ হাজার।”

    রহিমের বাবা পায়ে ধরে কাঁদলেন। বললেন, “চাচা, আমরা গরিব। এত টাকা নিতে পারব না।”
    নূর চাচা বললেন, “গরিব তো আমরাও ছিলাম। তোমার ছেলে আমাদের বড়লোক বানিয়ে দিয়েছে। মানুষ বানিয়েছে।”

    দেখতে দেখতে ৫ বছর। রহিম এখন ক্লাস টেনে। স্কুলে ফার্স্ট বয়।
    নূর চাচার দেওয়া টাকায় রুমার অপারেশন হয়েছে। এখন সে দৌড়ে বেড়ায়।

    করিম মিয়া আর রিকশা চালায় না। নূর চাচার ছেলে তাকে দুবাইতে একটা দোকানে কাজ দিয়েছে।

    আর রহিম? সে প্রতি শুক্রবার নোয়াগাঁও গ্রামে যায়। গরিব বাচ্চাদের পড়ায়। সাথে ১০ টাকা করে দেয়। বলে, “এটা তোমার টিফিনের টাকা।”

    গত মাসে রহিম একটা রচনা লিখে জেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছে। রচনার নাম: “১০ টাকার দাম”

    শেষ লাইনে লিখেছে:
    “সেদিন আমি ১০ টাকা দিয়েছিলাম। আজ আমি বুঝেছি, আমি ১০ টাকা দেইনি। আমি আমার মনুষ্যত্ব দিয়েছিলাম। আর বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে একটা পরিবার, একটা গ্রাম আর একটা স্বপ্ন ফিরিয়ে দিয়েছেন।”

    1
    1 Comment
    • গল্পটা পড়ে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি, বিশেষ করে “আমি ১০ টাকা দেইনি, আমি আমার মনুষ্যত্ব দিয়েছিলাম” – এই লাইনটা কলিজা ছুঁয়ে গেল। আপনার শেয়ার করা লেখাটি পড়ে হৃদয়টা অনেক প্রশান্তিতে ভরে উঠল।

Friends

Skip to toolbar